শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “কুরুশ্রেষ্ঠ বিদুর যিনি ভগবদ্ভক্তিতে পূর্ণরূপে নিষ্ণাত ছিলেন, এইভাবে সুরধুনী গঙ্গার উৎসস্থলে (হরিদ্বার) পৌছে অগাধ জ্ঞানসম্পন্ন মহর্ষি মৈত্রেয়কে উপবিষ্ট অবস্থায় দর্শন করলেন। সৌম্যতায় পরিপূর্ণ এবং দিব্য গুণাবলীর প্রভাবে পরিতুষ্ট বিদুর যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন- ‘হে মহর্ষি! এই জগতে সকলেই জড় সুখভোগের জন্য সকাম কর্মে লিপ্ত হয়, কিন্তু তার ফলে তাদের জড় সুখও লাভ হয় না অথবা দুঃখেরও নিবৃত্তি হয় না, পক্ষান্তরে তাদের অধিক থেকে অধিকতর দুঃখই লাভ হয়। তাই আপনি দয়া করে আমাদের বলুন, প্রকৃত সুখ লাভের জন্য কিভাবে আমাদের জীবনযাপন করা কর্তব্য। হে প্রভু! বহিরঙ্গা শক্তির প্রভাবে কৃষ্ণ-বহির্মুখ, অধর্মপরায়ণ, অত্যন্ত দুঃখ-দুর্দশাগ্রস্থ ব্যক্তিদের অনুগ্রহ করবার জন্য পরোপকারী মহাপুরুষেরা ভগবানের প্রতিনিধিরূপে এই মর্ত্যলোকে পরিভ্রমণ করেন। অতএব, হে সাধুশ্রেষ্ঠ! আপনি আমাদের সেই অপ্রাকৃত ভগবদ্ভক্তির বিষয়ে উপদেশ দান করুন, যার ফলে সকলের হৃদয়ে বিরাজমান পরমেশ্বর ভগবান সম্পূর্ণরূপে আরাধিত হয়ে, কৃপাপূর্বক অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বেদ এবং পুরাণের প্রামাণিক আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান, যা তিনি কেবল তাঁর শুদ্ধ ভক্তদেরই দান করেন, তা যেন আমাদের কাছে প্রকাশ করেন। হে মহর্ষি! সম্পূর্ণরূপে স্বতন্ত্র, নিস্পৃহ, ত্রিলোকের অধীশ্বর এবং সমস্ত শক্তির নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান কিভাবে অবতরণ করে এই জগৎ সৃষ্টি করেন এবং তা পালনের জন্য সকলের জীবিকা নির্বাহ করেন, আপনি দয়া করে তা বর্ণনা করুন। তিনি তাঁর হৃদয়াকাশে শয়ন করেন এবং এইভাবে সমস্ত সৃষ্টিকে সেই স্থানে স্থাপন করে তিনি বিভিন্ন যোনিতে প্রকাশিত বহু জীবরূপে নিজেকে বিস্তার করেন। তাঁকে তাঁর ভরণপোষণের জন্য কোন রকম প্রচেষ্টা করতে হয় না, কেননা তিনি সমস্ত যোগশক্তির অধীশ্বর এবং সব কিছুর অধিপতি। এইভাবে তিনি সমস্ত জীব থেকে পৃথক। ব্রাহ্মণ, গাভী এবং দেবতাদের কল্যাণ সাধনের জন্য, যে ভগবান বিভিন্ন রূপে অবতরণ করেন, তাঁর অমৃতময় চরিতাবলী আপনি আমাদের কাছে দয়া করে বর্ণনা করুন। তাঁর অপ্রাকৃত কার্যকলাপ নিরন্তর শ্রবণ করা সত্ত্বেও আমাদের মন কখনও পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয় না। সমস্ত রাজাদের পরম রাজা বিভিন্ন গ্রহলোক এবং বাসস্থান নির্মাণ করেছেন, যেখানে জীব তাদের প্রবৃত্তি ও কর্ম অনুসারে অবস্থান করছে। ভগবানই সেই সমস্ত স্থানের রাজা এবং শাসকদের সৃষ্টি করেছেন। হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ! কৃপা করে আমাদের বলুন কিভাবে বিশ্বস্রষ্টা, স্বয়ংসম্পূর্ণ নারায়ণ বিভিন্ন জীবের স্বভাব, কর্ম, রূপ, আকৃতি এবং নাম সৃষ্টি করেছেন। হে প্রভু! আমি ব্যাসদেবের মুখ থেকে মানবসমাজের উচ্চতর এবং নিম্নতর জাতির ধর্ম সম্বন্ধে বার বার শ্রবণ করেছি এবং এই সমস্ত অকিঞ্চিৎকর বিষয় শ্রবণ করে তৃপ্ত হয়েছি, কিন্তু কৃষ্ণকথামৃত পানে তৃপ্ত হইনি। যাঁর চরণকমল সমস্ত তীর্থস্থানের সমষ্টি এবং যিনি মহান ঋষিগণ ও ভক্তগণ কর্তৃক পূজিত, সেই পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা পর্যাপ্তরূপে শ্রবণ না করে, কে তৃপ্ত হতে পারে? এই সমস্ত বিষয় কেবল কর্ণরন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করার মাধ্যমে, যে কেউ ভববন্ধন ও পারিবারিক আসক্তি ছেদন করতে পারে। আপনার সখা মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস পূর্বেই তাঁর মহান রচনা মহাভারতে ভগবানের দিব্য গুণাবলীর বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার প্রকৃত অভিপ্রায় ছিল জনসাধারণের অর্থ ও কাম বিষয়ক গ্রাম্য কথা শ্রবণ করার তীব্র প্রবণতার মাধ্যমে, তাদের মনোযোগকে কৃষ্ণকথার (ভগবদ্গীতা) প্রতি আকৃষ্ট করানো। যিনি নিরন্তর কৃষ্ণকথা শ্রবণ করতে উৎসুক, তিনি ক্রমশ অন্য সমস্ত বিষয়ের প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়েন। যে ভক্ত নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণর শ্রীপাদপদ্ম স্মরণ করার ফলে দিব্য অনন্দ আস্বাদন করেছেন, তাঁর সব রকম দুঃখ-কষ্ট অচিরেই পরাভূত হয়।”
“হে মহর্ষি! যে সমস্ত মানুষ তাদের পাপকর্মের ফলে হরিকথায় বিমুখ এবং তার ফলে মহাভারতের তাৎপর্য (ভগবদ্গীতা) সম্বন্ধে অজ্ঞ, তারা শোচনীয়দেরও শোচনীয়। তাদের জন্য আমিও শোক করি, কেননা আমি দেখছি কিভাবে তারা দার্শনিক বাক্বিতন্ডায় জীবনের লক্ষ্য সম্বন্ধে নানা রকম মতবাদ সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন প্রকার অর্থহীন আচার অনুষ্ঠানের অনুশীলন করে শাশ্বত কালের প্রভাবে তাদের আয়ু ক্ষয় করছে। হে আর্তবন্ধু মৈত্রেয়! ভ্রমর যেভাবে ফুল থেকে মধু আহরণ করে, তেমনই আপনিও সমস্ত কথার সারভূত পবিত্র কীর্তি শ্রহিরির কথাই সারা জগতের মঙ্গলের জন্য আমাদের কাছে কীর্তন করুন। এই বিশ্বের উৎপত্তি ও পালনের জন্য সর্বশক্তিসম্পন্ন হয়ে যিনি অবতরণ করেন, সেই পরম নিয়ন্তা, পরম পুরুষ ভগবানের অতিমানবীয় দিব্য লীলাবিলাসসমূহ আপনি দয়া করে বর্ণনা করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “এইভাবে বিদুর কর্তৃক জিজ্ঞাসিত হয়ে মহর্ষি মৈত্রেয় বিদুরকে বহু প্রশংসা করে সমস্ত মানুষের পরম মঙ্গলের জন্য বলতে শুরু করলেন- ‘হে বিদুর! আপনার জয় হোক। আপনি আমার কাছে যে প্রশ্ন করেছেন তা নিখিল মঙ্গলের চরম প্রকাশ এবং এইভাবে আপনি সমগ্র জগৎ ও আমার প্রতি আপনার কৃপা প্রদর্শন করেছেন, কেননা আপনার মন সর্বদাই ভগবানের অপ্রাকৃত চিন্তায় মগ্ন থাকে।’ ”
“হে বিদুর! আপনি যে একান্তভাবে ভগবানকে লাভ করেছেন, তা মোটেই আশ্চর্যজনক নয়, কেননা আপনি মহর্ষি বেদব্যাসের বীর্য থেকে জন্মগ্রহণ করেছেন। আমি জানি যে, আপনি পূর্বজন্মে প্রজা সংহারক যম ছিলেন, মান্ডব্য মুনির অভিশাপে বিচিত্রবীর্যের ভার্ষাস্বরূপে গৃহীতা দাসীর গর্ভে সত্যবতীপুত্র ব্যাসদেবের বীর্যে আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন। আপনি পরমেশ্বর ভগবানের নিত্য পার্ষদ এবং ভগবান তাঁর স্বধামে ফিরে যাওয়ার সময়, আপনার জন্য আমার কাছে নির্দেশ রেখে গিয়েছেন। তাই আমি আপনার কাছে ভগবান কিভাবে এই জগতের সৃষ্টি, পালন এবং সংহারের জন্য তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তি বিস্তার করে লীলাবিলাস করেন তা একে একে বর্ণনা করব।”
“সমস্ত জীবের প্রভু পরমেশ্বর ভগবান অদ্বয়রূপে সৃষ্টির পূর্বে বিরাজমান ছিলেন। তাঁর ইচ্ছার প্রভাবেই কেবল সৃষ্টি সম্ভব হয় এবং পুনরায় সব কিছু তার মধ্যে লীন হয়ে যায়। এই পরম আত্মা বিভিন্ন নামে উপলক্ষিত হন। সব কিছুর একচ্ছত্র অধীশ্বর পরমেশ্বর ভগবান ছিলেন একমাত্র দ্রষ্টা। সেই সময় জড় জগৎ ছিল না এবং তাই তিনি তাঁর অংশ এবং বিভিন্নাংশ ব্যতীত নিজেকে অপূর্ণ বলে অনুভব করেছিলেন। বহিরঙ্গা প্রকৃতি তখন সুপ্ত অবস্থায় ছিল, যদিও তাঁর অন্তরঙ্গা প্রকৃতি তখন প্রকাশিত ছিল। ভগবান হচ্ছেন দ্রষ্টা এবং বহিরঙ্গা শক্তি হচ্ছে দৃশ্য, যা জড় সৃষ্টির কারণ এবং কার্য উভয়রূপে ক্রিয়াশীল হয়। হে মহাসৌভাগ্যবান বিদুর! এই বহিরঙ্গা শক্তি মায়া নামে পরিচিত এবং তার মাধ্যমেই কেবল সমগ্র জড় সৃষ্টি সম্ভব হয়। পরমেশ্বর ভগবান পুরুষাবতার রূপে নিজেকে বিস্তার করে ত্রিগুণাত্মিকা