দ্বিতীয় অধ্যায়- ভগবান শ্রীকৃষ্ণের স্মরণ

শ্রীল শুকদেব গোস্বামী বললেন- “বিদুর যখন মহাভাগবত উদ্ধবকে পিয়তম (ভগবান শ্রীকৃষ্ণ) সম্বন্ধীয় কথা বলতে অনুরোধ করলেন, তখন ভগবৎ স্মৃতিজনিত তীব্র উৎকন্ঠার ফলে উদ্ধব তৎক্ষণাৎ উত্তরদানে অক্ষম হলেন। তিনি বাল্যকালে, পাঁচ বছর বয়সে, শ্রীকৃষ্ণের সেবায় এমনই মগ্ন থাকতেন যে, তাঁর মা তাঁকে প্রাতঃরাশ করার জন্য ডাকলেও তিনি তা গ্রহণ করতে ইচ্ছা করতেন না। উদ্ধব এইভাবে তাঁর শৈশব থেকে নিরন্তর ভগবানের সেবা করেছিলেন এবং বার্ধক্যেও তাঁর এই সেবাবৃত্তি হ্রাস পায়নি। শ্রীকৃষ্ণের বার্তা তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলে তৎক্ষণাও তার কৃষ্ণসম্বন্ধীয় সব কথা স্মরণ হয়েছিল। ক্ষণকালের জন্য উদ্ধব পূর্ণ মৌনতা অবলম্বন করলেন এবং তাঁর দেহ অচল হয়ে রইল। তীব্র ভক্তিযোগে তিনি ভগবানের শ্রীপাদপদ্ম স্মরণরূপ অমৃত আস্বাদনে সম্পূর্ণরূপে নিমগ্ন হয়ে রইলেন এবং তখন মনে হচ্ছিল তিনি যেন গভীর থেকে গভীরতর আনন্দে মগ্ন হচ্ছেন। বিদুর পূর্ণ ভগবৎ প্রেমজনিত বিকারসমূহ উদ্ধবের সর্বাঙ্গে প্রকাশ পেতে দেখলেন। তাঁর ঈষৎ উন্মীলিত নেত্রদ্বয় থেকে অশ্রু ঝড়ে পড়তে লাগল। বিদুর বুঝতে পারলেন যে, উদ্ধব প্রগাঢ় ভগবৎ প্রেমলাভ করে কৃতার্থ হয়েছেন।”
মহান্ ভক্ত উদ্ধব শ্রীঘ্রই ভগবদ্ধাম থেকে মনুষ্যলোকে ফিরে এলেন এবং চোখ মুছে তাঁর পূর্ব স্মৃতি জাগরিত করে প্রসন্ন চিত্তে তিনি বিদুরকে বলতে লাগলেন- “হে প্রিয় বিদুর! কৃষ্ণরূপ সূর্য অস্তমিত হওয়ায় কালরূপ মহাসর্প আমাদের গৃহকে গ্রাস করেছে, অতএব আমাদের কুশল সম্বন্ধে আমি আর কি বলব? সমস্ত গ্রহলোকসহ এই ব্রহ্মান্ড অত্যন্ত দুর্ভাগ্যশালী এবং তার থেকে অধিক দুর্ভাগা হচ্ছে যদুবংশের সদস্যরা, কেননা তাঁরা শ্রীহরিকে পরমেশ্বর ভগবানরূপে চিনতে পারেননি, ঠিক যেমন চন্দ্র সমুদ্রে থাকার সময় মাছেরা তাঁকে চিনতে পারেনি। যাদবেরা সকলেই ছিলেন অভিজ্ঞ ভক্ত, তাঁরা লোকের চিত্তস্থ ভাব জানার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ছিলেন। সর্বোপরি তাঁরা সর্বদাই শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে ক্রীড়া করতেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা কেবল তাঁকে অন্তর্যামীরূপেই জানতেন। ভগবানের মায়ার দ্বারা বিভ্রান্ত ব্যক্তিদের বাক্যে কোন অবস্থাতাতেই পূর্ণরূপে ভগবানের শরণাগত ব্যক্তিদের বুদ্ধিভ্রষ্ট করতে পারে না। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, যিনি পৃথিবীর সকলের সম্মুখে তাঁর শাশ্বত স্বরূপ প্রকাশ করেছিলেন, আবার যারা আবশ্যকীয় তপশ্চর্যা না করার ফলে তাঁকে যথাযথভাবে দর্শন করার অযোগ্য ছিল, তিনি তাঁর স্বরূপ সেই সমস্ত ব্যক্তিদের দৃষ্টির অগোচর করেছিলেন। ভগবান এই জড় জগতে তাঁর যোগমায়াবলে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর লীলার উপযোগী তাঁর নিত্য শাশ্বত রূপে তিনি এসেছেন। সেই লীলসমূহ এতই মনোরম যে, তাতে ঐশ্বর্যমদে গর্বিত সকলের, এমনকি বৈকুন্ঠাধিপতি ভগবানেরও বিস্ময় উৎপাদন হয়। তাই শ্রীকৃষ্ণের চিন্ময় দেহ সমস্ত ভূষণের ভূষণস্বরূপ। ত্রিভুবনের সমস্ত দেবতারা মহারাজ যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নয়নানন্দকর রূপ দর্শন করে এই অনুমান করেছিলেন যে, বিধাতার মনুষ্য নির্মাণ বিষয়ে যে নৈপুণ্য ছিল, তা সমস্তই এই শ্রীমূতি প্রকাশে নিঃশেষিত হয়েছে। হাস্য, প্রমোদ ও দৃষ্টি বিনিময়ের লীলাবিলাসের পর শ্রীকৃষ্ণ যখন ব্রজসুন্দরীদের ত্যাগ করেছিলেন, তখন তারা অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন। তাঁদের দর্শনেন্দ্রিয়ের সঙ্গে তাঁদের চিত্তও শ্রীকৃষ্ণের অনুগামী হয়েছিল, এবং তাঁদের স্ব-স্ব কার্য সমাপ্ত না হলেও, তাঁরা নিশ্চেষ্টের মতো অবস্থান করেছিলেন।”
চেতন ও জড় উভয় সৃষ্টিরই পরম কৃপাময় নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবান অজ, কিন্তু যখন তাঁর শান্তশিষ্ট ভক্ত এবং জড়া প্রকৃতির অধীন ব্যক্তিদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তখন তিনি মহত্তত্ত¡সহ অগ্নিসদৃশ আবির্ভূত হন। আমি যখন শ্রীকৃষ্ণের কথা চিন্তা করি- জন্মরহিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি কারাগারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, শত্রুুর ভয়ে তিনি আত্মগোপন করে তাঁর পিতার প্রতিরক্ষা থেকে দূরে ব্রজে বাস করেছিলেন এবং অসীম শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও তিনি ভয়ে মথুরা থেকে পলায়ন করেছিলেন- এই সমস্ত বিভ্রান্তিকর ঘটনা আমার মনে খেদ উৎপন্ন করে। শ্রীকৃষ্ণ কংসের ভয়ে দূরে থাকার জন্য তাঁর পিতামাতার চরণ সেবা করতে অক্ষম হওয়ার ফলে তাঁদের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “হে মাতঃ! হে পিতঃ! দয়া করে আপনারা আমাদের (আমার বলরামের) অক্ষমতা ক্ষমা করুন।” ভগবানের এই প্রকার আর সমস্ত আচরণের স্মৃতি আমার হৃদয়কে ব্যথাতুর করছে। যারা পৃথিবীকে ভারাক্রান্ত করেছিল, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শুধুমাত্র তাঁর ভ্রুভঙ্গিরূপ কৃতান্তের দ্বারা তাদের সংহার করেছিলেন। তাঁর চরনকমলের রেনু এমনকি একবার মাত্রও যিনি আঘ্রাণ করেছেন, তিনি কি আর তা বিস্মৃতি হতে পারেন? আপনি নিজেও দেখেছেন কিভাবে চেদিরাজ (শিশুপাল) কৃষ্ণবিদ্বেষী হওয়া সত্ত্বেও, যোগীরা সম্যক্ যোগ অনুশীলন করার প্রভাবে যে সিদ্ধি বাঞ্ছা করেন, সেই সিদ্ধি লাভ করেছিল। তাঁর বিরহ কে সহ্য করতে পারে? তেমনই অন্য যে সমস্ত যোদ্ধা কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনের বাণের আঘাতে পবিত্র হয়েছিলেন, শ্রীকৃষ্ণের নয়নানন্দকর মুখকমলের শোভা তাঁদের নয়ন দ্বারা পান করতে করতে প্রাণত্যাগ করেছিলেন, তাঁরাও ভগবানের ধাম প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তিনের অধীশ্বর এবং সমস্ত ঐশ্বর্যের অধিকারী স্বতন্ত্র পরম পুরুষ। অসংখ্য লোকপালেরা তাঁদের মুকুট তাঁর শ্রীপাদপদ্মে স্পর্শ করে বিধি সামগ্রীর দ্বারা তাঁর পূজা করেন।”
“হে বিদুর, রাজসিংহাসনে আসীন উগ্রসেনের সম্মুখে দন্ডায়মান হয়ে যখন তিনি (শ্রীকৃষ্ণ), “মহারাজ দয়া করে অবধান করুন” এই বলে নিবেদন করতেন, সেই কথা স্মরণ হওয়ার ফলে আমার মতো ভৃত্যদের অন্তঃকরণ কি ব্যথিত হয় না?
“আহা! দুষ্টা পুতনা রাক্ষসী শ্রীকৃষ্ণের প্রাণ সংহার করার উদ্দেশ্যে কালকুট মিশ্রিত স্তন পান করিয়েও ধাত্রীর যোগ্য গতি লাভ করেছিল। তাঁর থেকে দয়ালু আর কে আছে যে, আমি তার শরণাপন্ন হব? ত্রিশক্তির অধীশ্বর শ্রীকৃষ্ণের প্রতি যে অসুরেরা বৈরীভাবাপন্ন হয়ে তাঁর প্রতি অভিনিবিষ্ট চিত্তে তার্ক্ষ্য (কশ্যপ) পুত্র গরুড়ের স্কন্ধে চক্র হস্তে তাঁকে তাদের সম্মুখে দর্শন করেছিল, সেই অসুরদেরও আমি অধিক ভাগ্যবান ভক্ত বলে মনে করি। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ পৃথিবীর কল্যাণের জন্য ব্রহ্মা কর্তৃক প্রার্থিত হয়ে ভোজরাজের কারাগারে বসুদেবপত্নী দেবকীর গর্ভে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তারপর, কংসের ভয়ে ভীত পিতা কর্তৃক আনীত হয়ে, নন্দ মহারাজের গোচারণভূমিতে তিনি এগার বছর আচ্ছাদিত অগ্নির মতো বলদেবসহ বাস করেছিলেন। সর্বশক্তিমান ভগবান তাঁর শৈশবে গোপবালক এবং গো-বৎসে পরিবৃত হয়ে পক্ষীকুলের কাকলি কূজনে মুখরিত ঘন বৃক্ষসঙ্কুল যমুনাতটের উপবনে বিচরণ করতেন। ভগবান যখন তাঁর বাল্যলীলা প্রদর্শন করেছিলেন, তখন তা কেবল ব্রজবাসীদের কাছেই প্রকট হয়েছিল। কখনও তিনি ঠিক একটি শিশুর মতো রোদন করেছিলেন এবং কখনও হাস্য করেছিলেন এবং তখন তাঁকে একটি মুগ্ধ সিংহ-শিশুর মতো দেখাত। পরম সুন্দর গাভী ও বৃষদের চারণ করতে করতে সমস্ত ঐশ্বর্য ও সৌভাগ্যের আলয় ভগবান তাঁর বংশী বাজাতেন। এইভাবে তিনি তার বিশ্বস্ত অনুচর গোপবালকদের উল্লসিত করতেন। ভোজরাজ কংস কর্তৃক কামরূপধারী মহা মায়াবী অসুরেরা শ্রীকৃষ্ণকে হত্যা করার জন্য নিযুক্ত হয়েছিল, কিন্তু ভগবান লীলাচ্ছলে অবলীলাক্রমে তাদের হত্যা করেছিলেন, ঠিক যেমন একটি শিশু তার পুতুল ভেঙ্গে ফেলে। কালীয় সর্পের বিষে যখন যমুনার এক অংশ বিষাক্ত হয়ে গিয়েছিল, তখন বৃন্দাবনের অধিবাসীরা মহা দুর্দশায় বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। ভগবান তখন সেই সর্পরাজকে দন্ডদান করে সেখান থেকে নির্বাসিত করেছিলেন, তারপর নদী থেকে উঠে এসে, যমুনার জল যে স্বাভাবিক অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছে তা প্রমাণ করার জন্য তিনি গাভীদের সেই জল পান করিয়েছিলেন। মহারাজ নন্দের সমৃদ্ধিশালী বিত্তসমূহ গো-পূজায় ব্যবহার করার বাসনায় এবং দেবরাজ ইন্দ্রকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পিতাকে উপদেশ দিয়েছিলেন অভিজ্ঞ ব্রাহ্মণদের সাহায্যে গো, অর্থাৎ গোচারণ ভূমি ও গাভীদের পূজা অনুষ্ঠান করার জন্য।”
“হে সৌম্য বিদুর! দেবরাজ ইন্দ্র অপমানিত হওয়ার ফলে বৃন্দাবনে প্রবলভাবে বারি বর্ষন করেছিলেন এবং তার ফলে ব্রজভূমির অধিবাসীরা ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়েছিলেন, কিন্তু পরম দয়ালু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বতকে ছত্রের আকারে ধারণ করার লীলাবিলাসের দ্বারা তাঁদের সেই বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলেন। শরৎকালের পূর্ণ চন্দ্রের জোছনায় উজ্জ্বল রাত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মনোহর সঙ্গীতের দ্বারা গোপীদের অঅকৃষ্ট করে রমণী-সমাজের ভূষণরূপে সুশোভিত হয়ে আনন্দ উপভোগ করেছিলেন।

Leave a Reply

May 2025
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits