শ্রীমায়াপুরে গৌরপূর্ণিমা মহোৎসব

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীশ্রীমৎ অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ অনেক আশা করে ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পূত আবির্ভাবস্থল শ্রীধাম মায়াপুরে শ্রীমায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দির স্থাপন করেছিলেন। তাঁর আশা ছিল সারা বিশ্বের সকল দেশ থেকে ভক্তরা এখানে এসে মিলিত হবে, তারা ভগবান শ্রীগৌরাঙ্গের জয়গান করবে। তাই মঙ্গল, শুভ এবং পবিত্র সময় ভগবানকে আরাধনা করবার ব্রহ্মমুহূর্তে শঙ্খ ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে শত শত ভক্তরা মায়াপুর চন্দ্রোদয় মন্দিরে সমবেত হয়েছে। শ্রীবিগ্রহ-শ্রীশ্রীরাধামাধব দর্শন লাভ করে সকল দেশের ভক্তরা মধুর সুরে নৃত্য-গীতে ভরে তুলছিল মন্দিরকে।  মহাপ্রভুর জয়গান করে তারা গাইছিল–
জয় জয় শ্রীচৈতন্য জয় নিত্যানন্দ।
জয়াদ্বৈতচন্দ্র জয় গৌরভক্তবৃন্দ ॥
আবার কখনও বা তারা গাইছিল
জয় শচীনন্দন গৌরহরি।
গৌর হরি জয় গৌর হরি ॥
কেউ কেউ গাইছিল–
নিতাই গৌরাঙ্গ, নিতাই গৌরাঙ্গ। যারা গান গাইছিল, তারা এসেছিল পৃথিবীর দূর দূরান্ত থেকে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে, বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী সকলেই আজ এখানে শ্রীগৌরসুন্দরের নাম ধর্মের জয় গান করছেন–শুদ্ধভক্ত শ্রীল প্রভুপাদের আহ্বানে। এই কৃষ্ণপ্রেষ্ঠ শুদ্ধভক্ত শ্রীল প্রভুপাদ এমন একটি গৃহ তৈরী করেছেন যেখানে বিশ্বের সকল জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে সুখ-শান্তিতে বসবাস করতে পারে। এখানে রাশিয়ান, আমেরিকান, ভারতীয়, পাকিস্থানী, আরব, ইস্রায়িলী, দক্ষিণ কোরিয়া-উত্তর কোরিয়ানদের মধ্যে কোন বিবাদ নেই, ‘কীর্তনীয় সদাহরি’– ভগবান ‘শ্রীহরি’ আমাদের সকল অশুভ হরণ করেন। যা কিছু শুভ তাতে আমাদের জীবন ভরে তোলেন। শ্রীগৌরসুন্দর আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন–ভগবান তাঁর নাম অভিন্ন। পৃথিবীর সকল শাস্ত্রে তাঁর অসংখ্য উল্লেখ আছে। সরলচিত্তে সম্বন্ধ জ্ঞানে ও নিরপরাধে সেই নাম কীর্তন করে সকলেই ভগবৎ-সান্নিধ্য লাভ করতে পারে। এটিই হচ্ছে ভগবৎ-দর্শনের পন্থা। এই পন্থা–শ্রীগৌরসুন্দরের দান, এর আগে কেউ এই শিক্ষা দেয়নি–মহাপ্রভুর এই দান তুলনাহীন। তাই শ্রী রূপ গোস্বামী মহাপ্রভুকে ‘নমো মহাবদান্যায়’– বলে তাঁকে প্রণাম জানিয়েছেন। ভগবান আর কখন এত উদারভাবে প্রদর্শন করেননি। সব ধর্মেই বলা হয়েছে–ভগবান সর্বত্রই রয়েছেন–তিনি সর্বত্রই বিরাজমান–তিনি সর্বব্যাপী। তাই বৈদিক শাস্ত্রে তাকে বিষ্ণু বলা হয়। সত্যযুগে তাঁকে লাভ করবার পথ সম্বন্ধে শাস্ত্রে বলা হয়েছে ‘কৃতে যুদ্ধায়তো বিষ্ণু’–অর্থাৎ সত্যযুগে হাজার হাজার বছর ধ্যান করবার পর তাঁকে লাভ করা যেত, আর এই কলিযুগের মানুষ সকলেই প্রায় শুদ্র, তারা ভগবদ্বিমুখ, দ্বন্দ্ব কলহে পূর্ণ এই যুগ। এই কলিযুগের ত্রুটি অনেক, তাই শাস্ত্রে বলছে ‘কলের্দোষনিধে’ অর্থাৎ কলিযুগের দোষ-ত্রুটির পরিমাণকে সমুদ্রের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এত দোষ-ত্রুটি কলিযুগে রয়েছে। তাহলে কি ভগবানকে লাভ করবার কোন উপায় নেই ? কোন আশা নেই?–আছে, তারপরে লেখা ‘অস্তি’ অর্থাৎ আছে। ‘এক মহান্ গুণঃ’–অর্থাৎ কলিযুগের একটি মহান গুণ, সেটি কি? ‘কীর্তনাদেব কৃষ্ণস্য’–অর্থাৎ কৃষ্ণ-কীর্তন, কৃষ্ণ কখনও একা নয়, কৃষ্ণ যেখানে সেখানে তাঁর পার্ষদরাও আছেন, অর্থাৎ কৃষ্ণ ও তাঁর প্রিয় সবকিছুই কীর্তন করা চাই, তাহলে কি হবে? কৃষ্ণ-কীর্তন করবার ফল কি ? ‘মুক্তসঙ্গ পরং ব্রজেৎ’, আমরা সংসার মুক্ত হব, আমাদের মায়ার বন্ধন ছুটে যাবে, তখন আমরা ভগবানের নাম কীর্তন ও শ্রবণাদিতে উন্মুখ হব।
ভগবান পরম করুণাময়, তিনি মহাবদান্য শ্রীগৌরসুন্দর রূপে কলিযুগে অবতরণ করেছেন, এইসব পতিত জীবদের উদ্ধারের জন্য। বৈষ্ণব ঠাকুর গান গেয়েছেন–‘পতিত-পাবন হেতু তব অবতার’ আগে যারা ছিল বেদ বিরোধী সেই সব খস, আভির, যবন, পুলিন্দ পুল্কশ আদি সবাই এখন হরিকীর্তনে মেতেছে। শ্রীল সচ্চিদানন্দ ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন–জগতের সকল ধর্ম এক হয়ে মহাপ্রভু প্রদর্শিত একটি মাত্র এই ‘হরিনাম কীর্তন’ ধর্ম জগতের বিরাজ করবে, তা আজ বাস্তবে রূপায়িত হয়েছে।
ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণাবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামীর অক্লান্ত প্রচেষ্টায়, তিনি প্রকৃতপক্ষে সারা বিশ্বকে ভাতৃত্বের বন্ধনে মিলিত করেছেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন যথার্থ রাষ্ট্রসংঘ। তবে জড় জগতের রাষ্ট্রসংঘের চেয়ে অনন্ত গুনে শ্রেষ্ঠ এই রাষ্ট্রসংঘ কেননা এটি দিব্য ভাবময়, তিনি জগৎবাসীকে শিক্ষা দিয়েছেন–কৃষ্ণ সকল জীবের পিতা, সকলের নিত্য কালের একমাত্র প্রভু, জীব মাত্রই তাঁর নিত্য দাস। তাঁর সেবা করাই সকলের একমাত্র ধর্ম, কৃষ্ণ সকল আনন্দের উৎস–তিনি চিন্ময় আনন্দের মূর্তবিগ্রহ–
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥
তার আগে–
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ
শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌরভক্তবৃন্দ ॥
এই কীর্তনের দ্বারা মহাপ্রভুর কৃপা লাভ করে হরিনাম মহামন্ত্র কীর্তন করা তাদের পক্ষে সহজ হচ্ছে, আর শ্রীল প্রভুপাদের কৃপায় তারা আমিষাহার, অবৈধ সঙ্গ, আসবপান ও জুয়াদি খেলা ত্যাগ করে আজ তারা সদাচারী হয়েছে।
ইটালী, জার্মানী, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, পোলাও, রাশিয়া, উত্তর আমেরিকা, ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, পেরু, আর কত দেশ থেকে এসেছে গৌর-ভক্তরা। এরা কি করে নিজেদের দেশের আচার ব্যবহার জীবনযাত্রা ছেড়ে দিয়ে এই মহাপ্রভুর প্রদর্শিত পন্থা কৃষ্ণভাবনাময় জীবন গ্রহণ করল ? অনেকে এদের দেখে এই সব কথা ভাবে। মেয়েরা কিভাবে বাংলার মেয়েদের মত শাড়ি, শাখা, সিদুঁর ও তার উপর তিলক-মালা নিয়ে সব সময় সুন্দর ভাবে ‘হরিনাম’ করছে, ছেলেরাও ধুতি-কোর্তা, গৈরিক বেশবাস ও তিলক-মালা সহ সরল জীবন খুব সহজেই গ্রহণ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে সব রকম ভারতীয় খাবারেও অভ্যস্ত হল কি করে– হাজার হাজার ভিন্ন দেশের লোক, কেননা পূর্ব জন্মে কেউ কেউ ভগবানের সেবা করেছে বা ভক্তের সেবা করেছে, বা ভক্তি উন্মুখী কোন সেবা হয়তো করেছিল, তাই পতিতপাবন মহাবদান্য মহাপ্রভু তাদের আবার ভগবৎ-সেবা কৃষ্ণভক্তি অনুশীলনের সুযোগ দিয়েছেন।
তারা জগতের বিভিন্ন দেশে জন্মগ্রহণ করে শ্রীগৌরাঙ্গের শুদ্ধ ভক্তের নেতৃত্বে শ্রীল প্রভুপাদের পরিচালনায় আবার ভগবৎ-সেবা করতে এসেছে মহাপ্রভুর আবির্ভাব স্থান শ্রীধাম মায়াপুরে, এই সব বিদেশীরা যারা মহাপ্রভুর শরণাগত হয়েছে, আজ তারা কৃষ্ণসেবার দিব্য আনন্দ অনুভব করছে, তাই আজ রাশিয়ার মত সাম্যবাদীদের দেশেও অন্ততঃ একশটি কৃষ্ণভাবনামৃত কেন্দ্র হয়েছে, সেখানে শহরে শহরে, রাস্তায় রাস্তায় ভক্ত কৃষ্ণনামে মৃখরিত করছে, জনসাধারণের কাছে কৃষ্ণপ্রসাদ বিতরণ করছে, হাজার হাজার লোক শ্রীল প্রভুপাদের লেখা ভগবদগীতা, শ্রীমদ্ভাগবত, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা–এইসব বই শুধু সংগ্রহেই যে তারা গ্রহণ করছে তা নয়, শ্রীল প্রভুপাদের লেখা এইসব কৃষ্ণভাবনাময় গ্রন্থের অবিশ্বাস্য রকম চাহিদা, আর তা দিন দিন বাড়ছে সেখানে ও অন্যান্য পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে।
কট্টর ইসলামপন্থী নেতার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ অধ্যাপক ও তার পত্নী ও তাদের এক বন্ধু মহাপ্রভু প্রদর্শিত পথে হরিনাম প্রচার করেছেন। শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থগুলি ঐ দেশের ভাষায় অনুবাদ করে, তারাও তাদের ঘোর বিরোধী ইস্রায়িলী ভক্তদের সঙ্গে একসঙ্গে কৃষ্ণপ্রসাদ পেল, এবং এক সঙ্গে নবদ্বীপ ধাম পরিক্রমা করল এবং একসঙ্গে ‘হরিনাম সংকীর্তন’ করল। এইটি হচ্ছে দিব্য জাতিসংঘ। শ্রীল প্রভুপাদের পন্থা–কৃষ্ণপ্রসাদ গ্রহণ কর ও হরিনাম কীর্তন কর–
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে নাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥
তাহলে ধীরে ধীরে সকলে কৃষ্ণানুশীলন করতে শুরু করবে, শ্রীল প্রভুপাদ এইভাবে সারা বিশ্বকে মহাপ্রভুর প্রদর্শিত কৃষ্ণভক্তির পথে এনেছেন। ভগবদগীতায় এই সব কথা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শিক্ষা দিয়েছিলেন আজ থেকে ৫০০০ বছর আগে। ‘যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ সন্তো মুচ্যন্তে সর্বকিল্বিষৈঃ’–কৃষ্ণপ্রসাদ সেবার ফল বহু বহু জন্মের সব পাপের ফল থেকে অচিরেই একজন মুক্ত হয়, পরম পবিত্র কৃষ্ণপ্রসাদ গ্রহণ করবার ফলে তাদের দেহও পবিত্র হচ্ছে, কৃষ্ণ-কীর্তন করে তাদের মন কৃষ্ণভাবনাময় হচ্ছে, তারা চৈতন্যচন্দ্রের দয়া অনুভব করছে, তাই তারা সকলে আনন্দে মহাপ্রভুর জয়গান করছে। বিগত পাপময় জীবন ত্যাগ করছে, তারা আজ এক নতুন জীবন,–এক দিব্য জীবন লাভ করছে, তাই মহাজন বৈষ্ণবাচার্য গান গেয়েছেন–
চৈতন্যচন্দ্রের দয়া করহ বিচার।
বিচার করিলে, চিত্তে পাবে চমৎকার ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিত্যানন্দ প্রভু ও হরিদাস ঠাকুরকে এইভাবে হরিনাম প্রচার করবার পদ্ধতি বলেছিলেন–
শোন শোন নিত্যানন্দ শোন হরিদাস
সর্বত্র আমার আজ্ঞা করহ প্রকাশ ॥
প্রতি ঘরে ঘরে গিয়া কর এই ভিক্ষা।
বল কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ কর কৃষ্ণ-শিক্ষা ॥
ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপা লাভ করতে হলে, তাঁর অনুগত্য স্বীকার করা একান্ত কর্তব্য, তাঁর উপদেশ মতো তাঁর অভিন্ন প্রকাশ শ্রীনিত্যানন্দের আনুগত্য অর্থাৎ বর্তমানে তাঁর প্রতিনিধি সদ্‌গুরুর আনুগত্যে রূপানুগ ধারায় কৃষ্ণানুশীলন করা উচিত। ষড়্ গোস্বামীরা সেই শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন–
যারে দেখ, তারে কহ ‘কৃষ্ণ’-উপদেশ।
আমার আজ্ঞায় গুরু হঞা তার’ এই দেশ ॥
তাই আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের ভক্তরা নিজেরা কৃষ্ণপ্রাপ্তির জন্যই শুধু কৃষ্ণ অনুশীলন করেন না, পক্ষান্তরে অন্য সকলে যেন কৃষ্ণোন্মুখ হয়,–অন্যেরা যাতে কৃষ্ণানুশীলন পথে অগ্রসর হয় তারজন্যও সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করে। এইটি আরও উদার মনোবৃত্তির পরিচায়ক। যখন কোন বাড়িতে আগুন লাগে, তখন প্রতিবেশী তার ভাষা বুঝতে না পারলেও, নানা উপায়ে ঐ অবস্থার কথা তাদের বোঝান যেতে পারে, সেটি জরুরী অবস্থা। সেই রকম এই জগতে এখন কৃষ্ণভাবনা প্রচারের জরুরী প্রয়োজন, এই বিশ্বের জীবকে মায়ার তমোন্ধকার থেকে উদ্ধারের জন্য কৃষ্ণভক্তি প্রচার একান্তই প্রয়োজন।
বৈষ্ণবকুলচূড়ামণি শ্রীশ্রীমৎ ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুর বলতেন–‘প্রাণ আছে যার, সেহেতু প্রচার’, অর্থাৎ কৃষ্ণভক্তিতে বিশ্বাস থাকলেই হবে না, সেবা করা, প্রচার করা চাই–এর জন্য প্রয়োজন প্রাণ প্রাচুর্য, চাই অদম্য উৎসাহ, এই কৃষ্ণভাবনার অমৃত আস্বাদন করে আজ বিশ্বের দিকে দিকে জনমানস জড় জাগতিক আনন্দ উপভোগ ছেড়ে দিয়েছে, কোথায় কৃষ্ণ ভক্তির দিব্য আনন্দ ? কোথায় জড় আনন্দ ? তা শ্রীমদ্ভাগবতে শ্রীল ব্যাসদেব লিখেছেন–
বাসুদেবে ভগবতি ভক্তিযোগ প্রয়োজিতঃ।
জনয়ত্যাশু বৈরাগ্যং জ্ঞানং চ যদহৈতুকম্্ ॥
অর্থাৎ, যেই ভগবান সর্বত্র বাস করেন, তাঁর প্রতি অহৈতুকী ভক্তি করলে অচিরেই জ্ঞান ও বৈরাগ্যের উদয় হয়, এইসব সারা বিশ্বের কৃষ্ণানুশীনকারী ভক্তদেরও তাই হয়েছে, শ্রীল প্রভুপাদের নির্দেশ মতো তারা কৃষ্ণকথা শ্রবণ, কৃষ্ণকীর্তন, কৃষ্ণস্মরণাদি নবধা ভক্তি অনুশীলন করায়, কৃষ্ণ যে তাদের প্রভু, তারা কৃষ্ণের নিত্য দাস, এই উপলব্ধি হয়েছে। জড় জাগতিক বিষয় ভোগে তাদের বৈরাগ্য এসেছে–কেউ আর আজ চা, কফি, সিগারেট বা মদ্যাদি পানীয় বা আজে-বজে চলচ্চিত্র, নাটক, নাচ-গান অমেধ্য আহারে ইচ্ছা প্রকাশ করে না।
ভগবানকে বা ভগবৎ-সেবা ভাল লাগলে, অন্য সব কিছুতে বিরক্তি আসে। ভগবানকে অথবা তাঁর সেবায় আনন্দ পেলে, মনে হয় এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুই নেই, তখন চরম বিপদেও কৃষ্ণানুশীলনকারীরা বিচালিত হন না। এইভাবে হরিনাম শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণাদি নবধা ভক্তির মাধ্যমে ভগবদ্ সান্নিন্ধে যে আনন্দ তা চিন্ময়, তা অপ্রাকৃত হওয়ায় এই আনন্দ অসীম–তাই এইটি যথার্থ আনন্দ। এরা নিজ নিজ দেশে প্রচুর বিলাসবহুল জীবন যাপন করলেও কৃষ্ণসেবার অপ্রাকৃত লাভ করে, কৃষ্ণভাবনার অমৃত আস্বাদন করে, পূর্বের জীবনধারাকে তুচ্ছ জ্ঞানে ত্যাগ করেছেন। কেননা ভগবৎ-সেবার মাধ্যমে দিব্য আনন্দময়ের সান্নিধ্য তারা পেয়েছেন।
শ্রীধাম মায়াপুর থেকে মহাপ্রভু একদিন যে ভগবৎ-প্রেমের বন্যার সূচনা করেছিলেন, তা আজ সারা বিশ্বকে প্লাবিত করছে, মায়াপুরে গৌরপূর্ণিমা মহোৎসবে যোগদান করে এই কথা মনে পড়ে বার বার। মনে পড়ে শুদ্ধ গৌরভক্ত সচ্চিদানন্দ শ্রী ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভবিষ্যদ্বাণী–নবদ্বীপ তথা মায়াপুরে এসে বিভিন্ন দেশের গৌরভক্তরা ভারতের গৌরভক্তদের সঙ্গে প্রেমালিঙ্গন করবে, ‘জয় শচীনন্দন, জয় শচীনন্দন’ বলে শ্রীধাম মায়াপুরের আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তুলবে। এইভাবে শ্রীধাম মায়াপুর আজ সারা বিশ্বের সকল জাতি ও ধর্মের মিলনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আজ গৌর-নিত্যানন্দের দয়া উপলব্ধি করে গাইতে ইচ্ছা করে ঠাকুর লোচন দাসের গান–
পরম করুণ, পঁহু দুইজন,
নিতাই গৌরচন্দ্র।
সব অবতার, সার-শিরোমণি,
কেবল আনন্দ-কন্দ ॥
আর বাঞ্ছাকল্পতরু কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ও বৈষ্ণবকুলচূড়ামণি শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত ঠাকুরের চরণারবিন্দ স্মরণ করে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি–গৌরনাম, গৌর রূপ, গৌর গুণ, গৌরলীলা, গৌর-নিতাই ধামের মহিমায় ও কীর্তনে সারা জগৎ প্লাবিত হোক্।

Comments are closed.

March 2019
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031

Blog Stats

  • 140,978 hits