শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু সব সময়ে একটা লাঠি হাতে করে থাকতেন, এবং কলির প্রভাব ধ্বংস করতেন। সেই জন্যই তো তিনি এসেছিলেন। কৃষ্ণভাবনার যে কল্পবৃক্ষ, শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হচ্ছেন তার কান্ড স্বরূপ। আমি প্রার্থনা করি যেন আমি তাঁর ভজনা করতে পারি। ঠিক যেমন গাছের সমস্ত ভারটাই কান্ডের ওপরে নির্ভরশীল, তেমনি সমস্ত জীবের কৃষ্ণভাবনা কৃষ্ণপ্রেম নির্ভর করে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর ওপর। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা ব্যতীত আমরা শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের কৃপা লাভ করতে পারি না এবং এই শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণ হচ্ছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু–শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণের মিলিত রূপ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে যেতে হলে আমাদের যেতে হবে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মাধ্যমে। সেটা খুব সুন্দরভাবে বর্ণনা করছেন শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামী।
শ্রীল রঘুনাথ দাস গোস্বামী শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কাছে গিয়েছিলেন। মহাপ্রভু বৃন্দাবনে যাচ্ছিলেন এবং তখন শ্রীঅদ্বৈত আচার্য প্রভুর বাড়িতে থেমেছিলেন। সন্ন্যাস নেওয়ার পর তিনি বৃন্দাবন অভিমুখে যাচ্ছিলেন। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে ভুল পথে চালালেন, নিয়ে গেলেন গঙ্গার তীরে এবং বার্তা পাঠিয়েছিলেন শ্রীঅদ্বৈত আচার্যকে যে, তাঁরা যেন গঙ্গার ধারে এসে মহাপ্রভুকে নিয়ে যান, শুকনো কাপড় যেন নিয়ে আসেন। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তখন মহাপ্রভুকে বললেন, এই গঙ্গা হচ্ছে যমুনা। এইভাবে মহাপ্রভুকে ভুল পথে নিয়ে গিয়ে নবদ্বীপে নিয়ে এসেছিলেন। তিন দিন ধরে মহাপ্রভু হাঁটছিলেন বৃন্দাবনের দিকে কিন্তু কোন অগ্রগতি হয়নি। তিনি যদি আট মাইল যেতেন তো ৮ মাইল আবার পিছিয়ে আসতেন, এইভাবে এগিয়ে পিছিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে গঙ্গা তীরে নিয়ে আসেন।
মহাপ্রভু গঙ্গাকে যমুনা বলে মনে করছেন, তিনি ভাবলেন তিনি বৃন্দাবন পৌছে গেলেন। আর যমুনা ভেবে তিনি নদীর জলে ঝাঁপ দিয়েছেন; তারপর শ্রীঅদ্বৈত আচার্য নৌকা করে এসেছেন; মহাপ্রভু তাঁকে দেখে বললেন, আরে, তুমি এখানে বৃন্দাবনে এলে কি করে!
শ্রীঅদ্বৈত আচার্য মহাপ্রভুকে বললেন, তুমি যেখানে থাকবে, সেটাই তো বৃন্দাবন।
তখন মহাপ্রভু বুঝতে পারলেন–তিনি বৃন্দাবনে যাননি, তিনি নবদ্বীপেই আছেন শান্তিপুরের অপর পাড়ে আছেন।
তাই শ্রীঅদ্বৈত আচার্য প্রভুর বাড়িতে নিয়ে আসা হল তাঁকে। সেই খবর ছড়িয়ে পড়ল যে, মহাপ্রভু এসেছেন এবং এই খবর নবদ্বীপে পৌঁছে গেল, চন্দ্রশেখরের মাধ্যমে, আর সমস্ত ভক্তরা এলেন মহাপ্রভুকে দর্শন করতে, শচীমাতাও গেলেন।
সেই সময়ে সপ্তগ্রামের রাজপুত্র রঘুনাথ দাস গোস্বামী হরিদাস ঠাকুরের কৃপায় মহান ভক্ত হয়ে গেছেন মহাপ্রভুর। তিনি মহাপ্রভুর কাছে এলেন এবং তাঁর অভিলাষ প্রকাশ করলেন যে, তিনি মহাপ্রভুর সঙ্গে যাবেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁকে তিরস্কার করে বললেন, না, ঐভাবে মর্কট-বৈরাগ্য প্রকাশ করো না, ঘরে ফিরে যাও এবং গৃহস্থালিতে মন দাও।
তখন রঘুনাথ দাস গোস্বামী ঘরে ফিরে গেলেন। তার কয়েক বছর পর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা লাভ করলেন। যখন শ্রীনিত্যান্দ প্রভু পানিহাটিতে ছিলেন, শ্রীরঘুনাথ গোস্বামী তখন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। শ্রীরঘুনাথ গোস্বামী তখন যুবক, আর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু তাঁকে বললেন, ‘তুমি চোর, তোমাকে দন্ড দেব।’ কেন তাঁকে চোর বললেন, কেন দন্ড দেবেন? কারণ, মহাপ্রভু হচ্ছেন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর সম্পত্তি। কিন্তু রঘুনাথ দাস গোস্বামী নিত্যানন্দ প্রভুর অনুমোদন ব্যতীতই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সেবা অনুরাগী হয়েছিলেন।
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হচ্ছেন আদি গুরু, তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে পেতে হলে তাঁর প্রতিনিধি শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মাধ্যমে পেতে হবে। তিনি হচ্ছেন সদ্গুরু। যদি কেউ শ্রীকিৃষ্ণ সান্নিধ্য পেতে চায় সদ্গুরুর আশীর্বাদ ব্যতীতই– তা হলে সে-ই চোর।
এখন শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামী নিত্যানন্দ প্রভুর কাছে গেলেন, তিনি দন্ড দেবেন বললেন। দন্ড অন্য কিছু নয়, বরং তার কৃপা। সেই কৃপা কৃষ্ণপ্রাপ্তির উপায় শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে পাওয়ার উপায়। শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা না হলে আমরা কখনও শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণকে বা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে পেতে পারি না। যেহেতু শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হচ্ছেন আদি গুরু, তাই আবার বলা হচ্ছে সদ্গুরুর কৃপা ব্যতীত শ্রীশ্রীরাধাকৃষ্ণকে বা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে আমরা পেতে পারি না।
তাই শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু রঘুনাথ দাস গোস্বামীকে এই দন্ড দিলেন যে, সে যেন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর সমস্ত পার্ষদের চিড়া আর দধি ভক্ষণ করায়, মহোৎসব করায়। এখনও পর্যন্ত প্রতি বছর সেই উৎসব হয় পানিহাটিতে–সেই লীলা স্মরণ করবার জন্য আমরা এই উৎসব পালন করি। সেইদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চিড়া দই ফল দিয়ে বিভিন্ন মিষ্টান্ন মিশিয়ে প্রসাদ বিতরণ করা হয়। তিরিশ থেকে চল্লিশ হাজার মানুষকে সেদিন এই প্রসাদ বিতরণ করা হয়।
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা লাভ করার পর শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামী যোগ্য হলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে লাভ করতে। তখন তিনি শ্রীজগন্নাথপুরীতে গেলেন। আর এই সময়ে মহাপ্রভু তাঁকে গ্রহণ করলেন। স্বরূপ দামোদরের হাতে অর্পণ করলেন–এইভাবে তাঁকে গ্রহণ করলেন। শ্রীরঘুনাথ দাস গোস্বামী শ্রীস্বরূপ দামোদরের সম্পত্তি হলেন। শ্রীরঘুনাথ গোস্বামী হচ্ছেন স্বরূপের রঘুনাথ। শ্রীচৈতন্যদেবের লীলায় শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু হচ্ছেন প্রধান ব্যক্তিত্ব যাঁর মাধ্যমে মহাপ্রভু কৃষ্ণভাবনা বিতরণ করেছিলেন।
শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু একটা খাল খুঁড়েছিলেন। কারণ, দিব্য প্রেমের যে সমুদ্র কৃপাসিন্ধু– তা বন্ধ হয়েছিল। সমুদ্রের জল তো আমরা ভাগ করতে পারি না। যদি একটা খাল কেটে নিয়ে আসা যায়, তবে সেই সুযোগ নেওয়া যায়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সবসময়ে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর সঙ্গে আলোচনা করতেন। তিনি শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুকে জিজ্ঞেস করতেন, কিভাবে এই কলিযুগের পতিতদের উদ্ধার করা যায়। আর শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ইচ্ছা পূরণ করতে দ্বারে দ্বারে গিয়ে আমন্ত্রণ করতেন যে, অনুগ্রহ করে কৃষ্ণভাবনা গ্রহণ কর, ভিক্ষা করতেন যে, কৃষ্ণনাম হরিনাম কর।
শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুর নিত্যানন্দ প্রভুর সেই লীলা বর্ণণা করেছেন–শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু দ্বারে দ্বারে যেতেন আর অনুরোধ করতেন, হরিণাম কর, তা হলে আমি দায়িত্ব নেব যাতে তুমি এই জড় জগতের সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে পার। এই রকম বলতে বলতে তাঁর বাহুযুগল উত্তোলন করে যেতেন।
“যারে দেখে তারে কহে দন্তে তৃণ ধরি।
আমারে কিনিয়া লও, ভজ গৌরহরি ॥ ”
‘তুমি যদি গৌরহরির ভজনা কর, তা হলে আমি তোমার ক্রীতদাস হয়ে যাব।’ কী অপূর্ব ধরনের শর্ত তিনি দিয়েছেন–ভগবান নিজে বলছেন আমাদের ক্রীতদাস হয়ে যাবেন শুধুমাত্র যদি আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর নাম উচ্চারণ করি, মহামন্ত্র জপ করি। এই বলে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু ভূমিতে গড়াগড়ি যেতেন যেন সোনার পর্বত ধুলায় লুটাচ্ছে। এই ধরনের কৃপালু ছিলেন শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু হচ্ছেন মহাবদান্য অবতার। তাঁর যে কৃপা বিতরণ তা প্রকাশিত হয় শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর মাধ্যমে। শ্রীনিত্যানন্দ-ত্রয়োদশীতে তাঁর আবির্ভাব তিথিতে আমরা যদি নিষ্ঠা সহকারে শ্রীনিত্যানন্দ প্রভুর কৃপা প্রার্থনা করি, তা হলে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু খুব খুশি হবেন আমাদের ওপরে এবং আমরা সহজেই মহাপ্রভুর কৃপা লাভ করতে পারি।