হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা ॥
“বিবাদ ও শঠতায় পরিপূর্ণ এই কলিযুগে মুক্তিলাভের একমাত্র উপায় হচ্ছে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র সংকীর্তন করা। এ ছাড়া আর কোন গতি নাই, এ ছাড়া আর কেন গতি নাই, এ ছাড়া আর কেন গতি নাই।”
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বৃহন্নারদীয় পুরাণ থেকে এই শ্লোকটি উদ্ধৃত করে বলেছেন যে, এই কলিযুগে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন করা ছাড়া পরমার্থ লাভের আর কোন উপায় নেই। অন্যান্য অনেক আধ্যাত্মিক পন্থা আছে যেগুলি পারমার্থিক উন্নতির সহায়ক, কিন্তু এই কলিযুগে সেগুলি কার্যকরী নয়। “নাস্ত্যেব” কথাটির অর্থ হচ্ছে–আর কোন গতি নাই। এই শব্দটি পরপর তিনবার ব্যবহার করে আর যে কোন গতি নেই সেটির উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ধ্যান, যজ্ঞ ও বিগ্রহ অর্চন এই পারমার্থিক কর্মগুলি ফলপ্রসূ হয় যখন তার সঙ্গে ভগবানের দিব্যনাম কীর্তন করা হয়। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর বলেছেন যে, বিগ্রহ অর্চনের মাধ্যমে হৃদয় নির্মল হয়, যদি সেই সঙ্গে কীর্তন করা হয়, কারণ এটি আমাদেরকে ভগবানের সাথে সরাসরি যুক্ত করে। আামাদের জড় দৃষ্টিতে বিগ্রহকে যেমন কাঠ, পাথর অথবা ধাতুর মতো মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে তেমনটি নয়। বিগ্রহ সম্পূর্ণ চিন্ময় এবং ভগবান থেকে অভিন্ন।
আমরা দেখতে পাই যে, ভগবানের দিব্যনাম কতই না গুরুত্বপূর্ণ, যা সঙ্গে না থাকলে অন্যান্য পারমার্থিক পন্থাগুলি কার্যকরী হয় না। যখন আমরা মহামন্ত্র কীর্তন করি, তখন অন্যান্য পারমার্থিক কর্মগুলির প্রয়োজন হয় না। তাই “হরের্নাম হরের্নাম হরের্নাম”–এভাবেই তিনবার বলা হয়েছে–ভগবানের দিব্যনাম, ভগবানের দিব্যনাম, ভগবানের দিব্যনাম কীর্তনই একমাত্র পন্থা। আর কোন গতি নাই, আর কোন গতি নাই, আর কোন গতি নাই।
শ্রীল প্রভুপাদ মহামন্ত্র কীর্তন সম্পর্কে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তাঁর মূলনীতি ছিল–‘হরেকৃষ্ণ’ কীর্তন করুন এবং ‘সুখী হউন’। সকলেই সুখী হতে চায়। আমরা সুখের জন্য কত রকমের পন্থার উদ্ভাবন করি, কিন্তু সুখী হওয়ার একমাত্র পন্থা হচ্ছে হরেকৃষ্ণ কীর্তন করা। জপ করার সময় আমাদের সুখে থাকার প্রয়াস করা বা অন্য কিছু পাওয়ার আশা করা উচিত নয়। ভক্তরা অর্থ উপার্জন অথবা জড় সুখভোগের পরিমাণ বৃদ্ধি করার জন্য আগ্রহী নন। তাঁরা ভগবানের দিব্যনামের উচ্চতর রস আস্বাদন করেন, ফলে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা জড় জগতের নিম্নতর রসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হন।
মানুষ অর্থের জন্য একে অপরকে হত্যা করে, কিন্তু যখন আমরা কৃষ্ণভাবনামৃতের রস আস্বাদন করি, তখন সেই অর্থের মূল্য গৌণ হয়ে যায়। যখন আমাদের কাছে কোন অর্থ আসে, সেটিকে আমরা কৃষ্ণের সেবায় লাগাই, কিন্তু অর্থ উপার্জনের জন্য আমাদের পথ থেকে সরে যাওয়া উচিত নয়। তাই উচ্চতর রস আস্বাদন করা গুরুত্বপূণ, যেটি হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তনের মাধ্যমে লাভ হয়ে থাকে।
যখন ভক্তরা পারমার্থিক জীবনের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, তখন আমাদের বুঝতে হবে যে, তারা জপ করা বন্ধ করে দিয়েছে। যদি কেউ নিষ্ঠা সহকারে জপ করতে থাকেন, তবে তিনি কখনই কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা ত্যাগ করতে পারেন না। যাঁরা নিষ্ঠা সহকারে ষোল মালা জপ করেন, তাঁরা যে কোন অবস্থায় থাকুক না কেন, তাঁরা পারমার্থিক অগ্রগতি লাভ করবেন। তাই অবহেলা না করে প্রত্যহ ষোল মালা জপ করা উচিত, যদি সম্ভব হয় সকালে জপ করাই ভাল।
সব সময় মনে রাখতে হবে, জপই হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেবা। অন্যান্য কর্মগুলি হচ্ছে গৌণ। ভগবানের দিব্যনাম ভগবান থেকে অভিন্ন। যখন আমরা শুদ্ধনাম জপ করব, তখন আমরা শুধু শ্রীকৃষ্ণকেই দর্শন করব না, বরং তাঁ লীলা, তাঁর পরিকর এবং তাঁর সমগ্র ধাম দর্শণ করতে পারব। আমরা এখানে এসেছি কৃষ্ণের সেবার জন্য, আর তাঁকে সেবা করার সর্বোচ্চ পন্থা হচ্ছে নিরাপরাধে তাঁর দিব্যনাম কীর্তন করা।
জপ তিন প্রকারঃ নাম অপরাধ–নাম-অপরাধ হচ্ছে দশবিধ। অপরাধযুক্ত নাম থেকে যদি মুক্ত না হওয়া যায়, তবে তা থেকে বৈষ্ণব অপরাধের প্রবণতা সৃষ্টি হয়, আর তার ফলে পরমার্থিক জীবন থেকে পতন ঘটায়।
যখন আমাদের হৃদয় কামনা-বাসনায় পূর্ণ থাকে, আর মুখে ‘হরেকৃষ্ণ’ জপ করছি, প্রকৃতপক্ষে তখন আমাদের হৃদয় বলছে, ‘ধনং দেহি, জনং দেহি’ অর্থাৎ ধন, জন, সুন্দরী স্ত্রী কামনা করছি। ভগবান আমাদের প্রার্থনায় সাড়া দেবেন, আর আমাদের জড় কামনা-বাসনা পূরণ করে দেবেন। নাম-অপরাধের ফলে ধর্ম, অর্থ ও কাম লাভ হয় তাই যখন নাম অপরাধের ফলে জড় জাগতিক সাফল্য লাভ হয়, তখন অমাদের অবশই সতর্ক থাকা উচিত যাতে করে সেগুলি আমাদেরকে কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা থেকে দূরে না নিয়ে যায়।
পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে যে, নাম-অপরাধ থেকে মুক্ত হওয়ার একমাত্র পন্থা হচ্ছে নিরন্তর জপ করা। সমস্ত প্রকার অপরাধ, এমন কি নাম প্রভুর চরণে যে অপরাধ তাও মুক্ত হওয়া যায় একমাত্র ভগবানের নামের আশ্রয় গ্রহণ করার মাধ্যমে।
নামাভাস–নামাভাসের ফলে মুক্তি লাভ হয়। অষ্টাঙ্গযোগীর মুক্তিলাভের আশায় যোগের মাধ্যমে এমন কি নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ করে দেন। এভাবেই কঠোর তপশ্চর্যার ফলে কদাচিৎ কেউ কেউ মুক্তি লাভ করেন। সেই একই মুক্তি লাভ হয় নামাভাসের ফলে ।
শুদ্ধনাম–শুদ্ধ নাম উচ্চারণের ফলে অপরাধ সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়। শুদ্ধ নাম কৃষ্ণপ্রেম দান করে, যা মুক্তির চেয়ে অনেক দূরের বস্তু। যখন কোন যুবক-যুবতী ভালবাসার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ে, তখন তারা যে আনন্দ লাভ করে, তা শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেমের বিকৃত ও ক্ষণিক প্রতিফলন মাত্র। কৃষ্ণপ্রেম হচ্ছে নিত্য অবর্ণনীয় পারমার্থিক আনন্দে নিমগ্ন হওয়া।
আমাদের সমস্ত চাওয়া-পাওয়া হরিনামের জন্য হওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় আমাদের কামনা থাকে জড়, তারপর আসে মুক্তি (জড়-জাগতিক দুঃখকষ্টের নিবৃত্তি)। আর মুক্তিকে অতিক্রম করার পর তখনই কেবল আমরা শুদ্ধ কৃষ্ণপ্রেমের স্তরে আসতে পারব। তই যে কোনও পরিস্থিতিতে কখনও জপ বন্ধ করা উচিত নয়। শ্রীল প্রভুপাদ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যদি আমরা শুধু ষোল মালা জপ ও চারটি নিয়ম পালন করি, তা হলে আমরা ভগবৎ-ধামে ফিরে যাব।