রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে ছ’বছরের রাজপুত্র ধ্রুব তাঁর তপস্যার জন্য বনে গমনের সময়ে তাঁর গুরুদেব নারদ মুনির আদেশ সর্বান্তঃকরণে পালন করেছিলেন। ধ্রুব মহারাজ মধুবনে পৌছে, যমুনা নদীতে স্নান করেছিলেন এবং গভীর মনোযোগ সহকারে সেই রাত্রে উপবাস করেছিলেন। তারপর দেবর্ষি নারদের উপদেশ অনুসারে তিনি পরমেশ্বর ভগবানের আরাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন। (ভাগবত ৪/৮/৭১)
শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ এই বিশেষ শ্লোকের তাৎপর্যে লিখেছেন, ধ্রুব মহারাজ তাঁর গুরুদেব দেবর্ষি নারদের উপদেশ অনুসারে আচরণ করেছিলেন। শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তীও উপদেশ দিয়েছেন যে, আমরা যদি ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই অত্যন্ত নিষ্ঠাপূর্বক শ্রীগুরুদেবের নির্দেশ পালন করতে হবে। সেটিই হচ্ছে সিদ্ধি লাভের উপায়। সিদ্ধি লাভের ব্যাপারে উৎকন্ঠিত হওয়ার কোন কারণ নেই, কেননা কেউ যদি গুরুদেবের উপদেশ পালন করেন, তা হলে তিনি অবশ্যই সিদ্ধিলাভ করবেন। গুরুদেবের আদেশ কিভাবে পালন করা যায়, সেটিই আমাদের একমাত্র চিন্তা হওয়া উচিত। গুরুদেব তাঁর প্রতিটি শিষ্যকে বিশেষ আদেশ প্রদানে অত্যন্ত পারদর্শী, এবং শিষ্য যদি গুরুদেবের অদেশ পালন করে, তা হলে সেটিই হচ্ছে সিদ্ধি লাভের আদর্শ পন্থা।
ধ্রুব মহারাজও গুরুদেবের আদেশ পালন করেছিলেন কোনও রকম প্রশ্ন না করে। পারমার্থিক জীবনে সাফল্য লাভের এইটিই একমাত্র পন্থা। পারমার্থিক জীবনের শুরু হয় গুরু পাদাশ্রয়ের মাধ্যমে। যখন শ্রদ্ধার উদয় হয়, তখন ভগবানের প্রতি বিশ্বাস আসে। ভগবান যে রয়েছেন, তিনি যে সবকিছু পরিচালনা করছেন, তিনি যে পরম ঈশ্বর, তিনি যে পরম পুরুষ, সেই বিশ্বাসের উদয় হয়।
সেই বিশ্বাসের ফলেই আমরা জানতে পারি যে, এই জগতে আমাদের যে জীবন, সেইটিই সবকিছু নয়। এই জীবনের পূর্বে আমরা ছিলাম এবং এই জীবনের পরেও আমরা থাকব। আর যেভাবে আমরা আচরণ করব, সেই অনুসারে আমরা ফল ভোগ করব। যেভাবে জীব কর্ম করে, সেই কর্ম অনুসারে সে তার ফল ভোগ করে।
অতএব এই জীবনে আমরা যেভাবে আচরণ করছি, যে কাজগুলি করছি, সেই বিষয়ে আমাদের খুব সতর্ক থাকা উচিত যাতে আমরা এমনভাবে আচরণ করি যার ফলে আমাদের উন্নতিই হয়। অবনতি যেন না হয়। আমরা যদি অন্যায়ভাবে আচরণ করি, অবৈধভাবে আচরণ করি, তা হলে সেই অন্যায় আচরণের ফলে আমাদের দন্ডভোগ করতে হবে। সেই দন্ডটি কি রকম? অন্যায় আচরণের ফলে আমরা অধঃপতিত হব, নিম্নগামী হব। আমরা যতই নিম্নগামী হব, ততই আমরা দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করি। আর যত আমরা ঊর্ধ্বগামী হই, ততই আমরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করব।
এমন নয় যে, এই জীবটাই সবকিছু বা এই জীবনটা শেষ হয়ে গেলেই বুঝি সব শেষ হয়ে গেল। সেটা মূর্খের বিচার। তাই মূর্খেরা মনে করে, যাবজ্জীবেৎ সুখং জীবেৎ, ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ। এটা মূর্খের বিচার-যদ্দিন বেঁচে আছি, চুরি করে হোক, ডাকাতি করে হোক, ঋণ করে হোক, লোক ঠকিয়ে হোক, ভাল করে থাকব, ভাল করে খাব। কেননা, দেহটা যখন ভস্মীভূত হয়ে যাবে, তখন সব শেষ হয়ে যাবে। ভস্মীভূত দেহের পাপপুণ্য কি আছে? এটা চার্বাক মুনির বিচার।
কিন্তু যারা বুদ্ধিমান, তারা জানে যে, এই জীবনটাই সব কিছু নয়। এই জীবনের সমাপ্তি হলে জীবের অস্তিত্বের সমাপ্তি হয় না। আমরা এই জীবনের পরেও থাকব–মৃত্যুর পরেও থাকব। মৃত্যুর পরেও আমাদের পুনরাগমন হবে। মৃত্যুর পরে আমরা আর একটি শরীর প্রাপ্ত হব।
তবে কি ধরনের শরীর প্রাপ্ত হব এবং কি ধরনের জীবনযাপন করব, সেটা নির্ধারিত হবে আমাদের বর্তমান কার্যের ধারা অনুসারে। আমরা যদি এই জন্মে, এই জীবনে যথাযথভাবে আচরণ করি, তা হলে পরবর্তী জীবনটি সুখের হবে এবং আমরা আমাদের পরবর্তী জীবনে একটি উন্নততর শরীর প্রাপ্ত হব। শুধু পরবর্তী জীবনেই নয়, এই জীবনটিও সুখের হবে।
এটা আমাদের মনগড়া কথা নয়। আমাদের ব্যবহারিক জীবনেও আমরা দেখতে পাই এবং শাস্ত্রেও সেই কথা নির্ধারিত হয়েছে, সত্য বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। ভগবদ্ভক্তির পন্থাটি এত সুন্দর যে, যাঁরাই এটি অনুসরণ করেন, তাঁরা যেখানেই থাকেন, মহানন্দে থাকেন।
ধ্রুব মহারাজ ছ’বছরের একটি শিশু। সে রাজপুত্র, রাজার ছেলে। কিন্তু সে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে গেছে কোথায়? বনে। বনে তো নানারকম কষ্ট পাওয়ার কথা। কিন্তু ধ্রুব মহারাজ আনন্দেই আছেন। ভক্ত গৃহে থাকে বা বনে থাকে, সে সর্বত্রই মহা আনন্দে থাকে। “গৃহে বা বনেতে থাকো, ‘হা গৌরাঙ্গ’ বলে ডাকো।”
শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর বলেছেন, “গৃহে থাক, বনে থাক, সদা ‘হরি’ বলে ডাক।” যেখানেই হরিনাম, সেখানেই আনন্দ। শ্রীল প্রভুপাদও তাই বলেছেন, “ Chant Hare Krishna and Be Happy” হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন কর এবং মহা আনন্দে থাকো।
এইটিই হচ্ছে ভগবদ্ভক্তির সরল পন্থা। আর যারা ভগবদ্ভক্তির পন্থা অবলম্বন করেনি, তারা যেখানেই থাকুক, সেখানেই তারা অসুখী। তারা প্রাসাদে থাকলেও অসুখী, তারা বনে থাকলেও অসুখী। তারা যেখানে থাকে সেখানেই তারা অসুখী। তারা অভাবে থাকলেও অসুখী, ঐশ্বর্যে থাকলেও অসুখী।
এটিই হচ্ছে জড়বাদী বা সংসারে আসক্ত ব্যক্তিদের অবস্থা। কিন্তু যারা কৃষ্ণভক্ত, তারা সর্ব অবস্থাতেই মহা আনন্দেই থাকে।
এখন, এই যে ভক্তির পন্থা, তার জন্য প্রথম কথাটি হচ্ছে আদৌ শ্রদ্ধা। ভগবান যে আছেন, এই বিশ্বাস যাদের আছে– তাদের বলা হয় আস্তিক। যারা মনে করে ভগবান নেই, তাদের বলা হয় নাস্তিক।
যাঁরা ভক্ত, তাঁরা বিশ্বাস করেন ভগবান আছেন, এবং আমাদের এই জীবনের পরেও আমাদের অস্তিত্ব থাকবে, এই জীবনের কর্ম অনুসারে আমাদের পরবর্তী জীবন নির্ধারিত হবে, তাঁরা অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে এই জীবনটি যাপন করবেন।
সাবধানতার সঙ্গে কিভাবে জীবনযাপন করতে হয়? প্রথমে এমন কারও আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়, যিনি আমাদের পথ প্রদর্শণ করতে পারবেন। যেমন, আমরা যখন কোনখানে যাই, এবং এই জায়গাটিতে কিভাবে যেতে হয়, আমরা যদি না জানি, তা হলে কি করতে হয় আমাদের? আমাদের কাউকে জিজ্ঞাসা করতে হয়– যে পথের সন্ধান জানে।
যেমন, আপনারা আজ মায়াপুরে এসেছেন। আপনারা হয়তো অনেকেই জানতেন না কিভাবে আসতে হয়। এলেন কি করে? এমন কাউকে আশ্রয় ভরসা করেছেন, যে পথ জানে। যে পথ জানে, সে অনায়াসে আপনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসতে পারবে। আপনি নিশ্চিন্তে তাঁকে অনুসরণ করে মায়াপুরে পৌছে গেছেন– পথে কোনও অসুবিধা হয় নি। কিন্তু সেরকম কাউকে যদি না পেতেন, তা হলে কি হত? অসুবিধা হত।
এখন, যদি আমরা ভঘবদ্ধামে যেতে চাই, ভগবানের কাছে ফিরে যেতে চাই, তা হলে এমন কাউকে প্রয়োজন, যে পথ চেনে, যে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। আর সেইরকম কোনও ব্যক্তির যদি সন্ধান আমরা পাই, তা হলে দুশ্চিন্তার কোনও কারণ থাকে না। তখন আমরা অনায়াসে ভগবানের কাছে পৌছে যেতে পারব।
ভগবানের কাছে পৌছতে গেলে প্রথমে কি করতে হবে? প্রথমে আমাদের এই সংসাররূপ যে সমুদ্র, সেই ভবসাগর উত্তীর্ণ হতে হবে। সাগর পার হতে হলে কিসের দরকার? এমন নৌকায়া উঠতে হবে, যে-নৌকার কান্ডারী, বা কর্ণধার, সে ভাল করে নৌকাটা চালাতে পারে।
এই সংসার-সমুদ্র উত্তীর্ণ হতে হলে গুরুরূপ কর্ণধারের প্রয়োজন। ভাল নৌকায় যখন কেউ উঠে বসেন, তখন আর কোনও চিন্তা থাকে? কান্ডারী ভাল আছে, নৌকাটাও মজবুত আছে, অতএব আর ভাবনা কি? সুতরাং আমি নৌকাতে বসে থাকব আর পরপারে পৌছে যাব।
এখন, এই নৌকাটি হচ্ছে এই আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ, ইসকন। নৌকা তো নয়, বিশাল এক জাহাজ! এই জাহাজের কর্ণধার হলেন শ্রীল প্রভুপাদ। ইসকন সেই জাহাজ! এই জাহাজে উঠে বসলে আমরা যথাসময়ে গন্তব্যস্থলে পৌছে যাব। গন্তব্যস্থল হল ভগবদ্ধাম।
কিন্তু যদি এই জাহাজ থেকে আমরা মাঝপথে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে সাঁতরাতে যাই, যদি মনে করি জাহাজটা তেমন ভাল নয়, তাহলে ভবসাগর পার হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। অতএব খুব সাবধানে, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে শ্রীল প্রভুপাদের পাদপদ্ম যথাযথভাবে অবলম্বন করে পারমার্থিক জীবনে আমাদের এগুতে হবে।
সেটা যদি আমরা করতে পারি, তা হলে যথাসময়ে আমরা ভগবদ্ধামে অবশ্যই পৌছতে পারব। যেহেতু শ্রীল প্রভুপাদ ইসকনের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য তাই যাঁরাই এই সংঘে যোগদান করেন, তাদের সকলেরই তিনি শিক্ষাগুরু। শ্রীল প্রভুপাদের শিক্ষাকে আশ্রয় করেই সমস্ত গুরুরা এবং সমস্ত ভক্তরা অন্যদের পথ প্রদর্শণ করে থাকেন। যদি আমরা শ্রীল প্রভুপাদের আশ্রয়ে থেকে আমাদের ভক্তিজীবন অনুশীলন করি, তা হলে আমাদের কোনও অসুবিধা হবে না।
এইভাবে গুরু পরম্পরায় ভগবদ্ভক্তির যে পন্থা আমরা পেয়েছি, এটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পরম কৃপা। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং গুরুরূপে এসেছিলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুরূপে। কারণ গুরুর পদাশ্রয় গ্রহণ করলে সর্বপ্রকার অনর্থ নিবৃত্ত হয়। আপনারা সকলে সেইভাবে ভগবদ্ভক্তির অনুশীলন করুন।