চতুর্থ অধ্যায়- মৈত্রেয় সমীপে বিদুরের গমন

উদ্ধব বললেন- “তারপর, তাঁরা সকলে (বৃষ্ণি এবং ভোজবংশীয়গণ) সেই ব্রাহ্মণদের অনুমতিক্রমে ভোজন সমাপন করে মদিরা পান করেছিলেন। তার ফরে তাঁরা সকলে হতজ্ঞান হয়ে উন্মত্তের মতো পরস্পরের প্রতি কটুক্তি প্রয়োগ করে পরস্পরের মর্ম স্পর্শ করেছিলেন। বাঁশের ঘর্ষণের ফলে যেমন বিনাশ সংঘটিত হয়, তেমনই সূর্য অস্তগত হলে সুরাপানে তাঁদের সকলের চিত্ত বিকৃত হয়েছিল এবং তাঁদের বিনাশ সাধন হয়েছিল। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির প্রভাবে (তাঁর বংশের) গতি দর্শন করে সরস্বতী নদীর তীরে গিয়েছিলেন এবং আচমন করে একটি বৃক্ষের মূলে উপবেশন করেছিলেন। ভগবান শরণাগতের দুঃখ-দুর্দশা হরণ করেন। তাই, তাঁর স্বীয় বংশ ধ্বংসসাধন করার ইচ্ছা করে, তিনি পূর্বেই আমাকে বদরিকা আশ্রমে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।”
“হে শত্রুদমনকারী বিদুর! তাঁর যদুবংশ ধ্বংসের অভিপ্রায় অবগত হওয়া সত্ত্বেও, প্রভুর শ্রীপাদপদ্ম দশর্ন-বিচ্ছেদের দুঃখ সহনে অসমর্থ হয়ে, আমি তাঁর অনুগমন করেছিলাম। এইভাবে তাঁকে অনুসরণ করে, আমার সংরক্ষক এবং প্রভু ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সরস্বতী নদীর তীরে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে, একাকী উপবিষ্ট অবস্থায় আমি দর্শন করেছিলাম। যদিও তিনি লক্ষ্মীদেবীর আশ্রযস্বরূপ, তবুও তিনি নিরাশ্রয়ভাবে সেখানে বিরাজ করছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীবিগ্রহ উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ এবং সচ্চিদানন্দময়। তাঁর নেত্রদ্বয় প্রশান্ত এবং প্রভাত সূর্যের মতো অরুণবর্ণ। তাঁর চতুর্ভুজ ও বিভিন্ন প্রকার লক্ষণ এবং পীতবর্ণ কৌশেয় বস্ত্রের দ্বারা আমি তৎক্ষণাৎ চিনতে পেরেছিলাম যে, তিনিই হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তিনি একটি নবীন অশ্বত্থ বৃক্ষে পৃষ্টদেশ রেখে, বাম ঊরুর উপরে দক্ষিণ পাদপদ্ম স্থাপন করে উপবিষ্ট ছিলেন। যদিও তিনি সর্বপ্রকার গৃহসুখ ত্যাগ করেছিলেন, তবুও তাঁকে আনন্দপূর্ণ বলে মনে হয়েছিল। তখন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের সুহৃৎ ও সখা মহাভাগবত মৈত্রেয় ঋষি ত্রিভুবন পর্যটন করতে করতে যদৃচ্ছাকৃমে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।”
শ্রীভগবানের প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত মৈত্রেয় মুনি প্রসন্ন চিত্তে ভগবানের কথা শ্রবণ করছিলেন। তখন শ্রদ্ধায় তাঁর মস্তক অবনত হয়েছিল। ভগবৎ কথা শ্রবণপরায়ণ সেই মুনির সম্মুখে ভগবান মুকুন্দ অনুরাগ ও হাস্যযুক্ত দৃষ্টির দ্বারা আমার শ্রান্তি অপনোদন করে বলতে লাগলেন- হে বসু! পুরাকালে যখন অষ্ট বসু এবং অন্যান্য দেবতারা ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকার্য বিস্তারের জন্য যজ্ঞ করেছিলেন, তখন তুমি আমার সঙ্গ লাভের বাসনা করেছিলে। তোমার অন্তরে অবস্থান করে তোমার মনের সেই বাসনা আমি জানতে পেরেছিলাম। অন্যদের জন্য যদিও তা দুষ্প্রাপ্য, কিন্তু আমি তোমাকে তা দান করেছি। হে সাধো! তোমার সমস্ত জন্মের মধ্যে বর্তমান জন্মই চরম জন্ম, কেননা তুমি এই জন্মে আমার কৃপালাভ করেছ। এখন তুমি এই মর্তলোক পরিত্যাগ করে আমার দিব্য ধাম বৈকুন্ঠে গমন করতে পার। তোমার ঐকান্তিক ভক্তির প্রভাবে সৌভাগ্যক্রমে এই নির্জন স্থানে তুমি আমার দর্শন লাভ করলে। হে উদ্ধব! পুরাকালে পদ্ম কল্পে, সৃষ্টির প্রারম্ভে আমার নাভিপদ্মে অবস্থিত ব্রহ্মাকে আমি আমার অপ্রাকৃত মহিমা বর্ণনা করেছিলাম, মনীষিগণ তাকেই শ্রীমদ্ভাগবত বলেন।”
উদ্ধব বললেন- “হে বিদুর! পরমেশ্বর ভগবান কর্তৃক এইভাবে অনুগৃহীত হয়ে এবং তাঁর সাদর উক্তি শ্রবণ করে গভীর আবেগে আমার কন্ঠ রুদ্ধ হয়েছিল এবং শরীরে রোমাঞ্চিত হয়েছিল। তখন আমি আমার অশ্রু মুছে কৃতাঞ্জলিপুটে তাঁকে এই রকম বলেছিলাম- ‘হে প্রভু! যে ভক্ত আপনার শ্রীপাদপদ্মের অপ্রাকৃত প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত, তাঁর কাছে ধর্ম, অর্থ, কাম এবং মোক্ষ চতুর্বর্গের মধ্যে কোনটিই দুর্লভ নয়। কিন্তু হে মহান! আমি কেবল আপনার চরণারবিন্দের প্রেমময়ী সেবাতেই যুক্ত হতে চাই। হে প্রভু! আপনি যে নিষ্ক্রিয় হওয়া সত্ত্বেও কর্ম করেন, জন্মরহিত হয়েও জন্ম স্বীকার করেন, কালের নিয়ন্তা হওয়া সত্ত্বেও শত্রুভয়ে পলায়ন করেন ও দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং আত্মরতি হয়েও বহু স্ত্রী পরিবৃত হয়ে গৃহস্থ আশ্রম স্বীকার করেন- এই সমস্ত বিষয়ের সমাধান করতে গিয়ে বিদ্বান ঋষিদেরও বুদ্ধি সংশয়ের দ্বারা খিন্ন হয়। হে প্রভু! কালের দ্বারা অখন্ডিত, অন্তহীন জ্ঞান সমন্বিত এবং সংশয়রহিত হওয়া সত্ত্বেও আপনি যে আমাকে ডেকে এনে আমার পরামর্শ গ্রহণ করতেন, আপনি মোহপ্রাপ্ত না হয়েও যে, মোহাচ্ছনের মতো এই সব আচরণ করতেন, তা আমাকে বিমোহিত করেছে। হে প্রভু! আপনি আপনার নিজের রহস্য প্রকাশ করে, যে পরম গুহ্য জ্ঞান ব্রহ্মাকে বলেছিলেন, তা যদি আমাদের গ্রহণের যোগ্য বলে মনে করেন, তাহলে কৃপা করে তা ব্যাখ্যা করুন। তা শ্রবণ করলে আমরা আনায়াসে সংসার দুঃখ অতিক্রম করতে পারব। আমি যখন পরমেশ্বর ভগবানকে আমার হৃদয়ের বাসনার কথা বলেছিলাম, তখন কমলনয়ন ভগবান আমাকে তাঁর অপ্রাকৃত স্থিতি সম্বন্ধে উপদেশ দিয়েছিলেন। আমি আমার গুরু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে পরম তত্ত্বজ্ঞানের পন্থা অধ্যয়ন করে, তাঁর শ্রীপাদপদ্মে প্রণাম ও তাঁকে প্রদক্ষিণপূর্বক বিরহকাতর চিত্তে এখানে উপস্থিত হয়েছি। হে প্রিয় বিদুর! তাঁর দর্শন-আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে আমি এখন উন্মত্তের মতো হয়েছি এবং সেই বেদনা অপনোদনের জন্য, আমি এখন সঙ্গ লাভের জন্য হিমালয়ের বদরিকা আশ্রমে যাচ্ছি, যে সম্বন্ধে তিনিই আমাকে উপদেশ দিয়েছিলেন। সেই বদরিকা আশ্রমে ভগবান নর এবং নারায়ণ নামক ঋষিরূপে অবতরণ করে সমস্ত সৎ জীবাত্মাদের কল্যাণের জন্য দীর্ঘকাল ধরে কঠোর তপস্যা করছেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “উদ্ধবের কাছ থেকে বিদ্বান বিদুর তাঁর আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবদের বার্তা শ্রবণ করে, দিব্য জ্ঞানের দ্বারা তাঁর অসহ্য শোক প্রশমিত করেছিলেন। ভগবানের শেষ্ঠ ভক্ত উদ্ধব যখন বদরিকা আশ্রমে চলে যাচ্ছিলেন, তখন কুরুশ্রেষ্ঠ বিদুর তাঁর প্রতি স্নেহ এবং বিশ্বাসবশত এই কথাগুলি বলেছিলেন- ‘হে উদ্ধব! যেহেতু ভগবানের সেবকেরা অন্যদের সেবা করার জন্য সর্বত্র বিচরণ করেন, তাই ভগবান স্বয়ং যে জ্ঞান আপনাকে প্রদান করেছেন, সেই আত্ম-তত্ত্বজ্ঞান কৃপাপূর্বক বর্ণনা করা আপনার পক্ষে সর্বতোভাবে উপযুক্ত।’ ”
