শ্রীমদ্ভাগবতে রাজা পুরঞ্জনের রূপক কাহিনীতে বলা হয়েছে, এক সময় ঐ রাজা তাঁর মহৎ ধনুক ও অক্ষয় তূণীর গ্রহণ করে এবং স্বর্ণনির্মিত বর্মে সজ্জিত হয়ে, একাদশ সেনাপতি সহ পাঁচটি দ্রুতগামী অশ্বচালিত রথে পঞ্চগ্রন্থ নামে একটি বনে গিয়েছিলেন মৃগয়ার উদ্দেশ্যে।
সেই রথে তিনি দুটি বিস্ফোরক বাণ তাঁর সঙ্গে নিয়েছিলেন। সেই রথটির দুটি চক্র এবং একটি ঘূর্ণায়মান অক্ষ ছিল। সেই রথে তিনটি পতাকা, একটি রজ্জু, একটি সারথি, একটি উপবেশন স্থান, জোয়াল লাগানোর দুটি দন্ড, পাঁচটি অস্ত্র এবং সাতটি আবরণ ছিল। সেই রথের গতি ছিল পঞ্চবিধ, এবং তার সামনে পাঁচটি বাধা ছিল। সেই রথের সমস্ত সাজসজ্জা ও অলঙ্করণ স্বর্ণনির্মিত ছিল।
শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই রূপক বর্ণনাটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, জীবের জড় দেহটি জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। দেহটি হচ্ছে রথ, এবং জীবাত্মা সেই রথের রথী। সেই কথা বিশ্লেষণ করে ভগবদ্গীতায় (২/১৩) বলা হয়েছে–দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে। দেহের যিনি মালিক তাঁকে বলা হয় দেহী, এবং তিনি দেহের অভ্যন্তরে হৃদয়ে অবস্থান করেন। জীবের সেই দেহরূপ রথটি পরিচালিত হয় একজন সারথির দ্বারা। সেই রথটি তিনটি গুণের দ্বারা নির্মিত হয়, যে সম্বন্ধে ভগবদ্গীতায় (১৮/৬১) বলা হয়েছে–যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া। ‘যন্ত্র’ শব্দটির অর্থ ‘শকট’। এই যন্ত্র বা দেহটি জড়া প্রকৃতি প্রদান করেছে, এবং সেই রথের সারথি হচ্ছেন পরমাত্মা। সেই রথের রথী হচ্ছে জীবাত্মা। এটিই হচ্ছে বাস্তবিক অবস্থা।
জীব সর্বদাই সত্ত্ব, রজ, তম–এই ত্রিগুণের দ্বারা প্রভাবিত। সেই কথা ভগবদ্গীতায় (৭/১৩) প্রতিপন্ন হয়েছে।
ত্রিভির্গুণময়ৈর্ভাবৈঃ–জীব জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা বিমোহিত। এই তিনটি গুণকে রাজা পুরঞ্জনের রথের তিনটি পতাকা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। পতাকার মাধ্যমে বোঝা যায়–রথের মালিক কে, তেমনই প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে সহজেই বোঝা যায়–কোন্দিকে সেই রথটি চলছে। অর্থাৎ, যাঁর চোখ আছে, তিনি বুঝতে পারেন–প্রকৃতি কোন বিশেষ গুণের দ্বারা এই শরীর কোন্ দিকে চলেছে।
মানুষ ধার্মিক হতে চাইলেও তার দেহ তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। শ্রীনারদ মুনি মহারাজ প্রাচীন বর্হিষতের কাছে রাজা পুরঞ্জনের রূপক কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, রাজা যদিও আপাতদৃষ্টিতে অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন, তবুও তিনি কিভাবে তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন।
মৃগয়ার উদ্দেশ্যে রাজা পুরঞ্জনের বনগমন তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিভিন্ন প্রকার ইন্দ্রিয় সুখভোগের প্রচেষ্টার প্রতীক। জড় দেহটি স্বয়ং ইঙ্গিত করে যে, প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, জাগতিক বিষয় ভোগে জীব প্রবৃত্ত হয়ে রয়েছে।
দেহটি যখন তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখন ভবরোগ অত্যন্ত প্রবল হয়। যখন তা রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়, তখনও তার রোগটি বেশ কঠিন। কিন্তু, দেহ যখন সত্ত্বগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। তখন ভবরোগের উপশম হয়।
বৈদিক শাস্ত্রাদিতে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই সত্ত্বগুণের স্তরে অবস্থিত, কিন্তু এই জড় জগতে সত্ত্বগুণ কখনও কখনও রজ ও তমোগুণের দ্বারা কলুষিত হয়, তাই সাত্ত্বিক ভাবাপন্ন মানুষেরাও কখনও কখনও তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
রাজা পুরঞ্জনও তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মৃগয়ায় গিয়েছিলেন। তিনি যে বনে মৃগয়া করতে গিয়েছিলেন, তার নাম হচ্ছে পঞ্চপ্রস্থ। এই পঞ্চপ্রস্থ বনটি ইন্দ্রিয়ের পাঁচটি বিষয়কে ইঙ্গিত করে। দেহে রয়েছে হস্ত, পদ, উদর, পায়ু এবং উপস্থ–এই পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়। এই সমস্ত কর্মেন্দ্রিয়গুলির সাহায্যে দেহ এই জড়জাগতিক জীবন উপভোগ করে।
রাজা পুরঞ্জনের রথটি পাঁচটি অশ্বের দ্বারা চালিত। সেইগুলি হচ্ছে পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়ের রূপক বর্ণনা–চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক। এই সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলি অতি সহজেই বিষয় ভোগের দিকে আকৃষ্ট হয়। তাই, ভাগবতে বলা হয়েছে, রাজা পুরঞ্জনের রথের অশ্বগুলি অতি দ্রুতগামী।
রথে রাজা পুরঞ্জন দুটি বিষ্ফোরক অস্ত্র রেখেছেন, সেইগুলি হচ্ছে–অহংকার, অর্থাৎ ‘আমি এই শরীর’ এবং ‘মমতা’– অর্থাৎ ‘এই দেহের সম্পর্কিত সব কিছুই আমার।’
রথের চাকা দুটি হচ্ছে পাপ ও পুণ্য। রথটি তিনটি পতাকার দ্বারা সজ্জিত, যেগুলি প্রকৃতির তিনটি গুণের প্রতীক। পাঁচ প্রকার প্রতিবন্ধক হচ্ছে দেহাভ্যন্তরের পাঁচটি বায়ুর প্রতীক। সেইগুলি হচ্ছে–প্রাণ, অপান, উদান, সমান ও ব্যান। দেহটি সপ্ত আবরণের দ্বারা আচ্ছাদিত। সেই সাতটি আবরণ হচ্ছে–চর্ম, মাংস, মেদ, মজ্জা, রক্ত, অস্থি ও শুক্র। জীবন তিনটি সুক্ষ্ম জড় উপাদান এবং পাঁচটি জড় উপাদানের দ্বারা আবৃত। এইগুলি জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার পথে প্রতিবন্ধক।
শ্রীমদ্ভগবতে রাজা পুরঞ্জনের রথের বর্ণণায় যে রজ্জুর কথা আছে, সেটি মনকে ইঙ্গিত করে। রথের উপবেশনের স্থানটিকে ‘নীড়’ বলা হয়েছে–এই ‘নীড়’ শব্দটির দ্বারা পাখির বাসা বোঝায়–এখানে ‘নীড়’ মানে হৃদয় যেখানে জীবাত্মা এক স্থানে বসে থাকে। তার বন্ধনের কারণ হচ্ছে–শোক ও মোহ। এই জড় জগতে জীব সর্বদা এমন বস্তুর আকাক্সক্ষা করতে থাকে, যা সে কখনই পেতে পারে না। তাই সেটি হচ্ছে মোহ। এইভাবে মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় থাকা ফলে, জীব সর্বদা শোক করে। তাই শোক ও মোহকে শ্রীমদ্ভাগবতে রাজা পুরঞ্জনের রথের জোয়াল বাঁধার দুটি দন্ড রূপে বর্ণনা করা হয়েছে।
জীব পাঁচটি উপায়ের দ্বারা তার বিবিধ বাসনা চরিতার্থ করে, সেগুলি হচ্ছে পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়। স্বর্ণ, অলঙ্কার এবং শয্যা হচ্ছে জীবের রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার প্রতীক। যার কাছে প্রচুর ধনসম্পদ রয়েছে, সে বিশেষভাবে রজোগুণের দ্বারা পরিচালিত হয়। রজোগুণের দ্বারা পরিচালিত হয়ে মানুষ এই জড় জগতে কত কিছু ভোগ করতে বাসনা করে।
রাজা পুরঞ্জনের রূপক কাহিনীতে উল্লেখিত রাজার মৃগয়া গমনকালে এগারজন সেনাপতির তাৎপর্য হচ্ছে দেহের দশটি ইন্দ্রিয় এবং মন। মন সর্বদা দশজন সেনাপতির সঙ্গে পরিকল্পনা করে কিভাবে জড় জগৎকে উপভোগ করা যায়।
মৃগয়ার উদ্দেশ্যে রাজা, পুরঞ্জন যে পঞ্চপ্রস্থ বনে গিয়েছিলেন তার অন্য একটি তাৎপর্য এই যে, রূপ, রস, শব্দ, গন্ধ ও স্পর্শ–এই পাঁচটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মাধ্যম বা তন্মাত্র সমন্বিত বন।
এইভাবে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা থেকে মুক্তি পেতে হলে, শ্রীনারদ মুনির পরামর্শ মতো ভগবানের শরণ গ্রহণ করতে হবে। হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ কীর্তনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির পথে অগ্রসর হতে হবে।
এই রূপক কাহিনীর মাধ্যমে শ্রীনারাদ মুনি সসুস্পষ্টভাবে রাজা প্রাচীন বর্হিষৎকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, জড়জাগতিক বাসনা যথাসম্ভব সংযত করতে হলে ভগবদ্ভক্তির পন্থা গ্রহণ করতে হয়। সর্বদা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপা প্রার্থনা করতে হয় যেন তিনি অনুগ্রহণ করে মানুষের এই বাসনাবদ্ধ জীবনধারা থেকে মুক্ত হওয়ার শুভ চেতনা জাগরিত করেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে এইভাবে প্রার্থনা জানালে তিনি তাতে সাড়া দেন।
ভগবানের করুণালাভের একটি সহজ পন্থা হল ভক্তসঙ্গ। ভগবান সুযোগ করে রেখেছেন যাতে আমরা সদ্গুরুর সান্নিধ্য লাভ করতে পারি। ভগবানের কৃপায় এই সমস্ত সুযোগই মানুষের জীবনে আসে এবং বুদ্ধিমানের মতো শ্রদ্ধা সহকারে তা গ্রহণ করতে হয়। আমরা যদি যথার্থভাবে ভগবদ্ভক্তদের সঙ্গ সান্নিধ্য রক্ষা করে আমাদের জীবনধারা গড়ে তুলতে পারি, তা হলে ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির মায়ামোহ আমাদের কখনই কেশাগ্র স্পর্শ করতেও পারবে না।
বাস্তবিকই, এ জড় জগতের বিপুল কলুষতার মধ্যেও পরম মঙ্গলময় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উপরোক্ত সুযোগ সুবিধার বহুবিধ ব্যবস্থা করে রেখেছেন এবং সেইগুলির সদ্ব্যবহার করার শুধুমাত্র চাই আমাদের আন্তরিক প্রচেষ্টা। তার সুফল আপনা হতেই আমাদের জীবনে প্রতিভাত হতে দেখা যাবে। সেই শুভফল “আনন্দাম্বুধিবর্ধনম্” রূপ আমরা অবশ্যই লাভ করতে পারব। প্রতিপদং পূর্ণমৃতাস্বাদনং–তখন প্রত্যেকটি কাজে ভগবানের নাম স্মরণের অমৃত আস্বাদন করতে পারব পরিপূর্ণ ভাবে। আমাদের তখন উপলব্ধি হবে যেন আনন্দের মহাসমুদ্রে অবগাহন করছি। এই অমৃতময় আনন্দের বৃদ্ধি ক্রমশই আমাদের জীবনে অপূর্ব দিব্য অনুভূতি সৃষ্টি করতে থাকবে।
এই থেকেই বোঝা যায়, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের কল্যাণবিধানে কত কিছু ব্যবস্থা করে রেখেছেন। এখন আমাদের কর্তব্য–সেই সকল সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে মানজীবন সার্থক করে তোলা। মানবজীবনে শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় উপভোগের মাধ্যমে পশুর মতো যাপন করে গেলেই চলবে না–মানবজীবনে সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দিব্য পারমার্থিক উন্নতির পথ সুগম করে তুলতে হবে।
ভাগবতে রাজা পুরঞ্জনের কাহিনীতে রয়েছে, তিনি ইন্দ্রিয় সুখভোগের অন্তহীন বাসনা নিয়ে সারা পৃথিবী ভ্রমণ করে এমন একটি জায়গা খুঁজছিলেন, যেখানে তার সমস্ত বাসনা পূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তিনি তেমন জায়গা খুঁজে পাননি।
মহান্ বৈষ্ণব কবি শ্রীল বিদ্যাপতি গেয়েছেন–
তাতল সৈকতে বারিবিন্দু সম, সুত-মিত-রমনী সমাজে।
আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের নিয়ে ইন্দ্রিয় সুখভোগের বাসনাকে এখনে ঠিক যেন মরুভুমিতে এক বিন্দু জলের মতো বর্ণনা করা হয়েছে। মরুভূমির তৃষ্ণা নিবারণের জন্য সমুদ্রের প্রয়োজন, কিন্তু সেখানে যদি এক বিন্দু জল ঢালা হয়, তাতে কি লাভ হয়? তেমনই, জীবেরা হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন অংশ–বেদান্ত-সূত্রে যাদের “আনন্দময়োহভ্যাসাৎ” বা পূর্ণ আনন্দময় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সেই পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন অংশ হওয়ার ফলে, জীবও পূর্ণ আনন্দের অন্বেষণ করছে।
কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কখনই সেই আনন্দ লাভ করা যায় না। বিভিন্ন জন্মযোনিতে ভ্রমণ করে জীব বিভিন্ন প্রকারের শরীর লাভের মাধ্যমে একটু-আধটু সুখ উপলব্ধি করতে পারে, কিন্তু ইন্দ্রিয়ের পূর্ণ সুখভোগ কোনও জড় শরীরের মাধ্যমেই সম্ভব নয়।
তাই পুরঞ্জন বা জীব বিভিন্ন প্রকার শরীরে ভ্রমণ করে কেবল সুখভোগের প্রচেষ্টায় সর্বত্র নিরাশ হয়েছিল। অর্থাৎ, জড়ের দ্বারা আচ্ছাদিত চিৎ-স্ফুীলঙ্গ কখনই জড়জাগতিক জীবনের কোন পরিবেশেই পূর্ণরূপে ইন্দ্রিয়সুখ উপভোগ করতে পারে না।
ব্যাধের বংশীধ্বনিতে মগ্ন হয়ে, হরিণ কিছুকালের জন্য আনন্দ উপভোগ করতে পারে, কিন্তু তার পরিণাম অবশ্যই মৃত্যু। তেমনই, মাছ তার জিভের তৃপ্তি সাধনে অত্যন্ত দক্ষ, কিন্তু সে যখন ধীবরের টোপ গেলে, তখন তার জীবনের অবসান ঘনিয়ে আসে।
এমন কি, হাতিও যে অতি বলবান, সে-ও হস্তিনীর সাথে মৈথুনের আকাক্সক্ষা চরিতার্থ করার লালসায় তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে সে বন্দীদশা ভোগ করে।
প্রত্যেক যোনিতে জীব তার ইন্দ্রিয়সুখ চরিতার্থ করবার জন্য শরীর লাভ করে, কিন্তু তার ইন্দ্রিয়গুলি সে একসঙ্গে উপভোগ করতে পারে না। মানবজীবনে জীব তার সব কয়টি ইন্দ্রিয়কে বিকৃতভাবে উপভোগ করবার সুযোগ পায়, কিন্তু তার ফলে তাকে এত বিড়ম্বনা ভোগ করতে হয় যে, চরমে সে বিষাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে। মানুষ যতই তার ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধনের চেষ্টা করে, ততই সে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
সেই জন্যই রাজা পুরঞ্জনের মতো সব মানুষই বিলাশ ঐশ্বর্য সম্পদসহ রাজ্য লাভ করে আরামে থাকতে চায়। মানুষ দিব্য পারমার্থিক সম্পদ লভের উপযোগিতা বুঝতে চায় না। জীবাত্মার নানা প্রকার কামনা বাসনা থাকে, কিন্তু তা থাকলেই তো চলবে না। আমাদের বাসনাগুলি চরিতার্থ করতে হলে, আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সঠিক পদ্ধতি আয়ত্ত করতে হয়।
প্রকৃত বুদ্ধির সাহায্যেই মানুষ ভাল-মন্দ যাচাই করতে শেখে–কিভাবে যথার্থ সুখভোগের বিষয় নির্বাচন করতে হয়। এই বুদ্ধিকেই ভাগবতে রাজা পুরঞ্জনের রাণী রূপে রূপকভাবে বর্ণনা করা হেেছ। ঐ রাণীর মাধ্যমেই রাজা পুরঞ্জন তাঁর যাবতীয় বাসনা চরিতার্থ করতে চেয়েছিলেন।
বুদ্ধি যেমন জড়জাগতিক বিষয়ে আবদ্ধ থাকে, তেমনি যথার্থ পারমার্থিক বুদ্ধি চিন্ময় জগতের সব বন্ধন থেকে মানুষকে মুক্ত করতে পারে। পারমার্থিক বুদ্ধি বলতে বোঝায়–আমাদের ইন্দ্রিয়ের সব কর্মক্ষমতা অন্তরে বিরাজমান পরম সখা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রীতিবিধানে নিয়োজিত করার সদিচ্ছা। ভগবানের সেবায় সকল বুদ্ধিবৃত্তি সমর্পণ করতে পারলেই যথার্থ ভক্তি জাগে।
অতএব যে মানুষ পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলাচিন্তায় মনপ্রাণ সমর্পণ না করে, তাকে বুদ্ধিমান বলা শক্ত। সেই সমর্পিত প্রাণ ভক্তি জাগে সদ্গুরুর অধীনে আত্মনিবেদন করতে পারলে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে সেইজন্যই তাঁর শ্রীগুরুদেব বলেছিলেন যে, নির্বোধের মতো কেবলমাত্র জড়জগৎকে উপভোগ করতে মেতে থাকলেই মুক্তিলাভ সম্ভব হয় না। নিজেকে যথার্থ বুদ্ধিমান বলতে পারে সেই মানুষই, যে শ্রীভগবানের কাছে সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করতে পেরেছে এবং জড় সুখভোগ থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখতে শিখেছে।