জড়া প্রকৃতিতে গর্ভাদান করেন এবং তার ফলে নিত্যকালের প্রভাবে জীবসমূহ আবির্ভূত হয়। তারপর কালের প্রতিক্রিয়ার প্রভাবে মহত্তত্ত¡ আবির্ভূত হয়েছিল এবং এই বিশুদ্ধ সত্ত্বস্বরূপ মহত্তত্ত্বে ভগবান তাঁর স্বীয় শরীর থেকে ব্রহ্মান্ড প্রকাশকারী বীজ বপন করেছিলেন। তারপর ভাবী জীবদের উৎসরূপে মহত্তত্ত্ব বিভিন্নরূপে রূপান্তরিত হয়েছিল। মহত্তত্ত্ব তমোগুণ প্রধান এবং তার থেকে অহঙ্কারের উদ্ভব হয়। এই সৃষ্টিতত্ত্বের চেতনা সমন্বিত এবং ফলপ্রসু হওয়ার কাল সমন্বিত পরমেশ্বর ভগবানের একটি অংশ। মহত্তত্ত্ব বা মহান কারণিক সত্য অহঙ্কারে রূপান্তরিত হয়, যা কারণ, কার্য এবং কর্তা এই তিন পর্বে প্রকাশিত হয়। এই সমস্ত কার্যকলাপ মানসিক স্তরে সম্পাদিত হয় এবং এগুলির ভিত্তি হচ্ছে পঞ্চ মহাভূত, স্থূল ইন্দ্রিয়সমূহ ও মানসিক জল্পনাকল্পনা। সত্ত্ব, রজ এবং তম এই তিনটি গুণে অহঙ্কার প্রকাশিত হয়। সত্ত¡গুণের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার ফলে অহঙ্কার মনে রূপান্তরিত হয়। যে সমস্ত দেবতারা প্রকাশ্যমান জগতের নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরাও সেই একই তত্ত্ব থেকে, অর্থাৎ অহঙ্কার এবং সত্ত্বগুণের প্রতিক্রিয়া থেকে উৎপন্ন হয়েছেন। ইন্দ্রিয়গুলি নিশ্চিতভাবে রাজস অহঙ্কার থেকে উদ্ভূত। আর তাই, জল্পনা-কল্পনা ভিত্তিক দার্শনিক জ্ঞান এবং সকাম কর্ম প্রধানত রজোগুণ থেকে উৎপন্ন হয়। আকাশ শব্দের পরিণাম এবং শব্দ তামসিক অহঙ্কারের রূপান্তর। অর্থাৎ, আকাশ পরমাত্মার প্রতীকাত্মক প্রতিনিধি। তারপর পরমেশ্বর ভগবান আকাশের প্রতি ঈক্ষণ করেন, যা শাশ্বত কাল এবং বহিরঙ্গা শক্তির আংশিক মিশ্রণ এবং তার ফলে স্পর্শ অনুভূতির বিকাশ হয়, যার থেকে আকাশে বায়ুর উদ্ভব হয়। তারপর অত্যন্ত শক্তিশালী বায়ু আকাশের সঙ্গে বিকার প্রাপ্ত হয়ে রূপতন্মাত্র সৃষ্টি করেছে এবং রূপতন্মাত্র থেকে ভুবন প্রকাশক জ্যোতি সৃষ্টি হয়েছে। সেই জ্যোতি যখন বায়ুর সঙ্গে মিলিত হয় এবং পরমেশ্বর ভগবানের দৃষ্টির বিষয়ীভূত হয়, তখন কাল ও মায়ার অংশযোগে রসতন্মাত্র এবং জলের উৎপত্তি হয়েছিল। তারপর জ্যোতি থেকে উদ্ভুত জল ভগবানের দৃষ্টিগোচর হয় এবং তাতে কাল ও মায়ার সহযোগে গন্ধ গুণাত্মিকা পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছিল।”
“হে সজ্জন পুরুষ, সমস্ত ভৌতিক উপাদানসমূহ, আকাশ থেকে মাটি পর্যন্ত সব কটি ভৌতিক উপাদানে প্রকাশিত হয় কেবল পরমেশ্বর ভগবানে দৃষ্টিপাতরূপ অন্তিম স্পর্শের ফলে। উল্লেখিত ভৌতিক উপাদানগুলির নিয়ন্ত্রণকারী দেবতারা ভগবান শ্রীবিষ্ণুর শক্ত্যাবিষ্ট কলা। তাঁরা বহিরঙ্গা শক্তির অধীন শাশ্বত কালের প্রভাবে দেহ ধারণ করেন এবং তাঁরা তাঁর বিভিন্ন অংশ। তাঁদের উপর ব্রহ্মান্ডের বিভিন্ন কার্যকলাপের ভার অর্পন করা হয়েজিল এবং সেগুলি সম্পাদন করতে অক্ষম হয়ে তাঁরা কৃতাঞ্জলিপুটে পরমেশ্বর ভগবানের উদ্দেশ্যে মনোমুগ্ধকর প্রার্থনা নিবেদন করেছিলেন।”
দেবতারা বললেন- “হে ভগবান! আপনার চরণারবিন্দ শরণাগত জীবেদের কাছে একটি ছত্রের মতো, যা তাঁদের সংসারের সমস্ত ক্লেশ থেকে রক্ষা করে। সেই আশ্রয়ে আশ্রিত মহর্ষিগণ সমস্ত জড়জাগতিক ক্লেশ দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেন। তাই আমরা আপনার শ্রীপাদপদ্মে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। হে পিতা, হে প্রভু, হে পরমেশ্বর ভগবান! এই জড় জগতে জীবেরা কখনও সুখী হতে পারে না, কেননা তারা ত্রিতাপ দুঃখের দ্বারা অভিভূত। তাই তারা আপনার জ্ঞানে পরিপূর্ণ শ্রীপাদপদ্মের ছায়ার আশ্রয় গ্রহণ করে। আমরাও সেই শ্রীপাদপদ্মের আশ্রয় গ্রহণ করি। ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম সমস্ত তীর্থের আশ্রয়স্বরূপ। নির্মল চিত্ত মহর্ষিরা বেদরূপী পাখার দ্বারা বাহিত হয়ে নিরন্তর আপনার মুখকমলরূপ নীড়ের আশ্রয় অন্বেষণ করেন। তাঁদের কেউ কেউ পাপনাশিনী সরিৎশ্রেষ্ঠা গঙ্গার শরণ গ্রহণ করার মাধ্যমে প্রতিপদে আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করেন। শ্রদ্ধা ও ভক্তি সহকারে কেবল আপনার শ্রীপাদপদ্ম সম্বন্ধে শ্রবণ করার ফলে এবং হৃদয়ে তার ধ্যান করার ফলে, মানুষ তৎক্ষণাৎ জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হয় এবং বৈরাগ্যবলে শান্ত হয়। তাই, আমাদের অবশ্য কর্তব্য হচ্ছে আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করা।”
“হে ভগবান! জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের জন্য আপনি অবতার গ্রহণ করেন, এবং তাই আমরা আপনার শ্রীপাদপদ্মের শরণ গ্রহণ করি, কেননা তা সর্বদা আপনার ভক্তদের স্মৃতি ও অভয় প্রদান করে। হে প্রভু! আত্মীয়স্বজনসহ তুচ্ছ দেহ-গেহাদিতে যাদের ‘আমি’ ও ‘আমার’ এই আবাঞ্ছিত বাসনা প্রবল, সেই সমস্ত মানুষদের দেহপুরে আপনি অন্তর্যামীরূপে অবস্থান করলেও যে পাদপদ্ম তাদের দুষ্প্রাপ্য, আমরা সেই পাদপদ্মকে ভজনা করি। হে পরমেশ্বর ভগবান! যে সমস্ত