শ্রীনিত্যানন্দের অহৈতুকী কৃপা

আজ থেকে মোটামুটি ৫০০ বছর আগের কথা। তখন হুগলী জেলায় হিরণ্য দাস ও গোবর্ধন দাস নামে মহা ধনবান দুই জমিদার ছিল। তাদের মাসিক আয় ছিল ২০ লক্ষ মুদ্রা। ছোট্ট ভাই গোবর্ধন দাসের একমাত্র ছেলে ছিলেন রঘুনাথ দাস। শান্তিপুওে রঘুনাথ দাস মহাপ্রভুর চরণ দর্শনের সুযোগ লাভ করেছিলেন। মহাপ্রভুর মথুরা থেকে আসার খবর পেয়ে, তাঁর চরণ দর্শন করতে চেষ্টা করেছিলেন রঘুনাথ।
বার বার রঘুনাথ মহাপ্রভুকে দর্শন করতে যান, তার স্নেহান্ধ বাবা মা তাকে প্রতিবার বাধা দেয়। গোবর্ধন দাস পুত্র সম্বন্ধে তার স্ত্রীকে বলেছিল-
“ইন্দ্রসম ঐশ্বর্য, স্ত্রী অপ্সরা-সম।
এ সব বান্ধিতে নারিলেক যাঁর মন ।।
দড়ির বন্ধনে তাঁকে রাখিবা কেমতে?
চৈতন্যচন্দ্রের কৃপা হঞাছে ইঁহারে।
চৈতন্যচন্দ্রের ‘বাতুল’ কে রাখিতে পারে?”
(চৈঃ চঃ অন্ত্যঃ ৬/৩৯-৪১)
তারপর বহু সেবক নিয়ে নিত্যানন্দ প্রভু পানিহাটিতে এলে, রঘুনাথ তাঁর চরণ দর্শনের ইচ্ছায় সেখানে যান। সূর্যের মত তেজস্বী নিত্যানন্দ প্রভু সেখানে গঙ্গার তীরে এক বৃক্ষের মূলে বসেছিলেন। অনেক অনুগামী তাঁর চারধারে বসেছিলেন। তেজঃপূর্ণ সপার্ষদ নিত্যানন্দ প্রভুকে দেখে রঘুনাথ বিস্মিত ও অভিভূত হলেন ও দূর থেকে ভুক্তিভরে তাঁকে দন্ডবৎ প্রণাম করলেন। পরম দয়ালু ও কৌতুকপ্রিয় নিত্যানন্দ প্রভু কৃপাকরে রঘুনাথ দাসকে বললেন-
“নিকটে না আইস, চোরা, ভাগ’ দূরে দূরে।
আজি লাগ পাঞাছি, দন্ডিমু তোমারে ।।
দধি, চিড়া ভক্ষণ করাহ মোর গণে।”
(চৈঃ চঃ অন্ত্যঃ ৬/৫০-৫১)
এই কথা শুনে রঘুনাথ দাস খুব আনন্দিত হলেন এবং চিড়া, দধি, দুগ্ধ, সন্দেশ, চিনি, কলা দূর দূর গ্রাম থেকে আনালেন। দু’শ গোল মাটির পাত্র, বড় বড় মাটির ৫/৭ টি পাত্র অন্য গ্রাম থেকে লোকেরা নিয়ে এলেন। মহোৎসব- এর নাম শুনে সজ্জন-ব্রাহ্মণরা সেখানে আসতে শুরু করলেন।
নিত্যানন্দ প্রভুর প্রধান পার্ষদ তাঁর চারিদিকে বৃত্তাকারে বসেছিলেন। এদিকে সেখানে রাঘব পন্ডিত গিয়ে উপস্থিত হলেন, এবং মহোৎসব করতে দেখে তিনি বিস্মিত হয়ে হাসতে হাসতে নিত্যানন্দ প্রভুকে বললেন-
“তোমা লাগি’ ভোগ লাগাইল।
তুমি ইঁহা উৎসব কর, ঘরে প্রসাদ রহিল ।।”
রাঘব পন্ডিত তাঁর সঙ্গে আনা প্রসাদ প্রথমে নিত্যানন্দ প্রভুকে দিলেন, তারপর তাঁর পার্ষদ ও ভক্তদের মধ্যে তা বিতরণ করে দিলেন। সেখানে রামদাস, সুন্দরানন্দ, দাস গদাধর, মুরারি, কমলাকর, সদাশিব, পুরন্দর, ধনঞ্জয়, জগদীশ, পরমেশ্বর দাস, মহেশ পন্ডিত, গৌরীদাস, উদ্ধরণ দত্ত ও হোড়কৃষ্ণ দাস ছিলেন।
কোন কোন মাটির পাত্রে গরম দুধে চিড়া ভেজান হল; আবার কোন কোন পাত্রে দই, চিনি, কলা ও চিড়ে মেশান হল। কোন কোন পাত্রে চাঁপা কলা, চিনি, ঘি, কর্পূর ও ঘন দুধ চিড়ে মেশান হল। এক ব্রাহ্মণ এইগুলি থেকে সাতটি পাত্র নিত্যানন্দ প্রভুকে নিবেদন করলেন।
যে সব ব্রাহ্মণ পন্ডিত, পুরোহিতরা বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসেছিলেন, নিত্যানন্দ প্রভু সসম্মানে তাদের উচ্চ আসনে বসতে দিলেন, এবং দুধ-চিড়ে ও দই-চিড়ে মেশান ২টি করে পাত্র সকলকে দেওয়া হল। যাদের সেখানে বসার জায়গা হল না, তাদের মধ্যে কেউ কেউ গঙ্গার তীরে, কেউ উপরে, কেউ নিচে, এমন কি কেউ কেউ জলে দাঁড়িয়ে পাত্রে চিড়ে ভেজাল। বিশ জন লোক এদেরকে দুটি পাত্রে চিড়ে, দুধ, দই বিতরণ করছিলেন। শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে এই মহোৎসব এইভাবে বর্ণনা করেছেন-
“ধুতি পরি’ প্রভু যদি পিন্ডাতে বসিলা।
সাতকুন্ডী বিপ্র তাঁর আগেতে ধরিলা ।।
চবুতরা উপরে যত প্রভুর নিজগণে।
বড় বড় লোক বসিলা মন্ডলী-রচনে ।।
উদ্ধারণ দত্ত আদি যত নিজগণ।
উপরে বসিলা সব, কে করে গণন?
আর যত লোক সব চৌতরা-তলানে।
মন্ডলী-বন্ধে বসিলা, তার না হয় গণনে ।।
একেক জনারে দুই দুই হোল্‌না দিল।
দধি-চিড়া দুগ্ধ-চিড়া দুইতে ভিজাইল ।।
(চৈঃ চঃ অন্ত্যঃ ৬/৫৯, ৬০, ৬৩, ৬৬, ৬৭)
তিনি আরও বর্ণনা করেছেন এভাবে-
কোন কোন বিপ্র উপরে স্থান না পাঞা।
দুই হোল্ নায় চিড়া ভিজায় গঙ্গাতীরে গিয়া ।।
তীরে স্থান না পাইয়া আর কত জন।
জলে নামি দধি-চিড়া করয়ে ভক্ষণ ।।
(চৈঃ চঃ অন্ত্যঃ ৬/৬৮-৬৯)
নিত্যানন্দ প্রভু রাঘব পন্ডিতকে দু’পাত্রে চিড়ে-দুধ ও চিড়ে-দধি দিতে নির্দেশ দিলেন। রাঘবকে তাঁর ঘরে রাত্রে আহার করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন। তারপর তিনি তাঁকে জানালেন যে, প্রকৃতপক্ষে তিনি হচ্ছেন জাতিতে গোপ আর তারপর অনুগামীরাও সকলেই গোপ, তাঁদের নিয়ে একসঙ্গে নদীতীরে এইভাবে ভোজনে তিনি খুবই আনন্দ পান।
সকলকে মিশান চিড়ে বিতরণ করা হলে, নিত্যানন্দ প্রভু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে ধ্যান করলেন, এদিকে নিত্যানন্দের আহ্বানে মহাপ্রভু সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তখন তাঁরা দুজন সকলের চিড়ের পাত্র দেখতে লাগলেন। কৌতুক-প্রিয় নিত্যানন্দ প্রভু প্রত্যেক পাত্র থেকে এক এক মুঠো মেশান চিড়ে তুলে নিয়ে মহাপ্রভুর মুখে পুরে দেন। আর মহাপ্রভুও তখন হাসতে হাসতে এক এক মুঠো মেশান চিড়ে পাত্রগুলি থেকে নিত্যানন্দের মুখে পুরে দেন। এইভাবে শ্রীগৌরাঙ্গ ও শ্রীনিত্যানন্দের রঙ্গ-পরিহাস-লীলা হচ্ছিল সেখানে। উপস্থিত যারা সেখানে ছিলেন, একমাত্র ভাগ্যবানরাই মহাপ্রভুকে দেখতে পাচ্ছিলেন। অন্যান্য কেউ এসব জানতেও পাচ্ছিল না, বুঝতেও পাচ্ছিল না- কি হচ্ছে সেখানে।
তারপর গরম দুধে ভেজান চার পাত্র চিড়ে সামনে রেখে, মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দ প্রভু আহারে বসলেন। মহাপ্রভুর সঙ্গে একত্রে আহার করে নিত্যানন্দ প্রভু অনেক ভাবাবেশ প্রকাশ করলেন।
তারপর ‘হরি ধ্বনি’ করে সকলকে চিড়া-দধি, চিড়া-দই আদি আহার করতে নিত্যানন্দ প্রভুর নির্দেশ শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে এইভাবে লেখা আছে-
“আজ্ঞা দিলা, ‘হরি বলি’ করহ ভোজন’।
‘হরি’ ‘হরি’- ধ্বনি উঠি’ ভরিল ভুবন ।।
‘হরি’ ‘হরি’ বলি বৈষ্ণব করয়ে ভোজন।
পুলিন-ভোজন সবার হইল স্মরণ।।
(চৈঃ চঃ অন্ত্যঃ ৬/৮৬-৮৭)
রঘুনাথ দাসের পরম সৌভাগ্য- অশেষ করুণাময় ও উদার শ্রীনিত্যানন্দ ও চৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর এই প্রীতিময় সেবা গ্রহণ করলেন।
এই মহোৎসবের কথা শুনে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের দোকানদাররা তাদের দোকানের দই, চিড়ে, সন্দেশ, কলা এসে সেখানে বিক্রী করতে লাগল। অন্যান্য বহু লোকও সেখানে এলো সেই মহোৎসব দেখতে। রঘুনাথ সব খাদ্যদ্রব্য কিনে নিয়ে তাদের ও উপস্থিত অন্যান্য সকলকে দই-চিড়ে-কলাদি বিতরণ করে খাওয়ালেন। চারটি পাত্রের ভুক্তাবশেষ নিত্যানন্দ প্রভু রঘুনাথকে দিলেন; একজন ব্রাহ্মণ এসে নিত্যানন্দ প্রভুকে নিবেদিত অবশিষ্ট তিনটি পাত্রের চিড়ে-দই সকল ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করলেন। আর রঘুনাথ দাস মহাপ্রভু ও নিত্যানন্দের ভুক্তবশেষ নিজ জনদের নিয়ে সানন্দে আহার করলেন।
এই মহোৎসবে লক্ষণীয় এই যে রঘুনাথ দাস নিত্যানন্দ প্রভুকে প্রণাম করছেন জানান হল, নিত্যানন্দ প্রভু রঘুনাথ দাসকে বলেন-
‘চোরা দিলি দরশন’- কেননা রঘুনাথ দাস হচ্ছেন ভগবানের প্রতি অতি অন্তরঙ্গ নিজজন- তা অন্যেরা জানত না, নিত্যানন্দ প্রভু তা আভাষে প্রকাশ করলেন। রঘুনাথের পিতা ছিলেন ধনবান, বিষয়-ভোগী। এই লীলাবিলাসের মাধ্যমে নিত্যানন্দ প্রভু শুদ্ধভক্তদের সেবা দ্বারা ধনীর বিত্তশাঠ্যরূপ অনর্থ নাশ ও নিত্য মঙ্গলের শিক্ষাদান করলেন। এইভাবে রঘুনাথ দাস নিত্যানন্দ প্রভুর অহৈতুকী কৃপা লাভ করলেন। পরদিন রঘুনাথ কাতরভাবে ও সদৈন্য আবেদন করলে, নিত্যানন্দ প্রভু সপার্ষদ রঘুনাথকে চৈতন্যচরণ লাভের আশীর্বাদ করলেন।

Comments are closed.

September 2021
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

Blog Stats

  • 140,959 hits