মহাবদান্য শ্রীগৌরাঙ্গ

যুগে যুগে ভগবান ভক্তদের পরিত্রাণ এবং অসুর ও ভগবদ্বিদ্বেষীদের বিনাশ- এই দুটি কাজ করেন। কিন্তু কলিযুগে ভগবান গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অবতরণের এক বিশেষ অবদান আছে- যা অন্য কোন অবতারে ভগবান দেননি।
ভগবান কৃষ্ণ সকলেকে তাঁর শরণাগত হতে বললেন। তিনি ভগবদ্‌গীতায় বললেন,- “সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।” একমাত্র তাঁর অর্থাৎ, শ্রীকৃষ্ণের শ্রীচরণে আশ্রয় নিতে বললেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি কিন্তু শর্ত আরোপ করলেন, সবরকম ধর্ম ত্যাগ কর আগে। আর শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর জগৎকে কি শিক্ষা দিলেন?- বল কৃষ্ণ, ভজ কৃষ্ণ, কর কৃষ্ণ শিক্ষা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃষ্ণের মত কোন শর্ত আরোপ করেননি, যদিও তিনি কৃষ্ণের মত একই কথা বলেছেন- নাচ গাও ভক্ত সঙ্গে কর সংকীর্তন; এগুলি বড়ই মধুর কথা। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথায় সারা ভারত কৃষ্ণপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ হল। সকলে আগে ভেবেছিল, কৃষ্ণ শুধু নিজের কথা বলছেন, কৃষ্ণের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে বলছেন। মহাপ্রভুও কৃষ্ণই, কিন্তু তিনি কৃষ্ণভক্তের ভূমিকা গ্রহণ করলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুও সকলকে কৃষ্ণের জন্যই জীবন, কর্ম সকলই নিবেদন করতে উপদেশ দিলেন।
তাঁর শিক্ষা হচ্ছে- কর্ম হতে হবে না, জ্ঞানীও হতে হবে না, যোগী হওয়ার দরকার নেই, শুধু কৃষ্ণের দাস হওয়া চাই। মহাপ্রভুর বলেছেন, “জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্যদাসঃ।” কৃষ্ণ অনুশীলনকারী কর্মফল কামনা করেন না। জ্ঞানের ফল হচ্ছে মুক্তি, ভগবানের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়া; আর যোগ অনুশীলনের ফল- অনিমা, লঘিমা আদি যৌগিক ঐশ্বর্যও ভগবদনুশীলনকারীর কাম্য নয়।
শ্রী লোচন দাস ঠাকুর গান গেয়েছেন-
গোরা প্রভু না ভজিয়া মৈনু
সৎসঙ্গ ছাড়ি কইনু অসতে বিলাস
তে কারণে লাগিল মোর কর্মবন্ধ ফাঁস।
অর্থাৎ, ভগবান শ্রীচেতন্য মহাপ্রভুর সেবা না করায়, আমার জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে গেল। আমরা শাস্ত্র থেকে মহাজন, আচার্য ও তত্ত¡দর্শীদের জানতে পারি যে, মানব জীবন হচ্ছে ‘অর্থদম্’- এই মানব জীবনের একটি অর্থ আছে, এইটির এক উদ্দেশ্য রয়েছে, এই জীবন অত্যন্ত দুর্লভ। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, ‘লব্ধা সুদুর্লভং ইদং বপু সম্ভবন্তি’; ৮৪ লক্ষ যোনি সম্ভুত জীবদেহ প্রাপ্তির পর এই মানবদেহ লাভ হয়; তার মধ্যে ৪ লক্ষ রকম মনুষ্য দেহ রয়েছে। মায়িক ব্রহ্মান্ডগত অনন্ত জীবগণ যে ৮৪ লক্ষ যোনিতে ভ্রমণ করছে, শাস্ত্রে তার নিম্নরূপ তালিকা প্রদত্ত হয়েছে-
জলজা নবলক্ষানি স্থাবরা লক্ষবিংশতি
কৃময়ো রুদ্রসংখ্যকা পক্ষিণাং দশলক্ষকম্।
ত্রিংশল্লক্ষানি পশব চতৃর্লক্ষানি মানবাঃ ।।
অর্থাৎ, জলজ প্রাণীরূপে নব লক্ষবার, স্থাবর জন্ম বিশ লক্ষবার, ক্রিমিকীটরূপে এগার লক্ষবার, পক্ষী জন্ম দশ লক্ষবার, পশুরূপে ত্রিশ লক্ষবার, মনুষ্যজন্ম চারি লক্ষবার। এই ৮৪ লক্ষ জন্ম- মৃত্যু প্রবাহে অখিল ব্রহ্মান্ডগত বদ্ধজীবসমূহ প্রতিনিয়ত নিমজ্জিত হচ্ছে। শবর, পুলিন্দ, খস, আন্ধ্র, কিরাত, হুণ, সভ্য, অর্ধসভ্য বহু রকম মানুষ আছে। ভক্তশ্রেষ্ঠ প্রহ্লাদ মহারাজ বলেছেন মানব জীবন অনিত্য, অনিশ্চিত- কেউ জানি না তার আয়ু কত দিন। তাছাড়া এই জীবনে বহু বাধা-বিপদ রয়েছে পদে পদে। তাই সাধু-গুরু-শাস্ত্রের নির্দেশ মতে এই মানব জীবনের অর্থপূর্ণ উদ্দেশ্য সাধনে কেউ যখন সচেষ্ট হয়- এদের বলা হয় ব্রাহ্মণ; আর যারা এই বহু মূল্য মানব জীবন, এই পরম সম্পদ, উপযুক্ত সদ্ব্যবহার করল না, তাদের বলা হয় কৃপণ; কেননা কৃপণের বহু সম্পদ থাকলেও, সে দেখে শুনেও মূল্যবান সম্পদের কিছুই সদ্ব্যবহার করে না।
তাহলে মানব জীবনের এই অর্থটা কি? উদ্দেশ্যটা কি? সেই অর্থটা হচ্ছে, সেই উদ্দেশ্য হচ্ছে- এই জন্ম- মৃত্যুর হাত থেকে মুক্ত হয়ে, ভগবৎ-ভজন করে ভগবানের কাছে, কৃষ্ণের কাছে ফিরে যাওয়া।
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর গান গেয়েছেন-
“জীব কৃষ্ণদাস এ বিশ্বাস, করলে তো আর দুঃখ নাই।”
বাস্তবিক যে কোন উপায়েই হোক, আমাদের যদি দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে কৃষ্ণের প্রীতিময়ী সেবাই আমাদের জীবন, আমাদের প্রাণ, তাহলে আমাদের জীবনে দুঃখ-দুর্দশার লেশও থাকবে না।
তাই শাস্ত্র বলছে- আমাদের প্রকৃত স্বার্থ হচ্ছে, ভগবান যিনি সর্বব্যাপ্ত- সেই বিষ্ণু বা কৃষ্ণকে তুষ্ট করা, তাহলেই পরমব্রহ্ম ভগবান শ্রীহরি তুষ্ট হবেন, তখন সব কাজই সফল হবে। যজ্ঞ দ্বারা ভগবান তুষ্ট হন, বিশেষভাবে কলিযুগে, ‘যজ্ঞৈঃ সংকীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ।’ অর্থাৎ, সকলে নয়, যারা মেধাসম্পন্ন, যারা সবচেয়ে বুদ্ধিমান তারা ভগবানের সম্যক্ গুণকীর্তন করে, তাঁরা যজ্ঞ করেন। তাঁরা ভগবানের দিব্য নাম, রূপম, গুণ, লীলা, পরিকর, বৈশিষ্ট্যাদি কীতন করেন, অর্থাৎ কৃষ্ণনাম, কৃষ্ণরূপ, কৃষ্ণগুণ, কৃষ্ণলীলাদি সর্বদাই কীর্তনীয়। ‘শ্রবণং কীর্তনং বিষ্ণোঃ স্মরণম্’- কৃষ্ণনাম শ্রবণ হলে, কৃষ্ণকীর্তন হবে, তখন স্বতই কৃষ্ণ স্মরণ হবে। ভগবৎ-ভজন এর অর্থ হচ্ছে মনটাকে জড় জাগতিক বিষয় থেকে তুলে নিয়ে ভগবান কৃষ্ণের পাদপদ্মে অর্পণ করা। শাস্ত্রে বলেছেন-
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
কলৌ ন্যাস্তেব ন্যাস্তেব ন্যাস্তেব গতিরন্যথা ।।
কিন্তু কিভাবে ভগবান শ্রীহরির নাম করতে হবে? নিরপরাধে হরিনাম করতে হবে, নিষ্কপটে ও সম্বন্ধ জ্ঞানের সঙ্গে ভগবন্নাম করা চাই, নামাপরাধ ত্যাগ করতে হবে, সেবাপরাধ ত্যাগ করতে হবে, ধামাপরাধও বর্জন করতে হবে, নিষ্পাপ হওয়া চাই, জীব-হিংসারূপ আমিষাহার, অবৈধসঙ্গ, দ্যুতক্রীড়া ও আসব পানাদি বর্জন করা উচিত, এইগুলি পাপ জীবনের স্তম্ভ স্বরূপ। আমাদের জীবন হওয়া উচিত সহজ ও সরল, আমাদের মনোভাব হওয়া উচিত- ‘সাধুসঙ্গে কৃষ্ণনাম এইমাত্র চাই’, যিনি কৃষ্ণভক্ত তিনিই সাধু, কৃষ্ণভক্তের সঙ্গ প্রভাবে যে কেউ কৃষ্ণভক্ত হতে পারেন এবং ভগবান কৃষ্ণের ধাম প্রাপ্ত হতে পারেন। শাস্ত্রে এই কথা রয়েছে- ‘ভক্তিস্তু ভগবদ্ভক্ত সঙ্গেন পরিজায়তে।’ এমনকি এইভাবে ক্ষণিকের সাধুসঙ্গের প্রভাবে সর্বসিদ্ধি লাভ হয়। মহাপ্রভু মহাপাপী, পতিতদের সবচেয়ে কৃপা করেছেন, তাদের কৃষ্ণভক্তি দান করেছেন।
পাপীতাপী যত ছিল, হরিনামে উদ্ধারিল।
তার সাক্ষী জগাই আর মাধাই ।।
চাঁদকাজী ও জগাই-মাধাই উদ্ধার লীলার কাহিনীর সঙ্গে সকলেই পরিচিত। পাঠান বিজুলী খানকে তিনি ভগবদ্ভক্তে পরিণত করেছিলেন এই কাহিনী শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে উল্লেখ আছে।
বলভদ্র ভট্টাচার্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে বৃন্দাবন থেকে প্রয়াগে নিয়ে যাচ্ছিলেন, মহাপ্রভুর সঙ্গে রাজপুত কৃষ্ণদাস বলভদ্র সহ আরো দুজন ব্রাহ্মণ ছিল। পথে এক গাছে নীচে যখন তাঁরা বিশ্রাম করছিলেন, সেখানে হঠাৎ এক গোপের বংশীধ্বনি শুনে মহাপ্রভু ভগবৎ-প্রেমে মুর্ছিত হওয়ার লীলা করেন। ঠিক সেই সময় বিজলী খাঁন অশ্বারোহীদের নিয়ে সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সাধুর ধন লুট করে, মহাপ্রভুকে হত্যা করবার অভিযোগ করে বিজলী খাঁন সঙ্গী চারজনকে বন্দী করে। অচিরেই মহাপ্রভুর চৈতন্যোদয় হল। ‘হরি, হরি’ বলে, হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন মহাপ্রভু। বিজলী খাঁ তৎক্ষণাৎ চারজনের বন্ধন মোচন করে দিল। মহাপ্রভুও বিজলী খাঁকে তাদের পরিচয় দিলেন পাঠানদের মধ্যে মৌলবীর সঙ্গে শাস্ত্রোলোচনায় মহাপ্রভু কোরাণ উল্লেখ করে ভগবদ্ভক্তির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপন্ন করলেন। তখন বিজলী খাঁন ও তার অশ্বারোহীরা মহাপ্রভুর চরণ আশ্রয় করে কৃষ্ণভক্ত হলেন। শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী তার সম্বন্ধে লিখেছেন-
‘পাঠান-বৈষ্ণব’ বলি’ হৈল তাঁর খ্যাতি।
সর্বত্র গাহিয়া বুলে মহাপ্রভুর কীর্তি ।।
সেই বিজলী-খাঁন হৈল ‘মহাভাগবত’।
সর্বতীর্থে হৈল তাঁর পরম-মহত্ত্ব।।
মহাপ্রভুর অপ্রকট লীলার পর আজ সারা বিশ্বে সব জায়গায় লোকেরা অত্যন্ত পতিত। মাংসাহার, মদ্যপান, অবৈধ সঙ্গ ও জুয়াখেলা জন-জীবনের এক সাধারণ অভ্যাস। তাই এইসব পাপকর্ম থেকে মুক্ত করে, মহাপ্রভুর শিক্ষার আদর্শে অনুপ্রাণিত করবার জন্য ভগবানের শুদ্ধভুক্ত কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীশ্রীমৎ অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ সারা বিশ্বে শুদ্ধ হরিনাম বিতরণ করেছেন। সকলকে মহাপ্রভু ও কৃষ্ণপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ করেছেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় আজ বিশ্বের সর্বত্র কীর্তন হচ্ছে-
শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ।
শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌরভক্তবৃন্দ।।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।

Leave a Reply

March 2025
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits