কালের আবর্তন হয় চক্রাকারে। যেমন একটি সেকেন্ডের পরে আর একটি সেকেন্ড আসে, একটি মিনিটের পরে আর একটি মিনিট শুরু হয়। একটি দিনের পরে শুরু হয় আর একটি দিন। একটি সপ্তাহের পর আবার শুরু হয় একটি সপ্তাহ। একটি মাসের পর শরু হয় অন্য একটি মাস এবং একটি বছরের পর শুরু হয় অন্য একটি বছর। এইভাবে আমরা দেখতে পাই কাল চক্রাকারে ভ্রমণ করে। কালের যে বৃহত্তর চক্র বা আবর্তন সেটি হচ্ছে যুগ। চারটি যুগ–সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি। এই চারটি যুগ নিয়ে চতুর্যুগ এবং সেই চতুর্যুগের পরে আর একটি চতুর্যুগ। সত্যযুগের পরে আসে ত্রেতা, ত্রেতা যুগের পরে আসে দ্বাপর, দ্বাপরের পরে আসে কলি, কলির পরে আবার সত্যযুগ। এমনি করেই কালের আবর্তন হয় চক্রাকারে। এইভাবে একহাজার চতুর্যুগে ব্রহ্মার একদিন হয়। এবং সেই একদিনে প্রতিদিন একবার স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই ব্রহ্মান্ডে আসেন। কখন আসেন অষ্টবিংশতি চতুর্যুগে। একহাজার চতুর্যুগের মধ্যে অষ্টবিংশতি চতুর্যুগের দ্বাপরে ভগবান স্বয়ং অবতীর্ণ হন। সেই স্বয়ং ভগবানের রূপটি দ্বিভুজ শ্যামসুন্দর মুরলীধর। এটি হচ্ছে ভগবানের স্বরূপ বা স্বয়ংরূপ। সেই স্বয়ংরূপ ভগবান থেকে প্রথম বিস্তার হয় বলরামের। বলরাম থেকে বিস্তার হয় দ্বারকার চর্তুব্যূহ। অর্থাৎ বাসুদেব, সংকর্ষণ, প্রদ্যুম্ন ও অনিরুদ্ধ। তারপর সেই সংকর্ষণ থেকে বৈকুন্ঠের অসংখ্য নারায়ণের বিস্তার হয় বৈকুন্ঠলোকে। আর তারপরে এই জগৎ সৃষ্টির জন্য সেই সংকর্ষণের অংশ মহাবিষ্ণু তিনি কারণোদকশায়ী। তিনি কারণসমূদ্রে শয়ন করেন এবং তার নিঃশ্বাসের ফলে যে বুদবুদের সৃষ্টি হয়ে কারণসমূদ্রে উঠে সেই বুদবুদগুলি এক একটি ব্রহ্মান্ড। এইভাবে শাস্ত্রে চিৎ-জগৎ এবং জড় জগতের বর্ণনা রয়েছে। এই স্বয়ংরূপ ভগবান অর্থাৎ বৃন্দাবনের লীলাবিলাসকারী ব্রজেন্দ্রননন্দ শ্রীকৃষ্ণ, যিনি স্বয়ং ভগবান, তিনি এই জড় জগতে অর্থাৎ এই ব্রহ্মান্ডে ব্রহ্মার একদিনে একবার অবতীর্ণ হন। সৌভাগ্যক্রমে এইটি হচ্ছে অষ্টবিংশতি চতুর্যুগ। অর্থাৎ এই যুগে আজ থেকে ৫০০০ বছর আগে দ্বাপর যুগে স্বয়ং ভগবান লীলাবিলাস করে গেছেন। ভগবান তাঁর সেই বৃন্দাবন লীলাবিলাস করার পর পরবর্তী কলিযুগে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে আবির্ভূত হন এই নবদ্বীপ ধামে। নবদ্বীপ হল নয়টি দ্বীপের সমন্বয়। নব মানে নয়, দ্বীপ মানে হচ্ছে চতুর্দিকে জল বেষ্টিত ভূমি। মাঝখানে একটি দ্বীপ আর তার চারপাশে আটটি দ্বীপ একটি পদ্মফুলের মতো বিরাজ করছে। পদ্মফুলের মাঝখানে কোরক রয়েছে। কোরকের চারপাশে রয়েছে পাপড়ি। প্রথম পর্যায়ে আছে আটটি পাপড়ি। তারপর ১০০ পাপড়ি–এইভাবে বিন্যস্ত।
সহস্রপত্র কমলং গোকুলাখ্যং মহৎপদম্।
তৎকর্ণিকার তর্দ্ধাম তদনন্তাংশসম্ভরম্ ॥ ২ ॥
তৎকীঞ্জল্কং তদংশানাং তৎপত্রাণি শ্রিয়ামপি ॥ ৪ ॥
ব্রহ্মসংহিতায় এইভাবে গোলোকের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই নবদ্বীপ হচ্ছে সেই গোলোক। গোলকের দুটি প্রকোষ্ঠ, একটি বৃন্দাবন অপরটি নবদ্বীপ। বৃন্দাবনে রাধাকৃষ্ণ তাদের মাধুর্য লীলাবিলাস করছেন এবং সেই রাধাকৃষ্ণই মিলিতভাবে নবদ্বীপে শ্রীগৌরস্ন্দুর রূপে ঔদার্য লীলাবিলাস করছেন। মধুর রসে ভগবান তাঁর ভক্তদের সঙ্গে যে প্রেম বিনিময় করছেন, সেইটি হচ্ছে মাধুর্য লীলা। অর্থাৎ মধুর রসে যে লীলা।
জয় জয়োজ্জ্বল রস সর্বরসসার।
পরকীয়া ভাবে যাহা ব্রজেতে প্রচার ॥
সমস্ত রসের (শান্ত, দাস, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর) মধ্যে সর্বোত্তম এবং সবথেকে উজ্জ্বল রস হল মধুর রসে। মধুর রসের চরম পরাকাষ্ঠা হচ্ছে পরকীয়া রস। এখনও বৃন্দাবনে ভগবান তাঁর সেই মধুরলীলা বিলাস করছেন। তিনি তাঁর ভক্তদের সঙ্গে কৃষ্ণপ্রেম আস্বাদন করছেন। আর নবদ্বীপে সেই কৃষ্ণচন্দ্রই শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে ঔদার্যলীলা বিলাস করছেন। ঔদার্য মানে উদার। উদারভাবে তিনি ব্রহ্মারও দুর্লভ প্রেম বিতরণ করছেন। বিতরণটা ঔদার্যের লক্ষণ। অন্যকে দান করাটি ঔদার্যের লক্ষণ। উদার ব্যক্তি দান করেন। যে যত বেশি উদার তিনি ততো বেশি মূল্যবান সম্পদ দান করেন। এই জগতের মধ্যে সবচাইতে মূল্যবান সম্পদটি হল কৃষ্ণপ্রেম। সেই কৃষ্ণপ্রেম ব্রহ্মারও দুর্লভ। ব্রহ্মারও দুর্লভপ্রেম শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু যেচে যেচে সকলকে দান করছেন।
ব্রহ্মার দুর্লভ প্রেম সবাকারে যাচে।
আর তাঁর সেই প্রেম বিতরণের সহায়ক হচ্ছে নিত্যানন্দ প্রভু। নিত্যানন্দ প্রভুর সেই প্রেম বিতরণের লীলা বর্ণনা করে বলা হচ্ছে–
যথেষ্টং রে ভ্রাতঃ! কুরু হরিহরি-ধ্বানমনিশং।
ততো বঃ সংসারাম্বুধি-তরণ-দায়ো ময়ি লগেৎ ॥
হে ভাই সব! তোমরা মুখে শুধু হরিনাম কীর্তন কর। তাহলে এই সংসার-সমুদ্র থেকে তোমাদের উদ্ধারের দায়িত্বটি আমি গ্রহণ করব। তাহলে কত সহজে কত অনায়াসে আমরা এই সংসার-সমুদ্র পার হতে পারি। এই ভবসমুদ্র হচ্ছে দুরতিক্রম।
দৈবীহ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।
এই মায়া অতিক্রম করা অসম্ভব। কিন্তু নিত্যানন্দ প্রভু বলেছেন তোমরা যদি হরিনাম কর তাহলে আমি এই সংসার-সমুদ্র পার করে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব-ভার গ্রহণ করবো।
অক্রোধ পরমানন্দ নিত্যানন্দ রায়।
অভিমানশূন্য নিতাই নগরে বেড়ায় ॥
যারে দেখে তারে কহে দন্তে তৃণ ধরি।
আমারে কিনিয়া লহ ভজ গৌরহরি ॥
এত বলি নিত্যানন্দ ভূমে গড়ি যায়।
সোনার পর্বত যেন ধুলাতে লুটায় ॥
অত্যন্ত বিনীতভাবে তোমরা গৌরহরির ভজনা কর এবং সেই মূল্য দিয়ে আমাকে কিনে নাও। নিত্যানন্দ প্রভু বলেছেন তাঁকে এই কৃষ্ণ-নামের মূল্য দিয়ে আমরা যেন কিনে নিতে পারি। এইভাবে তিনি কৃপা করছেন জীবদের। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর রূপে আবির্ভাবের কারণ হল দুটি। একটি হচ্ছে আভ্যন্তরীণ আর একটি বাহ্যিক। বাহ্যিক কারণটি সম্পর্কে বলা হচ্ছে–
অনর্পিতচরীং চিরাৎ করুণয়াবতীর্ণঃ কলৌ ॥
যে বস্তুটি দীর্ঘকাল অর্পণ করা হয়নি বা দেওয়া হয়নি, সেই বস্তুটি দান করার জন্য তিনি কৃপা করে এই কলিযুগে অবতীর্ণ হয়েছেন। অর্থাৎ কখনও অবতারে ভগবান এই বস্তুটি দেননি।
উন্নত উজ্জ্বল রসে তাঁর নিজের যে ভক্তি সেই ভক্তিসম্পদটি দান করার জন্য তিনি করুণা করে এই কলিযুগে অবতীর্ণ হয়েছেন। অর্থাৎ তিনি তাঁর নিজের উন্নত উজ্জ্বল রসের ভক্তি দান করা জন্য এবং মধুর রসের পরকীয়া ভাবে যে কৃষ্ণপ্রেম বা কৃষ্ণভক্তি সেটি দান করার জন্য তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন।
…স্বভক্তিশ্রিয়ম্।
হরিঃ পুরটসুন্দরদ্যুতিকদম্বসন্দীপিতঃ ॥
ভগবান শ্রীহরি, যাঁর অঙ্গকান্তি বর্ষার জলভরা মেঘের মতো ঘনশ্যাম। কৃষ্ণ এসেছেন তাঁর সেই অঙ্গকান্তিটিকে আচ্ছাদন করে গৌরবর্ণ ধারণ করে, অর্থাৎ সোনার মতো অঙ্গকান্তি অবলম্বন করে গৌরবর্ণ ধারণ করে তিনি এসেছেন। প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণের অঙ্গকান্তি বা গায়ের রং ঘনশ্যাম। যিনি তপ্তকাঞ্চনের মতো অঙ্গকান্তি ধারণ করে অবতীর্ণ হয়েছেন, সেই শচীনন্দন গৌরহরি সদা আমাদের হৃদয়কন্দরে প্রকাশিত হন। এইটি মহাপ্রভুর আবির্ভাবের বহিরঙ্গা বা বাহ্যিক কারণ অর্থাৎ কৃষ্ণপ্রেম দান করার জন্য তিনি এসেছেন।
আর আভ্যন্তরীণ কারণটি হল–
রাধা কৃষ্ণপ্রণয়বিকৃতিহ্লার্দিনীশক্তিরস্মা-
দেকাত্মানাবপি ভুবি পুরা দেহভেদং গতৌ তৌ ।
চৈতন্যাখ্যং প্রকটমধুনা তদ্দয়ং চৈক্যমাপ্তং
রাধাভাবদ্যুতিসুবলিতং নৌমি কৃষ্ণস্বরূপম্ ॥ (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত আদিলীলা ১/৫)
শ্রীকৃষ্ণ শক্তিমান এবং শ্রীরাধা হচ্ছেন তার শক্তি। সেই হ্লাদিনী শক্তির মাধ্যমেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁর প্রেম আস্বাদন করেন। যদিও শক্তি এবং শক্তিমান এক তত্ত্ব, রাধা-কৃষ্ণ একই তত্ত্ব। কিন্তু তাঁরা ভিন্ন দেহে প্রকাশিত হয়েছেন। অর্থাৎ কৃষ্ণ এবং রাধারূপে ভিন্ন দেহে প্রকাশিত হয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন শক্তিমান এবং রাধারাণী হচ্ছে হ্লাদিনী শক্তির, আনন্দদায়িনী শক্তির মূর্ত প্রকাশ। তাঁরা যদিও এক আত্মা, এক তত্ত্ব কিন্ত দেহে তাঁদের ভেদ রয়েছে। অর্থাৎ তাঁরা দুই দেহে প্রকাশিত হয়েছেন। কিন্তু এখন তাঁরা দুজন একত্রীভূত হয়ে, এক হয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে প্রকটিত হয়েছেন। শ্রীমতী রাধারাণীর অন্তরের ভাবটি কৃষ্ণভক্তিতে পরিপূর্ণ। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সেই অন্তরের ভাবটি অর্থাৎ কৃষ্ণভক্তি নিয়ে, কৃষ্ণভক্তি ভাব অবলম্বন করে, শ্রীমতী রাধারাণীর দেহের অঙ্গকান্তি নিয়ে অবতীর্ণ হলেন।
কুঙ্কুমাক্ত-কাঞ্চনাব্জ-গর্বহারি-গৌরভা
পীতনাঞ্চিতাব্জগন্ধ-কীর্তি-নিন্দি-সৌরভা ॥
তপ্তকাঞ্চনের সঙ্গে কুমকুমের লাল রঙ মিশ্রিত করলে যে রঙটি হবে সেটি রাধারাণীর গায়ের রঙ। অতএব কৃষ্ণ সেই রঙটি অবলম্বন করে এসেছেন। তাহলে রাধারাণীর ভাব আর রাধারাণীর অঙ্গকান্তি অবলম্বন করে শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভুর রূপে কলিযুগে অবতীর্ণ হয়েছেন। কেন তিনি এইভাবে এলেন? তার কারণটি হচ্ছে–কৃষ্ণ ভাবলেন–
শ্রীরাধায়াঃ প্রণয়মহিমা কীদৃশো বানয়ৈবা-
স্বাদ্যো যেনাদ্ভুতমধুরিমা কীদৃশো বা মদীয়ঃ।
শ্রীরাধার প্রেমের মহিমা কি রকম? ঐ প্রেমের দ্বারা শ্রীরাধা আমার যে অদ্ভুত মাধুর্য আস্বাদন করেন, সেই মাধুর্যই বা কিরকম? এবং আমার মাধুর্য আস্বাদন করে শ্রীরাধা যে সুখ অনুভব করেন সেই সুখই বা কিরকম–এই তিনটি বিষয় শ্রীকৃষ্ণের জানার লোভ হয়েছিল। এবং এইগুলি জানার জন্যই শ্রীকৃষ্ণকে রাধারাণীর ভাব অবলম্বন করে আসতে হয়েছিল।
সৌখ্যঞ্চাস্যা মদনুভবতঃ কীদৃশং বেতি লোভা-
ত্তদ্ভাবাঢ্যঃ সমজনি শচীগর্ভসিন্ধৌ হরীন্দুঃ ॥ (শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত আদিলীলা ১/৬)
সমুদ্র মন্থনের ফলে ক্ষীসমুদ্র থেকে যেমন চন্দ্রের উদয় হয়েছিল, ঠিক তেমনই শচীমাতার গর্ভরূপ-সিন্ধু মন্থনের ফলে চৈতন্যচন্দ্রের উদয় হয়েছেন রাধাপ্রেমের পূর্ণ মহিমা হৃদয়ঙ্গম করার জন্য। এটি আভ্যন্তরীণ কারণ। এবং বাহ্যিক কারণটি হল কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ করার জন্য, যা ইতিপূবে উল্লেখ করা হয়েছে। চৈতন্য-চরিতামৃতে বলা হয়েছে–
চৈতন্যচন্দ্রের দয়া করহ বিচার।
বিচার করিলে চিত্তে পাবে চমৎকার ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দয়ার কথা, শ্রীচেতন্য মহাপ্রভুর যে অপূর্ব তত্ত্ব, সেটি বিচার করে দেখো। বিচার করে দেখলে চিত্ত চমৎকৃত হবে। চৈতন্যমহাপ্রভুর শিক্ষার পাঁচটি বিষয় রয়েছে। তাঁর দর্শনকে বলা হয় অচিন্ত্যভেদাভেদ তত্ত্ব। বেদের যে নিগূঢ় তত্তবজ্ঞান সেটি তিনটি পর্যায়ে প্রকাশিত–১) সম্বন্ধ ২) অভিধেয় ৩) প্রয়োজন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই তিনটি তত্ত্বকে প্রকাশ করেছেন। তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর যে দান তা অকল্পনীয়।
মহাপ্রভু নিজে কোন গ্রন্থ লেখেননি। তিনি কেবল শিক্ষাষ্টকের আটটি শ্লোক দিয়ে গেছেন। এই আটটি শ্লোকের মধ্যেই ভগবৎ-তত্ত্ববিজ্ঞান পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে। এই আটটি শ্লোক কেউ যদি পূর্ণরূপে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন তাহলে তিনি ভগবৎ-তত্ত্ব জ্ঞান লাভ করতে পারবেন। মহাপ্রভুর শিক্ষা হল–
আরাধ্যো ভগবান্ ব্রজেশতনয়স্তদ্ধাম বৃন্দাবনং।
রম্যা কাচিদুপাসনা ব্রজবধুবর্গেণ যা কল্পিতা ॥
শ্রীমদ্ভাগবতং প্রমাণমমলং প্রেমা পুমর্থো মহান্।
শ্রীচৈতন্যমহাপ্রভোর্মতমিদং তত্রাদরঃ ন পরঃ ॥
আরাধ্য ভগবান হচ্ছেন ব্রজেন্দনন্দন শ্রীকৃষ্ণ। নন্দ-যশোদার পুত্র শ্রীকৃষ্ণ। অর্থাৎ দেবকী নন্দন বাসুদেব কৃষ্ণ নন। স্বয়ংরূপ ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। অর্থাৎ ব্রজেন্দ্র নন্দন কৃষ্ণ। তাঁর ধাম হচ্ছে বৃন্দাবন। ব্রজ-গোপিকারা যে ভাবে কৃষ্ণকে ভালবেসেছিলেন বা আরাধনা করেছিলেন, সেটিই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ আরাধনা। অমলপুরাণ শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে এর প্রমাণ। শাস্ত্র প্রমাণ ছাড়া আমরা কতকগুলো মনগড়া কথা বলতে পারি না। যদি বলা হয় তা সাধুসমাজে গ্রহণ করবে না। আমরা যখন অধ্যাত্মতত্ত্ব নিরূপণ করব তখন শাস্ত্রের প্রমাণ দিতে হবে। আঠারোটি পুরাণের মধ্যে এটি হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরাণ। যার মধ্যে কোন মল নেই। অন্যান্য যে সতেরটি পুরাণ আছে, তাতে হয় সত্ত্বগুণের মল নতুবা রজগুণের মল নতুবা তমগুণের মল রয়েছে। কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে সম্পূর্ণরূপে নির্মল।
কৃষ্ণপ্রেম হচ্ছে জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। আমাদের জীবনের চরম লক্ষ্য হচ্ছে সেই কৃষ্ণপ্রেম। এইটি হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা। এটিকে আদরের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে, অন্য কিছু নয়। বৃন্দাবনের গোস্বামীরা, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুগামীরা ভুরি ভুরি গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং সেই গ্রন্থগুলি রচনার মাধ্যমে তাঁরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষার সর্বোত্তম বা সর্বশ্রেষ্ঠ তাৎপর্য কি তা নিরূপণ করে গেছেন।
নানাশাস্ত্র-বিচারণৈক-নিপুণৌ সদ্ধর্ম-সংস্থাপকৌ
লোকানাং হিতকারিণৌ ত্রিভুবনে মানৌ শরণ্যাকরৌ।
রাধাকৃষ্ণ-পদারবিন্দভজনানন্দেন মত্তালিকৌ
বন্দে রূপ-সনাতনৌ রঘুযুগৌ শ্রীজীব-গোপালকৌ ॥
নানা শাস্ত্র বিচার করে গোস্বামীগণ শ্রীচেতন্য মহাপ্রভুর যে মত সেটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। মহাপ্রভু নিজে কিছু লিখে যান নি। তিনি মুখে মুখে শিক্ষা দিয়েছেন। এবং তাঁর যে শিক্ষা সেটি হচ্ছে আধাত্মিক জীবনের সারাতিসার। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষাটি যে প্রকৃত সনাতন ধর্ম সেটি ষড়গোস্বামীগণ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন জগতের মানুষদের হিতসাধনের জন্য। সেইজন্য তাঁরা ত্রিভুবনের বরণীয় এবং স্মরণীয়। ত্রিভবন তাদের মান্য করেন এবং তাঁদের শরণাগত হন। আমি বার বার সেই শ্রীরূপ, সনাতন, রঘুনাথ ভট্ট, গোপাল ভট্ট, রঘুনাথ দাস ও শ্রীজীব গোস্বামিপাদগণের বন্দনা করি।