প্রথম অধ্যায়- বিদুরের প্রশ্ন

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “মহান ভগবদ্ভক্ত বিদুর তাঁর সমৃদ্ধশালী গৃহ ত্যাগপূর্বক বনে প্রবেশ করে ভগবৎ কৃপামূর্তি ঋষি মৈত্রেয়কে এই প্রশ্ন করেছিলেন। পান্ডবদের গৃহের কথা আর কি বলার আছে? পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁদের মন্ত্রীর কার্য করেছিলেন। তিনি তাঁদের গৃহকে নিজের মতো বলে মনে করে সেখানে প্রবেশ করতেন এবং তিনি দুর্যোধনের প্রাসাদ সম্পূর্ণরূপে অবহেলা করেছিলেন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামীকে মহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন- “কোথায় এবং কখন মহাত্মা বিদুরের সঙ্গে মহাভাগবত মৈত্রেয় ঋষির সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং তাঁদের মধ্যে কি আলোচনা হয়েছিল? হে প্রভু, দয়া করে আপনি তা আমাদের কাছে বর্ণনা করুন। মহাত্মা বিদুর ছিলেন ভগবানের একজন মহান শুদ্ধ ভক্ত এবং তাই ভগবৎ কৃপামূতি ঋষি মৈত্রেয়ের কাছে তাঁর প্রশ্নগুলি ছিল অবশ্যই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, সর্বোচ্চ স্তরের এবং বিজ্ঞজন কর্তৃক অনুমোদিত।”
শ্রীসূত গোস্বামী বললেন- “মহর্ষি শুকদেব গোস্বামী ছিলেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং মহারাজ পরীক্ষিতের প্রতি তিনি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছিলেন। রাজা কর্তৃক এইভাবে জিজ্ঞাসিত হয়ে, তিনি তাঁকে বলেছিলেন, “অনুগ্রহ করে মনোযোগ সহকারে সেই বিষয়ে শ্রবণ করুন।”
শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “রাজা ধৃতরাষ্ট্র তার অসৎ পুত্রদের পাপবাসনা চরিতার্থ করার প্রচেষ্টার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অন্তদৃষ্টিহীন হয়ে পড়েছিল এবং তার ফলে সে তার পিতৃহীন ভ্রাতুষ্পুত্র পান্ডবদের জতুগৃহে প্রবেশ করিয়ে দগ্ধ করতে উদ্যত হয়েছিল। দেবতুল্য রাজা যুধিষ্ঠিরের মহিষীর কেশাকর্ষণ করার নিন্দনীয় কার্য থেকে ধৃতরাষ্ট্র তার পুত্র দুঃশাসনকে নিবারণ করেনি, যদিও দ্রৌপদীর নেত্রজল তাঁর বক্ষঃস্থলের কুমকুম বিধৌত করেছিল। অজাতশত্রু যুধিষ্ঠির কপট দ্যুতক্রীড়ায় অন্যায়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন। কিন্তু, যেহেতু তিনি ছিলেন সত্যপ্রতিজ্ঞ, তাই তিনি বনে গিয়েছিলেন। যথাসময়ে বন থেকে ফিরে এসে তিনি যখন তাঁর রাজ্যের ন্যায়সঙ্গত অংশভাগ ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য প্রার্থনা করেন, তখন মোহাচ্ছন্ন ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। অর্জুন কর্তৃক জগদ্‌গুরু শ্রীকৃষ্ণ যখন কৌরবসভায় প্রেরিত হয়েছিল এবং যদিও তাঁর বাণী কেউ কেউ (ভীষ্ম আদি) বিশুদ্ধ অমৃতের মতো শ্রবণ করেছিলেন, কিন্তু পুণ্যক্ষয় হওয়াতে অন্যরা তা শ্রবণ করতে পারেননি। রাজা (ধৃতরাষ্ট্র অথবা দুর্যোধন) শ্রীকৃষ্ণের বাক্য বহুমানন করেনি। বিদুর যখন তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা (ধৃতরাষ্ট্র) কর্তৃক মন্ত্রণার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর গৃহে গিয়ে তাঁকে যে সদুপদেশ দিয়েছিলেন তা সুদক্ষ মন্ত্রিবিশারদ এবং রাজনীতিবিদ্‌রা অতি উৎকৃষ্ট বলে বিবেচনা করেন।”
বিদুর বলেছিলেন- “আপনার অন্যায়ের ফলে দুর্বিষহ যাতনা যে অকাতরে সহ্য করছে, সেই অজাতশত্রু যুধিষ্ঠিরের ন্যায্য রাজ্যভাগ আপনি তাকে ফিরিয়ে দিন। সে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতাদের সঙ্গে অপেক্ষা করছে, যাদের মধ্যে রয়েছে প্রতিশোধপরায়ণ ভীম, যে সাপের মতো দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করছে। অবশ্যই আপনি তার ভয়ে ভীত। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথার পুত্রদের তাঁর আত্মীয়রূপে স্বীকার করেছেন এবং পৃথিবীর সমস্ত রাজারা শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে রয়েছেন। তাঁর গৃহে তিনি তাঁর পরিবারবর্গ, যদুবংশীয় রাজা ও রাজপুত্রগণসহ বিরাজ করছেন, যাঁরা অসংখ্য রাজাদের জয় করেছেন এবং তিনি হচ্ছেন তাঁদের সকলের প্রভু। আপনি মূর্তিমান পাপস্বরূপ দুর্যোধনকে আপনার প্রিয় পুত্ররূপে পালন করছেন, কিন্তু সে কৃষ্ণবিদ্বেষী এবং যেহেতু আপনি এইভাবে একজন কৃষ্ণবিদ্বেষীকে পালন করছেন, তাই আপনি সমস্ত মঙ্গলজনক গুণাবলী হারিয়েছেন। যত শীঘ্র সম্ভব এই লক্ষ্মীছাড়াকে পরিত্যাগ করে আপনি সমস্ত বংশের মঙ্গল সাধন করুন।”
“যাঁর চরিত্রের গুণাবলী সমস্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিগণ বহুমানন করেন সেই বিদুর যখন এইভাবে বলছিলেন, তখন দুর্যোধন ক্রোধোদ্দীপ্ত হয়ে কম্পিত অধরে তাঁকে অপমান করেছিল। দুর্যোধন তখন কর্ণ, তার কনিষ্ঠ ভ্রাতাগণ ও তার মামা শকুনিসহ পরিবৃত ছিল। এই দাসীপুত্রকে এখানে কে ডেকে এনেছে? এ এতই কুটিল যে, যাদের অন্নে পুষ্ট হয়েছে, তাদেরই বিপক্ষতা আচরণে প্রবৃত্ত হয়ে শত্রুর সাহায্যার্থে নিযুক্ত হয়েছে। একে এখনি প্রসাদ থেকে নির্বাসিত করা হোক এবং তার শ্বাসমাত্র যেন সে তার সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে।”
“এইভাবে কর্ণভেদী বাণের মতো তীক্ষ্ণ বাক্যে মর্মাহত হয়ে বিদুর দ্বারে তাঁর ধনুক রেখে তাঁর ভ্রাতার প্রাসাদ পরিত্যাগ করলেন। ভগবানের মায়ার খেলা বলে মনে করে তিনি তাতে কিছুমাত্র ব্যথিত হননি। বিদুর তাঁর পুণ্যফলের প্রভাবে কৌরবদের পুণ্যার্জিত সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। হস্তিনাপুর ত্যাগ করার পর, তিনি ভগবানের শ্রীপাদপদ্মস্বরূপ বহু তীর্থস্থানের আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন। যে সমস্ত তীর্থস্থানে ভগবানের শত সহস্র চিন্ময় বিগ্রহ অধিষ্ঠিত, অতি উন্নত স্তরের পূণ্য সঞ্চয়ের বাসনায় তিনি সেই সমস্ত তীর্থপর্যটন করেছিলেন। তিনি অযোধ্যা, দ্বারকা, মথুরা আদি বিভিন্ন তীর্থস্থানে কেবল শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করতে করতে একাকী ভ্রমণ করেছিলেন। পুণ্যময় ও নিষ্কলুষ উপবন, পর্বত, কুঞ্জ, নদী, সরোবর এবং যে সমস্ত পুণ্যস্থানে ভগবান অনন্তের বিগ্রহসমূহ মন্দির অলঙ্কুত করে বিরাজমান, সেই সমস্ত স্থানে তিনি বিচরণ করতে লাগলেন। এইভাবে তিনি তীর্থপর্যটন করেছিলেন। পৃথিবী পর্যটন করার সময় তিনি কেবল ভগবান শ্রীহরির সন্তুষ্টিবিধানের ব্রত পালন করেছিলেন। তাঁর বৃত্তি ছিল পবিত্র ও স্বতন্ত্র। যদিও তাঁর বেশ ছিল অবধূতের মতো এবং ভূমি ছিল তাঁর শয্যা, তবুও পবিত্র তীর্থে স্নান করার ফলে তিনি সর্বদা পবিত্র ছিলেন। এইভাবে তিনি তাঁর আত্মীয়স্বজনদের অগোচর ছিলেন। এইভাবে ভারববর্ষের সমস্ত তীর্থপর্যটন করতে করতে তিনি প্রভাসক্ষেত্রে এসে উপস্থিত হলেন। সেই সময় মহারাজ যুধিষ্ঠির শ্রীকৃষ্ণের সহায়তায় পৃথিবীর একচ্ছত্র সম্রাটরূপে এক সামরিক শক্তির অধীনে পৃথিবী শাসন করেছিলেন। প্রভাসতীর্থে উপস্থিত হয়ে তিনি শুনতে পেলেন যে, বাঁশের ঘর্ষণের ফলে উৎপন্ন আগুনে যেমন সমস্ত বন দগ্ধ হয়, তেমনি পরস্পরের বিরোধানলে তাঁর সমস্ত স্বজনবর্গ বিনষ্ট হয়েছে। তারপর তিনি পশ্চিমবাহিনী সরস্বতী নদীর অভিমুখে গমন করলেন। সরস্বতী নদীর তীরে এগারোটি তীর্থ রয়েছে, যথা- (১) ত্রিত, (২) উশনা, (৩) মনু, (৪) পৃথু, (৫) অগ্নি, (৬) অসিত, (৭) বায়ু, (৮) সুদাস, (৯) গো, (১০) গুহ ও (১১) শ্রাদ্ধদেব। বিদুর সেই সমস্ত তীর্থ ভ্রমণ করে যথাবিধি ধর্মীয় অনুষ্ঠান করেছিলেন। এছাড়া মহান ঋষি ও দেবতাগণ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণুর আরোও অনেক মন্দির ছিল। এই সমস্ত মন্দির ভগবানের প্রধান চিহ্নসমূহের দ্বারা অঙ্কিত ছিল এবং সেগুলি সর্বদাই মানুষকে আদিপুরুষ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কথা মনে করিয়ে দেয়।”
“তারপর সমৃদ্ধিশালী সৌরাষ্ট্র প্রদেশ, সৌবীর, মৎস্য ও পশ্চিম ভারতের কুরুজাঙ্গল নাম রাজ্যসমূহ অতিক্রম করে যখন তিনি যমুনার তীরে উপনীত হলেন, তখন সেখানে শ্রীকৃষ্ণের মহান ভক্ত উদ্ধবের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তারপর তিনি গভীর প্রেম ও অনুভূতি সহকারে শ্রীকৃষ্ণের পার্ষদ, প্রশান্তমূর্তি ও বৃহস্পতির প্রখ্যাত পূর্বশিষ্য উদ্ধবকে আলিঙ্গন করলেন। বিদুর তারপর তাঁকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পরিবার পরিজনদের সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন। ভগবানের নাভিপদ্মজাত ব্রহ্মার অনুরোধে যে সনাতন পুরুষদ্বয় এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন এবং যাঁরা সকলের মঙ্গলসাধন করে পৃথিবীর সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করেছেন, তাঁরা (শ্রীকৃষ্ণ-বলরাম) শূরসেনের গৃহে স্বচ্ছন্দে আছেন তো? হে উদ্ধব! কুরুকুলের পরম হিতৈষী, আমাদের ভগিনীপতি বসুদেব ভাল আছেন তো? তিনি অত্যন্ত উদার। তাঁর ভগ্নীদের প্রতি তিনি পিতৃবৎ স্নেহপরায়ন এবং তিনি সর্বদা তাঁর পত্নীদের সন্তোষবিধান করেন। হে উদ্ধব! যদুদের সেনানায়ক এবং পূর্বজন্মে যিনি ছিলেন কামদেব, সেই প্রদ্যুম্ন এখন কেমন আছেন? রুক্মিনী ব্রাহ্মণদের সন্তুষ্টিবিধান করে তাঁদের কৃপায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে তাঁকে পুত্ররূপে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। হে বন্ধু! সাত্বত, বৃষ্ণি, ভোজ ও দাশার্হদের অধিপতি মহারাজ উগ্রসেন এখন ভাল আছেন তো? তিনি রাজসিংহাসনের সমস্ত আশা পরিত্যাগ করে দূরদেশে অবস্থান করেছিলেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে পুনরায় রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। হে সৌম্য! সাম্ব ভাল আছেন তো? তাঁর রূপ ঠিক শ্রীকৃষ্ণের মতো। পূর্বজন্মে শিবপত্নী অম্বিকার গর্ভে কার্তিকেয়রূপে তাঁর জন্ম হয়েছিল এবং এখন এই জন্মে কৃষ্ণমহিষী জাম্ববতী অনেক ব্রত অনুষ্ঠানের ফলে তাঁকে তাঁর পুত্ররূপে লাভ করেছেন। হে উদ্ধব! যুযুধান কুশলে আছেন তো? তিনি অর্জুনের কাছে ধনুর্বিদ্যার রহস্য শিক্ষা করেন এবং তিনি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করে সন্ন্যাসীদেরও দুর্লভ চিন্ময় পদ লাভ করেছেন। শ্বফল্কনন্দন অক্রুর ভাল আছেন তো? তিনি নিষ্পাপ এবং পরমেশ্বর ভগবানের শরণাগত। এক সময় তিনি পথের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্ন দর্শন করে অপ্রাকৃত প্রেমানন্দে ধৈর্ষহারা হয়ে সেই পথের ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছিলেন। বেদ যেমন যজ্ঞবিস্তাররূপ অর্থকে প্রকাশ করেন, তেমনই দেবক-ভোজরাজের কন্যা দেবকী দেবমাতা অদিতির মতো পরমেশ্বর ভগবানকে তাঁর গর্ভে ধারণ করেছিলেন। তিনি (দেবকী) ভাল আছেন তো? অনিরুদ্ধ কুশলে আছেন তো? তিনি সমস্ত শুদ্ধ ভক্তদের সমস্ত বাসনা পূরণকারী এবং অতীত কাল থেকেই তাঁকে ঋগ্বেদের প্রবর্তক বলে বিবেচনা করা হয়। তিনি মনের প্রবর্তক এবং বিষ্ণুর চতুর্থ ব্যূহ। হে সৌম্য! এছাড়া যাঁরা শ্রীকৃষ্ণকেই তাঁদের অন্তরাত্মারূপে জেনে চিরকাল তাঁরই অনুসরণ করেন, সেই হৃদীক, চারুদেষ্ণ, গদ ও সত্যভামার পুত্র- এঁরা সকলে ভাল আছেন তো? মহারাজ যুধিষ্ঠির ধর্ম প্রতিপালন করে এবং ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করে রাজ্যশাসন করছেন তো? পূর্বে দুর্যোধন যুধিষ্ঠিরের প্রতি ঈর্ষায় দগ্ধ হচ্ছিল কেননা তিনি (যুধিষ্ঠির) তাঁর বাহুদ্বয়সদৃশ শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন কর্তৃক সুরক্ষিত ছিলেন। যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে গদা ঘুর্ণন করতে করতে বিচিত্র মার্গে ভ্রমণ করতেন এবং যাঁর গদাঘাত রণভূমি সহ্য করতে পারত না, সেই সর্পের মতো অত্যন্ত ক্রোধপরায়ণ, অজেয় ভীম পাপীদের প্রতি তাঁর দীর্ঘকালের সঞ্চিত ক্রোধ পরিত্যাগ করেছেন তো? যে অর্জুনের বাণের জালে আচ্ছন্ন হয়েও কপট কিরাতবেশধারী শিব তাঁর যুদ্ধনৈপুণ্যে সন্তোষ লাভ করেছিলেন এবং মহারথীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কীর্তিমান গান্ডবীব ধনুর্ধারী সেই অর্জুন শত্রুদের বিনাশ করে সুখে আছেন তো? যে যমজ ভাতৃদ্বয় তাঁদের ভ্রাতাদের দ্বারা সুরক্ষিত, তাঁরা ভাল আছেন তো? চক্ষু যেমন পক্ষ্মের দ্বারা আবৃত থাকে, তেমনি তাঁরা পৃথার পুত্রদের দ্বারা সুরক্ষিত। গরুড় যেমন বজ্রধারী ইন্দ্রের মুখ থেকে অমৃত আহরণ করেন, তাঁরাও তেমনি যুদ্ধে দুর্যোধনের কাছ থেকে তাঁদের ন্যায়সঙ্গত রাজ্য ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। হে উদ্ধব! পৃথা কি এখনও বেঁচে আছেন? তিনি কেবল তাঁর পিতৃহীন পুত্রদের জন্যই জীবনধারণ করছিলেন; তা না হলে অদ্বিতীয় যোদ্ধা এবং অধিরথ যিনি একাকী ধনুকমাত্র সহায় করে চতুর্দিক জয় করেছিলেন, সেই রাজর্ষিশ্রেষ্ঠ পান্ডু ব্যতীত তাঁর পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব ছিল।”
“হে সৌম্য! যে ধৃতরাষ্ট্র মৃত ভ্রাতা পান্ডুর অনাথ সন্তানদের প্রতি বিদ্রোহ আচরণ করে ভ্রাতার দ্রোহ করেছেন, যিনি তাঁর পুত্রদের অনুবর্তী হয়ে আমাকে তাঁর গৃহ থেকে নির্বাসিত করেছেন, যদিও আমি হচ্ছি তাঁর যথার্থ হিতাকাঙ্ক্ষী, সেই অধঃপতিত ধৃতরাষ্ট্রের জন্য আমি অনুশোচনা করি। তাতে আমি আশ্চর্য হইনি। সকলের অলক্ষ্যে আমি পৃথিবী ভ্রমণ করেছি। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নরবৎ লীলাসমূহ এই মর্ত্যলোকে সাধারণ মানুষের কার্যকলাপের মতো বলে মনে হয় এবং তাই তা অন্যের পক্ষে মোহজনক, কিন্তু আমি তাঁর কৃপার প্রভাবে তাঁর মহিমা উপলব্ধি করতে পেরেছি এবং তার ফলে আমি সর্বতোভাবে সুখী। ধন, জন ও বিদ্যা এই তিন প্রকার গর্বের দ্বারা উৎপথগামী হয়ে যে সমস্ত নৃপতিরা তাদের প্রবল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে পৃথিবীর দুঃখ উৎপাদন করেছে, তাদের বিনাশ করে শরণাগত ভক্তদের দুঃখ দূর করতে সমর্থ হয়েও ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সব রকম অপরাধে অপরাধগ্রস্থ কুরুদের বিনাশ করেননি। ভগবান গুণরহিত হওয়া সত্ত্বেও দুর্বৃত্তদের বিনাশের জন্য আবির্ভূত হন, কর্মরহিত হওয়া সত্ত্বেও সকলকে আকর্ষণ করার জন্য তিনি তার লীলাবিলাশ সম্পাদন করেন। তা না হলে গুণাতীত পরমেশ্বর ভগবানের এই পৃথিবীতে আসার কি কারণ থাকতে পারে? হে সখে! তাই দয়া করে সেই ভগবানের মহিমা কীর্তন কর, যাঁর মহিমা তীর্থস্থানসমূহে কীর্তিত হয়। তিনি অজ, তবুও ব্রহ্মান্ডের সমস্ত শারণাগত শাসকদের প্রতি তাঁর অহৈতুকী কৃপার প্রভাবে তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের উদ্দেশ্যেই তিনি তাঁর অনন্য ভক্ত যদুদের বংশে আবির্ভূত হয়েছেন।”

Leave a Reply

May 2025
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits