ধ্রুব মহারাজ তাঁর মায়ের নির্দেশ অনুসারে পরম পুরুষোত্তম ভগবানকে দর্শন করতে ইচ্ছুক হয়েছিলেন এবং তাঁর ঐকান্তিক নিষ্ঠার ফলে অবশেষে তাতে সফল হন। পরমেশ্বর ভগবান যখন ধ্রুবের সামনে আবির্ভূত হন, স্বভাবতই তখন ধ্রুব চেয়েছিলেন ভগবানের স্তুতিগান কীর্তন করতে। কিন্তু প্রথমে ধ্রুব একটু অস্বস্তিতে পড়েছিলেন, কারণ তিনি তখনও এক শিশু মাত্র, বুঝতে পারেননি হঠাৎ কি করণীয়। কিন্তু অশেষ করুণাময় ভগবান তাঁর শঙ্খটি ধ্রুবের মাথয় স্পর্শ করান এবং এই আশীর্বাদের ফলে ধ্রুব স্বয়ংসিদ্ধ ভাবে সুন্দর করে ভগবানের প্রার্থনা করতে সক্ষম হন।
গ্রন্থরাজ শ্রীমদ্ভাগবতের চতুর্থ স্কন্ধের নবম অধ্যায়ের চতুর্থ শ্লোকে এই কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে, এবং এটি সর্বোৎকৃষ্ট শ্লোকগুলির অন্যতম। সুতরাং এইভাবে আমরা জানতে পারি, ভগবান কিভাবে ভক্তদের সাহায্য করতে সর্বদাই প্রস্তুত, যেখানে ভক্তদেরই কাজ হল ভগবানের সেবা করা। প্রকৃতপক্ষে, ভক্তিযুক্ত সেবার মাধ্যমে যারা ভগবানের কাছে আত্মনিবেদন করতে উদ্গ্রীব, ভগবানও তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে সদা উদ্গ্রীব। অথচ, আমরা, জীবেরাই শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে দ্বিধাযুক্ত। এই ইচ্ছা বোধটুকু বাদে জীবের আর সমস্ত সুযোগ-সুবিধাই রয়েছে পরমেশ্বরের সেবা করার।
জীবাত্মা হল ভগবানের অংশ, এবং ভগবানের সেবায় নিযুক্ত হতে পারলে জীবের অস্তিত্ব সার্থক হয় এবং সে তখন দিব্য, অপ্রাকৃত আনন্দ অনুভব করতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ তো সর্বদাই তাঁর ভক্তদের ইচ্ছা পূরণে আগ্রহী–বিশেষ করে চিৎ জগতে। চিৎ জগতে জীবাত্মার ইচ্ছাপূরণের সমস্ত আয়োজন রয়েছে–চিন্তামণি রয়েছে সেখানে। চিন্তামণি হল চিন্তা; অর্থাৎ মনে যা ভাবব তা পূরণ হবে। কল্পবৃক্ষ রয়েছে, যা জীবগণের সমস্ত বাসনা পূরণ করে থাকে, এবং সুরভী গাভীরা তাঁদের পর্যাপ্ত দানে সকল ইচ্ছা পূরণ করতে পারে।
সুতরাং চিজ্জগতে বসবাসকারীদের হয় কেবল শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে পারার আকাঙ্ক্ষা করা চাই, নয়তো সেবার জন্য কোনও কিছুর বাসনা করতে হয় যা এইভাবে সহজেই এবং সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ হয়ে যায়। চিজ্জগতের কথা কি বলার আছে, এই জড় জগতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ভক্তদের এবং সকল জীবের বাসনা পূরণ করতে প্রস্তুত হয়ে আছেন। বরং জীবাত্মারাই শ্রীকৃষ্ণকে বাদ দিয়ে সমস্ত কিছু উপভোগ করেই চলতে চায়।
কিন্তু জীবগণের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির ভোগ ইচ্ছা চিৎ জগতে সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়। তাই শ্রীকৃষ্ণ সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন এই জড় জগৎ সৃষ্টি করে, এবং সেটি চালিত হচ্ছে গুণ কর্ম পদ্ধতি অনুসারে। জড় জগতে তিনটি গুণ আরোপ করা আছে, এবং তার নিয়ন্ত্রণে যে যেমন কর্ম করে, বাসনা অনুসারে সেই রকম ফল সে প্রাপ্ত হয়। এইভাবেই জীবগণ তাদের সব বাসনা পূরণ করে থাকে শ্রীকৃষ্ণেরই সরবরাহের ভিত্তিতে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, জীবাত্মারা যতই শ্রীকৃষ্ণকে বাদ দিয়ে ভোগ করতে চায়, ততই তারা দুর্নিবার কামনা-বাসনার জালে জড়িয়ে পড়ে এবং ক্লেশ ভোগ করে। এইটাই জড় সৃষ্টির নিয়ম। যেহেতু পরিস্থিতিটাই কৃত্রিম এবং যেহেতু ব্যবস্থাটাই প্রাথমিকভাবে স্বাভাবিক নয়, সুতরাং সুখী হবার স্বাভাবিক ইচ্ছাটা পূরণ হওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই জানা দরকার যে, শ্রীকৃষ্ণকে ছাড়া সুখী হওয়া সম্ভব নয়। মূল উৎসকে ভুলে গিয়ে আমরা কোনও ব্যবস্থাকেই উপভোগ করতে পারি না, সুখী বোধ করতে পারি না। বরং আমাদের তথাকথিত সাধগুলি মেটাবার প্রচেষ্টায় আরও বেশি করে কষ্ট পেতে থাকি।
শ্রীকৃষ্ণকে বাদ দিয়ে যতই ভোগ করতে চাই, মায়া প্রকৃতি ততই আমাদের সাজা দিতে থাকে। এমন নয় যে, শ্রীকৃষ্ণ চান আমরা সাজা পাই; তিনি চান আমরা যেন বুঝতে পারি–আমাদের কৃত্রিম পরিকল্পনাগুলি কাজ করবে না, বদ্ধ জীবদের তিনি শেখাতে চান তাঁকে ছাড়া, তাঁর সেবা করা ছাড়া, শুধু নিজেদের ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধনে কোনও স্থায়ী সুখ নেই, যে উপভোগ চাই তা ঐভাবে মিলবে না। এইভাবে তিনি চান যে, যে পরিকল্পনা কার্যকরী হবে না, তা যেন আমরা পরিত্যাগ করি, ইন্দ্রিয়তৃপ্তির পরিকল্পনাদি ত্যাগ করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় মন দিই। যেইমাত্র এই কাজ করব, সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবন আনন্দপূর্ণ হয়ে উঠবে, এবং এটাই হল শ্রীকৃষ্ণের দিব্য কার্যকৌশল। জড় সৃষ্টির উদ্দেশ্যই হল বদ্ধ জীবাত্মাদের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনজনিত ভয়ানক বন্ধন জাল থেকে মুক্তি দেওয়া।
ইন্দ্রিয় বাসনা চরিতার্থে জড়া প্রকৃতিকে শোষণ করা এবং তার ওপর আধিপত্য করার প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে। যখন জীব বুঝতে পারে যে, এই জড় জগতে সুখ ভোগ সম্ভব নয়, তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। সেই কারণেই শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মারূপে সকলের হৃদয়ে অবস্থান করছেন। সেইখান থেকেই তিনি এই সমস্তের আয়োজন করছেন।
আবার যখন জীবাত্মা চাইছে শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে থাকতে, তাঁকে বাদ দিয়ে চলতে, শ্রীকৃষ্ণ সেই ব্যবস্থাও করে দেন–তারই নাম অবিদ্যা বা অজ্ঞান, এবং এই জড় জগতের নীতিই হল এই অজ্ঞানতা। শ্রীকৃষ্ণকে ভুলতে চাইলেই জীব এই অজ্ঞানতার শিকার হয়। কৃষ্ণ-বহির্মুখ হয়ে ভোগ বাঞ্ছা করলেই মায়া জাপটে ধরে। মায়া খুব নিকটেই অবস্থিত। আরও বলা হয়েছে–
“পিশাচী পাইরে যেন মতিচ্ছন্ন হয়
মায়ামুগ্ধ জীবের হয় সে ভাব উদয় ॥”
মায়ার কবলে পড়লে মানুষ আর সুস্থ মস্তিষ্কে বিচার-বুদ্ধিসহ কাজ করতে পারে না, তার মতিচ্ছন্ন অবস্থা হয়।
বদ্ধ, মতিচ্ছন্ন জীব শ্রীকৃষ্ণকে ত্যাগ করলেও, শ্রীকৃষ্ণ জীবকে ত্যাগ করেন না–সব সময়ে তার সাথে সাথে তিনি থাকেন পরমাত্মারূপে।
“সর্বস্য চাহম্ হৃদি সন্নিবিষ্ট” অথবা “ঈশ্বর সর্বভূতানাম্ হৃদ্দেশেহর্জুন…” গীতায় অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, তিনি পরমাত্মারূপে কিভাবে সকলের হৃদয়ে সদা বিরাজমান, এবং প্রাথমিকভাবে তিনি হলেন “উপদ্রষ্টা ও অনুমন্তা”–জীবের সকল কর্মের সাক্ষী তিনি ও অনুমন্তা, অর্থাৎ অনুমোদনকারীও। যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের অনুমোদন ছাড়া কোনও কিছুই সম্ভব নয়, তাই তিনি স্বয়ং সকলের হৃদয়ে অবস্থান করে আছেন। সেখান থেকে তিনি জীবগণের বাসনাদি সমস্ত লক্ষ্য করছেন, এবং পূরণও করছেন।
যতক্ষণ জীব কামনা-বাসনার বদ্ধ অবস্থায় থাকছে, ততক্ষণ শ্রীকৃষ্ণ নিতান্তই দর্শকরূপে বিরাজ করে রয়েছেন এবং অপেক্ষা করছেন জীব কখনও তাঁর দিকে মনোযোগ দেবে। সকল জীবের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান করার উদ্দেশ্য একটাই। শ্রীকৃষ্ণ জীবকে সঙ্গ দান করে সেই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছেন, কখন জীব ‘বহির্মুখ’ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ‘উন্মুখ’ হবে।