পরমেশ্বর ভগবান জন্মরহিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অন্তরঙ্গা শক্তির দ্বারা তিনি কপিল মুনি রূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সমগ্র মানব জাতির কল্যাণার্থে দিব্যজ্ঞান প্রদান করার জন্যই তিনি অবতীর্ণ হয়েছিলেন। (ভাঃ ৩/২৫/১)
কর্দম মুনি বৈরাগ্য অবলম্বন করে যখন বনে গমন করেছিলেন, তখন তাঁর পুত্ররূপে কপিলমুনি তাঁর মাতা দেবহূতি (কর্দমমুনির পত্নী)-র প্রসন্নাত্মা বিধানের জন্য বিন্দু-সরোবরের তীরে অবস্থান করেন।
পিতার অনুপস্থিতিতে বয়স্ক পুত্রের মায়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করে তাঁর যথাসাধ্য সেবা করা কর্তব্য, যাতে তিনি পতির বিচ্ছেদ অনুভব না করেন, আর বয়স্ক পুত্র তাঁর পত্নী এবং গৃহস্থালির দায়িত্বভার গ্রহণ করতে সক্ষম হওয়া মাত্রই পতির কর্তব্য গৃহত্যাগ করা। এটাই বৈদিক গার্হস্থ্য জীবনের সমাজবিজ্ঞান সম্মত প্রথা। মৃত্যুর সময় পর্যন্ত–গৃহের ব্যাপারে নিরন্তর যুক্ত থাকা কোনও মানুষের উচিত নয়।
যেহেতু দেবহূতির পতি কর্দমমুনি গৃহত্যাগ করেছিলেন, তাই দেবহূতি তাঁর উপযুক্ত পুত্র কপিলদেবের সৎ উপদেশ শ্রবণ করে দুশ্চিন্তার কবল থেকে ত্রান পেতে চেষ্টা করতেন।
কপিল মুনিকে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অবতার বলে স্বীকার করা হয়। চিন্ময় জ্ঞানরূপী সূর্য-স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের সাক্ষাৎ প্রকাশ হলেন কপিলমুনি (ভাগবত ৩/২৫/৯)। সূর্য যেমন বিশ্বের অন্ধকার দূর করে, তেমনই পরমেশ্বর ভগবানের আলোক যখন এইভাবে অবতার রূপে নেমে আসে, তখনই মায়ার অন্ধকার দূর হয়ে যায়। আমাদের চোখ রয়েছে, কিন্তু সূর্যের কিরণ না থাকলে আমাদের চোখের কোনই মূল্য নেই। তেমনই, পরমেশ্বর ভগবানের আলোক ছাড়া বা সদ্গুরুর কৃপা ছাড়া পারমার্থিক জীবনের কোন বস্তুই আমরা যথার্যথভাবে লাভ করতে পারি না।
দেবহূতির কাছে ভগবদ্ভক্তির ব্যাখ্যা (ভাগবত ৩/২৯ অধ্যায়) প্রসঙ্গে ভগবান কপিলদেব বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি নিজের এবং অন্যের মধ্যে অণুমাত্রও ভিন্ন দর্শণ করে, মৃত্যুর প্রজ্জ্বলিত অগ্নিরূপে আমি তার মহাভয় উৎপন্ন করি।” (শ্লোক ২৬)
সমস্ত প্রকার জীবের মধ্যে নানা প্রকার দৈহিক পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু ভক্তের পক্ষে সেই পার্থক্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জীবের মধ্যে ভেদভাব দর্শন করা উচিত নয়, ভক্তের কর্তব্য সর্বপ্রকার জীবের মধ্যে আত্মা এবং পরমাত্মাকে সমানভাবে অবস্থিত দর্শন করা।
অতএব, দান, সম্মান, ও মৈত্রীপূর্ণ আচরণের দ্বারা সমস্ত জীবকে সম দৃষ্টিতে দর্শন করে, সমস্ত জীবের আত্মার স্বরূপে বিরাজমান ভগবানের পূজা করা উচিত।
ভগবান কপিলদেব তাঁর মাতা দেবহূতিকে তাই পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, যারা ভিন্নদৃশঃ অর্থাৎ ভেদদর্শী, যারা আপন এবং পর এই ভেদ দর্শন করে, তারা মায়াবদ্ধ জীব। যারা মায়ামুক্ত জীব, তাদের জীবন দর্শন “ঈশাবাস্যামিদম্ সর্বম্।” সব কিছুই ভগবান শ্রীকৃষ্ণের এবং তাঁর সঙ্গেই সব কিছু সম্পর্কিত। তাই তাদের দৃষ্টিতে কোনও ভেদভাব থাকে না।
যেমন, একটি পরিবারের বিভিন্ন সদস্যরা তাদের পরিবারগোষ্ঠীর পক্ষে যেটা ভাল, সকলেই সেই উদ্দেশ্যে কাজকর্ম করে, নিজেদের মধ্যে তারা কেউ কোনও ভেদ দর্শন করে না। সকলেই তারা বোঝে প্রত্যেকেই আপনজন। পরিবারের কেউ অনেক টাকা রোজগার করলে অন্যেরাও আনন্দ লাভ করে। কারণ সকলেরই তাতে ভাগ আছে, প্রত্যেকেরই তা থেকে কিছু না কিছু লাভ হয়।
কিন্তু যারা ভেদ দর্শন করে, তাদের মধ্যে অপর কেউ প্রচুর ধনসম্পত্তি লাভ করলে অন্য জনের মনে হয়–‘ওঃ ঐ লোকটার এত টাকা, আর আমার কিছু লাভ হল না!’ তেমনি আপনজন কষ্ট পেলেও আমরা তো কষ্ট পাই–ভাবি, কেমন করে তাকে নিষ্কৃতি দিতে পারি।
শ্রীল অভয়চরণাবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ তাঁর প্রাঞ্জল জ্ঞানগর্ভ ভাগবত-ভাষ্যে (৩/২৯/২৬) তাৎপর্য বর্ণনা করে লিখেছেন, সমস্ত প্রকার জীবের মধ্যে নানাবিধ দৈহিক পার্থক্য রয়েছে, কিন্তু ভক্তের পক্ষে সেই পার্থক্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন জীবের মধ্যে ভেদভাব দর্শন করা উচিত নয়, ভক্তের কর্তব্য সর্বপ্রকার জীবের মধ্যে আত্মা এবং পরমাত্মাকে সমানভাবে অবস্থিত দর্শন করা। অর্থাৎ, দৃষ্টি থেকে ভেদভাব দূর হয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে চিন্ময়ত্বের লক্ষণ। জড়ত্বের লক্ষণ হল–যত বেশি জড়মুখী হব, ভেদভাব তত বেড়ে যাবে, বিভেদ বিসম্বাদ ততই দেখা দেবে সমাজে।
যেমন, কিছুদিন আগেও ভারতবর্ষ এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলিতেও যৌথ পরিবার ছিল-এক-একটা পরিবারে ১০০-২০০ জন করে সদস্য মিলেমিশে বিরাট পরিবারগোষ্ঠীর মতো বসবাস করত। তার আগে একটা পুরো গ্রামই একটা পরিবারগোষ্ঠীর মতো থাকত এবং সেই পরিবারের নামেই গ্রামটি পরিচিতি লাভ করত। সেই গ্রামের সকলের সুখ-দুঃখে সকলেরই সহানুভূতি জাগত। কিংবা গোটা দেশটাই রাজাকে কেন্দ্র করে নিজেদের একই পরিবারভুক্ত বলে মনে করত। অবশেষে ভগবানকে কেন্দ্র করে সারা বিশ্বটাই একটি বিশ্বপরিবার হয়ে উঠেছিল পুরাকালে।
অর্থাৎ “বসুধৈব কুটুম্বকম্”–এই যে, ‘বসুধা’ বা বসুন্ধরা অর্থাৎ পৃথিবী–এই সারা পৃথিবীটাই একটা কুটুম্ব, একটা পরিবার বলে বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে মানুষকে শেখানো হয়েছিল–আজকের দিনে সমাজবিজ্ঞানী তথা আধুনিক রাজনীতিবিদেরা যাকে ‘ওয়ান ওয়ার্লড’ থিয়োরি নাম দিয়ে যেন নতুন কিছু তত্ত্ব শোনাচ্ছেন বলে মনে করছেন।
এইভাবে দেখা যায়, ভারতীয় সনাতন মানবধর্মে “বসুধৈব কুটুম্বকম্” ভাবধারা অনুযায়ী, পৃথিবীর সকলেই একটা বিরাট পরিবারের মতো, আত্মীয় কুটুম্বের মতোই নিবিড় প্রীতিমূলক আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ রয়েছে–সেখানে সকলেই সকলের সাথে ভালবাসার সূত্রে সুসম্পর্কিত।
কেবল মানুষের ক্ষেত্রেই নয়, পশুপাখি গাছপালা কীটপতঙ্গ–সকলেই পরস্পরের সঙ্গে প্রীতির বন্ধনে সম্পর্কিত, এই কথা ভাবতে শেখানো হয়েছে ভারতীয় বৈদিক শাস্ত্রসম্ভারে। ভগবানই এমনভাবে এই পৃথিবীটাকে সৃষ্টি করেছেন। একটু মনোনিবেশ সহকারে ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে ভাবলেই আমরা সেটা দেখতে পাই।
কারণ সকলেই ভগবানের বিভিন্ন অংশ, তাই সেই বিবেচনাতেও আমরা সকলের সঙ্গে পারস্পারিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে সম্পর্কিত। আপাতদৃষ্টিতে দেখতে পাই–চলমান পশু পাখি কীটপতঙ্গের কথা ছেড়ে দিলেও–নিশ্চল গাছপালাদের সাথেও আমাদের জীবনধারা কতরকমে সম্পর্কিত হয়ে রয়েছে। যখন আমরা শ্বাস গ্রহণ করছি, তখন অক্সিজেন নিচ্ছি, আবার শ্বাস ছাড়ার সময় কার্বনডায়অক্সাইড ছাড়ছি–সেটি গাছেরা গ্রহণ করে নিচ্ছে এবং তার বদলে তারা অক্সিজেন ছেড়ে দিচ্ছে। ভগবানই তো গাছপালাগুলিকে এমন বিস্ময়কর কলাকৌশলে তৈরী করে দিয়েছেন।
এইভাবে পরম পিতা শ্রীকৃষ্ণের সন্তান সন্ততিরূপে, তাঁর অবিচ্ছেদ্য বিভিন্নাংশরূপে সকল জীব চিরকালের মতো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত। কৃষ্ণ-সম্পর্ক না দেখলেও, ব্যক্তিগত সম্পর্ক বিচারেও গাছপালারা আমাদের কুটুম্ব। এইভাবে সারা পৃথিবী বাস্তবিকই একটা বিরাট পরিবার।
কিন্তু মানুষ যখন পরমেশ্বর ভগবান তথা পরম পিতা শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যায়, তখন তারা এই সম্পর্কের কথাও ভুলে যায়। আর যত বেশি তারা দূরে সরে যায় এই আধ্যাত্মিক সম্পর্ক বোধ থেকে, ততই ‘আপন’ ভাবটি হারিয়ে ফেলে।
তাই কলিযুগে আমরা দেখতে পাচ্ছি, বসুধার কথা ছেড়ে দিলেও, রাজ্য বা গ্রামের কুটুম্বতার কথা ছেড়ে দিলেও, একটা গৃহে সংসারেই একত্রে মানুষ থাকতে পারছে না-ছেলেরা বড় হয়ে বৃদ্ধ মা-বাবাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, তাদের কোনই কৃতজ্ঞতা বোধ নেই। মা-বাবা তাদের কত কষ্ট করে বড় করে তুলেছে, সেই কথা ভুলে গিয়ে ভিন্ন হয়ে বসবাস করছে। তারপরে, যে-স্ত্রীকে নিয়ে সুখে ঘর বাঁধবে বলে বৃদ্ধ মা-বাবাকে ছেড়ে চলে এসেছিল, একদিন সেই স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
ভগবানের প্রতি বিমুখ হলেই এই ধরনের ভিন্ন দর্শন জাগে। ভগবৎ-বিমুখতা মানেই জড় জগতের অস্থায়ী সুখের প্রতি আসক্ত। আমরা যতি বেশি জড় সুখান্বেষী হব, ততই ভেদভাব বাড়বে।
তাই শ্রীমদ্ভাগবতে (৩/২৯/২৬) ভগবান কপিলদেবের উপদেশ লিপিবদ্ধ হয়েছে যে, মানুষ যখন নিজের এবং অন্যের মধ্যে অণুমাত্রও ভিন্ন দর্শন করে, তখন মৃত্যুর প্রজ্বলিত অগ্নিরূপে ভগবান তার হৃদয়ে মহাভয় উৎপন্ন করেন।
অর্থাৎ যারা জড় জগতের সুখ আহরণের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে, তারা তাদের জড় দেহটাকে স্বরূপ বলে মনে করছে এবং তারা ভুলে যাচ্ছে যে, একটা দিন তাদের ঐ দেহটাকে ছেড়ে চলে যেতেই হবে। যেহেতু তারা ঐ জড় দেহের সুখান্বেষণে অত্যন্ত আসক্ত, তাই তারা মৃত্যুকেও অত্যন্ত ভয় করে।
কিন্তু যাঁরা ভক্ত হয়েছেন, ভগবানের শরণাগত হয়েছেন, ভগবানকে নিত্য স্মরণ না করে কোন কাজই করেন না, তাঁরা ভালভাবেই উপলব্ধি করতে পারেন যে, জড় দেহটি জীবের স্বরূপ নয়। দেহটির নিরন্তর পরিবর্তন হচ্ছে–কৌমার, যৌবন ও জরার শেষে দেহান্তর হবেই হবে। তবু সেই পাঁচ বছরের শিশু আমি এবং আজকের আমি স্বরূপত একই ব্যক্তি তাই যাঁরা ধীর, তত্ত্বজ্ঞানী, তাঁরা এই ব্যাপারে বিন্দুমাত্র মুহ্যমান হন না। পুরনো কাপড় ফেলে দিয়ে যেমন নতুন কাপড় পরতে হয়–ফেলে দেওয়া মানে মৃত্যু–তেমনি দেহ জীর্ণ হয়ে গেলে সেটি ত্যাগ করতেই হবে।
পুরনো কাপড় ত্যাগ করে নতুন কাপড় পেলে যেমন লোকে আনন্দ উপভোগ করে, তেমনি যাঁদের স্বরূপ জ্ঞান লাভ হয়েছে, তাঁরা কখনই জন্ম-মৃত্যুর ব্যাপারে দুঃখিত হন না। যার জন্ম হয়েছে, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। সেজন্য অনুশোচনার কোনই কারণ নেই। যাঁরা ভগবৎ তত্ত্ববেত্তা, তাঁদের এই জ্ঞানের স্ফুরণ ঘটে, তাঁরা তাই মৃত্যুভয়ে যেমন ভীত হন না, তেমনি কাউকে ভিন্ন দর্শনও করেন না।
জড় জগতের অস্থায়ী যশ প্রতিপত্তির লোভে মানুষের মধ্যে ঈর্ষাবোধ জাগ্রত হলে, জড় সুখের আকাক্সক্ষায় অত্যধিক লালায়িত হলে, ভয় জাগে বুঝি কেউ প্রাপ্তিযোগে বিঘ্ন ঘটাবে। তখন ভিন্ন বোধ জাগে, মহাভয়ে কাতর হয়ে আত্মরক্ষার জন্য মানুষ বৃথা চেষ্টা করতে থাকে।
অতএব, দান, সম্মান এবং সহনশীল মৈত্রীপূর্ণ আচরণের দ্বারা পৃথিবীর তথা সমাজের সমস্ত জীব, সমস্ত সম্প্রদায়, সমস্ত আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশীকে সম দৃষ্টিতে দর্শন করার শিক্ষা লাভ করতে হয় এবং সমস্ত জীবের আত্মার স্বরূপে বিরাজমান শ্রীভগবানের পূজা করা উচিত। (ভাঃ ৩/২৯/২৭)
ভগবানের আরাধনার মাধ্যমেই এই দর্শন শিক্ষা সহজে লাভ করা যায়। যার এই শিক্ষা লাভ হয়নি, সে মৃত্যুভয়ে সদাসর্বদা ভীত হয়ে থাকে–এই উপদেশ ভাগবতে স্বয়ং ভগবান কপিলদেব অবতাররূপে মানব সমাজকে দিয়ে গেছেন।
যারা এই সৎ উপদেশ লাভ করবার সুযোগ পায়নি, তারাই মৃত্যুকে ভয় পায়, তারা বলে, “মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে।” কিন্তু যতই এই ধরনের কবিতায় ভাব বিন্যাস করা হোক, মরতে হবেই–মরতে চাই না বলে ভয় পেলে বুঝতে হবে–ভগবানের উপদেশ তার কানে ঢোকেনি। অথচ বহু জড় সাহিত্য এই কবিতাংশটি অনেকের বেশ ভাল লাগে যদিও এই কাব্যিক ছত্রটির অন্তর্নিহিত ভাবার্থ কোনও যথার্থ জ্ঞানের পরিচয় মোটেই বহন করে না।
কারণ ‘মরিতে চাহিনা’ যে বলে, সে মরণকে ভয় পায়, অতএব অবশ্যই সে ভগবৎ-বিমুখ। অবশ্য, অধিকাংশ মানুষই তাই। আর ‘সুন্দর ভুবনে’ কথাটিও অলীক বর্ণনা। শাস্ত্রমতে বাস্তবিকই এই ভুবনটি হল ‘দুঃখালয়ম্ অশাশ্বতম্’। দুঃখময় আলয় এবং অশাশ্বত অর্থাৎ অনিত্য অস্থায়ী এই পৃথিবীকে ‘সুন্দর’ বলেন যে কবি, তিনি মানুষকে বৃথাই বিভ্রান্ত করেন, তা অবশ্যই বলতে হবে। এই সমস্ত সারতত্ত্ব ভালভাবে বুঝতে হলে উপযুক্ত জ্ঞানীর কাছে গীতা ভাগবতের কথা শুনতে হয় এবং নিত্য ভগবানের নামকীর্তন করতে হয়। এই শিক্ষা আমাদের সমাজে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। নচেৎ হানাহানি ভেদাভেদ পৃথিবীতে কমবে না। সকলের আত্মাকে ব্যষ্টি আত্মারূপে পরমেশ্বর ভগবানের সম্পর্কজ্ঞানে উপলব্ধি করা উচিত। ভাগবতে (৩/২৯/২৭) ব্যষ্টি আত্মার পূজা করার বিধি বর্ণনা করা হয়েছে সুস্পষ্টভাবে। বলা হয়েছে, অর্হযেৎ দানমানাভ্যাস্ মৈত্রা অভিন্নেব চক্ষুষা। অর্থাৎ দান এবং সম্মান প্রদানের মাধ্যমে সকলের হৃদয়ে বিরাজমান ভগবানকে ভেদভাবরহিত হয়ে এবং মিত্রতামূলক আচরণের মাধ্যমে পূজা তথা শ্রদ্ধাভক্তি নিবেদন করা উচিত।
ভাগবতের এই অংশে দুটি সংস্কৃত শব্দ রয়েছে–দান এবং মান। যারা জাগতিক অথবা আর্থিক অবস্থায় আমাদের থেকে নিকৃষ্ট, তাদের দান করতে হয়। মান অর্থাৎ সম্মান উৎকৃষ্টকে দেওয়া উচিত। দান নিকৃষ্টকে দিতে হয়। এইভাবে সমাজের ভেদাভেদ দূর করার জন্য সমতা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে সার্থক সুন্দর পদ্ধতিতে।