পাপীদের অন্তর্দৃষ্টি বহিরঙ্গা জড়বাদী কার্যকলাপের ফলে অত্যন্ত দূষিত হয়েছে, তারা আপনার শ্রীপাদপদ্ম দর্শন করতে পারে না, কিন্তু, আপনার লীলার অপ্রাকৃত আনন্দ আস্বাদন করাই যাঁদের একমাত্র লক্ষ্য, সেই শুদ্ধ ভক্তেরা আপনা শ্রীপাদপদ্ম দর্শন করেন। হে প্রভু! যাঁরা তাঁদের ঐকান্তিক মনোভাবের জন্য কেবল আপনার কথামৃত পানে প্রকৃষ্টরূপে বর্ধিত ভক্তির দ্বারা বৈরাগ্যের সারস্বরূপ জ্ঞান লাভ করেন, তাঁরা অচিরেই চিদাকাশে বৈকুন্ঠলোক প্রাপ্ত হন। অন্যেরা, যাঁরা চিন্ময় আত্ম উপলব্ধির প্রভাবে শান্ত হয়েছেন এবং জ্ঞানের শক্তিশালী প্রভাবের দ্বারা প্রকৃতির গুণ জয় করেছেন, তাঁরাও আপনাতে প্রবেশ করেন, কিন্তু তাঁদের কেবল অত্যন্ত ক্লেশই লাভ হয়, অথচ ভক্তেরা কেবল ভগবদ্ভক্তি সম্পাদন করেন এবং তাঁদের এই প্রকার কোন কষ্ট সহ্য করতে হয় না। হে আদি পুরুষ! তাই, আমরা কেবল আপনারই। যদিও আমরা আপনার সৃষ্টি, আমরা প্রকৃতির তিনগুণের প্রভাবে একে এক জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই কারণে আমাদের কার্যকলাপ পরস্পরের থেকে ভিন্ন। তাই, সৃষ্টির পর আপনাকে দিব্য আনন্দ প্রদান করার জন্য আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে কার্য করতে পারিনি।”
“হে অজ! কৃপা করে আপনি আমাদের সেই মার্গ ও সাধন সম্বন্ধে জ্ঞান দান করুন, যা অনুসরণ করার ফলে আমরা আপনার উপভোগের জন্য সমস্ত অন্ন এবং সামগ্রী অর্পণ করতে পারি, যার ফলে আমরা এবং এই জগতের অন্য সমস্ত প্রাণীরা নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারে এবং আপনার জন্য ও আমাদের নিজেদের জন্য জীবনের সমস্ত আবশ্যকতাগুলি অনায়াসে সংগ্রহ করতে পারি। আপনি সমস্ত দেবতাদের এবং বিভিন্ন শ্রেণী-বিভাগের আদি অধিষ্ঠাতা। আপনি পুরাণ পুরুষ এবং অপরিবর্তনীয়। হে ভগবান! আপনার কোন উৎস নেই এবং আপনার থেকে বরিষ্ঠ কেউ নেই। প্রাকৃত জন্মরহিত আপনি আদ্যশক্তি মায়াতে মহত্তত্ত্বরূপ বীর্য আধান করেছেন।”
“হে পরমাত্মা! সৃষ্টির আদিতে মহত্তত্ত্ব থেকে যে কার্যের জন্য আমরা উদ্ভূত হয়েছি, দয়া করে আপনি আমাদের নির্দেশ দিন কিভাবে আমরা আপনার আজ্ঞা পালন করব। দয়া করে আপনি আমাদের পূর্ণ জ্ঞান এবং পূর্ণ শক্তি প্রদান করুন যাতে আমরা আপনার সৃষ্টির বিভিন্ন বিভাগে আপনার অভিলষিত কার্য সম্পাদন করতে পারি।”
পঞ্চম অধ্যায়- বিদুর- মৈত্রেয় সংবাদ
21 May 2025 Leave a comment
in অমল পুরান, তৃতীয় স্কন্ধ- সৃষ্টির স্থিতি