বৈষ্ণব ধর্মের ঐতিহ্যের ইতিহাস- পর্ব ৪- রাগানুগা ভক্তি

শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের দুটি কারণ রয়েছে–একটি বাহ্যিক কারণ এবং অপরটি আভ্যন্তরীণ কারণ। বাহ্যিক কারণটি হল কৃষ্ণপ্রেম বিতরন করা এবং যুগধর্ম প্রবর্তণ করা।
“যজ্ঞৈঃ সংকীর্তনপ্রায়ের্যজন্তিহি সুমেধসঃ”
আর আভ্যন্তরীণ কারণটি হচ্ছে শ্রীমতী রাধারাণীর অন্তরের ভাব নিয়ে তিনি রাধারাণীর প্রেম আস্বাদন করছেন বা প্রেমের মর্ম উপলব্ধি করছেন। মহাপ্রভু রূপে শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের আর একটি কারণ–নিত্যানন্দ প্রভু নবদ্বীপ ধাম মাহাত্ম্যে শ্রীল জীব গোস্বামীকে নবদ্বীপ ধাম দর্শন করানোর পর উপদেশ প্রদান করেছেন। সেই উপদেশটির মর্মার্থ হচ্ছে এই যে, শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপরে তাঁর বৃন্দাবনলীলা প্রকাশ করার পর বিচার করলেন, এই যে ব্রজলীলা, যা হচ্ছে ভগবানের সমস্ত লীলার মধ্যে সর্বোত্তম এবং বৃন্দাবন, যে স্থান হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট। সেখানে প্রকাশিত লীলার বিশেষ বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে যে বৃন্দাবনে ভগবানের সঙ্গে ভক্তের যে সম্পর্ক সেটি তিনটি বিশেষ রসের উপরে লীলাটি প্রতিষ্ঠিত। সেই রসগুলি হচ্ছে সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। বৈকুন্ঠে ভগবানের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক হচ্ছে দাস্য রসের, বৈকুন্ঠে সকলেই দাসভাবে ভগবানের সেবা করেন বা আরাধনা করেন। কিন্তু বৃন্দাবনে ভগবানের সঙ্গে ভক্তের যে সম্পর্ক সেটি সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর রসের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ভগবান বিচার করলেন যে সাধারণতঃ দাস্য বা বৈধী ভক্তিতে ভক্তরা ভগবানের সেবা করে এবং বৈধী ভক্তিতে যখন সিদ্ধিলাভ হয় তখন তারা বৈকুন্ঠে উন্নীত হয়। কিন্তু বৈকুন্ঠের উপরে যে বৃন্দাবন, তাহলে সেখানে তারা প্রবেশ করবে কি করে? তাই ভগবান ভক্তরূপে আবির্ভূত হলেন। সেই যে ভক্ত রূপে ভগবান, তাঁকে বৈধী ভক্তির মাধ্যমে আরাধনার করার ফলে বৃন্দাবনে প্রবেশ লাভ হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর রূপে ভগবান এলেন বৃন্দাবনের দ্বারটি সকলের জন্য খুলে দেওয়ার জন্য। ভগবান বৃন্দাবন লীলা প্রকাশ করার পর ভাবলেন যে, জীব সেই লীলায় প্রবেশ করবে কি করে? প্রবেশের সেই পথটি হল ভক্তরূপী ভগবানকে বৈধী ভক্তির মাধ্যমে বা দাস্যভাবে, তাঁর সেবা করার মাধ্যমে বৃন্দাবনে সখ্য, বাৎসল্য অথবা মধুর রসে সেবার অধিকার লাভ।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে ভগবানকে সেবা করার ফলে এই গতি কেন হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে? তার কারণ হল–শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন রাধাকৃষ্ণের মিলিত তনু।
“শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য রাধাকৃষ্ণ নহে অন্য।”
দাস্য ভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে আরাধনা করার ফলে আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে রাধাকৃষ্ণ রূপে দর্শন করতে পারি। দাস্য রসে নবদ্বীপে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেবা হচ্ছে কিন্তু সেই সেবার চরম পরিণতি হচ্ছে মাধুর্য রসে রাধাকৃষ্ণের সেবা লাভ। এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জীবদেে কৃপা করেছেন।
বৃন্দাবনে ভগবানের এই যে সেবা তাকে বলা হয় রাগানুগা ভক্তি। ভক্তির দুইটি দিক রয়েছে, একটি হচ্ছে বৈধী ভক্তি এবং অন্যটি হচ্ছে রাগানুগা ভক্তি। বৈধী ভক্তি হচ্ছে শাস্ত্রের বিধিনিষেধ পালন করে ভগবানের সেবা করা আর রাগানুগা ভক্তি হচ্ছে–ভাবের আবেগের প্রভাবে ভগবানের প্রতি আমাদের যে অনুরাগ সেটিই হচ্ছে রাগানুগ। রাগ মানে হৃদয়ের রং, হৃদয়ের রং গুলি হল আমাদের ভাবের আবেগ। অনুরাগ মানে কোন কিছু প্রতি আকর্ষণ। আর এই আকর্ষণটি হল শ্রীকৃষ্ণের প্রতি। অনুরাগ–রাগ মানে প্রেম, সেই প্রেমের অনুবর্তী যে ভক্তি সেইটি হচ্ছে রাগানুগ ভক্তি, অর্থাৎ রাগের অনুগ। রাগ ভক্তি অর্থাৎ হৃদয়ে স্বতঃস্ফূর্ত প্রেমের প্রভাবে যে ভক্তি সেটি ব্রজবাসীদের সম্পদ। বৃন্দাবনে সকলে কৃষ্ণের প্রতি এক নিবিড় প্রেম অনুভব করেন। কৃষ্ণ যে ভগবান তার জন্য তাঁরা কৃষ্ণকে ভালোবাসেন না। কৃষ্ণের প্রতি তাঁদের ভালোবাসটি এই যে, তাঁরা কৃষ্ণকে না ভলোবেসে থাকতে পারেন না। তাঁদের মনোভাবটি হচ্ছে যে কৃষ্ণ যদি ভগবান হয়ে থাকেন তাতে কি আছে? কৃষ্ণ ভগবান বলে তাঁকে তারা ভালোবাসেন এমন নয়, কৃষ্ণ যদি ভগগান নাও হতেন তাহলেও তাঁরা কৃষ্ণকে ভালো বাসতেন। এটিই হচ্ছে ব্রজবাসীদের মনোভাব। তার একটি দৃষ্টান্ত হল, রাসস্থলী থেকে শ্রীকৃষ্ণ যখন চলে গেলেন তখন ব্রজগোপীকারা বৃন্দাবনের বনে কৃষ্ণকে খুঁজছেন, আর কৃষ্ণ বনপথে এক জায়গায় তাঁর চতুর্ভুজ নারায়ণরূপ ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছেন, ব্রজগোপীকারা দেখলেন যে নারায়ণ দাঁড়িয়ে আছেন, তখন তাঁরা নারায়ণকে প্রণাম নিবেদন করে প্রার্থনা করলেন যে তাঁরা যেন তাঁদের কৃষ্ণকে খুঁজে পান। ব্রজগোপীকারা জানতেন যে নারায়ন হচ্ছেন ভগবান, কিন্তু নারায়নের প্রতি তাঁরা আসক্ত ছিলেন না। তাঁরা কৃষ্ণের প্রতি আসক্ত ছিলেন, কিন্তু কৃষ্ণ যে ভগবান সেটা তাঁরা জানতেন না। তা তাঁরা ভুলে গেছেন। তাঁরা যখন নারায়ণকে দেখেন তখন তাঁরা নারায়ণকে চান না, তাঁরা নারায়ণের আশীর্বাদ চান। এই জন্য তাঁরা যেন কৃষ্ণকে খুঁজে পান। এই হচ্ছে বৈধী ভক্তি ও রাগানুগা ভক্তির পার্থক্য। যাঁরা বৈধী ভক্তির আরাধনা করছেন তাঁরা নারায়নকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবেন, তাঁরা মনে করবেন তাঁদের সারা জীবনের সাধনার চরম সিদ্ধিলাভ হল। কিন্তু ব্রজগোপীকারা নারায়ণকে দেখে প্রণাম জানিয়ে চলে গেছেন, সেটাই হচ্ছে ব্রজবাসীদের কৃষ্ণপ্রেমের মাহাত্ম্য। অন্য গোপীকারা যখন এলেন তখন স্বয়ং কৃষ্ণই নারায়ণ রূপ ধারণ করে রয়েছেন। কিন্ত যখন স্বয়ং রাধারাণী এলেন তখন কৃষ্ণ আর নিজের রূপ লুকিয়ে রাখতে পারলেন না, তখন চতুর্ভুজ নারায়ণ রূপ থেকে দ্বিভুজ কৃষ্ণরূপ ধারণ করলেন। রাধারাণীর প্রতি কৃষ্ণের প্রেম এত ঐকান্তিক যে কৃষ্ণ রাধারাণীর কাছে তাঁর স্বরূপ লুকাতে পারেন না।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর যে মহিমা সেটা এইভাবে আমরা উপলব্ধি করতে পারি। তাই বলা হয়েছে “ব্রহ্মারও দুর্লভ প্রেম সবাকারে যাচে।” ব্রহ্মাও বৈধী ভক্তি অনুশীলন করছেন–দাস্য ভক্তি, কিন্তু এই যে সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর ভক্তি সেই ভক্তিকে সাধারণত ব্রহ্মারও প্রবেশাধিকার নেই। কিন্তু শ্রীচেতন্য মহাপ্রভুর লীলায় ব্রহ্মা হরিদাস ঠাকুর রূপে প্রবেশাধিকার পেলেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, মহাপ্রভুর লীলায় ব্রহ্মা এই ভক্তি পেয়েছেন, কিন্তু তার আগে ব্রহ্মা তা পান নি। কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা দর্শন করেছেন ব্রহ্মা, কিন্তু কৃষ্ণকে চিনতে পারেন নি আর তাই তিনি কৃষ্ণের গোবৎস ও গোপবালকদের হরণ করে শ্রীকৃষ্ণের চরণে অপরাধ করলেন। তারপর অপরাধ করার পরে তিনি অন্তরে ব্যথিত হচ্ছেন যে, ‘হায় হায় আমি একি করলাম আমার প্রভুকে এইভাবে আমি পরীক্ষা করতে গেলাম।’
দেবাদিদেব মহাদেও এই ভক্তিতে প্রবেশ করতে পারছেন না, বৃন্দাবনে প্রবেশ করতে পারছেন না, যখন প্রবেশ করছেন তখন ঠিক বৃন্দাবনে প্রবেশ হচ্ছে না, তিনি গোপেশ্বর মহাদেব রূপে রাসলীলার দ্বার আগলে আছেন। ঠিক রাসলীলাতে প্রবেশ করতে পারছেন না।
লক্ষ্মীদেবীও রাসলীলায় প্রবেশ করতে পারছেন না। যখন লক্ষ্মীদেবীও কৃষ্ণের বৃন্দাবনে রাসলীলা দর্শন করতে চাইলেন, তখন নারায়ণ লক্ষ্মীদেবীকে বললেন, “তুমি যদি বৃন্দাবনের রাসলীলায় প্রবেশ করতে চাও, তাহলে তোমাকে কোন ব্রজবাসী সখীর অনুগত হতে হবে।” তখন লক্ষ্মীদেবী বললেন, “আমি তোমার মহিষী, আমি তো কারও কাছে মাথা নিচু করতে পারব না, আমি কি করে কারও অনুগত হবে, তাহলে তো তোমার মর্যাদা ক্ষুন্ন হবে।” তখন নারায়ণ বললেন, “তাহলে তোমারও বৃন্দাবনে প্রবেশ হবে না যদি তুমি সখির অনুগত না হতে পার।” তখন লক্ষ্মীদেবী মর্মাহত হয়ে কঠোর তপস্যা শুরু করলেন, কৃষ্ণ তখন লক্ষ্মীদেবীর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, “ কেন তুমি এমন কঠোর তপস্যা করছ?” তখন লক্ষ্মীদেবী বললেন, “আমি তোমার রাসলীলা দর্শন করব,” তখন কৃষ্ণ লক্ষ্মীদেবীকে শ্রীবৎস চিহ্নরূপে তাঁর বক্ষে ধারণ করলেন। এইভাবে লক্ষ্মীদেবী ব্রজলীলায় প্রবেশাধিকার পেলেন। তাহলে বোঝা যায় কত দুর্লভ সেই ব্রজের প্রেমভক্তি। আর সেই প্রেমভক্তি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এইভাবে বিতরণ করছেন। কেন না কৃষ্ণ যে বৃন্দাবনলীলা প্রকাশ করলেন তার উদ্দেশ্য হচ্ছে ভক্তেরা যাতে এই বৃন্দাবন লীলায় প্রবেশ করতে পারে। তাই সেই বৃন্দাবন লীলাতে জীবের প্রবেশাধিকার দেওয়ার জন্যই কৃষ্ণ রাধারাণীর ভাব ও অঙ্গকান্তি অবলম্বন করে শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু রূপে আবির্ভূত হলেন।
নমো মহাবদান্যায় কৃষ্ণপ্রেমপ্রদায়তে।
কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্যনাম্নে গৌরত্বিষে নমঃ ॥
আবার তার জন্য অত্যন্ত সাবধান বাণীও দেওয়া হয়েছে এবং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যদিও হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র বিতরণ করলেন সকলের কাছে, কিন্তু বৃন্দাবনের রাধাকৃষ্ণের যে নিগূঢ় লীলা সেগুলি তিনি সচরাচর প্রকাশ্যে কারও কাছে আলোচনা করেন নি, কেবল অন্তরঙ্গ ভক্তদের সঙ্গেই তিনি সেই রস আস্বাদন করেছেন। তা থেকে আমাদের বুঝতে হবে যে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সংকীর্তন যজ্ঞে কৃষ্ণের আরাধনা করে যাওয়া। সংকীর্তন মানে কৃষ্ণের মহিমা কীর্তন এবং কৃষ্ণভক্তির প্রচার, এটিই হচ্ছে আমাদের কর্তব্য আর সেটি করার ফলেই শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারাণী আমাদের কৃপা করবেন এবং সেই কৃপার প্রভাবেই আমরা বৃন্দাবনে প্রবেশ করার সুযোগ লাভ করতে পারব। কিন্তু কেউ যদি সরাসরি বৃন্দাবনে প্রবেশ করতে চায় বা অপক্ব অবস্থায় যদি রাগানুগা ভক্তির অনুশীলন করে, তাহলে তার অধঃপতনের সম্ভাবনা থাকে। অর্থাৎ অপক্ব অবস্থায় যদি রাগানুগা ভক্তির অনুশীলন হয় তাহলে সেটা সহজিয়ায় পর্যবসিত হয়। সেই জন্য আমাদের পূর্বতন আচার্যেরা খুব সুন্দর একটা বাঁধন দিয়ে গেছেন। সেই প্রতিরক্ষার উপায়টি কি? চারটি নিয়ম পালন করা, ধর্মের যে চারটি পা সেগুলি সুদৃঢ়ভাবে গড়ে তোল। ধর্মের যদি চারটি পা সুদৃঢ় ভাবে গড়ে ওঠে তাহলে, আর কখনও অধর্ম বা পাপ প্রবেশ করতে পারবে না। তাই যাঁরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুগামী হবেন তাদের অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে এই চারটি নিয়ম পালন করতেই হবে। অর্থাৎ আমিষ আহার, সব রকমের নেশা, অবৈধ যৌনসঙ্গ এবং দ্যূতক্রীড়া সম্পূর্ণরূপে বর্জন করতে হবে। যাঁরা এই চারটি নিয়ম পালন করে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করেন তাঁদের অন্তরে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় এই ব্রজপ্রেম প্রকাশিত হয়। তাঁরাই রাগানুগ ভক্তি যথাযথ ভাবে গ্রহণ করতে সক্ষম হন। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে রাধাকৃষ্ণের নিগূঢ় লীলা জনসাধারণের কাছে গিয়ে প্রচার করার কোন প্রয়োজন নেই। যখন কৃষ্ণের কৃপালাভ হবে তখন অন্তরেই কৃষ্ণলীলার স্ফুরণ হবে। সেই জন্য আমাদের পূর্বতন আচার্যরা বারবার এই সাবধান বাণী দিয়ে গেছেন। প্রভুপাদ, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বা শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুরও কখনও রাধাকৃষ্ণের নিগূঢ়লীলা সম্বন্ধে আলোচনা করেননি। পক্ষান্তরে তাঁরা বলে গেছেন–
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা ॥
এই হরিণাম কীর্তন কর, এই হরিনাম প্রচার কর, এই নামের প্রভাবেই সব কিছু লাভ হবে। অতএব এই পথে আমাদের খুব সাবধানতার সঙ্গে এগোতে হবে। যদি কেউ যারা রাধাকৃষ্ণের এই নিগূঢ় লীলা থেকে সমক্ষে কীর্তন করে লোকেদের আকর্ষণ করার চেষ্টা করে বা লোক ঠকাবার চেষ্টা করে, তাতে জনসাধারণের সর্বনাশই হয়, মঙ্গল হয় না। রাধাকৃষ্ণের লীলা স্মরণের প্রভাবে ভক্তদের চিত্ত বৃন্দাবন মুখী হবে, কিন্তু বিষয়ীদের কছে যদি রাধাকৃষ্ণের লীলা শোনান হয় তাহলে তারা নিজেরা কৃষ্ণ সেজে বাজারের আর পাঁচটি মেয়ে মানুষকে নিয়ে রাসলীলা করার কথা ভাববে। কৃষ্ণলীলার প্রভাবে আমাদের অধ্যাত্ম উন্নতি হবে, অবনতি হবে না। সেই সম্বন্ধে প্রভুপাদ বলেছেন, রাধাকৃষ্ণ লীলার এমনই মহিমা যে সেই লীলায় আমরা যদি যথাযথভাবে মনোনিবেশ করতে পারি তাহলে হৃদয়ের কাম ভাব সম্পূর্ণ রূপে দূর হয়ে যাবে, মহাপ্রভুর কৃপায় আমাদের হৃদয় নির্মল হবে, হৃদয় কলুষিত হবে না। এই লীলা এমনই মহিমান্বিত যে এই লীলা শ্রবণের ফলে আমাদের স্ত্রীসঙ্গের প্রতি আসক্তি বা হৃদয়ের কামভাব সম্পূর্ণরূপে দূর হয়ে যাবে। আর সেটিই হচ্ছে কৃষ্ণের এই বৃন্দাবন লীলার মাহাত্ম আর এই বৃন্দাবন লীলায় প্রবেশ করার উপায়টি হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অনুগত হওয়া।
গৌরপদারবিন্দে বিন্দেত
ভক্তি কৃতপুণ্যরাশি যথাতথা
উৎসার্পিত হৃদি অকস্মাৎ
রাধাপদাম্ভোজে সুধাম্বোরাশি ॥
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মে পুঞ্জীভূত পুণ্যের প্রভাবে যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মের প্রতি আমাদের যথাযথ আসক্তি হবে। সেই আসক্তি অর্থাৎ মহাপ্রভুর প্রতি ভক্তি অনুসারে হৃদয়ে রাধারাণীর শ্রীপাদপদ্ম নিঃসৃত যে সুধারাশি বা অমৃতরাশি তা হঠাৎ নিঃসৃত হতে থাকবে। এখন রাধারাণীর শ্রীপাদপদ্ম নিঃসৃত অমৃতরাশিটি কি? ব্রজপ্রেম, অর্থাৎ আমাদের কর্তব্য হচ্ছে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মের প্রতি আসক্ত হওয়া এবং সেই অনুসারে রাধারাণীর কৃপায় আমাদের হৃদয়ে ব্রজপ্রেম রূপ সুধা অকস্মাৎ নিঃসৃত হবে এবং সেই সুধা-অমৃতের দ্বারা আমাদের হৃদয় প্লাবিত হবে। এইটিই হচ্ছে অনুসরণীয় পন্থা, এইটিই হচ্ছে বৃন্দাবনের মাধুর্য, বৃন্দাবনের মহিমা হৃদয়ঙ্গম করার এবং বৃন্দাবন লীলায় প্রবেশ করা উপায়। কৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলায় যদি কেউ প্রবেশ করতে চায় তাহলে তার কর্তব্য হল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মের প্রতি আসক্ত হওয়া। তিনি মহাপ্রভু আর আমাদের কর্তব্য হল তাঁর নিত্য দাস হয়ে যাওয়া। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তরূপে এসে আমাদের কৃষ্ণভক্তি শিক্ষা দিচ্ছেন।
তাই আমাদের করণীয় হল শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীপাদপদ্মে আসক্ত হওয়া।
(যদি) গৌর না হইত, তবে কি হইত,
কেমনে ধরিতাম দে,
রাধার মহিমা, প্রেমরস সীমা
জগতে জানাত কে?
মহাপ্রভুর এই অতি অন্তরঙ্গ পার্ষদ বাসুদেব ঘোষ এইভাবে মহাপ্রভুর মহিমা কীর্তন করেছেন।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits