ব্রহ্মচর্য পালনের সুফল

শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত আছে কিভাবে শুক্রাচার্যের অভিশাপে রাজা যযাতি অকাল বার্ধক্যে উপনীত হতে বাধ্য হয়েছিলেন।
যযাতি ছিলেন খুব প্রভাবশালী রাজা। একবার দৈত্যরাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা তার সখীদের সঙ্গে জলক্রীড়া করে উঠে পোশাক পরার সময়ে সখীদের সঙ্গে পোশক বদলাবদলি হয়ে যায়। শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী আর শর্মিষ্ঠা একে অপরের পোশাক পরে ফেলে। দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য ছিলেন দৈত্যরাজা বৃষপর্বার পরামর্শদাতা।
দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য পারমার্থিক প্রগতি সংক্রান্ত পরামর্শ দেন না, যেটা হচ্ছে গুরুর মূল কর্তব্য। “যেই কৃষ্ণ তত্ত্ববেত্তা সেই গুরু হয়”–গুরুর কাজই হচ্ছে, কিভাবে ভক্ত হওয়া যায় সেই উপদেশ দান করা।
আবার ‘গুরু’ শব্দটির আর একটি অর্থ হচ্ছে শিক্ষক, সুতরাং যে কোনও শিক্ষকই এক প্রকার গুরু হন।
শুক্রাচার্য দৈত্যদের শিক্ষা দেন কিভাবে জাগতিক ভোগবিলাস আরও উন্নতি করা যায়, যদিও গুরুর কাজ এটা নয়। এই কারনেই বলী মহারাজ শুক্রাচার্যকে পরিত্যাগ করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল যে, যখন কোনও গুরু জানেন না করনীয় বা অকরনীয় কি এবং অনুচিত আচরণে শিষ্যকে ভুল পথে চালিত করেন–তখন সেই গুরুকে ত্যাগ করা উচিত। অধ্যাত্মিক উচ্চপদ থেকে যিনি পতিত হয়েছেন, তিনি–‘পরিত্যাজ্যঃ’–এটাই শাস্ত্রীয় বিধি।
বৃষপর্বা রাজার কন্যা শর্মিষ্ঠা এবং শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানীর পোশাক যখন তাড়াহুড়োতে বদলাবদলি হয়ে যায়–শর্মিষ্ঠা ক্রুদ্ধ হয়ে দেবযানীর গায়ে তার রাজকন্যার পোশাক দেখে। রাজার কন্যা হয়ে তার মধ্যে রজোগুণের প্রাবল্য ছিল এবং এই জাতির লোকেরা চট করে রেগে ওঠে।
শর্মিষ্ঠা তখন অপ্রিয় ভাষা ব্যবহার করে বলতে লাগল–‘আমার পিতা তোমার পিতাকে পালন করেন, ঠিক যেমন পোষা কুকুর তার প্রভুর দ্বারা পালিত হয়, আর তুমি আমার পোষাক পরার স্পর্ধা করো?’ এবং দেবযানীকে ধাক্কা মেরে একটি শুকনো কুয়োয় ফেলে দিয়েছিল। সেখানে দেবযানী কাঁদছিল।
ব্রাহ্মণ কন্যা হওয়ার ফলে তারও দৃঢ় অহমবোধ ছিল। সেই সময়ে রাজা যযাতি বনের মধ্যে শিকারে যাচ্ছিলেন। এক নারীর কান্না শুনে খুঁজে দেখলেন কুয়োর মধ্যে একটি অর্ধ বস্ত্রাবৃত মেয়ে পড়ে আছে।
তিনি তাকে উদ্ধার করলেন। এবং যেহেতু বৈদিক কালে অনুশাসন ছিল যে, যদি কোন পুরুষ কেন রমণীর হাত ধরা অবধিও স্পর্শ করে, তা হলে এই বোঝাত যে, সে রমণী বিবাহিত। সুতরাং রাজা যযাতি দেবযানীকে গ্রহণ করলেন।
ভীষ্মদেবের ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা ঘটেছিল। ভীষ্ম একবার কাশীরাজের তিন কন্যা অম্বা, অম্বিকা, অম্বালিকাকে তাদের হাত ধরে টেনে রথে তোলেন। অথচ অম্বা ছিল শল্য রাজার প্রণয়বদ্ধা। ভীষ্ম উপস্থিত হয়েছিলেন এই তিন রাজকন্যার স্বয়ংবর সভায় যেখানে তারা তাদের স্বামীদের মনোনয়ন করবে। সেখানে ভীষ্ম ঘোষণা করেন যে তাঁর ভাই বিচিত্রবীর্যই এদের বিবাহ করবে কারণ শীঘ্রই সে মহিষীসহ সিংহাসনে বসতে চলেছে। কিন্তু যেহেতু বৈমাত্রেয় ভাই বিচিত্রবীর্য খুব ছোট, তাই ভীষ্মদেব নিজে এসেছেন ভাইয়ের হয়ে তিনি রাজকন্যাকে দাবী করতে–এরা তাঁর ভাই এবং পরিবারের উপযুক্ত হবে।
অম্বা তখন এসে জানিয়েছিল যে, সে শল্যকে তার হৃদয়দান করে ফেলেছে। ভীষ্ম তা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। কিন্তু অম্বা যখন শল্যের কাছে গেল, শল্য অপমানিত বোধ করল এবং সেখানে উপস্থিত সমস্ত রাজাদের সাথে ভীষ্মের যুদ্ধ হলো।
ভীষ্ম একাই সবাইকে পরাজিত করেন। অম্বা যখন এসে শল্যকে বলে যে, সে আসলে শল্যকেই বিবাহ করতে চেয়েছিল এবং সেজন্যই ভীষ্ম তাকে যেতে দিয়েছে, তখন শল্য খুব সুন্দর একটা কথা বলেছিলেন–যে, সিংহ কখনও অন্য কোনও জন্তুর দ্বারা নিহত প্রাণী নিজের আহার হিসাবে গ্রহণ করে না। কেবলমাত্র শিয়াল, কুকুর এবং হায়নারাই সিংহের দ্বারা নিহত পশুর মাংস খেয়ে থাকে। সিংহ নিজের শিকার নিজেই করে।
শল্য জানাল যে, ভীষ্ম অম্বাকে দাবী করে, এখন তার কাছে ফেরত পাঠিয়ে উপকার করা দেখাচ্ছেন–‘আমি তোমাকে গ্রহণ করব না।’ অম্বা এই কথা শুনে ভীষ্মদেবের কাছে ফিরে আসতে ভীষ্ম জানালেন তিনি আজীবন ব্রহ্মচর্য পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তিনি তা ভঙ্গ করতে পারেন না।
সুতরাং এইভাবে ভীষ্ম অম্বাকে অস্বীকার করেছিলেন যদিও তাঁর উচিত ছিল তাকে গ্রহণ করা যেহেতু তিনি অম্বাকে হাত ধরে তুলেছিলেন।
সেই রকমই, রাজা যযাতি দেবযানীকে কুয়ো থেকে হাত ধরে টেনে তোলে এবং সে স্নান থেকে উঠে প্রায় অনাবৃত ছিল এবং এটি আরও একটি বিবেচ্য বিষয়–কোন সতী রমণী কখনও স্বামী ছাড়া অন্য কারো সামনে বস্ত্র ত্যাগ করে না। সুতরাং এই বিচারেও বলা যায়, যাযাতিই দেবযানীর স্বামী হয়েছিল।
তাই দেবযানী যযাতির কাছে আবেদন করল তাকে গ্রহণ করার জন্য। কিন্তু অনুমতি নেওয়া দরকার। তাই তারা শুক্রাচার্যের কাছে গেল। রীতি হচ্ছে–নিম্নবর্ণের কোনও পুরুষ উচ্চবর্ণের কোনও নারীকে বিবাহ করতে পারে না কারণ উচ্চবর্ণের নারীকে মাতৃস্বরূপা জ্ঞান করা হয়। দেবযানী ছিল উচ্চবর্ণের এবং রাজা যযাতি ক্ষত্রিয় রাজা হওয়ায় ব্রাহ্মণের চেয়ে নিম্নবর্ণের ছিল। কিন্তু শুক্রাচার্য রাজী হন একটি ভিত্তিতে।
শর্মিষ্ঠা যখন দেবযানীকে অপমান করে আঘাত দেয়, শুক্রাচার্য তা জানতে পেরে রাজ্য ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন। শুক্রাচার্য চলে যাওয়ায় রাজা বৃষপর্বা সঙ্কটে পড়েন এবং তিনি গিয়ে শুক্রাচার্যকে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু শুক্রচার্য আসতে রাজী হন একটা শর্তে যে, শর্মিষ্ঠা তাঁর কন্যা দেবযানীর পরিচারিকা হয়ে থাকবে।
রাজা যযাজি যখন দেবযানীকে বিবাহ করেন, শুক্রাচার্য তাঁকে উপদেশ দিয়েছিলেন, যযাতি যেন কখনও শর্মিষ্ঠার প্রতি হীনদৃষ্টি না দেন এবং তার সাথে শারীরিক সম্পর্ক না রাখেন। কারণ শুক্রাচার্য জানতেন, শর্মিষ্ঠা রাজার কন্যা হওয়ায় অত্যন্ত সুন্দরী ছিল এবং যযাজি স্বাভাবিকভাবে তার প্রতি আকৃষ্ট হতেই পারেন।
কিন্তু সময় যেতে, শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী তার পিতার কাছে ফিরে আসে এবং যা ঘটেছে তার বিবরণ দেয়। শুক্রাচার্য তখন যযাজিকে অভিশাপ দেন যে, যেহেতু তিনি তাঁর সতর্কবাণী উপেক্ষা করেছেন, তিনি অকাল বার্ধক্য প্রাপ্ত হবেন এবং তার ফলে রাজা যযাজি বুড়ো হয়ে যান।
যযাজি শুক্রচার্যের কাছে মিনতি জানান এই অভিশাপ তুলে নেবার জন্য। শুক্রাচার্য বলেন, যা দিয়ে ফেলেছি তা ফেরানো যায় না, তবে যদি তোমার কোনও পুত্র তোমার বার্ধক্য গ্রহণ করে তা হলে তুমি মুক্ত হবে।
ভাগবতের এই অংশে এই ঘটনাটিই বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, রাজা যযাতি তাঁর পাঁচ পুত্রের কাছে প্রস্তাব রাখেন। প্রথম চারজন রাজী হয়নি। কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র তার বাবার বার্ধক্য গ্রহণ করতে সম্মত হয় এবং যদিও পুরু ছিল এক অল্প বয়স্ক বালক, সে তখন বৃদ্ধ হয়ে যায়।
এই কাহিনীর তাৎপর্য এই যে, সময় বা জরার কন্যাই হলো বার্ধক্য, নাম কালকন্যা। সময় আমাদের বৃদ্ধা হতে বাধ্য করে। এই কালকন্যা জীবকে বা কাহিনীর পুরঞ্জনকে মোহিত করে।
এই প্রসঙ্গে আর একটি বিবরণ আছে। সময়ের এই কন্যা, কালকন্যা একবার নারদ মুনিকে বিবাহ করতে চায়। কিন্তু নারদ মুনি তাকে ফিরিয়ে দেন, ফলে নারদ মুনি একটি বরদান প্রাপ্ত হন যে, তিনি কোন দিন বৃদ্ধ হবেন না।
এই থেকে ব্রহ্মচর্যের গুরুত্বও নির্দিষ্ট হয়। যখন কেউ ‘সময়’– এর প্রভাবকে প্রত্যাখ্যান করে, বা প্রলোভনকে জয় করে তখন সময় তার প্রভাব সেই ব্যক্তির ওপর রাখতে পারে না।
এখানে আমরা ভীষ্মদেবের ব্রহ্মচর্যের দৃঢ়তাও তুলনা করতে পারি। তাঁর বাবার ইচ্ছা পূরণার্থে ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন তিনি কখনও বিবাহ করবেন না। এজন্য পিতা শান্তনুর কাছে ভীষ্ম ইচ্ছামৃত্যুর বরদান পেয়েছিলেন।
দেখা যাচ্ছে, যখন কেউ ব্রহ্মচর্য, সংযম পালন করে চলে, তখন সে কালের প্রভাবের শিকার হয় না। তার দেহত্যাগ মর্মান্তিক হয় না। সে মরতে বাধ্য হয় না। কিন্তু সুক্ষ্মতর গুণাবলী তার আয়ত্তে আসে–সুতীক্ষ্ম স্মৃতি, বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ইত্যাদি। ব্রহ্মচর্য পালনের সুফল এমনই সুদূরপ্রসারী।
শুধু ব্রহ্মচারীই নয়, পারমার্থিক পথে গৃহস্থরাও ব্রহ্মচর্যের সুফলের অধিকারী হতে পারে। গ্রহস্থরাও যখন কেবলমাত্র প্রজন্ম প্রসারণের উদ্দেশ্যেই মিলিত হয় তখন তা করা হয় এক কর্তব্য পালনের মনোভাব এবং এইভাবে যারা আচরণ করে তারাও একপ্রকার ব্রহ্মচারী।
সুতরাং আধ্যাত্মিক জীবনে সে ব্রহ্মচারী হোক বা গৃহস্থ হোক বা বানপ্রস্থী বা সন্ন্যাসী–সকলেরই উদ্দেশ্য তার জীবনীশক্তিকে ঊর্ধ্বমুখী, পরমার্থমুখী করে পরিচালিত করা। জড়মুখী করে জীবনীশক্তিকে চালিত করলে তা ক্ষয় হয়ে যায় এবং জীবনীশক্তিবিহীন জীব স্বভাবতই মৃতের সমান।
পুরঞ্জনের কাহিনীর ক্ষেত্রে আমরা দেখি যে, সে কেবলই ভোগ করতে চেয়েছিল। তার ফলে যবনরাজের আক্রমনে সে পড়ে। এই যবনরাজেরই সহচরী হচ্ছে কালকন্যা–সময় বা কালের কন্যা। সে যখন পুরঞ্জনকে আলিঙ্গন করে, পুরঞ্জনের সমস্ত জীবনীশক্তি লোপ পায়।
মানবরূপ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য আছে–ভগবানের নাম কীর্তন মাধ্যমে নিজেদের উন্নত করা এক অসামান্য সুযোগ। অন্যান্য জীবজন্তু কেবল দেহকেই যথাসর্বস্ব বোঝে–খাওয়া, ঘুম, আত্মরক্ষা, মৈথুন। মানব দেহ পেলে এসবের ঊর্ধ্বে উঠে কৃষ্ণভাবনাযুক্ত হওয়ার সুযোগ মেলে। কিংবা তারও আগে আসে ‘অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা’– নিজের সম্বন্ধে জানা, পারমার্থিক বিষয়ে জিজ্ঞাসা, আমি কি, আমার করণীয় কি। এই কৌতূহলই কৃষ্ণ-সম্বন্ধীয় জ্ঞানে পৌছে দেয় যদি একজন সদ্গুরুর দ্বারা চালিত হওয়া যায়।
সুতরাং সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে যে, মানব-জীবন পেলে, একজন সদ্গুরুর সন্ধান করা আবশ্যক, যিনি সেই পারমার্থিক গন্তব্যে পথ দেখাতে পারেন। সেটাই অমরত্ব লাভ। তা না হলে, দেহকে ভোগ করিয়ে দেহকে নষ্ট করা হবে। আত্মার বিনাশ নেই।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits