বৈষ্ণব ধর্মের ঐতিহ্যের ইতিহাস- পর্ব ২- বৈদিক ধর্মের পুনর্জাগরণ

বৈষ্ণব শব্দটি আসছে বিষ্ণু থেকে। অর্থাৎ বিষ্ণুর যাঁরা ভক্ত বা সেবক তাঁকে বৈষ্ণব বলা হয়। বিষ্ণু হচ্ছেন ভগবান। আর বৈষ্ণব হলেন ভগবানের ভক্ত। অতএব বৈষ্ণব ভগবান থেকে আসছেন। প্রতিটি জীব হচ্ছেন বৈষ্ণব। ভগবদ্ধামে সকলেই বৈষ্ণব। জীব যখন জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয় তখনই জীব অবৈষ্ণবে পরিণত হয়। অর্থাৎ তার বৈষ্ণব সত্ত্বা হারিযে ফেলে। তাই সৃষ্টির আদিতেই ভগবান কিভাবে বৈষ্ণব হওয়া যায় সেই পরম শিক্ষা প্রদান করেন। এই শিক্ষা প্রথমে তিনি ব্রহ্মাকে প্রদান করেন এবং সেই জ্ঞানটি বেদরূপে প্রকাশিত হয়েছে। ভগবান সৃষ্টির আদিতে ব্রহ্মাকে প্রণব বা গায়ত্রীমন্ত্র দান করেন। সেই গায়ত্রীমন্ত্র জপ করার ফলে ব্রহ্মার হৃদয়ে দিব্যজ্ঞান প্রকাশিত হয়।
তেনে ব্রহ্মা হৃদা য আদিকবয়ে মুহ্যন্তি যৎসূরয়ঃ। (ভাগবত ১/১)
সেই জ্ঞানটি ব্রহ্মার মাধ্যমে প্রকাশ হল। তাই সেটি বেদ। যেহেতু গায়ত্রী থেকে বেদের উদ্ভব হয় তাই গায়ত্রীকে বেদমাতা বলা হয়। যেমন মাতার গর্ভে সন্তানের জন্ম হয়, তেমনি গায়ত্রীর মধ্য থেকে বেদের উদ্ভব হয়। বেদ থেকে একটি শাখার উদ্ভব হয়। বেদের আরও দুটি শাখা আছে। একটি শাখা এই জড় জগতে প্রসারিত হয়েছে। কিভাবে জড় জগৎটি ভোগ করা যায়। সেই শাখাটিকে বলা হয় কর্মকান্ড। যখন জড় জগতের প্রতি বীতশ্রদ্ধ বা বিতৃষ্ণ হয়ে জীব মুক্ত হতে চায় তখন বেদের যে দিকটি বা যে অংশটি সেই মুক্ত হওয়ার তত্ত্বটিকে প্রকাশ করছেন তাকে বলা হয় জ্ঞানকান্ড। অতএব কর্মকান্ড ও জ্ঞানকান্ড দুটিই জড় জগৎ ভিত্তিক। অর্থাৎ এই জড় জগৎ ভোগ ও অপরটি জড় জগৎ ত্যাগ। অতএব দুটিই জড় জগৎকে কেন্দ্র করে। তাই এই দুটিকেই জড় জগতের সঙ্গে জড়িত বলে বিচার করা হয়েছে। তাই জড় জগতের অতীত যে আর একটি শাখা প্রসারিত হয়েছে চিৎ জগতের প্রতি, সেই শাখার মাধ্যমে কেবল ভগবত-তত্ত্ব জ্ঞান লাভ হয়। সেই শাখাটিকে বলা হয় ভগবৎ-তত্ত্ব। অতএব বেদের আমরা দুইটি দিক পাচ্ছি। একটি কর্মকান্ড ও জ্ঞানকান্ডের আর একটি ভগবদ্তত্ত্ব জ্ঞান বা ভগবদ্ভক্তির পন্থা। ভগবদ্ভক্তির পন্থাই হল বেদের প্রকৃত উদ্দেশ্য। অর্থাৎ বেদের উদ্দেশ্য হল ভগবানকে জানা।
বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো বেদান্তকৃদ্ বেদবিদেব চাহম্ ॥ (ভগবদ্গীতা ১৫/১৫)
সমস্ত বেদের মধ্যে একমাত্র জ্ঞাতব্য হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সেটিই বেদের প্রকৃত উদ্দেশ্যে। এবং সেই শখাটিতে ভগবদ্তত্ত্ব জ্ঞান এবং ভগবদ্ভক্তির পন্থা নিরুপিত হয়েছে। সেইটি হচ্ছে ভাগবত পরম্পরা ধারা। সেই ধারাটি ব্রহ্মা থেকে নারদ, নারদ থেকে বেদব্যাস, বেদব্যাস থেকে মধ্বাচার্য এইভাবে প্রসরিত হয়েছে। এইভাবে অনাদি কাল থেকে এই তত্ত্বজ্ঞান অর্থাৎ ভগবদ্তত্ত্ব জ্ঞান বা চিন্ময় জগতের কথা পম্পরাক্রমে আমরা লাভ করতে পেরেছি। এই জড় জগতের ঊর্ধ্বে আর একটি জগৎ আছে। সেটি চিদ্ জগৎ। সেই জগৎটি আমাদের জড় ইন্দ্রিয়ের অতীত।
