অহংকার বল দর্প কাম ক্রোধ ইত্যাদির বশবর্তী হয়ে আসুরিকভাবাপন্ন ব্যক্তিরা তাদের এবং অন্যের দেহে যে ভগবান রয়েছেন সেই ভগবানের প্রতি বিদ্বেষ পরায়ণ হয়। সকলের দেহেই ভগবান পরমাত্মারূপে বিরাজমান।
ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি।
গীতায় ভগবান বলছেন তিনি প্রতিটি জীবের হৃদয়ে পরমাত্মারূপে বিরাজ করছেন। “সর্বভূতানাম্” সমস্ত ভূতে অর্থাৎ সমস্ত জীবে ভগবান পরমাত্মারূপে বিরাজমান। কিন্তু এই শ্লোকে বলা হচ্ছে যে যারা আসুরিক ভাবাপন্ন তারা সেকথা বুঝতে না পেরে পরস্পরের প্রতি ও ভগবানের প্রতি বিদ্বেষ পরায়ন হয় এবং প্রকৃত ধর্মের নিন্দা করে। প্রকৃত ধর্ম শব্দটির অর্থ হচ্ছে ভগবানকে ভালোবাসার যে স্বাভাবিক প্রবণতা প্রতিটি জীবের মধ্যে রয়েছে সেটা প্রকাশ করা। ধর্ম মানে কতকগুলি আচার-আচরণ ও সংস্কারের অনুসরণ নয়। ধর্মের অর্থ হচ্ছে আমাদের সকলের হৃদয়ে যে ভালোবাসার প্রবৃত্তি রয়েছে সেই প্রবৃত্তিটিকে যথার্থ বস্তুতে অর্পণ করা। সকলেরই হৃদয়ে ভালোবাসার প্রবণতা রয়েছে। সকলেই কাউকে না কাউকে ভালোবাসতে চায়, কিন্তু সেই ভালোবাসার বস্তুটি কি? এই যে আমাদের হৃদয়ে প্রেম রয়েছে, সেই প্রেমের আস্পদ কি? প্রেমাস্পদ কি? সেই সকলের প্রেমাস্পদ হচ্ছেন ভগবান। এখন এই যে ভগবানকে ভালোবাসার যে স্বাভাবিক বৃত্তি সেই বৃত্তিটির ঠিকানাকে বলা হয় ধর্ম। ভগবানকে ভালোবাসা হচ্ছে আমাদের ধর্ম। কিন্তু আমরা যদি ভগবানকে ভাল না বেসে তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পরায়ণ হই তা হলে সেটি হচ্ছে প্রকৃত ধর্মের বিরুদ্ধাচরণ। প্রকৃত ধর্ম হচ্ছে ভগবানকে ভালোবাসা। আর আমি যদি ভগবানকে ভালো না বেসে বিদ্বেষপরায়ণ হই, ভগবানকে না মানি, ভগবানকে ত্যাগ করি, তাহলে তা হচ্ছে প্রকৃত ধর্ম থেকে বিচ্যুত হওয়া। আসুরিক ভাব। সুর এবং অসুর এই দুটি শব্দ রয়েছে। অসুরদের পরিণতি কি হয় সেটা ভগবান ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন। অসুর কারা? “অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং চ সংশ্রিতাঃ।”
অহংকার শব্দটি হচ্ছে আমাদের বিকৃত পরিচয়। আমাদের প্রকৃত পরিচয় কি?
জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্য দাস।
আমাদের প্রকৃত স্বরপ হচ্ছে আমরা কৃষ্ণের প্রকৃত দাস বা নিত্য সেবক। এখন সেই প্রকৃত স্বরূপটি যখন বিকৃত হয়ে যায় তখন তাকে বলা হয় অহংকার। আমার স্বরূপ সম্বন্ধে প্রত্যেকের যে একটা ধারণা যে আমি কৃষ্ণের দাস না হয়ে যদি মায়ার উপর প্রভুত্ব করার বা আধিপত্য করার চেষ্টা করি বা জড় জগৎকে ভোগ করার চেষ্টা করি সেইটি হচ্ছে অহংকার। এটা আমাদের ভ্রান্ত পরিচিতি। আমার প্রকৃত পরিচয় একটা বিকৃত পরিচয়কে প্রকাশ করে বা বিকৃত পরিচয় স্থাপন করে।
বলং শক্তি–এই শক্তি কি? প্রকৃতপক্ষে আমাদের কোন শক্তি নেই। জীবের কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই। কিন্তু ভগবানের কৃপায় জীব পরম শক্তিমান, তাঁর শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জীব কিছু করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। এখন এই যে বল, সেটি আমার বল নয়। আমার যা কিছু ক্ষমতা তা ভগবানের কৃপার প্রকাশ। কিন্তু সেটা না বুঝে আমরা মনে করি আমি তাত্যন্ত বলবান, আমার অনেক ক্ষমতা আছে, এবং আমি অনেক কিছু করতে পারি। সেই ক্ষমতা দিয়ে আমি কি করব? আমি এই জগৎটিকে ভাল করে ভোগ করব। সেই যে প্রবণতা সেইটিই হচ্ছে বলের বিকৃত প্রকাশ।
দর্পঃ আমার অনেক ক্ষমতা রয়েছে, আমি অনেক কিছু করতে পারি। আমার মনের মধ্যে একটা অভিমান আছে। সেটি হচ্ছে দর্প।
কামঃ কাম শব্দটির অর্থ কি? জড়জগৎকে ভোগ করার বাসনা।
আত্মেন্দ্রিয়-প্রীতিবাঞ্ছা তারে বলি কাম।
কৃষ্ণেন্দ্রিয়-প্রীতিইচ্ছা ধরে প্রেম নাম ॥
অর্থাৎ, কাম শব্দটির অর্থ হল–নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির বাসনা। নিজের ইন্দ্রিয়তৃপ্তি অর্থাৎ জড়জগৎকে ভোগ করে ইন্দ্রিয় তর্পণের দ্বারা যে সুখ ভোগের চেষ্টা সেটাকে বলা হয় কাম। অর্থাৎ নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধনের যে প্রবণতা সেটি হচ্ছে কাম, আর কৃষ্ণের ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধনের যে চেষ্টা সেটি হচ্ছে প্রেম। সাধারণত এই জড় জগতে কামকে প্রেম বলে মনে করে। এই জড় জগতে প্রকৃতপক্ষে প্রেম নেই। রয়েছে কাম। ভগবানকে ভালবাসার যে প্রবণতা সেটাই হচ্ছে প্রেম। কিন্তু নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধনের যে চেষ্টা সেটাই এই জগতে প্রেম বলে প্রচারিত হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে সেটি প্রেম নয়। শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত গ্রন্থে এইভাবে ব্যাখ্যা করেছেনঃ
কৃষ্ণের ইন্দ্রিয়ের প্রীতি সাধনের যে চেষ্টা সেটিকে বলা হয় প্রেম। কাম ও প্রেমের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে।
কাম অন্ধতম আর প্রেম নির্মল ভাস্কর।
কাম আমাদের অন্ধকারের গভীরতম জায়গায় নিয়ে যায়। আর প্রেম নির্মল সূর্যের মতো। সূর্য যখন ওঠে তখন কি অন্ধকার থাকে? ঠিক তেমনই কৃষ্ণরূপে যখন সূর্যের উদয় হয়, কৃষ্ণের প্রেম যখন হৃদয়ে প্রকাশিত হয় তখন সমস্ত অন্ধকার দূর হয়ে যায়। বেদে বলা হয়েছে যে, “তমসো মা জ্যোতির্গময়।”
অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আলোকে যাও, সেই অন্ধকারটি হচ্ছে কামের অন্ধকার। আর সেই আলোকটি হল কৃষ্ণপ্রেমের আলোক। যতই আমরা কৃষ্ণের কাছে যাব ততই অজ্ঞানের অন্ধকার দূর হয়ে যাবে এবং তত বেশি করে কৃষ্ণপ্রেমের আলোকে এবং দিব্যজ্ঞানের আলোকে আমাদের হৃদয় আলোকিত হবে।
কৃষ্ণ–সূর্যসম; মায়া হয় অন্ধকার।
যাঁহা কৃষ্ণ তাঁহা নাহি মায়ার অধিকার ॥
কৃষ্ণ হচ্ছেন সূর্যের মতো আর মায়া হচ্ছে অন্ধকার। মায়া কি? এই জড় জগতকে বাস্তব বলে যে সুখভোগ করার চেষ্টা সেটি হচ্ছে মায়া। মায়া শব্দটির দুটি বিশ্লেষণ হয়, একটি ‘মা’ অপরটি ‘য়া’। মা মানে না’ আর য়া মানে ‘যা’। অর্থাৎ যা নয়, যে বস্তুটি প্রকৃতপক্ষে তা নয় সেই বস্তুটিকে অন্য আর একটি বস্তু বলে মেনে করাকে বলা হয় মায়া। যেমন মরুভূমিতে জল নেই, কিন্তু মরীচিকা দেখে মনে হয় যেন সেটা জল। এখন মরীচিকার পেছনে ছুটলে আমাদের তৃষ্ণার প্রকোপ কখনও নিবৃত্ত হবে না। এই জড় জগতে তেমনি সুখ নেই, আনন্দ নেই, কিন্তু আমরা সকলে সেই আনন্দ পাওয়ার জন্য ছুটছি। এই জড় জগতে আনন্দের অন্বেষণ করে কখনও আনন্দ পাওয়া যায় না। মনে হয় এখাানে আনন্দ আছে, কিন্ত প্রকৃতপক্ষে তা নেই। অতএব সেটি মায়া। মায়ার আর একটি সংজ্ঞা হচ্ছে “মিয়তে অনয়াঃ।” “মিয়তেঃ মানে মাপার চেষ্টা। এখানে সকলে কি করছে? আর ইন্দ্রিয়ের দ্বারা মাপার চেষ্টা করছে। সব কিছুকে তার ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য করে সেটিকে গ্রহণ করে তার মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করার চেষ্টা করছে। সেটি হচ্ছে মায়া। আবার মায়ার আর একটি বিশ্লেষণ হচ্ছে– মায়া হল কৃষ্ণের অনুপস্থিতি। যেমন সূর্যের অনুপস্থিতিতে অন্ধকার। আলোকের অনুপস্থিতিতে অন্ধকার। অন্ধকারের প্রকৃতপক্ষে কোন সত্তা নেই, কিন্তু যেখানে আলোকের অভাব সেখানটাই অন্ধকার। আলোক যখন আসে তখন অন্ধকার থাকে না। তাই কৃষ্ণ বৈমুখ্য হচ্ছে মায়া।
কৃষ্ণ-বহির্মুখ হইয়া ভোগবাঞ্ছা করে।
নিকটস্থ মায়া তারে জাপটিয়া ধরে ॥
পিশাচি পাইলে যেমন মতিচ্ছন্ন হয়
মায়ামুগ্ধ জীবের হয় সে ভাব উদয় ॥
কৃষ্ণ-ভুলি’ সেই জীব অনাদি বহির্মুখ
অতএব মায়া তারে দেয় সংসার দুখ ॥
কৃষ্ণ-বহির্মুখ হলেই মায়া আসবে। কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে মায়ার প্রকাশ।
যখন আমরা কৃষ্ণকে ভুলে থাকি তখন আমাদের নিকটস্থ মায়া জাপটিয়া ধরে। মায়ার কাজ কি? মায়ার কাজ হচ্ছে জীবকে দন্ড দেওয়া। মহামায়া কৃষ্ণ-বহির্মুখ জীবকে দন্ড দিচ্ছে। মহামায়া দুর্গাদেবী কি করছেন? মহিষাসুরকে মর্দন করছেন। কি দিয়ে? ত্রিশুল। ত্রিতাপ দুঃখ। আধি আত্মিক, আধি দৈবিক ও আধি ভৌতিক এই ত্রিতাপ দুঃখে জীবকে বা মহিষাসুরকে তিনি সংহার করছেন। এইভাবে মায়া জীবদের দন্ডদান করছেন মায়ার বিশ্লেষণ আর একভাবে করা যায়। অর্থাৎ মায়া কি? সেটি আমরা এইভাবে বুঝতে পারি। সূর্যের উল্টোদিকে মুখ করে দাঁড়ালে তখন আমরা কি দেখতে পাই? আমাদের ছায়াটাকে দেখতে পাই তাহলে এই ছায়াটা কে সৃষ্টি করেছে? আমরা সৃষ্টি করেছি। সূর্যের অভাব যেখানে অন্ধকার সেখানে, সেইটিই হচ্ছে ছায়া। কিন্তু আমি আমার মুখটা যদি ঘুরিয়ে সূর্যের দিকে দেখি তখন কি আর ছয়াটা দেখতে পাব? ঠিক তেমনই কৃষ্ণ-বিমুখ হলে মায়া জীবকে প্রভাবিত করে।
দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে ॥
কৃষ্ণ বলছেন, এটি আমার মায়া এবং গুণময়ী মানে ত্রিগুনাত্মিকা আর সত্ত্ব, রজ ও তম এই তিনগুণ সমন্বিতা। এখন এই যে ত্রিগুণাত্মিকা মায়া, দৈবী এবং কৃষ্ণের মায়া তাকে অতিক্রম করা অসম্ভব। মামেব যে প্রপদ্যন্তে। “প্রপদ্যন্তে” মানে–আমাতে যে প্রপত্তি করে। সেই এই মায়া অনায়াসে উত্তীর্ণ হয়ে যেতে পারে।
কৃষ্ণের শরণাগত হলে তখন আর এই মায়া থাকবে না। যিনি মহাময়ারূপে আমাদের দন্ড দিচ্ছিলেন সেই মায়া তখন যোগমায়া রূপে আমাদের কৃষ্ণলীলায় প্রবেশ করাবেন। মায়া অসুরদের প্রতি এক রকম আচরণ করেন। আর ভক্তদের প্রতি আর এক রকম আচরণ করবেন। যেমন পুলিশ, একই পুলিশ চোরগুলিকে দন্ড দেয়, আর চোরেরা পুলিশকে দেখতে ভয়ে পালায়। খুব ভয় পায়। আর যে সাধু অর্থাৎ সৎ ব্যক্তি সে যখন বিপদে পড়ে তখন সেই পুলিশ এসে তাকে সাহায্য করে। একই পুলিশ দুই রকম মনাভাবের জন্য, দুই রকম প্রবৃত্তির জন্য দুই রকম আচরণ করে। কারোর কাছে সে শত্রু এবং কারোর কাছে সে বন্ধু। অতএব জীব যখন কৃষ্ণ- উন্মুখ হয় তখন সেই মায়াই জীবকে কৃষ্ণের কাছে নিয়ে যায়। যোগমায়ার রূপে তিনি কৃষ্ণের লীলায় জীবকে প্রবেশ করার অধিকার প্রদান করেন। সেই যোগমায়া বৃন্দাবন লীলায় হচ্ছেন পৌর্ণমাসী। যেমন নাটক যখন হয় তখন পরিচালক সমস্ত নাটকের ব্যবস্থাপনা করেন। ঠিক তেমনই যোগমায়া কৃষ্ণের সমস্ত লীলার আয়োজন করেন। কে কোন ভূমিকায় অভিনয় করবে সে সমস্ত ব্যবস্থা যোগমায়া করেন। পৌর্ণমাসী সেই অয়োজন করেন। এইভাবে জীব যখন কৃষ্ণ-উন্মুখ হয় তখন তার সমস্ত দুঃখ-দুর্র্দশার নিবৃত্তি হয়। জীব যতক্ষণ কৃষ্ণ-বিমুখ থাকে ততক্ষনই তার অশান্তি, দুখ-দুর্র্দশা থাকে। জীব যখন নিজের ইচ্ছায় কিংবা অসৎ প্রবৃত্তির জন্য কৃষ্ণ-বহির্মুখ হয়, তখন সেইটিকে বলা হয় আসুরিক প্রবৃত্তি। এগুলি পরে কৃষ্ণ বর্ণনা করছেন। পরের শ্লোকে কৃষ্ণ বলছেন–
তানহং দ্বিষতঃ ক্রূরান্ সংসারেষু নরাধমান্।
ক্ষিপাম্যজস্রমশুভানাসুরীষ্বেব যোনিষু ॥ (১৬/১৯)
“সেই বিদ্বেষী, ক্রূর ও নরাধমদের আমি এই সংসারেই অশুভ আসুরী যোনিতে অবিরত নিক্ষেপ করি।”
আসুরীং যোনমাপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি
মামপ্রাপ্যৈব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম্ ॥ (১৬/২০)
“হে কৌন্তেয়! জন্মে জন্মে অসুরযোনি প্রাপ্ত হয়ে, সেই মূঢ় ব্যক্তিরা আমাকে লাভ করতে অক্ষম হয়ে তার থেকেও অধম গতি প্রাপ্ত হয়।”
অতএব এখন আমাদের উপর নির্ভর করছে অামরা অসুর হব, না কৃষ্ণভক্ত হব। আমরা যদি কৃষ্ণ-উন্মুখ হই, তাহলে আমরা কৃষ্ণভক্ত হতে পারব। আর আমরা যদি কৃষ্ণ-বিমুখ হই তাহলে অসুর হয়ে যাব। কেউ কি অসুর হতে চায়? কেউ চায় না। কিন্তু প্রবৃত্তি অনুসারে কেউ না চাইলেও সে অসুর হয়ে যায়।
ভগবান ভগবদ্গীতা দিয়েছেন আমাদেরই প্রকৃত মঙ্গল সাধনের জন্য। এই জ্ঞান দিয়ে তিনি আমাদেরই পরম কল্যাণ সাধন করেছেন। তিনি বলেছেন কেন তোমরা এই জড় জগতে দুঃখ পাচ্ছ। অনায়াসে তোমরা ফিরে আসতে পার। সে উপায়টি কি ?
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবমাত্মানং মৎপরায়ণঃ ॥ (৯/৩৪)
আসুরিক ভাবাপন্ন মানুষেরা সর্বদাই ভগবানের মহত্বের বিরোধিতা করে এবং তারা শাস্ত্রের নির্দেশ পালন করতে চায় না। শাস্ত্র এবং পরম পুরুষোত্তম ভগবান উভয়র প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ। তাদের কথিত জড় প্রতিষ্ঠা, তাদের সর্ঞ্চিত সম্পদ, তাদের শক্তি-সামর্থ এগুলিই হচ্ছে তাদের এই মনোভাবের কারণ। তারা জানে না যে তাদের এই জীবনটি পরবর্তী জীবনকে গড়ে তোলার এক মহান সুযোগ। সেটি না জেনে তারা অন্য সকলের প্রতি এবং প্রকৃতপক্ষে নিজেদের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়। সে অপরের শরীরের প্রতি হিংস্র আচরণ করে এবং তাদের নিজেদের শরীরের প্রতিও হিংস্র আচরণ করে। তারা পরম নিয়ন্তা পরমেশ্বর ভগবানের কোন উপকার করেন না। কারণ তাদের কোন জ্ঞান নেই। শাস্ত্র ও ভগবানের প্রতি ঈর্ষাপরায়ন হয়ে তারা ভগবানের অস্তিত্বের জন্য নানা রকম কপট প্রমানের অবতারণা করে এবং শাস্ত্রের নির্দেশ খন্ডন করার চেষ্টা করে। তারা মনে করে যে সব রকম কর্ম করার শক্তি ও স্বাধীনতা তাদের রয়েছে। তারা মনে করে যেহেতু শক্তি সামর্থ্য বিদ্যায় কেউই তাদের সমকক্ষ নয়। তাই তাদের যা ইচ্ছা তাই করে। তাতে কেউই তাদের বাধা দিতে পারবে না। তাদের কোন শত্রু যদি ইন্দ্রিয় ভোগার্থে বাধা দিতে চেষ্টা করে, তখন তারা তাকে সমূলে বিনাশ করে। এইটি আসুরিক মনোভাবের পরিচয়।