দিব্য জ্ঞান কি?

আমাদের স্বরূপে আমরা কৃষ্ণের নিত্য দাস। স্বস্তি স্ব-অস্তি অর্থাৎ আমাদের স্বরূপে স্থিতি, সেটি হচ্ছে প্রকৃত স্বস্তি। যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা আমাদের স্বরূপে অধিষ্ঠিত হতে পারব ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা প্রকৃত শান্তি লাভ করতে পারব না। আমাদের প্রকৃত পরিচয় হল আমরা সব ভগবানের নিত্য দাস।
“দিব্য জ্ঞানং যতো দদ্যাৎ কুর্বন্তি পাপস্য সংক্ষয়ম্।” দিব্যজ্ঞান প্রদান করার ফলে এবং গ্রহণের ফলে পাপের ক্ষয় হয়। দিব্য জ্ঞানম্-এর ‘দি’ এবং সংক্ষয়ম্-এর ‘ক্ষ’ এই দুটি অক্ষরের যোগে হয় ‘দীক্ষা’।
শ্রীগুরুদেব দিব্যজ্ঞান দান করেন এবং তার ফলে এই দিব্যজ্ঞান গ্রহণকারী শিষ্যের পাপের ক্ষয় হয়। এই দিব্য জ্ঞান লাভের ফলে ভগবৎতত্ত্ব জ্ঞান হৃদয়ে প্রকাশিত হয় আর সেই ভগবত্তত্ত্ব জ্ঞান হচ্ছে জীবের এক মাত্র কাম্য।
জড় জগৎ এবং চিজ্জগৎ–দুটি জগৎ রয়েছে। আমরা জড় জগতে রয়েছি, কিন্তু এই নাশমান, ক্ষয়শীল, অনিত্য জড় জগতের ঊর্ধ্বে একটি নিত্য, শাশ্বত আনন্দময় জগৎ রয়েছে, সেই জগৎ থেকে আমরা সকলে এসেছি। আমাদের স্বরূপে আমরা চিন্ময় আত্মা এবং এই চিন্ময় আত্মা জড় জগতের বস্তু নয়, আত্মা হল চেতন জগতের বস্তু। সেই চিন্ময় জগৎ থেকে সমস্ত আত্মা এসেছে, আমরা সকলে এসেছি। আমাদের প্রকৃত আলয় সেই চিন্ময় ভগবদ্ধামে যেখানে ভগবান নিত্য বিরাজ করেন তাঁর অন্তরঙ্গ পার্ষদদের নিয়ে। এই জড় জগৎ থেকে সেই চিন্ময় জগতে ফিরে যাবার যে পন্থা সেটি গুরু-শিষ্য পরম্পরা ধারায় অনাদি কাল থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। সৃষ্টির আদিতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ব্রহ্মাকে এই দিব্যজ্ঞান দান করেন। ব্রহ্মা ভগবানকে হৃদয়ঙ্গম করে বা ভগবানকে জেনে ভগবান সম্বন্ধে যে কথাগুলি বলে গেছেন সেটি হচ্ছে “ব্রহ্ম-সংহিতা”। সৃষ্টির আদিতে প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মাকে ভগবান স্বয়ং এই দিব্য জ্ঞান দান করেন, ব্রহ্মা সেই দিব্যজ্ঞান দান করেন তাঁর পুত্র নারদ মুনিকে, নারদ মুনি সেই জ্ঞান দান করেন ব্যাসদেবকে, ব্যাসদেব তা প্রদান করেন মর্ধ্বাচার্যকে। এইভাবে গুরু-শিষ্য পরম্পরা ধারায় এই দিব্যজ্ঞান প্রবাহিত হচ্ছে। এই জ্ঞান প্রাপ্তির উপায় হচ্ছে শ্রীগুরুদেবের চরণাশ্রয় করে এই জ্ঞান লাভ করা। গুরুদেবের কাছ থেকে শিষ্য এই জ্ঞান প্রাপ্ত হন, যথাসময়ে শিষ্য গুরু হয়ে তাঁর শিষ্যকে সেই জ্ঞান দান করেন, তাঁর শিষ্য আবার কালক্রমে গুরু হয়ে তাঁর শিষ্যকে এই জ্ঞান দান করেন। এই গুরু এবং শিষ্যের পারস্পারিক জ্ঞান প্রদান এবং গ্রহণের যে ক্রিয়া সেটিকে বলা হয় গুরু-শিষ্য-পরম্পরা। পরম্পরাক্রমে এই জ্ঞান প্রবাহিত হচ্ছে। অতএব এই জ্ঞান প্রাপ্ত হতে হলে আমাকে এমন কোন ব্যক্তির কাছে যেতে হবে যাঁর কাছে এই জ্ঞান রয়েছে এবং তিনিই এই জ্ঞান প্রদান করতে পারেন।
ভগবদ্গীতাতে (৪/৩৪) ভগবান সেই কথা অর্জুনকে বলছেন যে, তুমি যদি এই জ্ঞান প্রাপ্ত হতে চাও তাহলে
তদবিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।
উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিন ॥
অপ্রাকৃত বস্তু নাহি প্রাকৃত গোচর, যে বস্তুটি জড় জগতের অতীত সেই বস্তুটি জড় ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য নয়, প্রাকৃত ইন্দ্রিয়ের দ্বারা তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি না। সেই বস্তুটি পাবার উপায় হচ্ছে যার কাছে তা আছে তার কাছে যেতে হবে প্রকৃষ্টরূপে নিজেকে সমর্পণ করে। যেমন ছাত্র যদি কোন শিক্ষকের কাছে শিক্ষালাভ করতে চায় তাহলে শিক্ষকের কাছে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে, নিজে বিনীত হয়ে তাঁকে যথাযথ সম্মান প্রদান করে এই জ্ঞানটি প্রাপ্ত হতে হবে। ঐকান্তিকভাবে তাঁর কাছে প্রশ্ন করতে হবে এবং সেবার দ্বারা তাঁর সন্তুষ্টি বিধান করতে হবে। তার ফলে তিনি তখন সেই জ্ঞান দান করবেন, তিনি সেটি দান করতে পারেন কারণ তাঁর কাছে সেই বস্তুটি রয়েছে–এটিই হচ্ছে পন্থা।
আবার শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে আমরা দেখতে পাই সেখানে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন–ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবান্ অহম্ অব্যয়ম্–এই জ্ঞানটি আমি সূর্যদেব বিবস্বানকে দান করেছিলাম, বিবস্বান মনবে প্রাহ–বিবস্বান তাঁর পুত্র বৈবস্বত মনুকে দান করেন, মনু ইক্ষ্বাকবে অব্রবীৎ–এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে দান করেন। এবং পরম্পরা প্রাপ্তম্ ইমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ–এইভাবে পরম্পরার মাধ্যমে এই যোগটি রাজর্ষিদের মাধ্যমে প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্ত স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ–কালক্রমে এই যোগটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষ্ণ আবার এসে ভগবদ্গীতার মাধ্যমে এই জ্ঞানটি প্রদান করলেন। অতএব এটিই হচ্ছে দিব্য জ্ঞান লাভের উপায়। অর্থাৎ এই দীক্ষার মূল বিষয়টি হচ্ছে দিব্য জ্ঞান। অনুষ্ঠানটি আনুষঙ্গিক কিন্তু প্রকৃত বস্তুটি হচ্ছে দিব্য জ্ঞান এবং এই দিব্য জ্ঞানটি যদি লাভ না হয় তাহলে দীক্ষা অর্থহীন। সেই দিব্য জ্ঞান যাতে আমরা অর্জন করতে পারি সেই চেষ্টা আমাদের করতে হবে এবং সেইজন্য এই দীক্ষার আয়োজন। আবার বলা হচ্ছে “দীক্ষা কালে শিষ্য করে আত্মসমর্পণ, সেইকালে কৃষ্ণ তারে করে আত্মসম।” দীক্ষার সময় শিষ্য তার গুরুদেবের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, তখন এই যে সমর্পিত আত্মা যে শিষ্য গুরুদেবের প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে কৃষ্ণ তাকে গ্রহণ করেন। যে মাত্রায় আমরা আত্মসমর্পণ করব সেই অনুসারে কৃষ্ণ আমাদের গ্রহণ করবেন। যদি আমরা পুরোপুরিভাবে আত্মসমর্পণ করি তাহলে কৃষ্ণ তা গ্রহণ করবেন।
গুরুদেব কৃষ্ণের প্রতিনিধি, তিনি কোন বিশেষ অলৌকিক শক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি নন। তাঁর একমাত্র যোগ্যতা হচ্ছে তিনি সৎগুরুর শিষ্য এবং তিনি তাঁর গুরুদেবের কাছ থেকে জ্ঞানটি প্রাপ্ত হয়েছেন। অর্থাৎ তিনি একজন সৎগুরুর শিষ্য এবং তাঁর কাছ থেকে এই জ্ঞান নিষ্ঠা সহকারে গ্রহণ করেছেন। গুরুদেব উদ্ধার করেন না, গুরুদেবের মাধ্যমে শিষ্য উদ্ধার লাভ করে। উদ্ধার কর্তা হচ্ছেন কৃষ্ণ। গুরুদেব তাঁর প্রতিনিধি। যেমন কোন প্রতিনিধির কাছে গেলে এবং তিনি যদি যথাযথভাবে প্রতিনিধিত্ব করেন তাহলে সেই বস্তুটি পাওয়া যাবে। যেমন আমি যদি একটা Ambassadar গাড়ী কিনতে চাই এবং তার প্রতিনিধির কাছে আমার Order-টা পেশ করে তাকে যদি আমি চেক দিই তাহলে আমার কাছে গাড়ীটা পৌছবে কিনা? নিশ্চয়ই পৌছবে। এর জন্য Hind Motor- এর মালিকের কাছে গিয়ে আমার চেকটা দিতে হবে না। আমাকে Order-টা পেশ করতে হবে Hind Motor- এর Sales Representative এর কাছে। সে যদি যথাযথ প্রতিনিধি হয় তাহলে তার মাধ্যমে আমি বস্তুটি প্রাপ্ত হব। গাড়িটি কিন্তু ওই প্রতিনিধির নয়, গাড়ীটি মালিকের, কিন্তু যেহেতু তিনি কোম্পানীর প্রতিনিধিত্ব করছেন তাই তাঁর মাধ্যমে বস্তুটি আমরা পেতে পারি।
তেমনই আমরা কৃষ্ণের কৃপা লাভ করতে চাই আর গুরুদেব কৃষ্ণের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এইভাবে দেখা যাচ্ছে তিনি হচ্ছেন কৃষ্ণের ভক্ত। তাই গুরুদেবের যোগ্যতা হচ্ছে তিনি হলেন কৃষ্ণভক্ত।
কিবা বিপ্র, কিবা ন্যাসী, শূদ্র কেনে নয়।
যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা সেই গুরু হয় ॥
তিনি ব্রাহ্মণ হোন, শূদ্র হোন, সন্ন্যাসী হোন, যাই হোন না কেন, তাতে কিছু যায় আসে না। তাঁর প্রকৃত যোগ্যতা হচ্ছে যে তিনি কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা, তিনি কৃষ্ণকে জানেন। আর কৃষ্ণকে কিভাবে জানা যায় সে সম্পর্কে ভগবান অর্জুনকে গীতায় বলছেন–ভক্তহসি মে সখা চেতি–আমি এই রহস্য তোমার কাছে উন্মোচন করছি, বা সবাইয়ের কাছে ব্যক্ত করছি। আমি কে এটা তোমাকে আমি জানাচ্ছি। কারণ তুমি আমার ভক্ত, তা না হলে তোমাকে জানাতাম না। ভগবানকে কে জানতে পারে? যিনি ভগবানের ভক্ত তিনি জানতে পারেন, অন্যথায় ভগবানকে জানা সম্ভব নয়। তাই “যেই কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা সেই গুরু হয়।” গুরুর যোগ্যতাই হচ্ছে যে, তিনি কৃষ্ণ তত্ত্ববেত্তা অর্থাৎ কৃষ্ণের ভক্ত। তাই এইভাবে যদি গুরুদেবের কাছে আত্মসমর্পণ হয়, কৃষ্ণের যথাযথ প্রতিনিধির কাছে যদি আত্মসমর্পণ হয় তাহলে কৃষ্ণ তাকে গ্রহণ করেন।
এতক্ষণ গুরুদেবের যোগ্যতা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা হল, এখন শিষ্যের যোগ্যতা কি? শিষ্য কথাটির অর্থ হচ্ছে যে শাসন গ্রহণ করতে প্রস্তুত। গুরুদেবের কাজ হচ্ছে শাসন করা, শিষ্যকে শাসানো, আর শিষ্যকে প্রস্তুত থাকতে হবে গুরুদেবের কাছ থেকে সেই শাস্তিটি গ্রহণ করার জন্য। গুরুদেব আমাকে শাসন করলে আমি গুরুদেবকে ত্যাগ করে চলে গেলাম সে শিষ্য নয়। গুরুদেব যখন মিষ্টি মধুর কথা বলবেন তখন তাঁর কাছে থাকব, তাঁর কথা শুনব, আর যেই গুরুদেব আমার ভুলত্রুটিগুলো দেখতে শুরু করলেন, আমাকে শাসন করতে শুরু করলেন, তখন আমার মন ভেঙ্গে গেল এই রকম অবস্থা যার হবে সে শিষ্য নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে শিষ্য মানে যে শাসন গ্রহণ করতে প্রস্তুত। তাই দীক্ষা নেওয়ার আগে সকলকে বিচার করে নিতে হবে যে, শাসন মানতে প্রস্তুত কিনা।
এখন আমরা বিচার করি দিব্য জ্ঞানটি তাহলে কি? দিব্য জ্ঞান মানে হচ্ছে ‘কৃষ্ণতত্ত্বজ্ঞান’। কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় জ্ঞান হচ্ছে দিব্য জ্ঞান। আর কৃষ্ণ সম্বন্ধীয় জ্ঞান মানে–কৃষ্ণের রূপ সম্বন্ধীয় জ্ঞান, কৃষ্ণের গুণ সম্বন্ধীয় জ্ঞান, কৃষ্ণের লীলা সম্বন্ধীয় জ্ঞান, কৃষ্ণের ধাম সম্বন্ধীয় জ্ঞান, কৃষ্ণের পার্ষদ সম্বন্ধীয় জ্ঞান, কৃষ্ণের ভক্ত সম্বন্ধীয় জ্ঞান, কৃষ্ণের পরিকর সম্বন্ধীয় জ্ঞান। এগুলিই হচ্ছে দিব্য জ্ঞান। এগুলি জড় জগতের বিষয় নয় এগুলি চিজ্জগতের বিষয় এবং চিজ্জগতের যা কিছু বিষয় তা হচ্ছে দিব্য জ্ঞান।
এই জড় জগতের জ্ঞানটি জড়জ্ঞান বা অজ্ঞান, কিন্তু প্রকৃত জ্ঞান কি? তা হল ভগবদ্তত্ত্ব জ্ঞান। সেই জ্ঞানটি লাভ করার পর সে জ্ঞানটির যখন উপলব্ধি সেটি হল বিজ্ঞান বা বিশেষ জ্ঞান। কৃষ্ণ কে? তা আমরা Theoretically জানলাম কিন্তু practically উপলব্ধি ছাড়া ততক্ষণ পর্যন্ত সেটি কেবল জ্ঞান, কিন্তু যখন সেই দিব্য জ্ঞান হৃদয়ে প্রকাশিত হয় তখন সেটিকে বলা হয় বিজ্ঞান। যারা দীক্ষা লাভ করতে চায় তাদের সেই দিব্য জ্ঞান বা বিজ্ঞান প্রাপ্ত হবার প্রয়াসী হতে হবে। অতএব আমাদের বিচার করে দেখতে হবে এই যে দীক্ষা এটি কেবল মাত্র একটি অনুষ্ঠান নয়।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits