শ্রীল প্রভুপাদের দৃষ্টিতে বৈদিক শিক্ষা-ব্যবস্থা

সংস্কৃত ভাষায় ‘বিদ্’ ধাতু আছে, যার অর্থ হচ্ছে জানা। আর যেখান থেকে সব কিছু সম্বন্ধে জানা যায়, তাকে বলা হয় ‘বেদ’।
শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে মধ্যলীলায় রামানন্দ রায় ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর মধ্যে কথোপকথনে আমরা জানতে পারি–
প্রভু কহে,–“কোন বিদ্যা বিদ্যা-মধ্যে সার?”
রায় কহে,–“কৃষ্ণভক্তি বিনা বিদ্যা নাহি আর। । ”
তাই বৈদিক সাহিত্যে আমরা বিভিন্ন মহাজনের জীবনে এই বিদ্যা অনুশীলন করতে দেখি। যেমন প্রহ্লাদ মহারাজ ও ঋষভদেব, তাঁরা এসম্বন্ধে অনেক উপদেশ দিয়েছেন। ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রূপ সনাতন গোস্বামীদেরও এ সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়েছিলেন।
নিজেকে জানাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বিদ্যা। তাই ভগবান ভগবদগীতায় তা বিশ্লেষণ করেছেন। এই আত্ম-বিদ্যা অত্যন্ত গোপনীয়, সবচেয়ে পবিত্র। এই বিদ্যালাভে আত্মানুভূতি হয় সোজাসুজি। এই বিদ্যা লাভ করলে তার সব মোহ দূর হয়, তার ভব-বন্ধন মোচন হয়, তাকে আর জন্মগ্রহণ করতে হয় না–আর মাতৃগর্ভে প্রবেশ করতে হয় না।
বৈদিশ শাস্ত্র থেকে জানা যায় ৮৪ লক্ষ রকম জীব রয়েছে। তার মধ্যে ৪ লক্ষ রকম মানুষ, ৩০ লক্ষ রকম পশু, ২০ লক্ষ রকম বৃক্ষ পাহাড়-পর্বত, ১০ লক্ষ রকম পাখি, ১১ লক্ষ রকম কৃমি জাতীয় জীব ও ৯ লক্ষ জলজ জীব। এরা সকলেই আহার-নিদ্রা-মৈথুন ও আত্মরক্ষা করেই প্রধানতঃ জীবন অতিবাহিত করে। এদের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ। মানুষের বিবেক আছে, তার বুদ্ধি উন্নত এবং সে চিন্তা করতে পারে। সেইজন্য শাস্ত্রে বলছে ‘জীবস্য তত্ত্বজিজ্ঞাসা’। জীব বিশেষত মানুষ মাত্রই এই আত্ম-জিজ্ঞাসা –আমি কে? এই প্রশ্নের উদয় হওয়া কর্তব্য। যার মনে এই রকম প্রশ্ন জাগে না শাস্ত্র অনুসারে তাদের ‘মানুষ’ বলে গণ্য করা হয় না।
আজকাল জগতে যে শিক্ষা দেওয়া হয় তা দেহকেন্দ্রিক। সকলেই নিজ নিজ দেহটিকে স্বরূপ বলে মনে করছে, অথচ সবচেয়ে সেরা প্রামাণিক সূত্র ভগবদগীতা থেকে আমরা জাতে পারি, স্বরূপতঃ আমরা এই দেহ নই। আমরা এক চেতন সত্তা। আমরা নিত্য, আমরা অবিনাশী, আমরা ব্রহ্ম। তাহলে তথাকথিত যে শিক্ষা আমরা পাচ্ছি, এগুলো হচ্ছে জড় বিদ্যা। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের জড় ইন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করা। এই বিদ্যা শিক্ষা করে বড় জোর একজন মূর্খ হতে পারে। কারণ এই দেহের ধ্বংসের সঙ্গে সঙ্গে এই বিদ্যার ফলও বিনাশ হবে। আর যতক্ষণ না আমরা ‘আত্মতত্ত্ব’ সম্বন্ধে শিক্ষা লাভ করছি ততক্ষণ আমাদের সব শিক্ষাই ব্যর্থ হবে।
আজকালকার শিক্ষা ব্যবস্থায় দেখা যায় যে, যে যত উচ্চতর শিক্ষা লাভ করে সে যেন ততই এই আত্মার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ প্রকাশ করে। অথচ চেতনা আসছে কোথা থেকে?–তার সদুত্তর আজ পর্যন্ত এদের কেউ দিতে সক্ষম হয় নি। বৈদিক শাস্ত্র থেকে জানা যায় যে এই চেতনা ‘আত্মা’ থেকে আসছে। চেতনার দ্বারা আত্মার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়। যেমন সূর্যের আলোর উৎস হচ্ছে সূর্য, ঠিক সেই রকম চেতনের উৎস হচ্ছে আত্মা।
শ্রীল এ.সি ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে কসাইখানার সঙ্গে তুলনা করেছেন। কেননা শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে নিজের নিত্য পরিচয়, এবং তার স্বরূপ সম্বন্ধে কিছুই জ্ঞানলাভ করছে না। তাদের সুদুর্লভ মানব জীবনকে সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট করছে তারা এইভাবে। তাই এই সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতে (৫/৫/৫) বলা হয়েছে,

পরাভবস্তাবদবোধজাতো
যাবন্ন জিজ্ঞাসত আত্মতত্ত্বম্‌।
মহাজনদের পথই অনুসরণীয়। প্রহ্লাদ মহারাজ বলেছেন–
মতির্ন কৃষ্ণে পরতঃ স্বতো বা
মিথোহভিপদ্যেত গৃহব্রতানাম্।
অদান্তগোভির্বিশতাং তমিস্রং
পুনঃ পুনশ্চর্বিতচর্বণানাম্ । ।
অর্থাৎ, বহির্রথমানী, দুরাশয়, গৃহব্রত, অন্ধের দ্বারা নীয়মান অন্ধ-প্রায় ঐ সকল ব্যক্তি বিষ্ণুই যে জীবের একমাত্র স্বার্থগতি তা জানে না। বৈদিক সভ্যতা অনুযায়ী প্রত্যেক বালক ৫ বছর বয়সে গুরুগৃহে শিক্ষা করতে যায়। সেখানে সে গুরুর কাছে ব্রহ্মচর্য জীবন যাপন করে। দুর্ভাশ্যবশত আজকাল আর সেই শিক্ষা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ভারববর্ষে কিছু কিছু জায়গায় এই গুরুকুল শিক্ষা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু শ্রীল প্রভুপাদ বর্তমান যুগে শিক্ষা ব্যবস্থার কুফল লক্ষ করে, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধিমুক্ত দিব্য-জীবন লাভের লক্ষ্যে পৌছাবার জন্য যুগোপযোগী গুরুকুল শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলন করেছেন। তাই বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ এই গুরুকুল প্রতিষ্ঠা করেছে। ভগবান কৃষ্ণের ভক্ত হলে, জন্ম-মৃত্যুকে জয় করা যায়। তাই শ্রীল প্রভুপাদ গুরুকুলের সকলকে কৃষ্ণভক্ত করতে চেয়েছিলেন। সংক্ষেপে বলা যায় গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের নিচের কৃষ্ণের উপদেশ মত ছাত্রদের জীবন গড়ে তুলতে হবে–
‘মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্‌যাজী মাং নমস্কুরু’–
অর্থাৎ, সবসময় কৃষ্ণকে মনে রাখতে হবে, কৃষ্ণভক্ত হতে হবে, কৃষ্ণ-পূজা করতে হবে ও কৃষ্ণকে প্রণাম কতে হবে। গুরুর কাছে খুব সহজ সরল ভগবদ্ ভাবনাময় জীবন যাপন শিক্ষনীয়।
ভগবদগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন–
‘বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্য’
অর্থাৎ, সকল বেদ পাঠের লক্ষ্য হচ্ছে ভগবান কৃষ্ণকে জানা, কৃষ্ণোপলব্ধি করা। আর কৃষ্ণকে তত্ত্বত জানলেই কৃষ্ণ যেমন ঠিক তেমন উপলব্ধি হবে। তখন তার আর এই জড় জগতে জন্মগ্রহণ করতে হবে না। কৃষ্ণের জন্ম, কৃষ্ণের কর্ম, কৃষ্ণের আবির্ভাব ও কৃষ্ণের লীলা বিলাসগুলি হচ্ছে দিব্য। সেগুলি হচ্ছে অপ্রাকৃত। এই জীবন অবসান হলে, যে কৃষ্ণকে এইভাবে উপলব্ধি করেছে তাকে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হবে না। তাহলে তার কি হবে?–সে ভগবান কৃষ্ণের কাছে চলে যাবে–সে সেখানে কৃষ্ণের সঙ্গে নিত্য, চিন্ময়, আনন্দঘন জীবন যাপন করবে আর কখনই দুঃখ-দুর্দশা-পূর্ণ এই জগতে আসতে হবে না।
ভগবান কৃষ্ণ ও বলরাম পর্যন্ত গুরুকুল শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। ভগবান হচ্ছেন পূর্ণতত্ত্ব। তাঁর বিদ্যা-শিক্ষার কোন প্রয়োজন নেই। তবু সকলকে শিক্ষা দেবার জন্য, আদর্শ দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য তিনি সন্দিপনী মুনির আশ্রমে বাল্যকালে শিক্ষাগ্রহণ লীলাবিলাস করেছিলেন। এইসব ঘটনা আজ থেকে ৫০০০ বছর আগে হয়েছিল। নিজে আচরণ না করলে, অন্যকে শিক্ষা অর্থাৎ ফলপ্রসু শিক্ষা দেওয়া যায় না– তাই আজ থেকে ৫০০ বছর পূর্বে ভগবান, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে শ্রীধাম নবদ্বীপে অবতরণ করে সেই শিক্ষা দিয়েছিলেন। তিনি বললেন–“আপনি আচরি ধর্ম শিখাইনু সবারে।”
শ্রীল প্রভুপাদ আমেরিকার একটি বিশ্ব বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ্যার শিক্ষায়তন মাসাচুসেট ইনস্টিটিউট্ অফ্ টেকনোলজিতে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। সেখানে ছাত্র শিক্ষাবিদ্, প্রযুক্তিবিদ্‌দের সভায় তিনি বৈদিক শিক্ষা, এই আত্মতত্ত্ব বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি তাদের প্রশ্ন করেছিলেন–এত বিভাগ রয়েছে, অথচ কোথাও আত্মতত্ত্ব শিক্ষা দেওয়ার কোন বিভাগ নেই কেন?
বাস্তবিক কোথাও এই রাজবিদ্যা শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। আজকাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বানিজ্য, বিজ্ঞান, কলা, রাজনীতি, সমাজনীতি, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, যন্ত্রবিজ্ঞান আদি সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়া হয়। এই সবই জড়বিদ্যা। চেতন সত্তা, আত্মা সম্বন্ধে তারা কিছুই শিক্ষা লাভ করে না অথচ বিশ্বময় কত বিদ্যালয়, শিক্ষায়তন, বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বহু বিভাগ রয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি যেমন বিশাল তেমনি সেখানে অনেক বহু বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু কোথাও এই ‘আত্মতত্ত্ব’ শিক্ষা দেওয়া হয় না। এইটি মানব সমাজের পক্ষে অতীব দুর্ভাগ্যের বিষয়।
এই শিক্ষা দেওয়ার জন্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও তাঁর নিত্য পার্ষদ রূপ-সনাতন গোস্বামী লীলাবিলাস করে গেছেন আজ থেকে পাঁচশ বছর আগে। অথচ জড় জাগতিকে বিচারে শ্রীল রূপ গোস্বামী ও শ্রীল সনাতন গোস্বামী–দুজনেই ছিলেন বিরাট পন্ডিত ও উচ্চশিক্ষিত। তারা মহাপ্রভুর কাছে আত্ম-তত্ত্ব সম্বন্ধে নানা প্রশ্ন করেছিলেন। মহাপ্রভুর শরণাগত হয়ে অতীব দৈন্য সহকারে মহাপ্রভুর কাছে এইসব প্রশ্ন করেছিলেন। চিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই মনে প্রশ্ন জাগে আমি কে? এই পরিদৃশ্যমান জগতের সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কি? পরম নিয়ন্তা কে? তার সঙ্গে আমার সম্বন্ধ কি? আমার জীবনের লক্ষ উদ্দেশ্য বা অর্থ কি?
এই বিষয়ে জ্ঞান লাভ করাই হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা। আজকাল বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে তা লাভ করে একজন শূদ্র হচ্ছে, চাকরি খুঁজছে–আসলে তা শুদ্রের কাজ। প্রকৃত উচ্চশিক্ষা হচ্ছে বৈদিক জ্ঞান লাভ করা। ব্রাহ্মণ হলে একজন ঐ শিক্ষা লাভ করতে পারে। সারা বিশ্বে এই শূদ্র ভাবাপন্ন ব্যক্তি তৈরি করার শিক্ষা দেওয়ার ফলে জগতে আজ এত অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। ছাত্ররা আজ উচ্ছৃঙ্খল, তাদের জীবন উদ্দেশ্যহীন ও নৈরাশ্যময়। তাই শ্রীল প্রভুপাদ যখন আমেরিকায় যান এবং ঐ দেশীয় যুবক-যুবতীদের কৃষ্ণানুশীলনে উদ্ধুদ্ধ করেন, সাংবাদিকরা তখন তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন–“এইসব যুবক যুবতীদের ভবিষ্যতে আপনি কি গড়ে তুলবেন? শ্রীল প্রভুপাদ বলেছিলেন,“আমি এদের ব্রাহ্মণ করে তুলবো, আর ভগবানকে জানতে হলে, শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তের শরণাপন্ন হওয়া চাই। কৃষ্ণতত্ত্ববিদের শরণাগত হওয়া চাই। বিনয় নম্রভাবে তাঁর কাছে গিয়ে, তাঁর শরণাপন্ন হয়ে তাঁর আনুগত্যে শিক্ষাপ্রাপ্ত হলে, দাস সুলভ দৈন্যভাবে তাঁর সেবা করলে, কৃপাসিন্ধু বৈষ্ণব তখন তুষ্ট হন। তাকে সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের ‘সার’ বুঝিয়ে দেন। শ্রদ্ধাভরে, দৃঢ় বিশ্বাসে তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী সর্বদা শ্রবণ করলে তা কায়-মন-বাক্যে পালন করলে তার কৃপায় ভগবানের কৃপা লাভ হয়। ভগবান শ্রীহরি তৃষ্ট হলে সর্বসিদ্ধি লাভ হয়। শাস্ত্রে আছে ‘সংসিদ্ধি হরিতোষণম্।’ তাই গুরুকুলের ছাত্র শম, দম, তপ, শৌচ, ক্ষান্তি, আর্জব, জ্ঞান, বিজ্ঞান, আস্তিক্য আদি ব্রাহ্মণের গুণাবলী অর্জন করে গুরুসেবা করে। সে শৈশব থেকে গুরুকুলে শিক্ষা লাভ করে। শ্রীমদ্ভাগবতের দশম স্কন্ধে আমরা কৃষ্ণ ও সুদামা কথোপকথন থেকে জানতে পারি–ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সকলের হৃদয়ে অবস্থান করে, সবকিছু লক্ষ্য করেন। যে সর্বান্তঃকরণে গুরুদেবকে তুষ্ট করবার প্রয়াস করে, ভগবান কৃষ্ণ তাঁর প্রতি সবচেয়ে তুষ্ট হন। গুরুর আশ্রমে বসবাস করে গুরুদেবের সেবায় সর্বস্ব নিবেদন করতে হবে। গুরুকুলে অবস্থানের সময় এমন কি ভগবান কৃষ্ণ পর্যন্ত অনেক কষ্ট স্বীকার করেছিলেন।
সাধারণত সূর্যোদয়ের প্রায় দেড় ঘন্টা আগে শয্যা ত্যাগ, স্নান, পরিচ্ছন্ন বেশে ভগবদ্বিগ্রহের সামনে এসে প্রতিদিন গুরুবন্দনা করা প্রতি গুরুকুল ছাত্রের কর্তব্য। সকলের উচিত মহামন্ত্র–
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ।।
জপ করা। প্রতিদিন গুরুদেবের মুখনিঃসৃত শ্রীমদ্ভাগবত-পাঠ শ্রবণ করা প্রত্যেক ছাত্রের কর্তব্য। শাস্ত্রে এইসব কথার উল্লেখ আছে, তাই সেখানে বলা হয়েছে–‘ব্রহ্মচারী গুরুকুলে বসনদন্ত গুরোহিতম্।’ ভগবদবতার ঋষভদেব তাঁর পুত্রদের শিক্ষাদানের সময় বলেছিলেন–
‘তপো দিব্যম্ পুত্রকা যেন সত্ত্বম্‌’
অর্থাৎ, শুদ্ধ ও পবিত্র হওয়ার জন্য জীবনে, অন্ততঃ ছাত্র জীবনে তপশ্চর্যা করা চাই। যেমন কলিযুগে মহাপ্রভু খুব সহজ করে দিয়েছেন–কঠোর তপশ্চর্যা যা বৈদিক সভ্যতায় দেখতে পাওয়া যায়, ঐ রকম নয়। তবে ব্রহ্মমুর্হূর্তে শয্যাত্যাগ ও স্নান করা এইগুলি এইযুগে তপশ্চর্যা। বৈদিক শিক্ষার উদ্দেশ্য আদর্শ চরিত্র গঠন করা। প্রত্যেক নারীকে মাতৃজ্ঞান করা। বড় বড় পন্ডিত হওয়া এই শিক্ষার লক্ষ নয়। প্রহ্লাদ মহারাজ বলেছেন–
কৌমার আচরেৎপ্রাজ্ঞো ধর্মান্ ভাগবতানিহ।
দুর্লভং মানুষং জন্ম তদপ্যধ্রুবমর্থদম্।।
এই মানব জীবন ক্ষণস্থায়ী, অনিশ্চিত অথচ সুদুর্লভ। তাই শৈশব থেকেই এমন শিক্ষা লাভ করা কর্তব্য যার দ্বারা জীবনের মূল সমস্যা জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধিকে জয় করা যায়। এটিই বৈদিক শিক্ষার লক্ষ্য। গুরুকুল শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন শিক্ষা দেওয়া হয়, যাতে ছাত্র ভগবদ্ভাবনাময় হয়ে উঠে ও দেহের অবসানে বৈকুন্ঠে নিত্যানন্দময় অনন্ত জীবন লাভ করে।
গুরুকুলে ব্রহ্মচারী গুরুর সম্পূর্ণ আনুগত্য স্বীকার করে শিক্ষা লাভ করে, তাহলে ছাত্রজীবন সফল হবে। যিনি বৈষ্ণব, কৃষ্ণের শরণাগত–কায়, মন ও বাক্য দ্বারা তিনি গুরু। ছাত্ররা তাঁর কাছে সদাচার শিক্ষা করে। এই গুরুকুলে ছাত্রদের এমনভাবে গড়ে তোলা হবে যাতে ভবিষ্যতে তারা শুদ্ধ বৈষ্ণব হয় ও সর্বত্র কৃষ্ণকথা প্রচার করতে পারে।
মহাপ্রভুর শিক্ষা–‘বৈরাগ্য বিদ্যা নিজ ভক্তিযোগম্’ এই শিক্ষা ব্যবস্থায় জড় জগৎ সম্বন্ধে বৈরাগ্যের উদয় হয় ও সঙ্গে সঙ্গে ভগবানে আসক্তি জন্মায়। সাধারণত জড় জগতে সকলেই কর্মী। তাদের সকলেরই লক্ষ অর্থনৈতিক উন্নতি। কেন? ভোগসুখের জন্য। এইভাবে তারা ক্ষণস্থায়ী দেহ, গেহ, দারা-সূত ধন-সম্পদে আসক্ত হয়ে পড়ে। তার ফলে জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধিময় এই জড় জগতে আবার তাদের আসতে হবে। কিন্ত বৈদিক শিক্ষার ভিত্তি হল ভগবানে আসক্তি, ভগবানকে ভালবাসা, আত্মার সম্বন্ধে জীবের সঙ্গে আত্মীয়তা, এবং সকলকে ভালবাসতে শেখা। তখন ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’ ভগবৎ-কেন্দ্রিক, কৃষ্ণ-কেন্দ্রিক জীবন হওয়ায় সকলকেই কৃষ্ণের সন্তান–এই দৃষ্টিতে দর্শন করায়, সারা জগৎকে কৃষ্ণের সংসার রূপে দেখা যায়। তখন এক বৈকুন্ঠময়–অভয়, অশোক ও আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি করা যায় এই দুঃখ-দুর্দশাপূর্ণ জগতে। এইটিই হল বৈদিক শিক্ষার ফল।

 

Comments are closed.

March 2019
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Blog Stats

  • 140,959 hits