শ্রীউদ্ধব বললেন- “আপনি মহর্ষি মৈত্রের কাছে জ্ঞান প্রাপ্ত হতে পারেন, যিনি নিকটেই অবস্থান করছেন এবং যিনি দিব্যজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার ফলে পূজনীয়। এই মর্ত্যলোক ত্যাগ করার ঠিক পূর্বে ভগবান স্বয়ং তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “হে রাজন্! যমুনার তীরে বিদুরের সঙ্গে ভগবানের দিব্য নাম, যশ, গুণ ইত্যাদি সম্বন্ধে আলোচনা করে উদ্ধব গভীর শোকে অভিভূত হয়েছিলেন। সেই রাত্রিটি যেন মুহূর্তের মতো অতিবাহিত হয়েছিল। তারপর তিনি সেখান থেকে প্রস্থান করেছিলেন।”
রাজা জিজ্ঞাসা করলেন- “সমস্ত বীর যোদ্ধাদের দলপতিদের দলপতি বৃষ্ণি এবং ভোজবংশীয়েরা ব্রহ্মশাপে বিনষ্ট হলে, ত্রিলোকের অধীশ্বর ভগবান শ্রীহরিও তখন তাঁর লীলা সংবরণ করেছিলেন, তাহলে কেবল উদ্ধব কিভাবে অবশিষ্ট রইলেন?”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী উত্তর দিলেন- “হে রাজন্! ব্রাহ্মণের অভিশাপ ছিল কেবল একটি ছলনামাত্র, প্রকৃতপক্ষে ভগবানের পরম ইচ্ছাই তাঁর লীলা সংবরণের প্রকৃত কারণ ছিল। সংখ্যায় অত্যন্ত পরিবর্ধিত তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভগবদ্ধামে প্রেরণ করার পর, তিনি স্বয়ং পৃথিবী ত্যাগ করতে ইচ্ছুক হয়ে, এইভাবে চিন্তা করেছিলেন। আমি এই জড় জগতের দৃষ্টি থেকে অপ্রকট হলে, আমার শ্রেষ্ঠ ভক্ত উদ্ধবই কেবল আমার সম্বন্ধীয় তত্ত¡জ্ঞান সম্যক্‌ভাবে অবগত হওয়ার যোগ্য হবেন। উদ্ধব আমার থেকে কোন অংশেই কম নয়, কেননা তিনি কখনও জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত নন। তাই তিনি ভগবৎ তত্ত্বজ্ঞান বিতরণ করার জন্য এই জগতে অবস্থান করুন।”
শুকদেব গোস্বামী মহারাজ পরীক্ষিৎকে বলেছিলেন যে, “সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের উৎস এবং ত্রিলোকের গুরু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে উদ্ধব বদরিকা আশ্রমতীর্থে উপস্থিত হয়েছিলেন, এবং ভগবানের সন্তুষ্টিবিধানের জন্য সমাধিমগ্ন হয়েছিলেন। পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণের এই জড় জগতে আবির্ভাব এবং তিরোভাব সম্বন্ধে বিদুরও উদ্ধবের কাছ থেকে শ্রবণ করেছিলেন, যে বিষয়ের অনুসন্ধান মহর্ষিরা অত্যন্ত অধ্যবসায় সহকারে করে থাকেন। ভগবানের মহিমান্বিত কার্যকলাপ এবং এই জড় জগতে তাঁর অলৌকিক লীলাবিলাসের জন্য বিভিন্ন প্রকার অপ্রাকৃত রূপ গ্রহণ, তাঁর ভক্ত ব্যতিত অন্য কারোর পক্ষে বোঝা অত্যন্ত কঠিন এবং অধীর-চিত্ত, পশু-স্বভাব ও ভগবৎ বহির্মুখ পাষন্ডদের জন্য তা কেবল মানসিক যন্ত্রণার কারণ। শ্রীকৃষ্ণ যে এই জগৎ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁকে স্মরণ করেছিলেন, সেই কথা মনে করে প্রেমে বিহ্বল হয়ে, বিদুর উচ্চস্বরে রোদন করতে লাগলেন। হে কুরুশ্রেষ্ঠ! পরম ভাগবত বিদুর কয়েকদিন যমুনার তটে বাস করার পর, গঙ্গার তীরে গমন করেছিলেন, যেখানে মহর্ষি মৈত্রেয় বিরাজ করছিলেন।”

Leave a Reply

May 2025
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits