কলির আক্রমণে কলহ

শ্রীমদ্ভাগবতে (৪/২৮/৩) রাজা পুরঞ্জনের উপমামূলক ও শিক্ষামূলক কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, “ক্রমে কালকন্যা তার ভয়াবহ সৈন্যসামন্ত সহ রাজা পুরঞ্জনের নবদ্বার নগরীর সমস্ত বাসিন্দাদের ওপর আক্রমণ হানল, এবং তার ফলে তাদের সকলকে নিজ নিজ কার্যে সম্পূর্ণ অযোগ্য করে ফেলল।”
শ্রীল প্রভুপাদ দেখিয়ে দিয়েছেন যে, শ্রীমদ্ভাগবতের শিক্ষাগুলি আধ্যাত্মিক সত্যতার পরিচায়ক এক বিজ্ঞান। লোকে মনে করে, ধর্ম হল এক ধরনের বিশ্বাস। শ্রীল প্রভুপাদ এই মতবাদের তীক্ষ্ণ প্রতিবাদ করে বলেছেন যে, কৃষ্ণভাবনা একটি বিজ্ঞান, এটি কোনও অন্ধ বিশ্বাস নয়। যা কিছু আমাদের অভ্যাস করতে বলা হবে, তা অবশ্যই বিজ্ঞান, যেহেতু শাস্ত্র বলছে, সুতরাং আমাদের তা অনুসরণ করতে হবে–এটা বৈদিক অনুশাসন নয়। বৈদিক অনুশাসন হচ্ছে–আমাদের বিচার করার সুবিধা দেওয়া হয়েছে–আমাদের নিজেদের বুঝে নিতে হবে। কোন কিছু আমাদের পক্ষে উপকারী কিনা, তবেই তা গ্রহণ করা উচিত।
এখানে পুরঞ্জনের কাহিনী আপাতদৃষ্টিতে উপমামূলক হলেও আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই তথ্যগতভাবে প্রযোজ্য। আমরা, যারা মানব শরীর ধারণ করেছি, তারা সকলেই এক-একজন পুরঞ্জন। মানব দেহ নামক এক নবদ্বার সমন্বিত নগরীতে বসবাস করছি, যে নগরী বা দুর্লভ মানব রূপী শরীর আমরা বহু বহু সম্ভাবনার পরে প্রাপ্ত হয়েছি–‘লব্ধা সুদুর্লভম্ ইদম্ বহু সম্ভাবান্তে”–এই সম্ভাবনাটি সুদুর্লভ।
মনুষ্য শরীর লাভ করাটা দুর্লভ কারন এই দেহে বিশেষ বিশেষ কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে–আমাদের চেতনাকে অপরিমিত সীমায় প্রসারিত করতে পারি। বিশেষ উন্নত বুদ্ধিমত্তার অবদান রয়েছে একমাত্র এই মনুষ্য শরীরেই। বুদ্ধিমত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পদ, কারণ বুদ্ধির দ্বারাই মনকে জড় বস্তু থেকে নিবৃত্ত করে আত্মার প্রতি নিবদ্ধ করা যায়। ইন্দ্রিয়সমূহ মনকে টেনে নিয়ে যায় ইন্দ্রিয়ভোগ্য বস্তুর দিকে, এবং এইভাবেই মানুষ জড়জাগতিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।
মন হচ্ছে চেতনার বাহক। আমরা যদি আমাদের চেতনাকে মনের চিন্তা ভাবনা ধ্যান ধারণার মাধ্যমে ইন্দ্রিয়ভোগ্য বিষয়ের দিকে ধাবিত করি–তা হলে সেটা হবে বন্ধনের কারণ কিন্তু বুদ্ধি হল সেই সুযোগ, যেটাকে ব্যবহার করে চেতনাকে শ্রীকৃষ্ণের চরণের দিকে আকৃষ্ট করাতে পারি। ‘বুদ্ধিযোগ’ হল কৃষ্ণভাবনাযুক্ত বুদ্ধিমত্তা। ‘যোগ’ শব্দটির তাৎপর্য হল, যে-বুদ্ধি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আসক্ত।
পুরঞ্জন মানব শরীর প্রাপ্ত হয়েছিল কিন্তু সেই সুযোগ সে কাজে লাগায়নি। যতক্ষণ না মানুষ কৃষ্ণভাবনা গ্রহণ করছে, সে পুরঞ্জনের মতোই থাকবে। মনুষ্যদেহ প্রাপ্ত হওয়াটা অনেকটা রাজকন্যার সাথে বিবাহ হওয়ার মতো। আমরা কেউ যদি রাজা না হতে পারি, কিন্তু যদি রাণীর সাথে বিবাহ হয়, তবে রাজাই হয়ে যাই। আপনা-আপনিই রাণী পাই, রাজ্য পাই–নবদ্বার বিশিষ্ট দেহ-রাজ্যটি। সেই সূত্রে সমস্ত সুযোগ সুবিধাও পাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এই নয়টি দ্বার সমন্বিত দেহ-নগরীটি বিশেষভাবে সুরক্ষিত–একটি পঞ্চফনা বিশিষ্ট সর্পের দ্বারা। অর্থাৎ পাঁচটি প্রাণবায়ু–প্রাণ, অপান, সমান, ব্যান, উদান। প্রাণ বায়ু দেহের মধ্যস্থ আত্মাকে সুরক্ষিত রাখে। অপান বায়ু রেচনক্রিয়ায় অর্থাৎ বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাষণে নিয়োজিত। ব্যান বায়ুর কাজ হল দেহের ¯œায়ুতন্ত্রকে ধারণ করা এই ইন্দ্রিয়গুলিকে চালনা করা। এইভাবে এই পাঁচ বায়ুর ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মানব দেহের সমস্ত কার্যকলাপ সম্ভব হয় এবং দেহকে আত্মার বসবাস যোগ্য সুরক্ষিত স্থান করে তোলে ও দেহকেও সামর্থপূর্ণ রাখে।
অবশেষে সময়ের কন্যা–কালকন্যা এই শরীরে আক্রমণ হানে। যতই শক্ত সামর্থ্য শরীর হোক না কেন, কালকন্যা এলেই সমস্ত শক্তি নিষ্ক্রয় হয়ে যায়, অর্থাৎ বৃদ্ধাবস্থার আগমন হয়। বৃদ্ধাবস্থা হল কালকন্যার আলিঙ্গন। সৈন্যসামন্তসহ কালকন্যা তার আক্রমণ হানে, এবং বৃদ্ধাবস্থার সাথে আসে যতরকমের বাধা বিপত্তি ফলে দেহ হয়ে পড়ে অকেজো। যে পাঁচ বায়ু এতকাল ধরে দেহের রক্ষা করে এসেছে তারাও হার স্বীকার করে, এবং তারপর পুরঞ্জনকে যবন সৈন্যরা টেনে হিচড়ে তার শরীর-নগরী থেকে বার করে নিয়ে যায়।
পুরঞ্জনের এই গল্পে একটা উদাহরণ পাওয়া যায়, যেটা আমাদের আলোচ্য ভাগবতের (৪/২৮/৩) এই শ্লোকের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক–একবার কালকন্যা উপযুক্ত পতির সন্ধানে নারদ মুনির কাছে উপনীত হয় এবং বিবাহের প্রস্তাব দেয়। নারদ মুনি তাতে সম্মত হননি। ফলে আমরা দেখি নারদ মুনি চিরযৌবন ও অমরত্ব লাভ করেছেন।
সময়ের প্রকোপ বা কালকন্যার আঘাত হানা থেকে কিভাবে পার পাওয়া যেতে পারে? তার উপায় হল ব্রহ্মচর্য। শ্রীল প্রভুপাদ বলেছেন যে যত অক্ষম, বৃদ্ধ বয়সের লক্ষণাদি তার মধ্যে তাড়াতাড়ি প্রকাশিত হয়, আবার যখন কেউ ব্রহ্মচারী হয়, যৌবন তার সাথে দীর্ঘকাল থাকে, সময় তার ওপর সহজে প্রভাব ফেলতে পারে না।
এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, আধ্যাত্মিক জীবন ব্রহ্মচর্যের নীতির ওপরই ভিত্তি করে আছে। শুধুমাত্র দৈহিক ধর্মই নয়, সমস্ত ধর্মমতই এই কথা মানে–খ্রিস্টান ধর্মেও একই কথা বলা হচ্ছে। আজ খ্রিস্টানরা তা মানছে কি মানছে না, সেটা প্রশ্ন নয়। বর্ণাশ্রমের চারটি আশ্রমও ব্রহ্মচর্যের ওপর ভিত্তি করে আছে। এমন কি গৃহস্থরাও ব্রহ্মচারী, কারণ তারা আধ্যাত্মিক জীবন অনুশীলন করছে এবং তাদের স্ত্রীদের সাথে তাদের সঙ্গ কেবলমাত্র প্রজন্ম সৃষ্টির উদ্দেশ্যে–একটি দায়িত্ব পালনের মনোভাব নিয়ে–অন্য কোনও পরিকল্পনায় নয়।
আবার দেখা যায, কলির দুর্দমনীয় প্রভাবে অধর্ম তার দাপটে এগিয়েই চলেছে। কলি ও অধর্ম দুই বন্ধু। অধর্মকে স্থাপন করার কাজে কলি কৃতকার্য হয়েছে। আমিষ আহার, অবৈধ সঙ্গ, নেশা করা, জুয়াখেলা ইত্যাদি অধার্মিক কাজকর্ম চারিদিকে প্রতিনিয়তই কিভাবে বেড়ে চলেছে– তা দেখে আমরা একথা অনুমান করতে পারি। এই কাজ হাসিলের জন্যই কলি অবৈধ সঙ্গের সূচনা ও বৃদ্ধি সাধন করে।
আজকের জগতের বক্তব্য–যৌনতাই হল জীবনের চরম লক্ষ্য। শ্রীল প্রভুপাদ বলছেন, প্রজন্ম সৃষ্টির উদ্দেশ্য ছাড়া আর সমস্ত যৌন সঙ্গই অবৈধ। অথচ কলি তারই প্রসার করে চলেছে। এমন কি স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গেরও উদ্দেশ্য আজকাল হয়ে দাঁড়িয়েছে–সন্তানের জন্ম না দেওয়া। তারা বিভিন্ন রকম পদ্ধতি গ্রহণ করছে। যদি কখনও ঘটনাচক্রে গর্ভধারণ হয়ে যায় তো ভ্রুণহত্যা করে ফেলা হচ্ছে। এইভাবে, আজকের জীবন সম্পূর্ণ অর্থে অবৈধ সভ্যতার বিপরীত মুখী হয়ে উঠেছে।
কলির পরম শত্রু হলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর সংকীর্তন আন্দোলন। এটা খুব আগ্রহ জাগানো বিষয়–কিভাবে কলি তার আক্রমণ হানছে এবং কিভাবে মহাপ্রভু তাঁর পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। মহাপ্রভু বিশেষ দক্ষতার সাথে একবার আক্রমণ হানছেন তাঁর সংকীর্তন আন্দোলন স্থাপনের মাধ্যমে, আবার তারপর কিছুকালের জন্য অন্তর্হিত থাকছেন–সংকীর্তন আন্দোলন প্রায় লুপ্তই হয়ে গিয়েছিল, শ্রীমায়াপুর ধাম ঢাকা পড়ে গিয়েছিল, সেই সাথে তাঁর শিক্ষাও হারিয়ে গিয়েছিল। তখন অপসম্প্রদায়ের প্রচারই তুঙ্গে উঠেছিল। তারপর শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর এসে ধাম উদ্ধার করলেন, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর এসে গৌড়ীয় মঠ স্থাপন করলেন। তাও এক সময়ে ভগ্নাবস্থা প্রাপ্ত হয়ে পড়ে–ভক্তরা নিজেদের মধ্যে বিবাদে মত্ত হয়। শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এসে শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুরের মঠ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে তাঁর পরিকল্পনা ও স্বপ্ন পূরণ করেন সারা পৃথিবীতে সংকীর্তন আন্দোলন প্রচার করে।
কলি যখন চারটি অধর্মের উপায়ে কুপ্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হয়, তখন পঞ্চম উপায় হল অর্থ বা স্বর্ণের মাধ্যমে আঘাত হানা। সেখানেও যখন সে অকৃতকার্য হয়, তখন তার ভয়ানক মরণাস্ত্র বার করে–কলহ। “করালবদনক্রুরং কলিশ্চ কলহপ্রিয়।” শ্রীল প্রভুপাদ বলতেন, আমাদের এই আন্দোলনকে বাইরে থেকে কোনও ভাবে কেউ ধ্বংস করতে পারবে না। ধ্বংস হতে হলে তা হবে আমাদের নিজেদের মধ্যে, ভক্তদের মধ্যে কলহের কারণে। তার প্রমাণ রয়েছে পূর্ববর্তী গৌড়ীয় সংস্থাগুলির পরিণতিতে।
আমরা সঠিক রাস্তায় এসে পড়েছি–‘অথাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা’। এখন আমাদের কাজ হবে বিপথগামী না হয়ে, সেই পথেই অবিচলিত ভাবে অগ্রসর হয়ে চলা।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits