ব্রাহ্মণ বলে পরিচিত অনেকেই আছেন। ব্রাহ্মণত্ব হল পারমার্থিক জীবনের প্রথম সোপান; অন্তত এটা জানতে হবে যে, ‘আমি দেহ নাই’। শম, বিশেষ করে মনকে, ইন্দ্রিয়কে সংযত করতে হবে। হরিকথা বললে মন শুদ্ধ হয়, যারা শুনছে তারাও শুদ্ধ হয়। যে সব সময় ভগবানকে স্মরণ করছে, তার বাইরেটা শুদ্ধ হয়, অন্তরও শুদ্ধ হয়। শ্রীচেতন্য মহাপ্রভু বলেছেন- ‘তোমাদের বদ্রিকা আশ্রমে গিয়ে ঠান্ডায় গলা পর্যন্ত জলে ডুবে তপস্যা করার দরকার নেই বা চারিদিকে আগুন জ্বালিয়ে প্রচন্ড গরমেও তপস্যা করার দরকার নেই’- এসব আগে করা হত, তিনি বলেছেন, যুক্ত বৈরাগ্য অভ্যাস করতে, সব কিছুই যতটা সহ্য হয়, সেই মতো করতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
শ্রীল প্রভুপাদ আমাদের বলেছেন, সাড়ে চারটায় মঙ্গল আরতির জন্য সাড়ে তিনটায় উঠে ঠান্ডা জলে স্নান- এটা করলেই চলবে। অনেকে উঠতে চায় না সেই সময়ে। তপস্যা করলে আমাদের যে অস্তিত্ব, সত্ত্ব- সেটা শুদ্ধ হয়। আমরা যদি পবিত্র না হই, তা হলে ভগবান আমাদের সেবা কেন গ্রহণ করবেন? এই জন্য আমরা সাত্তি¡ক আহার করি- সাত্ত্বিকের চেয়েও বেশি, কারণ যা সাত্ত্বিক, তা ভগবানকে নিবেদন করলে বিশুদ্ধ সত্ত্ব বা নির্গুণ হয়।
বৈষ্ণবদের মধ্যে শ্রীল প্রভুপাদ দু’টি জিনিস প্রধান কর্তব্য বলে দিয়েছেন- প্রসাদ বিতরণ আর গ্রন্থ দিয়ে হরিকথা শোনানো; এমনি শোনালে লোকে ভুলে যায়। যদি সত্যি কেউ সাধুসঙ্গ করতে চায়, তবে প্রভুপাদের গ্রন্থ, যা ভক্তরা বিতরণ করছে, তার কয়েকটা বাড়ি নিয়ে যেতে হবে। কত পয়সা লোকে নষ্ট করে। এই বইগুলি স্পর্শ করলেও কল্যাণের খনি উদ্ঘাটিত হবে, আর পড়লে তো আপনার সব ইচ্ছা পূরণ হয়ে যাবে।
শ্রীমদ্ভাগবতে (৪/৭) বর্ণিত দক্ষযজ্ঞের কাহিনীতে দক্ষ শিবকে অপমান করায় শিব কুপিত হয়ে যজ্ঞের সব কিছুর উদ্দেশ্য ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন। তারপর শিব যখন তুষ্ট হলেন, আবার যজ্ঞের অনুষ্ঠান হল। তখন তিনি ব্যক্তি করছেন যে, তাঁর মন যেহেতু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি নিবিষ্ট আছে, তাই তিনি তাঁর সমালোচনায় বিচলিত বা চঞ্চল হচ্ছেন না। সব থেকে বড় বিচার্য হচ্ছে- আমি কি বৈষ্ণব হয়েছি, শুদ্ধ ভক্ত হয়েছে?
রামায়নে জটায়ু পাখি শকুনি ছিল। যুদ্ধে তার ডানা কেটে গেল, কিন্তু সে ভগবানের কথা চিন্তা করতে ভুলল না; ভগবান নিজে এসে তাকে উদ্ধার করে নিলেন- কত ভাগ্যবান! আর আমরা দুর্লভ মনুষ্য-জন্ম পেয়েও এর সুযোগ নিতে পারব না? না নিলে এর থেকে দুর্ভাগ্যের আর কি আছে?
ভক্তের লক্ষণ হচ্ছে, সে নিজেকে দীন হীন বলে মনে করে। শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর একটা গান লিখেছেন-
“আমার জীবন সদা পাপে রত,
নাহিক পুণ্যের লেশ।”
– জীবনে কত পাপ করেছি, অন্যের দোষ খুঁজে বেড়িয়েছি, নিজের দোষ দেখিনি। অন্যে অসুখী হলে আমি আনন্দ পাই। আসলে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর নিজে তো আর তা নন, তিনি আমাদের শিক্ষা দিচ্ছেন।
যেমন, শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীপাদ বলেছেন, ‘দার্শনিকেরা এইরকম চিন্তা করে যে, শূকরেরা বিষ্ঠা খাচ্ছে আর আমি রাবড়ি রসমালাই খাচ্ছি, কেন? সক্রেটিসকে যখন রাজার লোকেরা ধরেছে তারা বলেছিল, এই লোকটা নতুন জিনিস প্রচার করছে, লোকে এর কথা শুনছে, আমাদের ক্ষমতা যদি কমে যায়? তখন তারা রাজাকে গিয়ে বলল, তারা তাঁকে বিষ খাওয়াতে এল।
পৃথিবীর ৯৯.৯ শতাংশ লোক আসল জিনিস দেখতে পায় না, কাম ক্রোধে মত্ত থাকে। সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘আগে তো ধরুন আমাকে, তবে তো বিষ পান করাবেন।’ সাধারণ লোক এই কথার মর্ম বুঝতে পারল না। উনি বলতে চেয়েছিলেন- আমি তো দেহ নই, আমি আত্মা।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলতেন, দিনরাত আমরা কৃষ্ণকথা আলোচনা করি, লোকে আমাদের পাগল ভাবতে পারে। দুনিয়ার বেশির ভাগ লোকই তো পাগল, কেউ টাকার প্রতি, কেউ স্ত্রীলোকের প্রতি, কেউ নাম-যশ-প্রতিপত্তির প্রতি। কিন্তু সে-ই বুদ্ধিমান, যে কৃষ্ণের প্রতি পাগল। ‘হে কৃষ্ণ, আমাকে আপনার সেবায় নিন।’ সত্যিকারের ভক্ত শ্রীকৃষ্ণের কাছে সেবা চায়- তার সবই ভগবান করে দেন।
পৃথিবীর লোকেরা কত মানসিক শারীরিক দুঃখ পাচ্ছে, জ্ঞানীরও রেহাই নেই, কি ইন্দিরা গান্ধী, কি মহাত্মা গান্ধী। কিন্তু ‘রাখে কৃষ্ণ মারে কে, মারে কৃষ্ণ রাখে কে?’ পান্ডবদের দৃষ্টান্তেই আমরা দেখতে পাই, কতবার দুর্যোধনের কত রকম কুমতলব থেকে তাঁরা রক্ষা পেয়েছেন।
‘বিপদে মধুসূদন।’ তা বলে সারা জীবন পাপ করব আর শ্রীকৃষ্ণ রক্ষা করবেন? আপনি বাবার কথা মতো চলছেন না, আর একজন হয়তো কথামতো চলছে, বাবা খেতে দেবে পরতে দেবে, কিন্তু আপনাকে সিন্দুকের চাবিটা দেবে না। এই যদি হয় সাধারণ ক্ষেত্রে, ভগবানের ক্ষেত্রেও তাই হওয়াটা স্বাভাবিক। বাড়িতে আগুন লাগলে একেবারে যারা শিশু তারা অসহায়, ছোট ছেলেমেয়েরা হয়ত পালিয়ে যাবে।
ভক্তরাও সেই রকম, তাঁরা কেবল ভগবানের উপর নির্ভর করে থাকেন, বলেন- ‘ভগবান, আমার বুদ্ধি নেই, চিত্তবৃত্তি নেই, তুমি আমাকে রক্ষা কর।’ সত্যি তাই। তাই যখন বিপদ হয়, ভগবান আগে তাঁকে রক্ষা করেন।
বিষয়ী ব্যক্তিদের যদিও অর্থ আছে, বল আছে, তবুও তারা ভগবানকে দিতে চায় না। ভারতে কিন্তু এখনও দেখা যায় ধনী ব্যক্তি ভারতের শ্রেষ্ঠ শিল্পপতি বিরাট বিষ্ণুমন্দির করে দিলেন, অপূর্ব সাজসজ্জা, চমৎকার বিগ্রহ, চমৎকার গহনা। আমার গুরু মহারাজ তাই ছিলেন- কি সুন্দর শ্রীকৃষ্ণকে সাজিয়েছে, এদেশী ও বিদেশী ছেলেমেয়েরা, শ্রীল প্রভুপাদ শিখিয়েছেন, শ্রীকৃষ্ণ কি পছন্দ করে জানতে হবে, কি করলে শ্রীকৃষ্ণকে আরও ভালো দেখাবে- এসব লেখা আছে শাস্ত্রে। যার অর্থ নেই, সে হাতে কাজ করে দিচ্ছে, আর যার অর্থ আছে, সে অর্থ সাহায্য দিয়ে সেবা করছে।
মহান আচার্যরা যা বলেছেন, আমাদের তা শিখে নিতে হবে- লোভ মোহ মদ মাৎসর্য ত্যাগ। কত ধনী লোকের ছেলেরা মদ-মাংস খাচ্ছে, তারা জানে না- মাম্ স- আজকে যাকে তুমি খাচ্ছ, একদিন তোমাকে সে-ই খাবে।
মহাজনদের উপলব্ধি বুঝতে সময় লাগে। এখন সাধু-বৈষ্ণব জনের সেবা করতে হবে, যার সেবা করব তার গুণ আমাদের মধ্যে চলে আসবে। ভগবানের সেবক হলে ভগবানের গুণ আমাদের মধ্যে পাব।
এখানে রাশিয়ানরা এদেশের মতো অন্ন সুক্তো ডাল চচ্চড়ি খাচ্ছে। কিন্তু আমাদের ভাতের বদলে কেবলই স্যান্ড্উইচ্ খেতে বললে খাবেন? একদিন দু’দিন- তার বেশি চলবে না। তারা নিশ্চয়ই কিছু পেয়েছে, যার কাছে এই ত্যাগ তুচ্ছ! নতুন সাত্ত্বিক জীবনধারা মেনে নিয়েছে।
উপনিষদে আছে, ভগবান বৈকুন্ঠে আছেন কোটি কোটি মাইল দূরে, আবার আমাদের অন্তরেও আছেন। ভক্তের বিপদ হলে তিনি এক মূহুর্তে তাঁকে রক্ষা করতে পারেন। এত জেনেও আমাদের দেশের অনেকে বলে, হরেকৃষ্ণ বললে আমার পেট চলবে? একবার মহাপ্রভুকে একজন অমেধ্য (অপবিত্র) কিছু দ্রব্য ‘প্রসাদ’ বলে দিয়ে গেল, কোথা থেকে একটা চিল এসে সেই সমস্তই ছোঁ মেরে নিয়ে চলে গেল, আর যে লোকটা মহাপ্রভুকে আজেবাজে জিনিস খেতে দিয়েছিল, তার গা-টা আঁচড়ে কামড়ে দিল। ভগবানের দ্বারা সুরক্ষার এই রকম বাস্তব অভিজ্ঞতা ভক্তদেরও আছে।
দুর্বাসা মুনি একবার ভক্ত অম্বরীষ মহারাজের কাছে অকারণে অপরাধ করায় সুদর্শন চক্রের কোপে পড়েছিলেন। ব্রহ্মা, শিব সকলের কাছে তিনি আশ্রয় প্রার্থনা করতে করতে ছুটছিলেন; শেষে নারায়ণ বললেন, ‘দেখ, কেউ আমার ভক্তের সাথে খারাপ ব্যবহার করলে আমিও রক্ষা করতে পারি না। যার কাছে তুমি অপরাধ করেছ, তিনি নিজে ক্ষমা করলে, তবেই নিস্তার পাবে।’
ভগবানের পাদপদ্ম এমন জিনিস যে, রুক্মিণীদেবী একবার শ্রীকৃষ্ণকে বলেছেন, ‘তোমার পাদপদ্মে যে কি জানু আছে, তা তুমি নিজেই জান না। যখন প্রলয় হয়, ছোট্ট গোপাল কৃষ্ণ বট পাতা উপর শুয়ে শিশুসুলভ ভাবে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ চোষেন। তাঁর পায়ের মধ্যে এমনই মাধুর্য আছে যে, ভগবান নিজে পর্যন্ত লোভ সামলাতে পারেন না তাঁর নিজের পায়ের ওপর।
তাই রুক্মিণীদেবীর মন্তব্যে শ্রীকৃষ্ণ বিস্ময় প্রকাশ করে ভাবলেন, ‘আমিও একবার ভক্ত হয়ে এসে দেখব।’ তখন তিনি শ্রৈীচতন্যদেব হয়ে এলেন, ভক্তের রূপ নিয়ে দেখালেন- ভগবানকে কেমন করে ভক্তি করতে হয়, এবং ভগবানের শুদ্ধ ভক্তদেরও কিভাবে শ্রদ্ধা করে চলতে হয় আর তাঁদের চরণে নূন্যতম অপরাধ করার সম্ভাবনা থেকেও নিরস্ত থাকতে হয়।
শুদ্ধ সাত্ত্বিক হওয়ার সহজ পন্থা
20 Mar 2025 Leave a comment
in নিত্য আনন্দের পথ নির্দেশ, প্রবচন- শ্রীমৎ সুভগ স্বামী মহারাজ