শাস্ত্রসম্মত বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলন

শ্রীমদ্ভাগবতের চতুর্থ স্কন্ধের ষড়বিংশতি অধ্যায়ে পুরাকালে রাজা পুরঞ্জনের মৃগয়ায় গমন এবং তার ফলে তাঁর মহিষীর ক্রোধ সম্পর্কে শ্রীনারদ মুনির বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে।
এই অধ্যায়টিতে ভারতবর্ষে প্রাচীনকালের রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সম্বন্ধে একটি খুব সুন্দর তত্ত্ব পাওয়া যায়। এক সময়ে রাজা বর্হিষৎ যখন তাঁর রাজকার্য থেকে অবসর গ্রহণের কথা বিবেচনা করছিলেন, তখন তিনি বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞ অনুষ্ঠানের সকাম কর্মে নিযুক্ত ছিলেন।
অবশ্য, বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞ অনুষ্ঠানের দ্বারা মানুষ উচ্চতর গ্রহলোকে বা স্বর্গলোকে উন্নীত হতে পারে, কিন্তু ভগবদ্ভামে ফিরে যাওয়ার মুক্তি তাতে লাভ হয় না।
তাই, দেবর্ষি নারদ যখন দেখলেন যে, ধ্রুব মহারাজের বংশধর এই রাজা প্রাচীনবর্হিষৎ এইভাবে সকাম কর্মের দ্বারা পথভ্রষ্ট হচ্ছেন, তখন তিনি তাঁর প্রতি কৃপাপরায়ণ হয়েছিলেন, এবং তিনি নিজে এসে জীবনের পরম লক্ষ্য যে ভক্তিযোগ, সেই সম্বন্ধে তাঁকে উপদেশ দেন। শ্রীনারদ মুনি কিভাবে মহারাজ প্রাচীনবর্হিষৎকে পরোক্ষভাবে রাজা পুরঞ্জনের রূপক কাহিনী শুনিয়ে ভক্তিযোগের উপদেশ দিয়েছিলেন, তা এখানে অতি আকর্ষণীয়ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এক সময় পুরঞ্জন নামে এক রাজা তাঁর মহৎ ধনুক ও অক্ষয় তূণীর গ্রহণ করে এবং স্বর্ণনির্মিত বর্মে সজ্জিত হয়ে, একাদশ সেনাপতি সহ পাঁচটি দ্রুতগামী অশ্বচালিত রথে পঞ্চপ্রস্থ নামক বনে গমন করেছিলেন।
যদিও রাজা পুরঞ্জনের পক্ষে এক পলকের জন্যও তাঁর প্রিয়তমা মহিষীর সঙ্গত্যাগ করা অসম্ভব ছিল, তবুও মৃগয়া করার বাসনায় অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়ে, তিনি মহাগর্বে তাঁর ধনুক ও বাণ গ্রহণ করে, তাঁর পত্নীর কথা চিন্তা না করে বনে গিয়েছিলেন।
শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই আচরণের তাৎপর্য বর্ণনা প্রসঙ্গে শ্রীমদ্ভাগবতে লিখেছেন–স্ত্রী-শিকারও এক প্রকার শিকার। বদ্ধ জীব কখনই এক স্ত্রীতে সন্তুষ্ট হয় না। যাদের ইন্দ্রিয় অত্যন্ত অসংযত, বিশেষ করে তারা বহু স্ত্রী শিকার করবার চেষ্টা করে। রাজা পুরঞ্জন যে তাঁর ধর্মপত্নীর সঙ্গ-পরিত্যাগ করে বনে মৃগয়া করতে গিয়েছিলেন, তা বদ্ধ জীবের ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের জন্য বহু রমণী শিকার করার চেষ্টার প্রতীক।
রাজা যেখানে যান না কেন, সব সময় তাঁর মহিষীকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু রাজা বা বদ্ধ জীব যখন ইন্দ্রিয়সুখ ভোগের বাসনায় অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে, তখন আর তার ধর্মনীতির কথা মনে থাকে না। পক্ষান্তরে, সে তখন মহাগর্বে আসক্তি ও বিরক্তিরূপ ধনুক ও বাণ গ্রহণ করে।
আমাদের চেতনা সর্বদাই এই দু’ভাবে কাজ করছে–ঠিকভাবে এবং ভুলভাবে। মানুষ যখন রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার মর্যাদার গর্বে অত্যন্ত গর্বিত হয়, তখন সে ঠিক পথ পরিত্যাগ করে ভুল পথ গ্রহণ করে।
ক্ষত্রিয় রাজাদের কখনও কখনও বনে গিয়ে হিংস্র পশুদের বধ করার উপদেশ দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা কিভাবে বধ করতে হয়, তা শিখতে পারেন। তার উদ্দেশ্য কখনই ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধন নয়। পশুমাংস আহার করার জন্য পশুহত্যা করা মানুষের জন্য নিষিদ্ধ।
শ্রীল প্রভুপাদ এইভাবে রাজা পুরঞ্জনের কাহিনীর তাৎপর্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছেন যে, এই কাহিনীটি এক বদ্ধ জীবাত্মার কাহিনী। এই কাহিনীর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, কিভাবে জীবাত্মা জড়জাগতিক পাপময় প্রকৃতির কবলে অধঃপতিত হয়ে থাকে এবং কিভাবে ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির সর্বপ্রকার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়। বাস্তবিকই, জড়জাগতিক জীবমাত্রেরই সমগ্র জীবন এইভাবে ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির বাসনার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে।
ভাগবতে বর্ণিত এই রাজা পুরঞ্জনের রূপক কাহিনীটি একটি শরীররূপী নগরের মতোই, যার মধ্যে ভোগতৃপ্তির বাসনায় জর্জরিত জড় জীব এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কেবলই বিচরণ করে চলেছে। আর এইভাবে ভ্রমণ করতে করতে সৌভাগ্যবশত সে হয়ত কখনও একটি মানবদেহ লাভ করে থাকে, বিশেষত ভারতবর্ষের মতো এই পুণ্য দেশে মানবদেহ ধারণ করা তো অতীব সৌভাগ্যের লক্ষণ।
ভারতভূমিতে মানবদেহ লাভ করে জন্মগ্রহণের মস্ত বড় সুযোগ এই যে, এই পুণ্যভূমিতে পারমার্থিক জীবনচর্যা অনুশীলনের সর্বপ্রকার সুবিধা সহ অনুকূল ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া যায়। স্মরণাতীত কাল থেকেই যে-দেশে পারমার্থিক জীবনচর্যার সর্বপ্রকার আয়োজন রয়েছে, যে-দেশে চিন্ময় জীবনধারার বিশেষ সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের অতুলনীয় অবকাশ রয়েছে, সেই দেশটি হল ভারতবর্ষ।
কিন্তু বর্তমান কলিযুগে সেই ভারতভূমি আজ অপ্রকটিত। সেই ভারতভূমি আজ হিন্দুস্থানে পরিণত হয়েছে। তবে আবার শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর শুদ্ধ ভক্তবৃন্দের কৃপায়, বিশেষত শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের কৃপায়, আবার সেই বিস্মৃত ভারতভূমির পারমার্থিক জীবনচর্যার সর্বপ্রকার সুযোগ-সুবিধা সমগ্র জগতের আপামর জনসাধারণের কাছে সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ আজ সারা পৃথিবীর মানুষ আজ এই ভারতভূমি থেকে একদা উৎসারিত কৃষ্ণভাবনামৃতের আস্বাদন গ্রহণের ব্যাপক সৌভাগ্য অর্জনে সক্ষম হচ্ছে। জগদ্বাসী কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে আত্মমগ্ন হবার পথ খুঁজে পেয়েছে। কলিযুগের আগে মানুষদের কাছে এই সুযোগ সহজলভ্য ছিল না, কিন্তু আজ তা সকলের নাগালে এসে গেছে।
তাই যখনই কোনও মানুষ এদেশে বা বিদেশে যেখানেই হোক, কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের সুযোগ লাভ করে, তখন বুঝতে হবে যে, জীবনের চরম লক্ষ্যে উপনীত হবার দুর্লভ সৌভাগ্য তার আয়ত্ত হতে চলেছে। তার ফলে তার সকল প্রকার জড়জাগতিক বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের এবং চিন্ময় জগতে ভগবদ্ধামে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ আসন্ন হয়েছে।
মনুষ্যজন্ম হল চুরাশি লক্ষ্য বিভিন্ন প্রকার জীবযোনির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, একথা সুবিদিত। কারণ এই মনুষ্যজন্মেই জীবাত্মা তা চিন্ময় চেতনার পরিধি এক অপরিমিত বিস্তারিত ক্ষেত্রে প্রসারিত করবার দুর্লভ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে পারে আর তার ফলে চিন্ময় সত্তার স্বরূপ তথা পরম পুরুষোত্তম ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করবার যোগ্যতা অর্জনের সামর্থ্য লাভ করে। এই পরম সুযোগ বা সামর্থ্য অন্য কোন জীবদেহের মাধ্যমে সম্ভব হয় না।
এমন কি উচ্চতর গ্রহলোকের অধিবাসী তথা দেব-দেবীরা মানবদেহ অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠতর শরীরের অধিকারী হলেও এবং নানাপ্রকার অচিন্তনীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগের যোগ্যতা অর্জন করলেও, মানবদেহ ঐ সকল দেব-দেবীর শরীর অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ বলে বৈদিক শাস্ত্রে স্বীকৃত হয়েছে। এর দুটি কারণ রয়েছে। একটি কারণ হল–মানুষ তার চেতনার পরিধি অপরিমিত বিস্তারিত ক্ষেত্রে প্রসারিত করবার সামর্থ্য লাভ করে থাকে, যেটি দেব-দেবীরা পারে না। অন্য কারণটি হল এই যে, মানুষ তার কর্মফল ভষ্মীভূত করে ফেলতে পারে, যে-ক্ষমতা দেব-দেবীদেরও থাকে না।
এই দুটি কারণেই মানুষ ইহজীবনেই পরমেশ্বর ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত হয়ে উঠতে পারে। মানুষের ক্ষুদ্র জীবৎকালেই তার কোটিজন্মের সকল কর্মফল ভস্মীভূত করে ফেলতে পারে, আত্মপরিতৃপ্তির সর্বপ্রকার বাসনা নিশ্চিহ্ন করে দিতে সক্ষম হয়, আর মানুষ তার চেতনার পরিধি এমনই সুদূর বিস্তারী করে তুলতে সমর্থ হয় যে, তার ফলে অচিন্ত্য অনন্ত পরমেশ্বর ভগবানের স্বরূপ সত্তাও তার উপলব্ধির আয়ত্ত হতে পারে। পরম পুরুষোত্তম ভগবান অচিন্ত্য, পরমেশ্বর ভগবান অনন্ত, তিনি পরমতত্ত্ব–সে ক্ষেত্রে আমরা কীটাণুসম আমাদের সত্তা সীমাবদ্ধ এবং আমাদের বিবিধ পারিপার্শ্বিক দুষ্ট পরিবেশের প্রভাবে সদাসর্বদা আঘাতে প্রতিঘাতে জর্জরিত হয়ে রয়েছি।
কিন্তু তা স্বত্ত্বেও, মানুষ পরম পুরুষোত্তম ভগবানের স্বরূপ উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। পরমেশ্বর ভগবান এক মহাসমুদ্রের মতো। আর আমরা জীবাত্মারা সেই তুলনায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধূলিকণার মতো আমরা মহাসমুদ্রে একবিন্দু জলের মতো। এখন, এই এক বিন্দু জলের পক্ষে কখনই ধারণা করা সম্ভব  নয় যে, মহাসমুদ্রটি কী বিশাল! বিন্দুর পক্ষের সিন্ধুর স্বরূপ উপলব্ধি এক অসম্ভব ব্যাপার তো বটেই। তা সত্ত্বেও মানুষ তার চেতনার চিন্ময় বিকাশ সাধনের মাধ্যমে সেই দুঃসাধ্য কাজটি অনেক ক্ষেত্রেই করতে পারে।
অবশ্য শ্রীমদ্ভাগবতে বর্নিত রাজা পুরঞ্জনের কাহিনী থেকে আমরা লক্ষ্য করেছি, ইন্দ্রিয়সুখলোভে ব্যাপৃত হওয়ার ফলে তিনি তাঁর চেতনার বিকাশ সাধনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। মানবদেহ লাভ করা সত্ত্বেও রাজা পুরঞ্জন সেই সুযোগের অপব্যবহার করেছিলেন।
তবে রাজা পুরঞ্জনের সৌভাগ্য এই যে, তাঁর গুরুদেব শ্রীনারদ মুনির আশীর্বাদে এবং সুপরামর্শে সৎবুদ্ধি সম্পন্ন হওয়ার ফলে, পরবর্তী জন্মে স্ত্রীত্ব প্রাপ্তির মাধ্যম চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। ইহজীবনে দেহসুখভোগে সদাসর্বদা লিপ্ত হয়ে থাকার ফলে, রাজা পুরঞ্জনকে পরজন্মে এক নারীদেহ ধারণ করতে হয়েছিল। তাঁর অত্যধিক স্ত্রীসম্ভোগেচ্ছার পরিণাম স্বরূপ তাঁকে স্ত্রীরূপে আবার জন্মগ্রহণ করতে হয়েছিল।
ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাই বলেছেন, মৃত্যুকালে মানুষ যেভাবে চিন্তাভাবনা করে, পরজন্মে সেইভাবেই সে অন্য একটি শরীর লাভ করে। মৃত্যুকালে আমাদের যেমন চিন্তাধারা হয়, ঠিক সেই মতোই পরজেন্মে শরীর প্রাপ্তি হয়।
এইভাবে শ্রীনারদমুনি রাজা প্রাচীনবর্হিষৎকে এক রূপক কাহিনীর মাধ্যমে রাজা পুরঞ্জনের কাহিনী শুনিয়ে বোঝাতে চেয়েছিলেন–কিভাবে এই দুর্লভ মানবদেহের যথার্থ সদ্ব্যবহার করা উচিত।
প্রবাদ আছে, যথার্থ বুদ্ধিমানেরা শুনে শেখে, যারা অল্পবুদ্ধিমান তারা দেখে শেখে, এবং হীনবুদ্ধি লোকেরা ঠেকে শেখে। আর বুদ্ধিহীন মানুষদের কথা তো বলে কাজ নেই, কারণ তারা কোন দিনই শেখে না।
তবে আমাদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের কাজ হল যথার্থ বুদ্ধিমান মানুষদের বিকাশ সাধন করা। রাজা পুরঞ্জনের কাহিনীর মাধ্যমে আমরা তাদের বোঝাতে চাই–কিভাবে এই মানব জন্মের পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করতে হয়।
রাজা পুরঞ্জনের কাহিনীর সারমর্ম হল এই যে, বদ্ধজীব তার ইন্দ্রিয় সুখভোগের আকাক্সক্ষা নিয়ে এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে বিচরণ করতে থাকে জন্মজন্মান্তর ধরে আর তার সঙ্গীরূপে তাকে পথনির্দেশ করতে থাকে, তার বুদ্ধি–ভাগবতে যাকে রাজা পুরঞ্জনের রাণীরূপে বর্ণনা করা হয়েছে এবং এই রাণীরূপে রাণীরূপী মোহময়ী বুদ্ধির প্রভাবে রাজা পুরঞ্জন তথা মানবদেহধারী জীবাত্মা বিভিন্ন প্রকার সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের প্রলোভনে মায়াচ্ছন্ন হয়ে থাকে, আর রাজা যেমন একটি নগরীর আধিপত্য লাভ করে সেখানে রাজত্ব করতে থাকে, তেমনি জীবাত্মাও তার দেহরূপী নগরীর আধিপত্যে মগ্ন হয়ে পড়ে। আর সেই নগরীর ন’টি দ্বার থাকে, ঠিক যেমন মানবদেহেও থাকে ন’টি দ্বার অর্থাৎ ন’টি ইন্দ্রিয়পথ।
রাজা পুরঞ্জনের নগরীতে রাণীকে সর্বদা চতুর্দিক থেকে সুরক্ষিত রাখত পাঁচটি মস্তকবিশিষ্ট একটি সর্প অর্থাৎ দেহের পঞ্চ বায়ুকে (প্রাণ, অপান, ব্যান, সমান ও উদান) এই সর্পটির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। কারণ সর্প কেবল বায়ু ভক্ষন করে জীবন ধারণ করতে পারে। বায়ুর দ্বারা বাহিত প্রাণশক্তিকে এই রূপক কাহিণীতে দেহরক্ষী বলে বর্ননা করা হয়েছে। প্রাণশক্তি ব্যতীত কেউ এক পলকের জন্যও জীবিত থাকতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে, সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলি প্রাণশক্তির অধীনেই কার্য করে। (ভাঃ ৪/২৫/২১)
রাজা পুরঞ্জনের রাণী হচ্ছেন বুদ্ধির প্রতীক এবং বুদ্ধির সাহায্যেই বিভিন্ন ইন্দ্রিয়কে কাজে লাগিয়ে মানবদেহ যত রকমের সুখভোগে লিপ্ত হতে উদ্যোগী হয়ে থাকে। কিন্তু এইভাবে সুখের অন্বেষণে বুদ্ধিকে পথপ্রদর্শণ রূপে মেনে নিলে মানবদেহ যথার্থভাবে পারমার্থিক উচ্চতর জীবনচর্যায় কাজে লাগানো সম্ভব হয়ে ওঠে না।
তা হলে কিভাবে বুদ্ধির এই সুখান্বেষী প্রবৃত্তি রোধ করা যেতে পারে? অবশ্য বুদ্ধির এই প্রবৃত্তি হল জড়া প্রকৃতির নিয়ামাধীন। তাই, এই প্রবৃত্তির মোকাবিলা করতে হলে, আমাদের নিজেদের বুদ্ধির ওপরে নির্ভরশীল না থেকে আমাদের কোনও প্রামাণ্য সদ্গুরুর নির্দেশানুসারে শাস্ত্রসম্মত বুদ্ধিবৃত্তির অনুশীলনে প্রবৃত্ত হওয়া উচিত। এই পথ অনুসরণ করলে তবেই মানবদেহ লাভের পরিপূর্ণ সার্থকতা অর্জন করা সম্ভব হয়ে উঠতে পরে।
সেই সঙ্গে অতীব মনোযোগ সহকারে সাধুসন্তের রচিত শাস্ত্রাদি থেকে উপদেশাবলী তথা অনুশাসনাদি শ্রবণ করে তা শ্রদ্ধা সহকারে হৃদয়ঙ্গম করতে হবে যার ফলে পারমার্থিক সংস্কৃতি অর্জনের পন্থা অনুসরণ করা সহজ হয়ে ওঠে আর তার ফলে পারমার্থিক তত্ত্বের প্রতি বিশ্বাস সৃষ্টি হলে আরও ব্যাপকভাবে সাধুসঙ্গ লাভের অভিলাষ জাগতে পারবে।
এইভাবে সাধুসঙ্গ করতে করতে এক সময়ে এমন একজন বিশেষ শুদ্ধ ভক্তের সান্নিধ্যলাভ করা সম্ভব হয়ে উঠবে, যাঁর কৃপায় তাঁর পথনির্দেশে পারমার্থিক জীবনে বিকাশ লাভের সুযোগ উন্মোচিত হবে। তখন সেই শুদ্ধ ভক্তের কাছে আত্মনিবেদন করাই আমাদের কর্তব্য। সেই আত্মনিবেদনের মাধ্যমেই পারমার্থিক জীবনধারায় দীক্ষালাভ করা সম্ভব হয়। তখন শুরু হয় পারমার্থিক জীবনের যথার্থ বিকাশ।
পারমার্থিক জীবনে এইভাবে যিনি দীক্ষাপ্রদান করেন, তাঁকে গুরু বলে মানতে হয়। যথার্থ দীক্ষাগুরু হলেন পরমাত্মার প্রতিভূ স্বরূপ। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রত্যেক জীবাত্মার অন্তরে বিরাজ করে থাকেন। শ্রীকৃষ্ণ ইচ্ছা করেন, প্রতিটি জীবাত্মা তার জড়জাগতিক জীবনের কর্তব্যকর্ম যথাশীঘ্র সম্ভব সম্পন্ন করে নিজ আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যাবে। তাই জীবাত্মা যেখানে যায়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণও তাঁর সঙ্গে থাকেন, পরমাত্মারূপে। ঠিক স্নেহশীল পিতার মতোই পরমপিতা শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সন্তানরূপী জীবাত্মাকে কখনই নিঃসঙ্গ অবস্থায় যেন কোথাও যেতে দিতে চান না। পরম পিতা জানেন, তাঁর সন্তান নিজের নিরাপত্তা বিধান করতে যথার্থ সক্ষম নয়। তাই সন্তান স্বতন্ত্রভাবে ইতস্তত ভ্রমণ করতে আগ্রহী হলেও, পরমপিতারূপে পরমাত্মারূপী ভগবান সদাসর্বদা জীবাত্মার অন্তরে প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজমান থেকে তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ তথা পথপ্রদর্শণ করতে থাকেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমরা বর্জন করলেও তিনি আমাদের কখনই পরিত্যাগ করে থাকতে পারেন না।
এইভাবে জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার সদা বিচরণের তিনটি কারণ আছে। এক, জীবাত্মাকে পরমাত্মা সর্বদা অনুসরণ করতে চান। দুই, জীবাত্মাকে পরমাত্মা নিত্য পথপ্রদর্শন করতে চান। এবং তিন, পরমাত্মা প্রত্যেক জীবাত্মাকে নিজধামে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,963 hits