ভগবান ভক্তদের সাথে লীলা করেন। সেই জন্য ভক্তিটা হল চিদ্তত্ত্ব। চিদ্ মানে চেতন জগতের। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন ‘লীলাপুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ’ বইটা যে পড়বে এবং আকৃষ্ট হবে তাতে সে ভক্ত হবে। কৃষ্ণ বইটা হল চিদ্ জগতের জানালা। যে জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে কৃষ্ণ গরু চরাতে যাচ্ছে কোনদিন তালবন, কোনদিন বৃন্দাবন, কোনদিন বেলবন, কোনদিন মধুবন। এক এক জায়গার এক একরকম বৈচিত্র আছে, কোন জাযগায় আমলকী গাছ, কোথাও বা বেলগাছ। কৃষ্ণ আমলকী ও বেল নিয়ে খেলা করছে বন্ধুদের সাথে। কৃষ্ণ বলরাম ও তার সহপাঠীরা কখনো কখনো রাজা রাজা খেলছে। তাদের সহপাঠীরা সুদাম, শ্রীদাম, বসুদাম, আরো অনেকে। কখনো কখনো এদের মধ্যে আবার ঝগড়াঝাটি হয়ও। শ্রীদাম বলে কৃষ্ণ এসব হবে না। কৃষ্ণ বলছে- আমি রাজার ছেলে আমি রাজার পাঠ করব। এক সখা বলে- না, না কৃষ্ণ কোথায় তুমি রাজা, তোমার বাড়ীতে নন্দ রাজা আছে সেখানে গিয়ে রাজাগিরি দেখাও। এখানে আমাদের সাথে চলবে না। কিন্তু কৃষ্ণ হয়ত বা বড়ো গলায় বলতে শুরু করে- না আমি রাজার ছেলে। আবার কখনো কখনো কৃষ্ণের গুরুদেবের ছেলে মধুমঙ্গল বলে- এই আমি ব্রাহ্মণ, অভিশাপ দিব তোমাদেরকে, ঠিকমতো তোরা যদি আমার সাথে ব্যবহার না করিস। তারা বলে- কিসের তুমি ব্রাহ্মণ?
আবার কখনো হয়ত বা মধুমঙ্গলের খাবার থলিটাতে খুব ভাল খাবার আছে। সবাই মিলে যুক্তি করল আমরা চোর চোর খেলব। কানামাছি খেলব। বলরাম বলল- ওর চোখ টিপে ধর। তখন তার মনে হল আমাকে কেন করল। এত সবাই থাকতো তখন সে তার খাবার থলিটা খোঁজ করতে শুরু করল এবং রাগে ও অহংকারে বলল- আবার বাবার বহু শিষ্য আছে জেনে রেখো। আমারও এই রকম বহু শিষ্য আছে। কারণ সে বহু খাবার পেয়ে থাকে। বলরাম থলিটা লুকিয়ে রেখেছে রাধারাণীর ভাই শ্রীদাম এর কাছে এবং তারা চুপিচুপি বলতে শুরু করছে- এই দেখ কি আছে। তখন মধুমঙ্গল বলল- কি কৃষ্ণ, আমি কিন্তু বুঝতে পারছি আমার খাবার চুরি করছে এরা।’
এই রকম ভারি মজা হয়। এবং তাতে আমাদের আকৃষ্ট হওয়া উচিত। তাহলে কৃষ্ণভক্তি লাভ করা সহজ হবে। আমি কৃষ্ণের সাথে নাচব, খেলব, এবং ঐ অঘাসুরকে বধ করে ওর মুখের মধ্যে খেলব এভাবে প্রলুব্ধ হলে খুব দ্রুত আমরা ভক্তির পথে উন্নতি লাভ করব।
কৃষ্ণের বদলে যদি আমরা আকৃষ্ট হই অন্য কোথাও ভাল খাব ভাল পরব এবং ভাল করে জগৎকে ভোগ করব, তাহলে দেহাত্ম বুদ্ধির ফলে এই জগতে পতিত থাকতে হবে।
কোন একদিন রাধারাণী এক স্বপ্ন দেখে কৃষ্ণকে বলছেন, আমি দেখছি একজন উন্মত্ত হয়ে কখনো গান গাইছে আবার নাচছে, তার গায়ের রং অনেকটা আমার মতো। ইনি কে? আমি বুঝতে পারছি না। কৃষ্ণ একটু হাসলেন এবং বুঝতে পারলেন। রাধারাণী বললেন আমি স্বপ্ন দেখলাম মুখে খালি ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ’ বলছেন তোমার মতো ভাব করছে। কৃষ্ণ জানেন এবং বুঝতে পেরেছেন আমি এক সময় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর রূপে জন্মগ্রহণ করব। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রাধাকৃষ্ণের মিলিত তনু। বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর বলেছেন এই রকম লীলা কাহিনী। সেই জন্য ভক্তিটাকাকে বলে চিদ্ তত্ত¡। চিদ্ তত্ত্ব মানে এটা চেতন জগতের ব্যাপার। তাই যারা উন্ন ভক্ত তারা এখানে থেকেও বুঝতে পারে রাধাকৃষ্ণ কি করছে, এমনকি দেখতেও পারে।
কৃষ্ণ রাধারাণীল সাথে মজা করবার জন্য কি করছে সে দেখতে পায়। রাধা স্বভাবে লাজুক আবার কৃষ্ণের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট। মাঝে মাঝে কৃষ্ণের কাছে কি জানি চায়, কদমফুল। তবে কদমফুল একটু উপরে আছে কৃষ্ণ রাধারাণীকে তুলে ধরল ফুল পাড়ার জন্য। ঐ সময় রাধারাণী ফুল ধরল এবং কৃষ্ণ তখন রাধারাণীকে ছেড়ে দিল এবং তখন রাধারাণী গাছের ডালে ঝুলছে। এই রকম অবস্থা দেখে রূপ গোস্বামী হাসছেন। সেই সময় একজন লোক রূপ গোস্বামীর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। সে দেখল যে, রূপ গোস্বামী হাসছে। সে ভাবল, “আমি এসেছি কিছু জিজ্ঞাসা করব তাঁকে, অথচ আমাকে দেখে উপেক্ষা করল, পরিহাস করল।’ ঐ অবস্থায় মনের দুঃখে চলে গেল। পরে জানতে পারল যে, উনি আমাকে দেখে হাসেননি। ভক্ত ভগবানের চিন্তায় তন্ময় থাকে। ভগবানের চিন্তায় গভীরভাবে তন্ময় হলে ভগবান তখন তাঁর সাথে লীলা করেন। এই লীলা করবার সময় ভক্তকে যোগমায়া সাহায্য করেন।
শ্রীল প্রভুপাদের ‘লীলা পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণ’ বইটা হল এই রকম। যে, এই জগতের একটা জানালা খুলে দেখাচ্ছে। কৃষ্ণ কতকি করছে তাঁর অন্তরঙ্গা ভক্তদের সাথে । কৃষ্ণ মাঝে মাজে গাভী চরাতে যাচ্ছে, কখনো কখনো বাড়ি ফিরতে খুব দেরী করছে।
তখন মাতা যশোদা বলছেন নন্দমহারাজকে- ছেলেটা এখনও আসছে না, যাও দেখ আসছে না কেন। বহুবার বলার পর নন্দমহারাজ ছাদে উঠে দেখলেন প্রথমে মাথার চুড়াটা, পরে অন্যান্য অংশ দেখা গেল। যাই হোক কৃষ্ণ বৃন্দাবনের ধুলোবালি মেখে সখাদের সাথে নৃত্য করতে করতে বাঁশি বাজাতে বাজাতে আসছে বাড়ির দিকে। নন্দমহারাজের গোশালাতে বিভিন্ন নামে ৯ লক্ষ ৩০ হাজার গাভী আছে। কৃষ্ণ বাঁশি বাজিয়ে গাভীদের ডাকত এবং গাভীরাও বুঝতে পারত কৃষ্ণ তাদের কাকে ডাকছে। গাভীদের নাম- শ্যামলী, ধবলী ইত্যাদি। বহু গরু আছে তাদের মধ্যে ১০৮ প্রকার শ্রেণীভাগে আছে। একটা গরু পাওয়া না গেলে কৃষ্ণ তাকে খুুঁজে বের করতেন। কৃষ্ণের বহু লীলা আছে আচার্যরা মাঝে মাঝে একটু আধটু বলেন। এইসব শুনে বৈধীমার্গের ভক্তরা হয়ত চিন্তা করে এমন দিন আমার কবে হবে যে, আমিও ভগবানের সাথে এইরকম করতে পারব। এক বলে চিদ্ বিলাস। ভক্ত ও ভগবানের সাথে ভাবের আদান-প্রদান। শুদ্ধ ভক্ত ভগবানের সেবা করছেন, আবার ভগবান সুযোগ খোঁজেন কখন আমি ভক্তের সেবা করব।
ভগবান ভক্তের কাছে খুব নীচ ধরনের কার্য পর্যন্ত করতে পারেন। যেমন কৃষ্ণ হয়েছিলেন কুরুক্ষেত্র মহাযুদ্ধে অর্জুনের রথের সারথি।
অর্জুন জানেন ইনি হচ্ছে ভগবান, কিন্তু তার সঙ্গে এমন একটা সম্পর্ক যে, অর্জুন বলতেও পারে, কৃষ্ণ তুমি আমার রথটা চালাবে। কৃষ্ণ বলেছিলেন হ্যাঁ। একবার অর্জুনদের দূত হয়ে গিয়েছিলেন দুর্যোধনের কাছে। দুর্যোধন কৃষ্ণকে অপমান করল এবং বন্দী করার জন্য আদেশ দিল।
নরোত্তম দাস ঠাকুর ভাবছেন- মহাপ্রভু অপ্রকট হলেন; নিত্যানন্দ প্রভু অপ্রকট হলেন কিন্তু কি দুর্ভাগ্য আমি তাঁদের দেখতে পাচ্ছি না। এই রকম চিন্তা করতে করতে তিনি নিত্যানন্দধামে গিয়েছিলেন, চোখ দিয়ে জল এল, হায়! কোথায় নিত্যানন্দ লীলাস্মৃতি। হঠাৎ গ্রামের কাছে দেখছেন একটা বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন- কি ব্যাপার তুমি কাঁদছো কেন? কোথা থেকে এলে? তুমি গৌড়ীয় ভক্ত? নরোত্তম দাস ঠাকুর বলেছেন- হ্যাঁ, আমার দুর্ভাগ্য যে, নিত্যানন্দ প্রভুকে দেখতে পেলাম না, এখন তাঁর লীলা স্থান দেখতে পারবো না ভালো করে। বৃদ্ধ বলছেন- চলো এখন আমি তোমাকে দেখাবো।
নরোত্তম দাস ঠাকুর তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন- আপনি তো খুব বৃদ্ধ হয়ে গেছেন।
বৃদ্ধ বললেন- আমি সব জানি কোথায় কেমন লীলা হয়েছে।
নিত্যানন্দ এইখানে এই গাছের তলায় বালকদের সাথে নানাপ্রকার রামলীলা ও অন্যান্য লীলাভিনয় করেছিলেন। এখানে কৃষ্ণের বিগ্রহ পেয়েছেন, বাঁকারায় বিগ্রহ। দেখাতে দেখাতে যখন শেষ হয়ে গেলে, হঠাৎ তার মনে হল বৃদ্ধ গেল কোথায়। তখন মনে হল উনি তো সাধারণ লোক নয়। উনাকে আবার দেখলে ভালো হত। এইরকম চিন্তা করায় বৃদ্ধটি আবার এলেন। একটু পরে আবার বৃদ্ধ চলে গেলেন তখন এমন একটা চিহ্ন রেখে গেলেন যে, নরোত্তম দাস ঠাকুর ভাবে এবং ভক্তিতে মুগ্ধ হয়ে আনন্দে ক্রন্দন করলেন। ভাবের উল্লাসে বুঝতে পারলেন যে, পরম করুণ নিত্যানন্দ প্রভু তাঁর প্রতি কত কৃপাময়!
কিন্তু বর্তমানে আমরা এত অপরাধ করছি যে, আমাদের হৃদয়টা কঠিন হয়ে গেছে। যদি আমরা ঐ রকম যোগ্যতা অর্জন করি তাহলে আমরাও দেখতে পাব।
শ্রীল প্রভুপাদ তাঁর শিষ্যদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছেন- মায়াপুর, এই জায়গা ছেড়ে তোমরা কেউ যেও না। দেখবে এখানে কত লোক আসবে। শ্রীল প্রভুপাদ এই সবকিছু দেখতে পেতেন। যারা সাধনায় উন্নত তাঁরা ত্রিকালজ্ঞ হয়ে যান। গৌরকিশোর দাস বাবাজী, ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এবং ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর এই ব্যাপারে বহু কিছু বলেছেন। ভালোও বলেছেন আবার খারাপও। যাঁরা তাদের সান্নিধ্য পেয়েছেন তাঁরা লিখে রেখেছেন। ভক্তরা আনন্দ পায় ভগবানের সান্নিধ্যে। সেই জন্য শ্রীল প্রভুপাদ এবং তার পূর্ব পূর্ব আচার্যরাও বলে গেছেন ভক্ত এই জগতে নেই। একজন ব্যক্তি ঘুমিয়ে থাকলে তার শরীরটা ঐ স্থানে থাকে কিন্তু সেই ব্যক্তি কি সেইখানে আছে? ঠিক সেইরকম ভক্ত তন্ময় থাকে ‘মচ্চিত্ত মদ্্গতপ্রাণা’ তার মন, প্রাণ, শরীর ভগবানের সেবায় উৎসর্গীকৃত থাকে। ‘বোধয়ন্ত পরস্পরম্’ ভগবানের কথা আলোচনা করে। ‘কথয়ন্তশ্চ মাং নিত্যম্’। ২৪ ঘন্টা ভগবানের কথা ছাড়া অন্যকথা বলে না।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন যদি তোমরা আমাকে প্রীত করত এবং চাও আমি এখানে থাকি তাহলে কৃষ্ণকথা ছাড়া অন্য কথা বলো না। এটাই আদর্শ। এটাই সাধনা।
আমরা পারি না। চেষ্টা করতে হবে। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন ইসকন মানে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠ, তাড়াতাড়ি স্নান করে মঙ্গল আরতিতে যোগ দাও। জপ শেষ কর। মঙ্গল আরতির পূর্বে জপ শেষ করতে পারলে আরো ভাল। ১৬ মালা কমপক্ষে খুব ভাল করে শেষ করতে হবে। না হলে বিপদ আছে। হঠাৎ মায়ার আক্রমণের বেগ সহ্য করতে পারবে। হরিকথা শোন এবং সংকীর্তনে যাও। প্রত্যেক সকাল সন্ধ্যার সময় মন্দিরে নৃত্য-কীর্তন কর। Krishna Consciousness মানে শ্রবণ, কীর্তনের আনন্দে যুক্ত থাকবে। বাকী সময় রাস্তায় গিয়ে সংকীর্তন কর, Book distribution কর এবং প্রসাদ বিতরণ কর। আমি জানি আমাদের Society মানে হচ্ছে তাই। কিন্তু দেখ কোন ভক্তের চরণে অপরাধ না হয়। ভক্তের মনে আঘাত দিও না। তা হলে এক জীবনেই ভগবদ্ধামে চলে যাবে।
হরেকৃষ্ণ মন্ত্রকে বলা হয় মহামন্ত্র। একজন ভক্ত শ্রীল প্রভুপাদকে বলেছেন- সবাইকেই কি ব্রাহ্মণ-দীক্ষা নিতে হবে- তার কোন কারণ দেখছি না; মহামন্ত্রের মধ্যে সবকিছু আছে, কিন্তু কেউ যদি খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে ভক্তিজীবনটাকে গ্রহণ করে পূজারীর কাজ করে এবং বিশেষ ক্ষেত্রে যজ্ঞ করলে তাকে ব্রাহ্মণদীক্ষা দেওয়া হবে। ভগবানের কাছে এই প্রার্থনা করা উচিত- আমাকে আপনি গ্রহণ করুন এবং আপনার দাস বলে স্বীকার করুন এবং আপনার সেবায় নিয়োজিত করুন।
কে কতটা কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদির বেগ থেকে মুক্ত হয়েছে। ‘তদারজস্তমো ভাবাঃ কামলোভাদয়শ্চ যে।’ আমি কতটা কাম ক্রোধ থেকে মুক্ত হয়েছি। শুদ্ধ হলে সাত্তি¡ক গুণ এবং বিশুদ্ধ শুদ্ধ হলে আরো ভাল। শুদ্ধভক্ত বিশুদ্ধ সত্ত্বে স্থিত। সেটা বলতে গেলে চিদ্ জগৎ। চিদ্ জগতে আছে বিশুদ্ধ স্বত্ত্ব স্তর। ভগবান বিশুদ্ধ সত্ত্বের মূর্তিমান বিগ্রহ। এই জগতে বেশি দেখতে পাওয়া যায় না বিশুদ্ধ সত্ত্বের ব্যক্তি। ‘সত্ত্ব বিশুদ্ধং বসুদেব শব্দিতম্’।
ভগবান বসুদেবের হৃদয় থেকে দেবকীর হৃদয়ে গেলেন। তেমনি বিশুদ্ধ সত্ত্বে অধিষ্ঠিত হলে গুরুর হৃদয় থেকে শিষ্যের হৃদয়ে ভক্তি সঞ্চারিত হয়। ‘দেবকী’ কথা অর্থ সে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে স্বামীর কাছে নিবেদন করেছে। শিষ্য মানে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে গুরুর কাছে নিবেদন করা।
অর্থাৎ, গুরুদেবের কথামতো চললে মায়ার হাত থেকে মুক্তি পাবে। অর্থাৎ, গুরুদেবের আদেশ মতো ২৪ ঘন্টা ভগবানের সেবা করছে। নিজের চেষ্টায় করলে তাহলে মায়াবাদী হয়ে গেল। মায়াবাদী নিজের বিদ্যাবুদ্ধির দ্বারা ভগবানকে জেনে নেওয়ার, ভগবানকে দেখে নেওয়ার এবং সাফল্য অর্জন করার অভিমান করে। যতক্ষণ না আমি আচার্যদের কৃপাদৃষ্টি পাচ্ছি ততক্ষণ ভগবানের কৃপা লাভ করা সম্ভব নয়। তাঁর কথামতো চলা খুব কঠিন, সেটাই সাধনা।
‘চেতোদর্পণ মার্জনম্’ চিত্তদর্পণটাকে পরিষ্কার কর, হরিনাম মহামন্ত্র উচ্চারণ করবার মাধ্যমে। জীবকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি গুন্ডিচা মার্জন লীলা করলেন। ভগবান যাহা কিছু করেন গভীর অর্থপূর্ণ, আমাদের শিক্ষাদানের জন্য হৃদয়ের গভীরে কত প্রকার কামনা বাসনা আছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু দেখিয়ে গেছেন কিভাবে এই হৃদয়ে অবস্থিত ময়লা দূর করা যায়। সবাই মিলে যত ময়লা আনল, তিনি একা তাদের সমান ময়লা আনলেন তারপর আবার সকলে জল দিয়ে ধুচ্ছে, কলসী কলসী জল নিয়ে এল মন্দির মার্জন করবার জন্য।
কিছু কিছু যেমন পাথরে দাগ থাকে তেমন আমাদের হৃদয়েও আছে প্রতিষ্ঠা, কনক-কামিনী, যদিও বা কনক কামিনী যায় তথাপিও প্রতিষ্ঠার আশা সহজে যায় না।
আমাদের দর্শন সম্পর্কে শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন কৃষ্ণ হচ্ছেন সকলের প্রভু, জীবমাত্রই কৃষ্ণের দাস একটাই জগৎবাসীকে শিক্ষা দিতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হল ২৪ ঘন্টা কেবল মাত্র কৃষ্ণের সুখের জন্য যত্ন করা। এটাই ইসকনের দর্শন।
জঙ্গলে আগুন লাগলে বনের পশু পাখি সব সময় উদ্বিগ্ন থাকে, সংসার মানেই তাই। ‘সংসার দাবানল লীড় লোক’ কারণ এই দেহটাকে ‘আমি’ ভেবে দেহের সুখের জন্য অনেক ক্লেশ স্বীকার করছি। আমি জপে আনন্দ পেলে দেহাত্ম বুদ্ধি চলে যাবে। কৃষ্ণ সেবায় আনন্দ পেয়ে যে, ২৪ ঘন্টা কৃষ্ণের সুখের জন্য সেবা করছে সে অবশ্যই কৃষ্ণকে অনুভব করবে সবসময়।
গোস্বামীরা আমাদের আদর্শ। এত কৃষ্ণসেবায় ব্যস্ত যে মাত্র ২ ঘন্টা ঘুমের জন্য ব্যবহার করছেন, রঘুনাথ দাস গোস্বামী। তাঁরা ভগবানের পার্ষদ, তাদের চিন্ময় তনু, আমাদের তা নয়। কিন্তু করতে করতে হবে। ভগবান হচ্ছেন সমস্ত আনন্দের উৎস। তার সেবা করে যদি আমরা আনন্দ পাই, তা হলে দেহের আকর্ষণ, বিশেষতঃ খাওয়া, ঘুমটা কমে যাবে। না হলে এর বিপরীতটাই হবে যা তমোগুণের লক্ষণ।
চায় না কেউ দুঃখ দুর্দশা, উদ্বেগ, কিন্তু সংসার মানে তাই। এবং বদ্ধ জীবের জীবনযাত্রা মানে তাই। সংসার মানে কুন্ঠা ধর্ম। ভগবানের সেবা করলে বৈকুন্ঠ ধর্ম। কেবলমাত্র ভগবানের ভজন করবার মাধ্যমে এই বৈকুন্ঠে কুন্ঠাহীনভাবে বসবাস করতে পারবে। তাহা না হলে দাবাগ্নি উপভোগ করতে হবে এই বদ্ধ জীবনে।
আমাদের জীবন মানে হচ্ছে ভবমহাদাবাগ্নি। একবার বদ্রীনাথের পথে যেতে যেতে আমি দেখছিলাম গাছে গাছে ঘর্ষণে আগুণ ধরে গিয়েছে। এই আগুন নেভানো কষ্টকর। কিন্তু যদি কেউ বালতি বালতি জল ঢালে তাও নেভানো সম্ভব নয়। যদি ভগবানের বিশেষ কৃপায় প্রবল বর্ষণ হয় তাহলে আগুন নিভবে।
ভগবান বা ভগবানের প্রতিনিধি শ্রীগুরুদেব সংসার দাবানল নেভাতে পারেন। কিন্তু তাঁর কথা না শুনলে কি করে হবে। ভগবানের কথামতো যে আচরণ করছে সে সংসারের সমস্ত দুঃখ ভয় পেতে মুক্ত হচ্ছে।
সাধারণত উপযুক্ত শিষ্য ও উপযুক্ত গুরু না হলে কি লাভ হবে। ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে’।
আমাদের লক্ষ করা উচিত দিন দিন আমার কি আনন্দ বর্ধন হচ্ছে কি হরির লীলায়। এই আনন্দ জড় নয়। ভগবদ্ভক্তির আনন্দ ক্রম বর্ধমান। পবিত্র হরিনামের মাধ্যমে।
শ্রীল প্রভুপাদের এক শিষ্য শ্রীল প্রভুপাদকে লিখেছেন যে, প্রভুপাদ আপনি কৃষ্ণের অর্থ লিখেছেন কিন্তু রাধারাণীর অর্থ তো লিখেননি। উত্তরে প্রভুপাদ বলেছেন- রাধারাণী আরাধনা। আরাধনার মূর্ত প্রকাশ রাধা। তার মতো কেউ ভগবানের সেবা করতে পারে না। যত ভালই সেবা করুন না কেন রাধারাণীর মতো তুমি পারবে না। রাধারাণীর খুব প্রিয় নাম গান্ধর্বিকা। এই গান্ধর্বিকা নাম বললে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের চোখ দিয়ে জল পড়ত। রাধারাণীর কৃষ্ণের প্রীতি বিধান করবার জন্য ভাল নাচ-গান সমস্ত করেন। যদি কেউ কোন সেবা ভাল করে, তাহলে সে রাধারাণীর কৃপা পেতে পারে।
ভগবান ভক্তদের সাথে লীলা করেন
20 Mar 2025 Leave a comment
in নিত্য আনন্দের পথ নির্দেশ, প্রবচন- শ্রীমৎ সুভগ স্বামী মহারাজ