অপ্রাকৃত বস্তু নহে ইন্দ্রিয় গোচর।
অপ্রাকৃত তত্ত্ব বা বস্তু আমাদের এই প্রাকৃত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা গ্রহনীয় নয়। তা অপ্রাকৃত ইন্দ্রিয় দ্বারা গ্রাহ্য। অতএব সেই জিনিসটি আমরা ইন্দ্রিয়ের দ্বারা দর্শন বা স্পর্শ করতে পারি না। যেমন ভারতবর্ষে বসে, আমেরিকা কি রকম দেশ তা জানতে পারবো না। কিন্তু যে আমেরিকায় গেছে সে যদি এসে আমেরিকার কথা বলে তাহলে জানা যাবে। যে আমেরিকা ঘুরে এসেছে সে যদি আমেরিকার সম্বন্ধে একটি বই লেখে তাহলে সেই বইটি পড়ে আমরা জানতে পারবো। ঠিক তেমনই ভগবদ্ধামের কথা বা চিৎ জগতের কথা আমরা জানতে পারি কেবল তাঁদেরই মাধ্যমে, অর্থাৎ যাঁরা চিৎ জগৎ দর্শন করেছেন এবং যারা চিৎ জগৎ দর্শন করে গ্রন্থাবলী রচনা করেছেন তার মধ্য দিয়ে। এখন চিৎ জগৎ সম্বন্ধে গ্রন্থাবলী হচ্ছে শাস্ত্র এবং সেই শাস্ত্র হচ্ছে বেদ। এখানে এই যে বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান সেটি পরম্পরা ক্রমে অর্থাৎ গুরু থেকে শিষ্য এবং সেই শিষ্য পরে গুরু হয়ে তার শিষ্যকে এই জ্ঞান দান করেছেন। এইভাবে একটা নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে পরম্পরা ধারায় এই জ্ঞান অনাদি কাল থেকে প্রবাহিত হয়ে আসছে এবং সেই জ্ঞানটির ধারক এবং বাহক ছিল ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়। সেই ভাবেই এই জ্ঞানটি প্রবাহিত হয়ে আসছিল। কিন্তু কলিযুগের আগমনের ফলে তা বিনষ্ট হয়ে যায়। কলিযুগ হল অধর্মের যুগ। ধর্ম শব্দটির অর্থ হচ্ছে ভগবানের দেওয়া আইন। ভগবান যে আইনটি দান করেছেন, সেই আইনটি মেনে চলাই হচ্ছে ধর্ম। যে মেনে চলবে তার কল্যাণ হবে। আমরা ভারতবর্ষে আছি। ভারতবর্ষের আইন যারা মেনে চলবে তারা সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাবে। এবং যারা আইন ভঙ্গ করবে তাদের দন্ডভোগ করতে হবে। ঠিক তেমনই এই জগৎটিও হচ্ছে ভগবানের রাজ্য। এই জগতের নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ভগবান আইন দিয়ে গেছেন, আর সেই আইনগুলি মেনে চলাই হচ্ছে ধর্ম। “ধর্মস্তু সাক্ষাদ্ ভগবৎ প্রণীতম্।”
ধর্ম সাক্ষাৎ ভগবানের প্রণীত আইন এবং সেই আইন যদি আমরা মেনে চলি তাহলে জগতের শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। আমরা যদি আইন ভঙ্গ করি তাহলে বিশৃঙ্খলা বা অশান্তির সৃষ্টি হবে। যারা ভগবানের আইন মেনে চলে তাদের বলা হয় ধার্মিক। আর যারা মেনে চলে না তাদের বলা অধার্মিক। ধর্ম আবার চারটি পা বা স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। ধর্মের সেই পাগুলি হল–সত্য, শৌচ, তপঃ ও দয়া। সত্যযুগে ধর্মের চারটি পা অক্ষত ছিল। কিন্তু ত্রেতা যুগে একটি পা (তপঃ) ভেঙ্গে গেল। অর্থাৎ তপস্যা হারিয়ে ফেলল। দ্বাপর যুগে দয়া এবং কলিযুগে শৌচ হারিয়ে গেল। এখন এই কলিযুগ কেবলমাত্র একটি পা বা সত্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে। যদি আমরা সত্যকে ত্যাগ করি তাহলে ধর্ম সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। ধর্মের যখন একটি পা ভাঙ্গে তখন অধর্মের একটি পা গজায়। ধর্মের যখন দয়া পাটি ভেঙ্গ গেল তখন অধর্মের আমিষ আহার পা-টি গজালো। ত্রেতাযুগের শেষে দ্বাপর যুগে যখন তপঃ পা-টি ভেঙ্গে গেল তখন অধর্মের আসবপান বা নেশা নামক পাটি গজালো। তারপর কলিযুগের আগমনে যখন ধর্মের তৃতীয় পাটি ( শৌচ) ভেঙ্গে গেল অর্থাৎ তখন অধর্মের অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ পাটি গজালো। এই কলিযুগে যখন ধর্মের চতুর্থ পাটি (সত্য) ভেঙ্গে যাচ্ছে তখন অধর্মের দ্যুতক্রীড়া পা’টি দেখা দিচ্ছে। এই কলিযুগটি হচ্ছে অধর্মের যুগ। এখন এই অধর্মের যুগে ধর্মকে নাশ করার জন্য সম্পূর্নরূপে কলি বেদকে নষ্ট করার পরিকল্পনা করল। কারণ বেদের উপর ভিত্তি করে ধর্ম রয়েছে। তাই কলি বেদের উপর নানা রকম অনাচারের প্রবেশ করাল বা সৃষ্টি করল। যেমন বেদের ধারক ছিল ব্রাহ্মণেরা। এখন কলিযুগকে আশ্রয় করে ব্রাহ্মণ-বৃত্তিসম্পন্ন কিছু জীবাত্মা বা মানুষরূপে ব্রাহ্মণ গৃহে জন্মগ্রহণ করল।
রাক্ষসাঃ কলিম্ আশ্রিত জায়ন্তে ব্রহ্মযোনিষু ॥
তার ফলে বৈদিক আচরণগুলো ভ্রষ্ট হতে শুরু করল। মানুষ বেদ বা বেদের প্রতি তাদের আস্থা হারিয়ে ফেলতে লাগল। এই বেদের অনাচারের ফলে, কলিযুগের প্রভাবে অসৎ আচরণ শুরু হল। যেমন কৌলিন্য প্রথা সৃষ্টি করল। কৌলিন্য প্রথা হল–কুলীন ব্রাহ্মণের মেয়েদের কুলীণ ব্রাহ্মণের ছেলের সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। আর যদি তা না হয়, তা হলে সেই ব্রাহ্মণ তার কৌলিন্য হারিয়ে জাতিচ্যুত হবে। অর্থাৎ মেয়েকে যথাযথ ব্রাহ্মনের গৃহে বিবাহ না দিতে পারলে তারা জাতিচ্যুত হবে। দেখা গেল কুলীণ ব্রাহ্মণের সংখ্যা কম আর মেয়েদের সংখ্যা বেশী। তাই এক ব্রাহ্মণ বহু মেয়েকে বিবাহ করতে লাগলো। তারা পঞ্চাশটি গ্রামে পঞ্চাশটি মেয়েকে বিয়ে করে শুধু ঘুরে ঘুরে বেড়াত। কখনও এই শ্বশুর বাড়ি আবার কখনও অন্য শ্বশুর বাড়ি। এইভাবে ঘুরে বেড়াতে লাগলো। শুধু তাই নয় এইসঙ্গে সতীদাহ প্রথা শুরু হল। সতীদাহ প্রথাটি বৈদিক আচরণ। বেদে তার নির্দেশ আছে। যেমন আমরা মহাভারতে দেখতে পাই কুন্তি এবং মাদ্রী পান্ডুর মৃত্যুর পরে দুজনেই সহমৃতা হতে চেয়েছিলেন। তখন তারা বিচার করে দেখল “দুজনেই যদি সহমৃত্যুবরণ করি তাহলে আমাদের এই পাঁচটি শিশু পুত্রকে দেখার জন্য কেউ থাকবে না। তাহলে আমাদের একজনকে বেঁচে থাকতে হবে।”এবং তাই নিয়ে তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হল। কুন্তী বলল–“যেহেতু আমি বড়, তাই আমি সহমৃতা হব।” আর মাদ্রী বলল–“তোমার তিনটি পুত্র তাই তোমাকে থাকতে হবে। যেহেতু আমার জন্য স্বামীর মৃত্যু হল তাই আমারই সহমৃতা হওয়া কর্তব্য।” এইভাবে তখন স্বেচ্ছায় তারা পতির সঙ্গে সহমৃতা হতেন। কিন্তু এই কলিযুগের প্রভাবে এটি প্রথাতে পরিণত হল। একে বলা হয় সতীদাহ প্রথা। অর্থাৎ পতির যদি মৃত্যু হয় তাহলে তার পত্নীকে জোর করে সেই পতির চিতার আগুনে ফেলে দেওয়া হতো। এইরকম সমস্ত নৃশংস আচরণ বেদের নামে হতে শুরু করল এবং বেদের নামে ব্রাহ্মণেরা অসংখ্য পশুবলি দিতে শুরু করল। এইভাবে বেদের নামে অধর্মের প্রসার এতো বাড়তে লাগল যে ভগবান তখন মানুষকে বেদ বিমুখ করতে এই সমস্ত অনাচার বন্ধ করার জন্য বুদ্ধদেব রূপে আবির্ভূত হলেন।
নিন্দসি যজ্ঞবিদেরহ অশ্রুতিজাতং
সদয়-হৃদয় দর্শিত-পশুঘাতং ॥
ভগবানের সদয় হৃদয় এই জীবহত্যা দর্শন করে ব্যথিত হয়েছিলেন। যজ্ঞ বিধির নাম করে যে সমস্ত আচরণ হচ্ছিল সেগুলিকে বন্ধ করার জন্য তিনি বুদ্ধদেব রূপে আবির্ভূত হয়ে ভারতবাসীদের বেদ-বিমুখ করলেন।
বেদ না মানিয়া বুদ্ধ হইল নাস্তিক।
বৌদ্ধরা যেহেতু বেদ মানে না তাঁরা প্রচ্ছন্ন নাস্তিক। সরাসরি ভাবে নাস্তিক নন তাঁরা। তাঁদের আচরণ দেখে মনে হয় যেন তাঁরা ভগবানকে মানেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁরা ভগবানকে মানছেন না। এটি প্রচ্ছন্ন নাস্তিকতার একটি দিক। আর একটি দিক হল যে, যদিও তাঁরা নাস্তিক কিন্তু যেহেতু তাঁরা বুদ্ধদেবকে মানছেন এং যেহেতু বুদ্ধদেব হচ্ছে ভগবানের অবতার, তাই তাঁরা পরোক্ষভাবে আস্তিক। এইভাবে প্রচ্ছন্ন নাস্তিকবাদ তিনি সৃষ্টি করলেন। তখন বুদ্ধদেবের প্রভাবে প্রায় সমস্ত ভারতবর্ষ বেদবিমুখ হয়ে পড়েছিল। আবার কালক্রমে আমরা দেখতে পাই যে ক্ষত্রিয়েরা বৌদ্ধ হয়ে যায়। আর সেই সময় জৈনধর্ম রূপে আর একটি শাখা আস্তিকতার বাণী নিয়ে প্রকাশিত হয়। জৈন ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল ঋষভদেবের থেকে। কিন্তু ঋষভদেব হলেন ভগবানের অবতার। তিনি ছিলেন পৃথিবীর রাজা এবং ভরত মহারাজ ও নবযোগেন্দ্রের পিতা। তিনি এক সময় তাঁর পুত্রদের উপর রাজ্যভার অর্পণ করে গৃহত্যাগী হন। তখন তিনি অবধূতের মতো সর্বত্র ভ্রমণ করতে থাকেন। কিন্তু ঋষভদেবের আচরণ সম্পূর্ণ উন্মাদের মতো ছিল। তা সত্ত্বেও সকলেই ঋষভদেবের অনুগমন করতে শরু করে। তা দেখে কঙ্কা ও বেঙ্কা প্রদেশের রাজা অর্হত ভাবলেন, আমি এত বড় রাজা হওয়া সত্ত্বেও তো এত লোক আমার সঙ্গে ছোটে না, এত লোক তো আমাকে মানে না। তাই আমি যদি এই লোকটির মতো আচরণ করি তাহলে হয়তো লোকেরা আমাকে শ্রদ্ধা ও  পূজা করবে। এই ভেবে রাজা অর্হত ঋষভদেবের অনুকরণ করতে শুরু করলেন। তার ফলে একটি সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়। মহাবীর এসে সেই সম্প্রদায়টিকে গ্রহণ করেন। জৈনরা বলে যে জৈন ধর্মের প্রবর্তক হচ্ছেন ঋষভদেব আর দ্বিতীয় তীর্থঙ্কর হচ্ছেন অর্হত বা অহন্ত। কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতে আমরা দেখতে পাচ্ছি ঋষভদেবের অনুকরণকারী অর্হত বলে কঙ্কার এবং বেঙ্কার প্রদেশের এক রাজা। কিন্তু তাঁর ধর্মটিও অনেকটা বৌদ্ধ ধর্মের মতোই অহিংস ধর্ম। বুদ্ধদেবের সমসাময়িক মহাবীরের দ্বারা জৈনধর্মেরও প্রসার শুরু হয়। এই সময় ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে বৈশ্যদের একটা বিবাদ গড়ে উঠে। তার ফলে বৈশ্যরা জৈন ধর্মের অনুসরণ করে। আর ক্ষত্রিয়রা বুদ্ধদেবের অনুসরণ করে। যার ফলে ক্ষত্রিয় সম্প্রদায় অহিংস হয়ে যায়। ক্ষত্রিয়রা যদি অহিংস হয় তাহলে সমাজকে রক্ষা করবে কারা? বিদেশীর আক্রমণ থেকে রাজ্যকে রক্ষা করবে কারা? এইভাবে ক্ষত্রিয় সমাজ বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ার ফলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে ভারতবর্ষ অত্যন্ত ক্ষীণবীর্য হয়ে পড়ে। তাই আমরা দেখতে পাই যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে অনাদিকাল থেকে কোন বিদেশী রাজা বা বিদেশী শত্রু ভারতবর্ষে প্রবেশ করতে পারেনি। তারা বহুবার ভারতবর্ষকে আক্রমণ করেছে। কিন্তু কেউ ভারতবর্ষে প্রবেশ করতে পারেনি। পক্ষান্তরে ভারতবর্ষের রাজারাই সারা পৃথিবীর উপরে আধিপত্য করে এসেছে। পরীক্ষিৎ মহারাজ পর্যন্ত ভারতবর্ষের রাজারাই সসাগরা পৃথিবীর রাজত্ব করে গেছেন। সসাগরা মানে সাগর সমন্বিত কেবল স্থলভাগই নয়, জল ভাগ সমন্বিত পৃথিবীর একছত্র রাজা ছিলেন। সেটি আমরা দেখতে পাই পরীক্ষিৎ মহারাজের রাজত্ব পর্যন্ত। আর পরীক্ষিৎ মহারাজের সময় থেকে কলিযুগের সূচনা হয়। ক্রমে ক্রমে এইভাবে যখন ভারতের বর্ণাশ্রম ধর্ম বা বৈদিক ধর্মের অবক্ষয় হতে থাকে তখন ভারতবর্ষের রাজারা অত্যন্ত হীনবীর্য হয়ে পড়ার ফলে বিদেশীরা এসে ভারতে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। ভারতের ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই যে, আজ থেকে প্রায় এক হাজার বৎসর আগেই বিদেশীরা ভারতে প্রবেশ করেছে। দশম শতাব্দীতে আফগানিস্তানের অধিবাসী পশতুভাষীদের দল, সাম্রাজ্যলোভী পাঠান সুলতান মামুদ সতেরবার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেছিল।। কিন্তু প্রতিবারই পরাজিত হয়। পরবর্তীকালে পাঠান সুলতান মহম্মদ ঘোরি, গিয়াসুদ্দিন তুঘলক প্রমুখ বিদেশী আক্রমণকারীরা ভারতীয় রাজাদের পরাজিত করে ভারতবর্ষে প্রবশে করে এবং রাজত্ব শুরু করে।
আমরা দেখছি এইভাবে কালক্রমে ভারতবর্ষ বিদেশীদের হস্তগত হয়েছে। বৈদিক ধর্মের থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ার ফলেই বিদেশীরা ভারতকে পরাভূত করতে পেরেছিল। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের সংস্কৃতি যদি আমরা হারিয়ে ফেলি তার ফলে আমাদের নানারকম অসুবিধাই কেবল হচ্ছে না, আমাদের সর্বনাশও হচ্ছে। আর আমাদের এই সর্বনাশ থেকে উদ্ধারের একমাত্র উপায় হল আমাদের বৈদিক সংস্কৃতিকে পুনরায় অবলম্বন করা। বৈদিক সংস্কৃতি বলতে বোঝায়–বর্ণাশ্রম ধর্ম এবং তার চরম প্রকাশ বৈষ্ণব ধর্ম। বুদ্ধদেব আসার পরেই যদিও সংস্কৃতির বিপর্যয় বা অবক্ষয় হয়েছে, তবুও একটা ভালো দিক আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ক্রমে ক্রমে সেই যে নাস্তিকতাবাদ থেকে আবার পুনরায় বেদের সংস্থাপন হলো।
প্রথমে শঙ্করাচার্য এলেন। শঙ্করাচার্য এসে ভারতবর্ষ থেকে বৌদ্ধধর্ম উৎখাত করলেন। বুদ্ধদেবের সিদ্ধান্ত ছিল যে, ১০ টি সৎ কর্ম করাই হচ্ছে ধর্ম, আর জীবনের চরম উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্বাণ। নির্বাণ মানে শূন্যে লীন হয়ে যাওয়া। শঙ্করাচার্য এসে বললেন–দেখো তোমরা যে নির্বাণের কথা বলছ সেটা তো বেদের কথা বা বেদের বাণী। আর বেদের নির্বাণের অর্থ শূণ্যের বিলীন হয়ে যাওয়া বা ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়া নয়। নির্বাণের অর্থ হল পূর্ণে লীন হয়ে যাওয়া। ব্রহ্ম কি তা তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন। যেহেতু বৌদ্ধরা নাস্তিক, তাই পূর্ণরূপে শঙ্করাচার্য বেদের তত্ত্বটি প্রদান করলেন না। যতটুকু তাদের পক্ষে গ্রহণীয় বা শিক্ষণীয় হয়, ঠিক ততটুকুই তাদের প্রদর্শন করলেন। তিনি বললেন যে, ব্রহ্ম হচ্ছে নিরাকার, নিঃশক্তিক ও নির্বিশেষ এবং সেই ব্রহ্মে লীন হয়ে যাওয়াই হচ্ছে জীবনের উদ্দেশ্য। তাঁর সিদ্ধান্তটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি বললেন “ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা।” জগৎ মিথ্যাটি হল–যেমন রজ্জুতে কখনও সর্পভ্রম হয় বা মরিচিকায় জল ভ্রম হয়। ঠিক তেমনই এই জগৎটি ভ্রম। প্রকৃত পক্ষে কিন্তু এটি তা নয়। আমাদের এই জগৎটি বাস্তব বলে মনে হতে পারে। আসলে রজ্জুতে যেমন সর্প নেই, ঠিক তেমনই এ জগতে বাস্তব বস্তুটি নেই। এই সিদ্ধান্ত দিয়ে শঙ্করাচার্য বৌদ্ধদের নিরস্ত করেন। তিনি পুনরায় বেদ প্রতিষ্ঠা করলেন। তারপরে রামানুজাচার্য এসে শঙ্করাচার্যের এই যে মত, সেটিও তিনি খন্ডন করলেন। তাঁর কয়েকটি দৃষ্টান্ত এই রকম যে, শঙ্করাচার্য বলেছেন “ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা।” যেমন রজ্জুতে কোন সর্প ভ্রম হয়, তেমনই এই জগৎটা ভ্রম। রামানুচার্য বললেন, ঠিক আছে রজ্জুতে সর্প নেই মানলাম কিন্তু কোথাও না কোথাও সর্প আছে বলে ভ্রম হচ্ছে। যদি সর্প না থাকতো তাহলে রজ্জুতে সর্প ভ্রমের কোন প্রশ্নই উঠত না। অতএব এই জগৎটি যাকে আমরা বাস্তব বলে মনে করছি সেটি বাস্তব নাও হতে পরে। কিন্তু বাস্তব জগৎটি কোথাও রয়েছে বলেই এই জগৎটিকে আমরা বাস্তব বলে মনে করছি। এইভাবে তিনি শঙ্করাচার্যের মত খন্ডন করে প্রতিষ্ঠা করলেন এই জড় জগতের ঊর্ধ্বে আর একটি জগৎ রয়েছে। এই জগৎটি হচ্ছে সেই জগতের প্রতিবিম্ব। এই জগতে যা কিছু রয়েছে তা সব ঐ জগতেও রয়েছে এবং ঐ জগৎটি বাস্তব, এবং এই জগৎটি তার ছায়া। এবং ছায়ারূপে এই এই জগৎটিও সত্য, মিথ্যা নয়। যেমন জলে গাছের ছায়া পড়ে তাহলে জলে যা কিছু দেখা যায়, গাছটিতে সেই সবকিছু রয়েছে বলেই দেখা যাচ্ছে। যদি গাছটিতে সবুজ পাতা আর লালফুল না থাকতো, হলুদ ফল না থাকতো তাহলে জলে লাল ফুল, হলুদ ফল দেখা যেতো না। সেই জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন–এই জগতের যে বৈচিত্র তা ঐ জগতেও রয়েছে। এইভাবে তিনি শঙ্করাচার্যের কেবলাদ্বৈতবাদের পরিবর্তে তিনি বিশিষ্টাদ্বৈতবাদের প্রতিষ্ঠা করলেন। তারপর মর্ধ্বাচার্য এসে আরও দৃঢ়ভাবে তার মধ্বগৌড়ীয় সম্প্রদায়ের মাধ্যমে এই জগতে বৈষ্ণব ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করলেন। শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদ এবং বৈষ্ণবদের দ্বৈতবাদ তার মধ্যে একটা সংঘর্ষ গড়ে উঠেছিল। অবশেষে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এসে তাঁর অচিন্ত্য ভেদাভেদতত্ত্বের মাধ্যমে শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদ এবং বৈষ্ণব আচার্যদের দ্বৈতবাদের সমন্বয় সাধন করলেন। তিনি বললেন যে গুণগতভাবে ব্রহ্ম জীব এবং প্রকৃতির মাঝে ঐক্য বা অভেদ রয়েছে, কিন্তু আয়তনগতভাবে তাদের মধ্যে পার্থক্য আছে। যেমন জীব এবং ঈশ্বর। গুণগতভবে জীব সচ্চিদানন্দময়, ভগবানও সচ্চিদানন্দময়। কিন্তু আয়তনগতভাবে জীব ক্ষুদ্র, ভগবান পূর্ণ। যেমন সমুদ্রের জল এবং একবিন্দু জল। কিন্তু কেউ যদি বলে যে একবিন্দু জলটাই সমুদ্র তাহলে সেটা ঠিক হবে না। ঠিক যেমন আগুনের স্ফুলিঙ্গও আলো এবং সূর্যের কিরণও আলো। কিন্তু আমরা কিরণ ও আগুনের কণাকে কি সূর্য বলি? গুণগতভাবে এক হলেও আয়তনগত ভাবে আলাদা। কিন্তু যে বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি সেটি অচিন্ত্য; চিন্তার অতীত। অতএব অচিন্ত্য তত্ত্বটি বা বস্তুটি যদিও অচিন্ত্য, তবুও তার মধ্যে ভেদ এবং অভেদ দুটিই রয়েছে। একদিকে ভেদ রয়েছে আর এক দিকে অভেদ রয়েছে। এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর অচিন্ত্য ভেদাভেদ তত্ত্বের মাধ্যেমে বেদের পূর্ণ তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠিত করলেন।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits