শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী করে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে–
কৃষ্ণবর্ণং ত্বিষাকৃষ্ণং সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্রপার্ষদম্।
যজ্ঞৈঃ সংকীর্তনপ্রায়ৈর্যজন্তি হি সুমেধসঃ ॥ (ভাঃ ১১/৫/৩২)
অর্থাৎ, যাঁর মুখে সর্বদা কৃষ্ণ নাম, যাঁর অঙ্গকান্তি অকৃষ্ণ, অঙ্গ, উপাঙ্গ, অস্ত্র ও পার্ষদ পরিবেষ্টিত সেই মহাপুরুষকে বুদ্ধিমান মানুষেরা সংকীর্তন যজ্ঞের দ্বারা আরাধনা করেন।
ভগবান যদিও কলিযুগে প্রচ্ছন্নভাবে অবতরণ করেন। অর্থাৎ নিজের স্বরূপ গোপন করে অবতরণ করেন। তবুও এই শ্লোক এবং শাস্ত্রোক্ত অন্যান্য বহু শ্লোকের বর্ণনার মাধ্যমে তাঁকে চিনতে পারা যায়। উপরোক্ত শ্লোকটি বিচার কররে সেই কৃষ্ণ যে স্বয়ং শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সে সম্বন্ধে কোন সন্দেহ থাকে না।
“কৃষ্ণবর্ণং”, শব্দটির অর্থ হচ্ছে, কৃ-ষ্ণ এই দুটি বর্ণ-নিরন্তর যাঁর মুখে উচ্চারিত হয়, অথচ ত্বিষা-অকৃষ্ণ অর্থাৎ তাঁর অঙ্গকান্তি অকৃষ্ণ। ভগবান চারটি যুগে চারটি ভিন্ন বর্ণে আবির্ভূত হন। সে সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতে কৃষ্ণ-বলরামের নামকরণের সময় গর্গমুনি বলেন–
আসন্ বর্ণস্ত্রয়ো হ্যস্য গৃহ্নতোহযুগং তনুঃ।
শুক্লো রক্তস্তথা পীত ইদানীং কৃষ্ণতাং গতঃ ॥ (ভাঃ ১০/৮/১৩)
অন্য তিনটি যুগে ভগবান শ্বেত, রক্ত ও পীতবর্ণ ধারণ করে অবতরণ করেন, এখন দ্বাপর যুগে তিনি কৃষ্ণবর্ণ প্রাপ্ত হয়েছেন। অতএব অকৃষ্ণ বর্ণ বলতে শ্বেত, রক্ত ও পীত এই তিনটি রঙের যে কোনো একটিকে বোঝাতে পারে, কিন্তু ইতিপূর্বে সত্য ও ত্রেতা যুগে তিনি যথাক্রমে শ্বেত ও রক্তবর্ণ ধারণ করে অবতরণ করেছেন। তাহলে বাকী রইল কেবল পীতবর্ণ, অতএব অকৃষ্ণ বর্ণ বলতে এখানে পীত বর্ণকেই নিশ্চিতরূপে ইঙ্গিত করা হয়েছে। সে সম্বন্ধে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃত গ্রন্থে বলেছেন–
“অকৃষ্ণবরণে তাঁর কহে পীতবরণ”।
তাঁর ‘অঙ্গ’ হচ্ছেন অদ্বৈত আচার্য এবং নিত্যানন্দ প্রভু। ‘উপাঙ্গ’ শ্রীবাসাদি ভক্তবৃন্দ, ‘অস্ত্র’–হরিনাম, এবং ‘পার্ষদ’–গদাধর, স্বরূপ দামোদর প্রভৃতি।
যজ্ঞৈঃ– যজ্ঞ সমূহের দ্বারা। এই শ্লোকের টীকায় শ্রীজীব গোস্বামী লিখেছেন, যজ্ঞ শব্দের অর্থ পূজার সম্ভার। সংকীর্তনপ্রায়ৈঃ, অর্থাৎ সঙ্কীর্তন প্রধান। বহু ব্যক্তি মিলিত হয়ে যখন শ্রীকৃষ্ণের নাম, রূপ, গুণ, লীলাদির কীর্তন করলে তাকে বলা হয় সঙ্কীর্তন। ভগবান শ্রীনারায়ন বলেছেন–
“নাহং তিষ্ঠামি বৈকুন্ঠে যোগীনাং হৃদয়ে ন চ
মদ্ভাক্তা যত্র গায়ন্তি তত্র তিষ্ঠামি নারদ।”
“হে নারদ, আমি বৈকুন্ঠে থাকি না, যোগীদের হৃদয়েও থাকি না; আমার ভক্তেরা যেখানে আমার নাম, গুণ, লীলাদি কীর্তন করেন, আমি সেখানেই থাকি।” অর্থাৎ ভক্তদের শ্রীমুখে তাঁর নিজের নাম, গুণ, লীলাদির কীর্তন শুনলে ভগবানের যত আনন্দ হয়, বৈকুন্ঠে বা যোগীদের হৃদয়ে অবস্থান করে তিনি তত আনন্দ পান না। ভগবানের আনন্দ বিধানের জন্যই ভক্তরা ভগবানের সাক্ষাতে তাঁর নাম, গুণাদির কীর্তন করেন। “যজন্তি হি সুমেধসঃ”–সুবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিগণ এই নাম সংকীর্তনের দ্বারা তাঁর আরাধনা করেন।
এই পীতবর্ণ স্বয়ং ভগবান হচ্ছেন রাধাকৃষ্ণের মিলিত স্বরূপ, অর্থাৎ শ্রীরাধার কুঙ্কুমাক্তকাঞ্চন বর্ণে আচ্ছাদিত স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীরাধার ভাব ও অঙ্গকান্তি সুবলিত কৃষ্ণ স্বরূপ–শ্রীরাধা ও কৃষ্ণের মিলিত তনু।
তাঁর এই অবতরণ প্রচ্ছন্ন; অর্থাৎ নিজের পরিচয় গোপন করে তিনি অবতরণ করেছেন। স্বয়ং ভগবান তাঁর ভগবত্তা গোপন করে ভক্তভাব অবলম্বন করে এই কলিযুগে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। এই রূপে তিনি প্রতি কলিযুগে আসেন না। এক হাজার চতুর্যুগে ব্রহ্মার এক দিন হয়।
অষ্টাবিংশ চতুর্যুগে দ্বাপরের শেষে
ব্রজের সহিতে হয় কৃষ্ণের প্রকাশে ॥
অষ্টাবিংশতি দিব্যযুগের দ্বাপর যুগের শেষভাগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাঁর নিত্য ব্রজধামের সমস্ত উপকরণ সহ এই জড় জগতে অবতরণ করেন। সেই লীলা বিলাসের পর কৃষ্ণ ভাবেন–“বহুকাল আমি জগতের মানুষকে প্রেমভক্তি দান করিনি, অথচ প্রেমভক্তি বিনা জগতের কোন অস্তিত্ব থাকতে পারে না। জড় জগতে শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে সকলে আমার আরাধনা করে। কিন্তু এই বিধি ভক্তির অনুশীলনের মাধ্যমে ব্রজের ভক্তদের প্রেমভাব লাভ করা যায় না। তাই আমি কলিযুগের যুগধর্ম নাম-সংকীর্তন প্রবর্তন করার মাধ্যমে জগতকে প্রেমানন্দে উদ্বেলিত করে নৃত্য করাব। ভক্তের ভাব অবলম্বন করে আমি সকলকে ভক্তিযোগে ভগবানের সেবা করার শিক্ষা দেব। আমি আমার অন্তরঙ্গ ভক্তদের সঙ্গে পৃথিবীতে অবতরণ করে বহুবিধ আনন্দময় লীলা বিলাস করব।” এইভাবে চিন্তা করে পরমেশ্বর ভগবান কলিযুগে প্রথম সন্ধ্যায় নবদ্বীপে অবতীর্ণ হলেন।
স্বয়ং ভগবানের এইভাবে অবতরণের দুটি কারণ রয়েছে, একটি বহিরঙ্গা, অন্যটি অন্তরঙ্গা। তার অবতরণের বহিরঙ্গা কারণটি হচ্ছে কলিযুগের যুগধর্ম নাম সংকীর্তন প্রচার এবং ভগবৎ-প্রেম বিতরণ। আর অন্তরঙ্গা কারণটি সম্বন্ধে শ্রীল কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী শ্রীচৈতন্য-চরিতামৃতে আদিলীলার চতুর্থ পরিচ্ছেদে বলেছেন–
শ্রীরাধায়াঃ প্রণয়মহিমা কীদৃশো বানয়ৈবা–
স্বাদ্যো যেনাদ্ভুতমধুরিমা কীদৃশো বা মদীয়ঃ।
সৌখ্যঞ্চাস্যা মদনুভতঃ কীদৃশং বেতি লোভা-
ত্তদ্ভাবাঢ্যঃ সমজনি শচীগর্ভসিন্ধৌ হরীন্দুঃ ॥ (চৈঃ চঃ আঃ ৪/২৩০)
শ্রীরাধার প্রেমের মহিমা কীরকম, ঐ প্রেমের দ্বারা শ্রীরাধা আমার যে অদ্ভুত মাধুর্য আস্বাদন করেন, সেই মাধুর্যই বা কিরকম এবং আমার মাধুর্য আস্বাদন করে শ্রীরাধা যে সুখ অনুভব করেন, সেই সুখই বা কিরকম– এই সমস্ত বিষয়ে জানবার জন্য লোভ জন্মানোর ফলে শ্রীরাধার ভাবযুক্ত হয়ে শ্রীকৃষ্ণরূপ চন্দ্র শচীগর্ভসিন্ধুতে আবির্ভূত হয়েছেন।
শ্রীকৃষ্ণ একসময় বিচার করেছিলেন–“সমস্ত জগৎ আমার থেকে আনন্দ লাভ করে, এমন কেউ কি আছে যে আমাকে আনন্দ দান করতে পারে? যার মহিমা আমার থেকে শত শত গুণে অধিক, সেই কেবল আমার মনকে আনন্দিত করতে পারে। এই জগতে আমার থেকে অধিক গুণসম্পন্ন কেউ নেই, কেবল রাধার মধ্যেই তো আছে বলে মনে হয়।
“যদিও আমার সৌন্দর্য কোটি কোটি কন্দর্পের সৌন্দর্যকে পরাভূত করে, যদিও আমার এই সৌন্দর্যের সমান অথবা তার থেকে অধিক সৌন্দর্য সমন্বিত আর কেউ নেই, এবং আমার এই সৌন্দর্য ত্রিভুবনের আনন্দ বিধান করে, তবুও রাধাকে দর্শন করে আমার চোখ জুড়িয়ে যায়। যদিও আমি সমস্ত জগতের সুখের কারণ, তবুও রাধার রূপ ও গুণ আমার জীবন-স্বরূপ। এইভাবে রাধার প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনুভব করতে পারলেও, যখন আমি বিচার করে দেখি, তখন সব বিপরীত বলে মনে হয়।
“রাধাকে দর্শন করে আমার চোখ জুড়ায়, কিন্তু আমাকে দেখে রাধা অধিক সুখ অনুভব করে চেতনা হারায়। আমার মিলনে রাধা যে আনন্দ আস্বাদন করে, তা শতমুখে বর্ণনা করেও আমি শেষ করতে পারি না। আমাদের লীলা বিলাসের পর যখন আমি তার অঙ্গের মাধুরী দর্শন করি তখন আমি সুখে মগ্ন হয়ে নিজেকে ভুলে যাই। অন্যের মিলনে আমি যে সুখ পাই, রাধার সঙ্গসুখ তার থেকে শত শত গুণ অধিক।
“তা বিবেচনা করে আমি বুঝতে পারি আমার মধ্যে এমন কোনো এক রস আছে, যা আমার মোহিনী রাধাকেও সম্পূর্ণভাবে বশীভূত করে। আমার থেকে রাধা যে সুখ পায়, সেই সুখ আস্বাদন করার জন্য আমি সর্বদাই উৎসুক।
“রাধার প্রেমের মহিমা, ঐ প্রেমের দ্বারা রাধা আমার যে অদ্ভুত মাধুর্য আস্বাদন করে, এবং সেই মাধুর্য আস্বাদন করে রাধা যে সুখ অনুভব করে, এবং সেই সুখই বা কিরকম– এই তিনটি বাসনা আমার পূর্ণ হয়নি। রাধার ভাবও কান্তি অবলম্বন না করলে এই তিনটি বাসনা পূর্ণ হবে না। তাই রাধার ভাব ও অঙ্গকান্তি অবলম্বনে করে আমি অবতীর্ণ হব।”
শ্রীকৃষ্ণ প্রথমে তার পিতা-মাতা এবং গুরুজনদের অবতরণ করালেন। তারপর শ্রীরাধার ভাব ও অঙ্গকান্তি অবলম্বন করে তিনি নিজে শচীমাতার গর্ভরূপ ক্ষীর সমুদ্র থেকে পূর্ণচন্দ্রের মতো নবদ্বীপে প্রকাশিত হলেন।