মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি

এই জড়া প্রকৃতি হচ্ছে অনিত্য। এর অর্থ হচ্ছে এটি কোন এক সময়ে সৃষ্টি হয়েছে এবং পরে তা বিনাশ প্রাপ্ত হবে।
ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্।
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্ বিপরিবর্ততে ॥
“হে কৌন্তেয়, আমার অধ্যক্ষতার দ্বারা ত্রিগুণাত্মিকা মায়া এই চরাচর বিশ্ব সৃষ্টি করে। প্রকৃতির নিয়মে এই জগৎ পুনঃ পুনঃ সৃষ্টি হয় এবং ধ্বংস হয়।” (ভগবদ্গীতা ৯/১০)
যারই জন্ম হয়েছে তার অবশ্যই মৃত্যু হবে। যা কিছুই সৃষ্টি হয়েছে তা অবশ্যই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং যা কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে তা অবশ্যই পুনরায় সৃষ্টি হবে। এটিই হচ্ছে এই জড় জাগতিক প্রকাশের প্রকৃতি।
খন্ড ও সামগ্রিক বিভিন্ন ধরনের প্রলয় বা ধ্বংস রয়েছে। অনন্ত দেবের অগ্নি সীমার মধ্যে, যা স্বর্গলোক পর্যন্ত ধাবিত হয়, খন্ড প্রলয় ঘটে থাকে। যখন অনন্তদেব অগ্নিশ্বাস ত্যাগ করেন স্বর্গ পর্যন্ত সমস্ত সৃষ্টি ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। আর যখন সংহার-কর্তা ভগবান শিব নৃত্য শুরু করেন তখন সামগ্রিক প্রলয় হয়। তিনি যখন নৃত্য করেন, তান্ডব নৃত্য, সমগ্র সৃষ্টি লয় প্রাপ্ত হয়। অণু-পরমাণুসমূহ বিদীর্ণ হয়ে সৃষ্টি লয় প্রাপ্ত হয়।
যখন ব্রহ্মার মৃত্যু হয় এবং যখন মহাবিষ্ণু মায়া হতে তাঁর দৃষ্টি প্রত্যাহার করেন তখনও প্রলয় ঘটে থাকে। আরেক ধরনের প্রলয় হচ্ছে ব্যক্তিগত প্রলয়–মৃত্যুর সময় যা ঘটে থাকে। যখন কারোর মৃত্যু হয় তার কাছে সমগ্র সৃষ্টিরই লয় হয়। তাছাড়া যুদ্ধের আকারেও বৃহদায়তন ধ্বংস সাধিত হয়।
কৃষ্ণ এই জড়া প্রকৃতি ধ্বংসের কত রকম আয়োজন করে রেখেছেন। কিন্তু এই ধরনের বিনাশশীল জড় সৃষ্টির অতীত আরেকটি সৃষ্টি রয়েছে, আরেকটি প্রকৃতি, আর সেটি হচ্ছে নিত্য। পরমেশ্বর ভগবান সেই নিত্য অবিনাশী বাস্তবতায় নিত্যত অবস্থান করেন।
পরস্তস্মাত্তু ভাবোহন্যোহব্যক্তোহব্যক্তাৎ সনাতনঃ।
যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি ॥
“আর একটি প্রকৃতি রয়েছে, যা নিত্য এবং ব্যক্ত ও অব্যক্ত বস্তুর অতীত। ব্রহ্মা থেকে স্থাবর জঙ্গম আদি সমস্ত প্রকাশ বিনষ্ট হলেও তা বিনষ্ট হয় না।” (ভগবদ্গীতা ৮/২০)
জীবও নিত্য শাশ্বত। আজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো, ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে। “তিনি (আত্মা) জন্মরহিত, শাশ্বত, নিত্য ও প্রাচীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না।” (ভগবদ্গীতা ২/২০)
পরমেশ্বর ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায়, জীবাত্মাও পরমেশ্বর ভগবানের চিন্ময় গুণাবলীর একই দিব্য গুণে বিভূষিত। জীবাত্মার যখন চিন্ময় প্রকৃতি থেকে পতন হয় সে তার চিন্ময় গুণাবলী হারিয়ে ফেলে। জীবাত্মার স্বাভাবিক অবস্থানটি হচ্ছে চিন্ময় প্রকৃতিগত। কিন্তু জীবাত্মা যখন তার স্বাধীনতাকে কৃষ্ণের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে উপভোগ করার জন্য ব্যবহার করে সে তার চিন্ময় প্রকৃতিতে অবস্থান করার অধিকার হারায়।
কৃষ্ণ-ভুলি’ সেই জীব অনাদি-বহির্মুখ।
অতবে মায়া তারে দেয় সংসার-দুঃখ ॥
অর্থাৎ “কৃষ্ণকে ভুলে জীব অনাদিকাল ধরে জড়া-প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে রয়েছে। তাই মায়া তাকে এই জড় জগতে নানা প্রকার দুঃখ প্রদান করছে।” (শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত মধ্য ২০/১১৭)
“সংসার-দুঃখ।” দুঃখ অর্থ হচ্ছে দুর্দশা বা যন্ত্রণা আর সংসার অর্থ হচ্ছে সমাজ, পরিবার ও বন্ধুত্ব ইত্যাদির ভিত্তিতে যে জড় জাগতিক লিপ্ততা। পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের প্রসারিত স্বার্থপরাতার মাধ্যমে বদ্ধ জীব এই জড়া প্রকৃতিকে ভোগ করার চেষ্টা করে। সে এই জড়া প্রকৃতিকে ভোগ করার বিভিন্ন ধরনের আয়োজন করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার আয়োজনগুলি হচ্ছে দুঃখ ভোগ করার আয়োজন। আর এটিকেই বলা হচ্ছে সংসার। জীব ভোগ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, তাদের ভোগ করার উদ্যম স্বত্ত্বেও তারা তাদের দুঃখ দুর্দশাকে বর্ধিত করছে।
কৃষ্ণ-বহির্মুখ হইয়া ভোগ-বাঞ্ছা করে।
নিকটস্থ মায়া তারে জাপটিয়া ধরে ॥
অর্থাৎ “যখনই জীব কৃষ্ণ বিমুখ হয় আর কৃষ্ণহীনভাবে আনন্দ উপভোগের আকাঙ্ক্ষা করে, মায়া অমনি তাকে জড়িয়ে ধরে।” (প্রেমবিবর্ত)
এইভাবে জীব জড়া প্রকৃতির মধ্যে পতিত হয় আর এই জড়া প্রকৃতির মধ্যস্থ প্রত্যেককেই হচ্ছে সেই একই ভুলের বলি। কিভাবে জীব কৃষ্ণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভোগ করতে ইচ্ছুক হয় সে কথা এই শ্লোকে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ‘বহির্মুখ’ কথাটির অর্থ হচ্ছে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া। ‘বহিঃ’ অর্থ হল বাইরের দিকে বা অন্য কোন দিকে। দুটো ভাব রয়েছে। উন্মুখ আর বহির্মুখ। উন্মুখ অর্থ হচ্ছে নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে থাকা আর বহির্মুখ অর্থ হল নির্দিষ্ট দিকে হতে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া। আমরা হয় কৃষ্ণের দিকে মুখ করে থাকতে পারি অথবা কৃষ্ণের দিক হতে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারি। জীবাত্মারূপে আমাদের কৃষ্ণের দিকে মুখ করে তাঁকে দর্শন করার কথা। কিন্তু কোন এক সময় আমরা কৃষ্ণের দিক হতে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলাম। আর যখন আমরা সেটি করি, আমরা কৃষ্ণের বহিরঙ্গা শক্তিকে দর্শন করি।
সমস্ত কিছুই হচ্ছে কৃষ্ণের শক্তির প্রকাশ। আমরা যখন কৃষ্ণকে দর্শন করি আমরা কৃষ্ণের সঙ্গে থাকি। কিন্তু যখনই আমরা কৃষ্ণ হতে দৃষ্টি অন্য দিকে নিক্ষেপ করি তখন আমরা তাঁর বহিরঙ্গা শক্তিকে দর্শন করি। আর কৃষ্ণের বহিরঙ্গা শক্তির প্রকৃতিটি কি?
অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধি মে পরাম্।
জীবভূতাং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ ॥
“হে মহাবাহো (অর্জুন), এই নিকৃষ্টা প্রকৃতি ব্যতীত আমার আর একটি উৎকৃষ্টা প্রকৃতি রয়েছে। সেই প্রকৃতি চৈতন্য স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হয়ে এই জড় জগতকে ধারণ করে আছে।” (ভগবদ্গীতা ৭/৫)
এখানে ‘জগৎ’ শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আক্ষরিক অর্থে এর মানে হচ্ছে যা অনবরত চলমান অর্থাৎ জড়া প্রকৃতি। একটি নদীর প্রবহমানতাও জগতের আর একটি উদাহরণ হতে পারে। নদী কোন সময়েই থেমে থাকে না। তেমনি সময়ের রথে আরাহণ করে এই জড়া প্রকৃতিও নিরন্তর প্রবহমান।
“যয়েদং ধার্যতে জগৎ” কথাটির অর্থ হল এই নিরন্তর প্রবাহিত জড়া প্রকৃতিকে জীবাত্মা ধারণ করছে। জীবাত্মা হচ্ছে উৎকৃষ্টা শক্তি আর এই জড় জগত হচ্ছে নিকৃষ্টা শক্তি। তাই যখনই কোন উৎকৃষ্টা জীবাত্মা নিকৃষ্টা জড়া শক্তির সংস্পর্শে আসে, তার মধ্যে জড়া প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব করার আকাঙ্ক্ষা জাগরিত হয়। নিকৃষ্টা শক্তির উপর আধিপত্য করাই হচ্ছে উৎকৃষ্টা শক্তির স্বভাব। এটি জীবাত্মার স্বাভাবিক প্রবণতা আর তার ফলে সে প্রথম জড় আচ্ছাদন অহংকার দ্বারা আবৃত হয়। অহংকারের অর্থ হচ্ছে ভুল বা ভ্রান্ত পরিচয়। জীরের মূল পরচয় হল, সে হল কৃষ্ণের নিত্য দাস। এ কথা ভুলে গিয়ে সে জড়া প্রকৃতির উপর আধিপত্য করার চেষ্টা করে আর সেটিই হচ্ছে তার প্রকৃত পরিচয় হারিয়ে ভ্রান্ত পরিচয়ে অবস্থান করার কারণ। একজন ভৃত্য হওয়ার পরিবর্তে সে প্রভু হওয়ার চেষ্টা করে। সে তখন পরিকল্পনা করে কিভাবে এই জড়া প্রকৃতিকে শোষণের মাধ্যমে সে সুখ উপভোগ করবে। এই পরিকল্পনা তখন তাকে জড়া প্রকৃতির দ্বিতীয় আচ্ছাদন ‘বুদ্ধি’ প্রদান করে। অতঃপর জড়া প্রকৃতির তৃতীয় আচ্ছাদন ‘মন’ দ্বারা আবৃত হয়ে তার চেতনা অনবরত জড়া প্রকৃতির বিষয় সমূহের দিকে ধাবিত হয়।
এইভাবে মন, বুদ্ধি ও অহংকার দ্বারা নির্মিত তার এইটি সুক্ষ্মদেহ গড়ে ওঠে এবং সুক্ষ্ম দেহটি থেকে সে একটি বাহ্য ইন্দ্রিয়সম্পন্ন দেহ লাভ করে জড়া প্রকৃতির কার্যক্রমের মধ্যে পূর্ণরূপে নিয়োজিত হয়ে পড়ে। এই জড়া প্রকৃতিতে প্রতিটি জীবাত্মা তার সুক্ষ্ম ও বাহ্য ইন্দ্রিয়গত দেহ দ্বারা আবদ্ধ। এছাড়াও আরও বিভিন্ন স্তরের বন্ধন রয়েছে। এইভাবে জড়া প্রকৃতির মধ্যেকার বিভিন্ন বস্তুকে অধিকার করে সে ভোগ করার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তার অধিকার গুলি হচ্ছে তার বিভিন্ন বন্ধন। সে আরও এবং আরও অধিকার উপভোগ করার চেষ্টা করে। ফলে সে আরও এবং আরও বদ্ধ হয়ে পড়ে।
বন্ধন মানেই হচ্ছে দুঃখ কষ্ট ভোগ। তাই যদি কেউ সত্যি সত্যিই আনন্দ লাভ করতে ইচ্ছুক হয় তাকে বন্ধন মুক্ত হতে হবে। অর কিভাবে কেউ মুক্ত হতে পারে? কেবলমাত্র তার যা কিছু আছে সেসব ত্যাগ করেই কি কেউ মুক্ত হতে পারে? না। মুক্ত হবার একমাত্র উপায় হচ্ছে সমস্ত কিছু তার প্রকৃত মালিকের কাছে নিবেদন করা। যদি কেউ বলে “আমি আমার সমস্ত টাকা পয়সা পরিত্যাগ করব”, তবুও তার পক্ষে সেই বন্ধন মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। সে বাহ্যত তা ত্যাগ করলেও অন্তঃস্থ আসক্তি থেকেই যায়। সে সেটি ত্যাগ করা সত্ত্বেও তার মনে স্মৃতিটি তখনও থেকে যায়। কেউ হয়ত তার পরিবারকে ত্যাগ করে ধ্যান করার কথা ভাবতে থাকে তাহলে সেটি হচ্ছে প্রবঞ্চনা। তাই মুক্ত হবার শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে সমস্ত কিছু তার আসল মালিক, কৃষ্ণকে নিবেদন করা আর প্রকৃতপক্ষে আমরা যার সঙ্গে সম্পর্কিত সেই কৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে জীবনের পরম স্বাদ আস্বাদন করা। সেটি কেবলমাত্র কৃষ্ণভাবনামৃতের মাধ্যমেই সম্ভব। উৎকৃষ্ট স্বাদ প্রাপ্ত হলে আমরা নিকৃষ্ট স্বাদ ত্যাগ করতে পারব।
বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ।
রসবর্জং রসোপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে ॥
“দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয় সুখ ভোগ নিবৃত্ত হতে পারলেও ইন্দ্রিয় সুখ ভোগের আসক্তি থেকেই যায়। কিন্তু উচ্চতর স্বাদ আস্বাদন করার ফলে সেই বিষয় তৃষ্ণা থেকে তিনি চিরতরে নিবৃত্ত হন।” (ভগবদ্গীতা ২/৫৯)
“পরম দৃষ্ট্বা নির্বততে” অর্থাৎ কৃষ্ণের সঙ্গ আমাদের প্রেমময়ী সম্পর্কে উচ্চতম স্বাদ প্রাপ্ত হওয়ার দ্বারা আমরা নিম্নতম স্বাদকে “বর্জম্” অর্থাৎ বর্জন করতে পারি। এবং আমাদের যা কিছু আছে তার সমস্তটি তাঁকে নিবেদন করার মাধ্যমে কৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের প্রেমময়ী সম্পর্কটি আমরা গড়ে তুলতে পারি। সমস্ত কিছু কৃষ্ণের জন্য ত্যাগ করার পন্থাটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা। এখানে ত্যাগের অর্থ হচ্ছে কৃষ্ণকে অর্পণ করা। সমস্ত কিছুই আসলে তাঁর, একথাটি ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করে, সমস্তকিছু কৃষ্ণকে অর্পণ করে আমরা আমাদের আসক্তি থেকে মুক্ত হতে পারি।
সমস্ত কিছুই কৃষ্ণের। তাই সমস্ত কিছু অবশ্যই তাকে নিবেদন করতে হবে। হ্যাঁ, আমরা আমাদের পরিবারের প্রতি আসক্ত, আমরা তাই আমাদের পরিবারের সদস্যদের কৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করলাম। আমরা আমাদের দেহের প্রতি আসক্ত, তাই আমরা আমাদের দেহকে কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করলাম। আমাদের সমস্ত আসক্তিগুলোকে কৃষ্ণকে নিবেদন করার মাধ্যমে আমরা মুক্ত হয়ে যাই। একজন ভক্তই হচ্ছে একমাত্র ব্যক্তি যিনি জড় আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে আনন্দময় হতে পারেন।
আমেরিকায় জনগণের জীবনযাত্রার মান ও আয় ইত্যাদি বিষয়ে কিভাবে একটি পরিসংখ্যান গ্রহণ করা হচ্ছিল সে বিষয়ে কিছুদিন আগে আমাকে বলা হল। এ বিষয়ে পরিসংখ্যান গ্রহণকারী এক মহিলা একজন তরুণ ব্রহ্মচারী ভক্তের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন। সেই মহিলা তাকে তার মাসিক বা সাপ্তাহিক আয় কত এ বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। ভক্তটি জানালেন তার কোন আয় নেই। মহিলাটি তখন তাকে তার সম্পত্তির বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। আপনার কোন বাড়ি আছে কি? না। আপনার কোন গাড়ি আছে কি? না। আপনার স্ত্রী রয়েছে? না। আপনার কোন মেয়ে বন্ধু আছে? না। আপনার কোন ব্যাঙ্ক একাউন্ট আছে? না। ব্রহ্মচারী ভক্তের সমস্ত উত্তর হল ‘না’। হঠাৎই সেই প্রশ্নকারী মহিলা তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলেন, “তাহলে আপনি এত সুখী কেন?”
সেই মহিলা জানতেন না যে, কোনকিছুর অধিকারী না হওয়াটাই সুখী হওয়ার একমাত্র পথ। জড়া প্রকৃতিতে সকলেই মনে করে যে তাদের যদি কোনকিছু না থাকে তাহলে তারা আনন্দ উপভোগ করতে পারবে না। তারা ভাবে যে আনন্দ উপভোগ করার জন্য কারোর অবশ্যই কিছু থাকতে হবে। এই জাগতিক ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।
যেভাবেই হোক না কেন, আমরা যখন পারমার্থিক স্তরে, প্রকৃত বাস্তবতায় অবস্থান করি, আমরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারি যে প্রকৃতপক্ষে আমাদের কোনকিছুর অধিকারী হওয়ার প্রয়োজন নেই। সবকিছুই সেখানে রয়েছে, আর সবকিছুরই অধিকারী হচ্ছেন কৃষ্ণ, যিনি আমাদের ভালবাসেন।
একটি শিশু হয়তো কোন কিছুর অধিকারী না হতে পারে, কিন্তু যদি তার বাবার অর্থ থাকে তাহলে শিশুটিকে অর্থের জন্য কোন চিন্তা করতে হয় না, তার বাবাই তার সমস্ত প্রয়োজনের যোগান দেয়। পারমার্থিক স্তরে এই সচেতনতা জাগরিত হয় যে সবকিছুর মালিকই হচ্ছেন কৃষ্ণ আর কৃষ্ণ হচ্ছেন আমার পিতা, আমার বন্ধু, আমার প্রেমিক, আমার সবকিছু। আমরা যখন সেটি হৃদয়ঙ্গম করব, কেবল তখনই আমরা কৃষ্ণের উপরে নির্ভর করতে পারব। আমাদের যা প্রয়োজন, কৃষ্ণ আমাদের তার সবকিছুই প্রদান করবেন, তাহলে আমরা কেন বিচ্ছিন্নভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করব?
আপনি কি কল্পনা করতে পারেন, কৃষ্ণের উপর নির্ভরশীল প্রত্যেকে কতটা ভারমুক্ত এবং উদ্বেগহীন? কেবলমাত্র কৃষ্ণকে গ্রহণ করার মধ্যেই ব্যাপারটি লুকিয়ে আছে।
সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচ ॥
“সমস্ত ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। সে বিষয়ে তমি কোন দুশ্চিন্তা করো না।” (ভগবদ্গীতা ১৮/৬৬)
প্রকৃতপক্ষে আসক্তি হচ্ছে বন্ধন যা এই জড়া প্রকৃতিতে আমাদের বেঁধে রাখে। এমন নয় যে আমাদের হাত পা বেঁধে রাখা হয়, কিন্তু আমারা আমাদের হৃদয়ের দ্বারা আবদ্ধ থাকি। কেউ হয়ত তার স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি আসক্ত। সেটির প্রকৃত অর্থ কি দাঁড়ায়? এর অর্থ হচ্ছে তার স্ত্রী বা স্বামী তাকে এই জড়া প্রকৃতিতে খুব সুন্দরভাবে বেঁধে রেখেছে। কেউ হয়ত তার অর্থ, তার গৃহ বা তার গাড়ির প্রতি আসক্ত। এই ধরনের অসংখ্য বন্ধন রয়েছে।
আমরা যখন কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণকে গ্রহণ করি তখন জাগতিক আসক্তির সকল বন্ধনই ছিন্ন হয় এবং আমাদের হৃদয়ের সকল সংশয়ের বিনাশ হয়। কেবলমাত্র কৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে আনন্দময় হয়ে ওঠা তাই খুবই সহজ। আমরা তৎক্ষণাৎ মুক্ত ও আনন্দিত হব। কৃষ্ণভাবনামৃতে কোন কর্ম নেই। আমরা কেবলমাত্র কৃষ্ণের লীলাসমূহে অংশগ্রহণ করছি। লীলা শব্দটি ক্রীড়ার সমার্থক। তাই ভক্তগণ কেবলমাত্র ক্রীড়া করেন।
আমরা যখন মঙ্গলারতিতে উপস্থিত থাকার জন্য প্রতুষ্যে ঘুম থেকে উঠি, সেটি কি কোন কর্ম? যদি আমাদের সঠিক চেতনাটি না থাকে তবে সেটি কর্ম। কিন্তু যদি সেটি কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত হয়ে করি, সেটি অত্যন্ত আনন্দের। আমরা যখন নৃত্য কীর্তন করি সেটি কি আমরা কর্মের জন্য করি? না। আনন্দবশতঃ কেউ নৃত্য করে। যখন আমাদের হৃদয়ের অভ্যন্তরস্থ আনন্দ আমাদের দেহে প্রকাশিত হয় সেটিকেই নৃত্য বলা হয়।
চিন্ময় প্রকৃতিতে কেবল সঙ্গীত ও নৃত্য রয়েছে। পরস্পারিক কথোপকথন যে কোন কথা বলা সকলই সঙ্গীতময়। চিন্ময় আকাশে সকলেই গান করছেন আর সেখানে প্রতিটি মুহূর্তেই নৃত্য রয়েছে। চিন্ময় প্রকৃতি এমনই আনন্দময়। শ্রীল প্রভুপাদের  কৃপায় আমাদের কেবলমাত্র সকল আসক্তিকে কৃষ্ণের কাছে সমর্পণ করার মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে সেই চিন্ময় প্রকৃতিতে রূপান্তরিত করার অপূর্ব সুযোগ লাভ করেছি। আমরা এই পন্থাটি গ্রহণ করব কি না সেটি আমাদের উপর নির্ভর করছে। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে এক মিনিটের মধ্যে, না এক মিনিটও নয়, এক সেকেন্ডের মধ্যে কেউ নিজেকে কেবলমাত্র কৃষ্ণের কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে চিন্ময় প্রকৃতিতে রূপান্তরিত করতে পারেন।
যত শীঘ্র আমরা কৃষ্ণের জন্য আমাদের আন্তরিক প্রেম গড়ে তুলতে পারব তত শ্রীঘ্র আমরা বৃন্দাবনে গতি প্রাপ্ত হব। আমাদের দেহটি এখানে থাকলেও, আমরা চিন্ময় আকাশে অবস্থান করব। সেটিই আমাদের উদ্দেশ্য আর সেইজন্যই আমরা এখানে রয়েছি। সেই কৃষ্ণপ্রেম গড়ে তুলে চিন্ময় আকাশে ফিরে যাবার জন্য আমরা সকলে ইসকনে যোগদান করেছি।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits