মন লাগামটি কৃষ্ণের হাতে দিন

বিভিন্ন দেবতারা বিভিন্ন গ্রহ নক্ষত্রের অধ্যক্ষতা করলেও প্রকৃতপক্ষে এগুলি ভগবানেরই নির্দেশনায় সম্পাদিত হয়। কিন্তু হিরণ্যকশিপু স্বর্গলোক অধিকার করার ফলে সে সমস্ত স্বর্গীয় ব্যবস্থাপনাগুলিও অধিকার করে বসেছিল। ফলে পবনদেব আর বায়ুর পরিচালনা করছিলেন না, ইন্দ্র বারি বর্ষণের কার্য পরিচালনা করছিলেন না এবং অগ্নিদেব আগুনের পরিচালনা করছিলেন না। সেগুলি পরিচালনা করছিল হিরণ্যকশিপু। তার ফল কি হয়েছিল? তার ফলে আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় যে, হিরণ্যকশিপুর ব্যবস্থাপনায় এমন সুন্দরভাবে প্রকৃতি পরিচালিত হচ্ছিল যে, সমস্ত ঋতুতেই সমস্ত বৃক্ষলতা ফলে ফুলে শোভিত ছিল। যেমন এখন আমরা দেখতে পাই যে, সমস্ত ঋতুতেই সব কিছু পাওয়া যায়। আগে একটি বিশেষ সময়ে ফুলকপি বাঁধাকপি পাওয়া যেত। কিন্তু এখন প্রায় সারা বছর ধরেই ফুলকপি বাঁধাকপি পাওয়া যায়, তেমনি পটল, পালং শাক এগুলি একটি বিশেষ সময়ে পাওয়া যেত, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এই সমস্ত শাক-সব্জিগুলি সারা বছর ধরেই পাওয়া যায়। আপাতদৃষ্টিতে  মনে হয় এটা খুব ভাল হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে তা নয়। বিশেষ ঋতুতে বিশেষ ফল ফুল শাক সব্জি হওয়ার ফলে সেগুলির একটি বিশেষ প্রভাব ছিল সেই ঋতু অনুযায়ী। কিন্তু সে প্রভাবগুলি নিয়ন্ত্রণ করেন কে? ভগবানের নির্দেশনায় সেগুলি নিয়ন্ত্রন করেন ভগবানের দ্বারা নিয়োজিত যে সমস্ত অধ্যক্ষ রয়েছেন, তাঁরা। কিন্তু যখন আসুরিক সভ্যতার বিকাশ হয়, যার প্রতীক হচ্ছে হিরণ্যকশিপু, তখন আসুরিক সভ্যতার প্রভাবে কি হয়? গূঢ় কারণটি বা গুঢ় প্রয়োজনটির ব্যাপারে তারা মাথায় ঘামায় না, তারা আপাত কারণটি নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আপাতদৃষ্টিতে সারা বছরই যদি সব রকমের ফুল, সব রকমের ফল পাওয়া যেত তাহলে ভালই হতো বলে মনে হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেটা ভাল নয়। চরম বিচার্য বিষয় ভগবান যেভাবে করেছেন সেই ভাবে চলাটাই আমাদের পক্ষে মঙ্গলজনক, সকলের পক্ষেই মঙ্গল জনক। কিন্তু যারা ভগবদ্বিদ্বেষী তারা ভগবানের নিয়মটি উল্টে দিয়ে তাদের নিজেদের নিয়ম প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু তার ফলে কি হয়, একটা সময়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয়ে একটা প্রচন্ড ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি গড়ে ওঠে। যেমন ভগবানের নিয়মে যারা ভারতবর্ষের মতো দেশে জন্ম গ্রহণ করে, তারা তাদের পুণ্যের ফলে এদেশে জন্ম গ্রহণ করে এবং ভারতবর্ষের মতো দেশে জন্ম গ্রহণ করার ফলে প্রকৃতির নিয়মেই নানারকম সুযোগ সবিধা পাওয়া যায়। যেমন ভারতবর্ষে প্রকৃতির দান অত্যন্ত বহুল পরিমানে বর্ষিত হয়। ভারতবর্ষ এমন একটি দেশ যেখানে অনায়াসে সব কিছু লাভ হয়। জীবনযাত্রা অত্যন্ত সরল, সহজ, এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন যে এখানে গাছের তলায় শুয়ে রাত কাটানো যায়। খোলা আকাশের নীচে শুয়ে অনেক মানুষ এখনও ভারতবর্ষে দিন কাটায়। শ্রীল প্রভুপাদ নিজেও গরমের সময় ছাদের উপরে খোলা আকাশের নীচে ঘুমাতেন, ঘরে ঘুমাতেন না এবং ভারতবর্ষের মতো দেশে যে কোন জায়গায় গেলেই প্রচুর পরিমাণে খাবার পাওয়া যায়। গ্রামের দিকে গেলে ফল মূল শাক সব্জি এগুলি অনায়াসে পাওয়া যায়। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য যে দেশগুলি– ইউরোপ, আমেরিকা সেখানে মানুষ সেই ভাবে জীবন যাপন করতে পারে না। ইউরোপ আমেরিকায় কেবল গ্রীষ্মকালটাতেই একটুখানি গরম, তাছাড়া অন্যান্য সময় এত ঠান্ডা যে বাইরে শোয়ার কথা, এমন কি গ্রীষ্মকালেও, কেউ ভাবতে পারে না। শীতের সময় তো প্রচুর তুষারপাত হয়। সুতরাং হিটিং এর ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ মরে যাবে তাই এখানে জীবন অত্যন্ত কঠিন ছিল। কিন্তু আসুরিক সভ্যতার প্রভাবে ঐ খানের জীবনটা সরল  হয়ে গেছে আর ভারতবর্ষের মতো দেশে জীবনটা অত্যন্ত কঠিন হয়ে গেছে। এখন ভারতবর্ষের লোকেরা মনে করে এটা অত্যন্ত দরিদ্র দেশ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভারতবর্ষ সবচাইতে ঐশ্বর্য মন্ডিত। কিন্তু আধুনিক তথাকথিত সভ্যতার বিচারে ধন-সম্পদের মাপকাঠি কি? কল কারখানা এবং যান্ত্রিক প্রগতি। এখন ওদের দেশে অর্থাৎ পাশ্চাত্যে যান্ত্রিক প্রগতির প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু ভারতবর্ষে যান্ত্রিক প্রগতির তেমন প্রয়োজন নেই। সাধারণভাবে জীবন যাত্রা নির্বাহের জন্য আমাদের এখানে বিশাল বিশাল যন্ত্র তৈরী করার কোন প্রয়োজন হয় না। পক্ষান্তরে অত্যন্ত সরলভাবে অত্যন্ত সহজভাবে এখানে মানুষ অনায়াসে জীবন যাত্রা নির্বাহ করতে পারে। ভারতবর্ষের মতো জায়গায় কারও যদি দু’বিঘে জমি থাকে, একটা পরিবারের খুব অনায়াসে ভরণ পোষণ হয়ে যায়। দু’বিঘে জমি আর একটা থাকার বাড়ি। এটা যদি থাকে তাহলে একটা পরিবারে অনায়াসে এখানে ভালমতো বেঁচে থাকতে পারে। এটা শ্রীল প্রভুপাদেরই কথা, “দু বিঘে জমি, দুটো গরু আর একটা বাড়ি” আর কোন কিছু ভাবতে হবে না। কিন্তু আমেরিকা ইউরোপের মতো জায়গায় দু’বিঘে কেন ২০০ বিঘে জমি থাকলেও যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। কেননা সেই জমিতে কি চাষ করবে? শীতের সময়ে সমস্ত জমি বরফে ঢাকা থাকে, বসন্তে বরফ গলতে শুরু করে তারপর গ্রীষ্মের সময় একটু খানি গরম পড়ে।
এ তো গেল ইউরোপ আমেরিকার কথা, সেখানে পরিস্থিতি তো তাও ভাল, এখন শাস্ত্রে বলা হয়েছে– যারা অত্যন্ত পাপী, যারা মহাপাপী, তাদের জন্ম হয় মরুভূমিতে অর্থাৎ এখন যা আরব অর্থাৎ মধ্য-প্রাচ্যের দেশগুলি, সেই দেশগুলো হচ্ছে মুরুভূমি এবং সেই মরুভুমিতে জন্ম কাদের হয়? যারা মহা পাতকী তাদের জন্ম হয় মরুভূমিতে। মরুভূমিতে জন্ম হওয়ার ফলে তাদের প্রচন্ড কষ্ট স্বীকার করতে হয়। একে তো সেখানে প্রচন্ড গরম, দ্বিতীয়ত সেখানে খাবার নেই, জল নেই, প্রচন্ড কষ্টকর তাদের জীবন। কিন্তু আজকে দেখতে পাচ্ছি, যে দেশগুলি মরুভূমি সেই  দেশিগুলিই সবচেয়ে ধনী হয়ে গেছে। এইভাবে কলির প্রভাবে সমস্ত পরিস্থিতিটা উল্টে গেছে। এটাই কলিযুগের প্রভাব অর্থাৎ অধর্মের যুগ। অন্যান্য যুগে মানুষের ধর্মের প্রভাবে সুখ ভোগ হয় আর অধর্মের প্রভাবে দুঃখ ভোগ হয়। কিন্তু কলিযুগ যেহেতু অধর্মের যুগ তাই অধর্মের প্রভাবে সুখ ভোগ হয়, আর ধর্মের প্রভাবে দুঃখ ভোগ হয়। সেই জন্য আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি এত ধনবান হয়ে উঠেছে এত বিত্তশালী হয়ে উঠেছে। আর ভারতবর্ষ দারিদ্রে পর্যবসিত হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে তারা সুখে থাকলেও চরমে তাদের জীবন অত্যন্ত দুঃখময়। টাকা পয়সা থাকলেই কি সুখ হয়? পক্ষান্তরে পাশ্চত্য দেশগুলিতে আমরা দেখতে পাই, টাকা পয়সা যার যত বেশী আছে তার জীবন তত বেশী দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। মানুষ সেখানে রাতে ঘুমাতে পারে না, সাধারণতঃ দিনেও ঘুমাতে পারে না। তাই তাদের নানারকম মাদকদ্রব্য নিয়ে ঘুমাতে হয়। শুধু ঘুমানোই নয়, তাঁদের বেঁচে থাকাটাও মাদকদ্রব্য ছাড়া দুষ্কর। আর সেই সমস্ত মাদকদ্রব্য শুধু মদ-মদিরাই নয়, তা অত্যন্ত উগ্রস্তরের বিষাক্ত মাদকদ্রব্য।
যারা বুদ্ধিমান তারা ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রিত করে জীবনযাপন করবে। আর যারা নির্বোধ তারা ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে জীবপযাপন করে। ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে জীবনযাপন করলে তার যত কিছুই প্রাপ্তি হোক না কেন পরিণামে তার তৃপ্তি হয় না। আর অতৃপ্তি হচ্ছে দুঃখের কারণ। যদি কারও কাছে কিছু নাও থাকে কিন্তু অন্তরে তিনি যদি তৃপ্তি হন তাহলে তিনি সুখেই আছেন, আর যদি কারও কাছে সবকিছু থাকা সত্ত্বেও যদি তিনি অন্তরে অতৃপ্ত হন তাহলে তিনি দুঃখেই আছেন। তাহলে সুখ বা দুঃখের মূল কারণটি হচ্ছে তৃপ্তি এবং অতৃপ্তি, অন্তরে সন্তুষ্টি এবং অশান্তি। অন্তরে যিনি সন্তুষ্ট তার কাছে যদি কিছু নাও থাকে তবুও তিনি সুখী । আর অন্তরে যিনি অতৃপ্ত, অন্তরে যিনি অসন্তুষ্ট, অন্তরে যিনি অশান্ত, তার কাছে সবকিছু থাকলেও তিনি অসুখী। হিরণ্যকশিপুর মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যদিও সে প্রচন্ড ক্ষমতাশালী হয়েছিল, ত্রিভুবন জয় করেছিল, স্বর্গের দেবতাদের স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করে তার দাসের দাসে পরিণত করেছিল, হিরণ্যকশিপুর স্বর্গের দেবতাদের দিয়ে তার বাড়ির কাজ করাতো, কেউ তার ঘর মুছতো, কেউ তার বারান্দ ঝাড়– দিত, কেউ তার জল  বয়ে আনতো, স্বর্গের দেবতাদের দিয়ে সে তার নিজের কাজগুলি করাতো, এত ক্ষমতাশালী সে হয়ে গিয়েছিল। সে ত্রিভুবন জয় করে ত্রিভুবনের সমস্ত কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করছিল, কিন্তু তা সত্ত্বেও হিরণ্যকশিপু অতৃপ্ত। কারণ সে তার ইন্দ্রিয়ের দাসে পরিণত হয়েছে। যারা ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করে, যারা গো-দাস তারা সর্ব অবস্থাতেই অতৃপ্ত থাকে, কেননা ইন্দ্রিয়ের অবস্থাটি এই রকম। ইন্দ্রিয় সব সময়ই ভোগ চাইছে। সে সর্বদাই বলে আমি এটা চাই আমি ওটা চাই। কিন্ত সে যতই পায় কখনও কি তৃপ্ত হয়? এই সম্বন্ধে বলা হয়েছে–আগুনে যেমন ঘি ঢালার ফলে কখনও আগুন নেভানো যায় না, ঠিক তেমনি ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ করার মাধ্যমেও ইন্দ্রিয়গুলিকে তৃপ্ত করা যায় না।
না জাতো কামান্ উপভোগের সংযতে। অর্থাৎ উপভোগের দ্বারা কখনই ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করা যায় না বা তৃপ্ত করা যায় না। অগ্নিতে যমন ঘি ঢালার ফলে সেই আগুনটি কখনই নেভানো যায় না। ঘি ঢেলে কি আগুন নেভানো যায়? পক্ষান্তরে কি হয়? যতই ঘি ঢালবে ততই আগুন বাড়তে থাকবে। আগুন উদ্দীপ্ত হয়ে উঠবে। অর্থাৎ যারা ইন্দ্রিয় উপভোগের মাধ্যমে তৃপ্তি সাধন করতে চায় তারা কখনই তৃপ্ত হতে পারে না।
তাহলে আমরা যদি প্রকৃতপক্ষে সুখী হতে চাই তবে আমাদের কি করতে হবে? ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করার পরিবর্তে ইন্দ্রিয়কে সংযত করতে হবে। আমরা যদি ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করি, অর্থাৎ ইন্দ্রিয় যা চায় তা যোগান দেওয়ার জন্য যদি আমরা তৎপর হই, তা হলে আমরা কোন দিনই সুখ ভোগ করতে পারব না। জড় জাগতিক জীবন মানে হচ্ছে ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করা। চোখ বলছে আমাকে এটা দাও, তখন সঙ্গে সঙ্গে সে সেটা পাওয়ার জন্য তৎপর হচ্ছে। তাহলে সে কার দাসত্ব করছে? ইন্দ্রিয় বলছে আমাকে এটা দাও তখন সে সেটা পাওয়ার জন্য ছুটছে। তেমননি স্পর্শ ইন্দ্রিয় বলছে আমি এটা চাই, ঘ্রাণ ইন্দ্রিয় বলছে আমি এটা চাই, জিহ্বা ইন্দ্রিয় বলছে আমি এটা চাই এবং কর্ণ ইন্দ্রিয় বলছে আমি এটা চাই। এখন সেই বেচারা এই পাঁচ ব্যক্তির দাসত্ব করতে গিয়ে  হিম-সিম খাচ্ছে। এক জনের দাসত্ব করাই কঠিন, আর পাঁচ জনের দাসত্ব করা, বিশেষ করে যখন পাঁচ জন এক সঙ্গে দাবী করতে থাকে, তখন তার অবস্থাটা কি রকম হয়? অতএব আমরা কি ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করব, না ইন্দ্রিয়কে সংযত করব? ইন্দ্রিয় সংযম করার উপায়টি কি? ইন্দ্রিয় সংযমের উপায়টি হচ্ছে যেমন– আমাদের দেহটিকে যদি একটি রথের সঙ্গে তুলনা করি, ইন্দ্রিয়গুলিকে যদি পাঁচটি ঘোড়ার সঙ্গে তুলনা করি, পঞ্চ ইন্দ্রিয় পাঁচটি ঘোড়া, তাহলে এই রথটি কিভাবে আমাদের চালাতে হবে? ঘোড়াগুলিকে সংযত করার জন্য লাগাম দরকার। লাগামটি কি? মন। তাহলে এই মন দিয়ে ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করতে হবে। লাগাম ছাড়া কি ঘোড়াগুলি সামলানো যায়? আবার লাগামটাকে সংযত করতে হলেও একজন সুদক্ষ সারথি বা চালক প্রয়োজন। তাহলে এখানে সারথি কে? বুদ্ধি হচ্ছে সারথি, আবার বুদ্ধি নিজে নিজেও যথার্থ সারথ্য করতে পারে না। বুদ্ধি কি করে? যথর্থ সারথি কে? কৃষ্ণ। আমাদের বুদ্ধিটি যদি কৃষ্ণকে অর্পণ করি তাহলে ইন্দ্রিয়গুলি পরিচালিত হবে মনের দ্বারা। তাই ভগবদ্গীতার নির্দেশটি কি পাচ্ছি আমরা? মনটাকে কৃষ্ণকে অর্পণ কর–“মন্মনা ভব” তাহলে লাগামটা কৃষ্ণের হাতে তুলে দাও। লাগামটা যদি কৃষ্ণের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাহলে ইন্দ্রিয়গুলি সংযত হবে। রথটা চলবে ঠিকমতো। দেহরূপ রথটা যদি ঠিকমতো চলে তাহলে আমাদের গন্তব্য স্থানটি কোথায়? ভগবদ্ধামে। অতএব প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ কি? লাগামটি কৃষ্ণের হাতে তুলে দেওয়া। অতএব সেই জন্যই বলা হয়েছে মন্মনা ভব। “মন্মনা” হতে হলে কি করতে হবে? “মদ্ভক্ত” কৃষ্ণের ভক্ত না হলে মনটা শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে অর্পণ করা যাবে না। আবার যদি ভক্ত হই তাহলে কি হবে? “মদযাজি” যজনা করতে হবে। “মাম নমস্কুরু” কৃষ্ণের চরণে প্রণতি নিবেদন করে নিজেকে সর্বতোভাবে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে অর্পণ করতে হবে।
ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে–
যঃ শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য বর্ততে কামকারতঃ।
ন স সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্ ॥ (গীতা ১৬/২৩)
–অর্থাৎ যারা শাস্ত্রবিধি পরিত্যাগ করে কামাচারে প্রবৃত্ত হয় তারা সিদ্ধি সুখ বা পরাগতি লাভ করতে পারে না।
–তাই যারা বুদ্ধিমান তারা শাস্ত্রবিধি অনুসরণ করবেন। এই যুগের শাস্ত্র বিধি হচ্ছে–
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা ॥ (বৃহন্নারদীয়পুরাণ ৩/৮/১২৬)
এবং সেই সঙ্গে চারটি ধর্ম আচরণ– তপঃ, দয়া, শৌচ ও সত্য পালন করতে হবে আর সেটি পালনের জন্য আমিষ আহার, নেশা, অবৈধ যৌনসঙ্গ ও দ্যূতক্রীড়া বর্জন করতে হবে। ফলে যারা বুদ্ধিমান তারা শাস্ত্র অনুযায়ী জীবনযাপন করবেন। আর সেটা করতে সাধু সঙ্গে থাকতে হবে। সেই জন্য বলা হয়েছে কখনই ভক্তসঙ্গ ছেড়ে যেও না। সর্বদাই সাধুসঙ্গে বা ভক্তসঙ্গে থেকে ভগবানের সেবা কর। যদি সাধুসঙ্গ ছেড়ে আমরা চলে যাই, আমাদের ভগবদ্ভক্তি অনুশীলন করা দুস্কর হয়ে উঠবে। ক্রমে ক্রমে আমরা মায়ার কবলিত হব।
সাধুসঙ্গ সাধুসঙ্গ সর্বশাস্ত্রে কয়।
লব মাত্র সাধুসঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয় ॥
শাস্ত্র শব্দটির অর্থ যা আমাদের কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রিত করে। শাস্ত্রবিধি কখনও লঙ্ঘন করা যায় না। কর্তব্য এবং অকর্তব্য নির্ধারণে শাস্ত্রই প্রমাণ। অতএব শাস্ত্র অনুসারে আচরণ করা কর্তব্য।

Comments are closed.

October 2015
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  

Blog Stats

  • 140,959 hits