আজ আমাদের পরম সৌভাগ্য যে, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাব তিথি উদযাপন উপলক্ষ্যে আমরা সকলে সমবেত হয়েছি। শ্রীচৈতন্য মহপ্রভুর পুণ্য পবিত্র ধাম, শ্রীমায়াপুরধামে আমরা মিলিত হতে পেরেছি, এ আমাদের বিশেষ সুকৃতির ফল। এই শ্রীমায়াপুরধামেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যিনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ থেকে অভিন্ন, যিনি শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকার মিলিত তনু থেকে ভিন্ন নন– তিনিই আবির্ভূত হয়েছিলেন শ্রীমতী শচীমাতার পুত্রসন্তান রূপে।
এই উপলক্ষে আমি শুধু একটি মহাজনবাক্য পড়ে শোনাতে চাই–এটি তদানীন্তন সর্বশ্রেষ্ঠ পন্ডিত শ্রীল সার্বভৌম ভট্টাচার্য রচনা করেছিলেন। তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বৈদান্তি পন্ডিত, তাঁকে সেই যুগের বেদান্ত দর্শনের সর্বোত্তম ভাষ্যকার রূপে বিবেচা করা হতো। আর তা ছাড়া তিনি ছিলেন এক বিশিষ্ট কবি। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এবং তাঁর পার্ষদবর্গের মহিমা কীর্তনমূলক বহু ভক্তিগীতি তিনি রচনা করেছিলেন। তাঁর সেই শ্রীশচীতনয়াষ্টকম্ বা শ্রীশচীসূতাষ্টকম্ ছিল এই ধরণের ভাবসম্বলিত–
উজ্জ্বল-বরণ-গৌরবর দেহং
বিলসিত-নিরবধি-ভাব-বিদেহম্।
ত্রিভুবন-পাবন-কৃপায়াঃ লেশং
তং প্রণামামি চ শ্রীশচীতনয়ম্ ॥১ ॥
যাঁর উজ্জ্বল বরণ, গৌরবর্ণ সুন্দর দেহখানি নিরবধি অসীম ভাবসমূহে বিশেষরূপে উপচিত হয়ে শোভা পাচ্ছে, যাঁর কৃপা ত্রিলোক পবিত্র করে সেই (কলিযুগপাবনাবতারী রাধাকৃষ্ণমিলিততনু ভগবান) শ্রীশচীতনয়কে প্রণাম করি।
গদ-গদ-অন্তর-ভাববিকারং
দুর্জন-তর্জন-নাদ-বিলাসম্।
ভব-ভয়-ভঞ্জন-কারণ-করুণং
তং প্রণমামি চ শ্রীমচীতনয়ম্ ॥ ২ ॥
যাঁর বাক্য গদগদ, অন্তর ভাববিকারে দ্রবীভূত, যাঁর হুঙ্কারে (সিংহনাদে) দুর্জনগণ ভীত হয়, যাঁর করুণা সংসার ভীতি খন্ডন করে, সেই শচীতনয়কে প্রণাম করি।
অরুণাম্বর-ধর-চারু-কপোলং
ইন্দু-বিনিন্দিত-নখচয়-রুচিরম্।
জল্পিত-নিজগুণ-নাম-বিনোদং
তং প্রণমামি চ শ্রীশচীতনয়ম্ ॥ ৩ ॥
যাঁর পরিধানে অরুনবসন, যাঁর সুন্দর গন্ডদেশ ও নখকান্তি চন্দ্রকে নিন্দা করে, যিনি নিজের (শ্রীশ্রীরাধা-কৃষ্ণের) নাম, গুণ ও লীলা কীর্তন করেন অথবা নিজ নাম গুণকীর্তনে উল্লসিত হন, সেই শ্রীশচীতনয়কে প্রণাম করি।
বিগলিত-নয়ন-কমল-জলধারং
ভূষণ-নবরস-ভাববিকারম্ ।
গতি-অতি-মন্থর-নৃত্য-বিলাসং
তং প্রণমামি চ শ্রীশচীতনয়ম্ ॥ ৪ ॥
যাঁর নয়নপদ্ম থেকে জলধারা বিগলিত হচ্ছে, নব নব অপ্রাকৃত রসাস্বাদজনিত ভাববিকারসমূহ যাঁর ভূষণ, যাঁর গমন অতি ধীর, যাঁর নৃত্য বিচিত্র, সেই শ্রীশচীতনয়কে আমি প্রণাম করি।
চঞ্চল-চারু-চরণ-গতি-রুচিরং
মঞ্জীর-রঞ্জিত পদযুগ-মধুরম্।
চন্দ্র-বিনিন্দিত-শীতল-বদনং
তং প্রণমামি চ শ্রীশচীতনয়ম্ ॥ ৫ ॥
যাঁর চঞ্চল পদের গমনভঙ্গি মনোহর, (মঞ্জীর) নূপুর যাঁর পদদ্বয়ের (মাধুর্য) শোভা সম্পাদন করছে, যাঁর বদন চন্দ্র অপেক্ষা শীতল, সেই শ্রীশচীতনয়কে প্রণাম করি।
ধৃত-কটি-ডোর-কমন্ডুল-দন্ডং
দিব্য-কলেবর মুন্ডিত-মুন্ডং।
দুর্জন-কল্মষ-খন্ডন-দন্ডং
তং প্রণমামি চ শ্রীশচীতনয়ম্ ॥ ৬ ॥
কটিদেশ ডোর (কৌপিন-বহির্বাস), হস্তে দন্ড, কমন্ডলু প্রভৃতি ভূষণে বিভূষিত যাঁর দিব্য কলেবর, মস্তক মুন্ডিত, যাঁর দন্ড (ধারণ) দুর্জনগণের পাপ খন্ডনের জন্য, সেই শ্রীশচীতনয়কে প্রণাম করি।
ভূষণ ভূরজ-অলকাবলিতং
কম্পিত-বিম্বাধরবর-রুচিরম্।
মলয়জ-বিরচিত-উজ্জ্বল-তিলকং
তং প্রণমামি চ শ্রীমচীতনয়ম্ ॥ ৭ ॥
ধরণীর ধূলি নির্মিত অলকাসমূহ যাঁর ভূষণ, যাঁর বিম্বফলের মতো অধর কম্পিত হচ্ছে, যাঁর ললাটে উজ্জ্বল মলয়জ-চন্দনের তিলক শোভা পাচ্ছে, সেই শচীতনয়কে আমি প্রণাম করি।
নিন্দিত-অরুণ-কমলদল-লোচনং
আজানুলম্বিত-শ্রীভুজযুগলম্।
কলেবর কৈশোর নর্তকবেশং
তং প্রণমামি শ্রীশচীতনয়ম্ ॥ ৮ ॥
যাঁর নেত্রযুগল রক্তপদ্মের পত্রতুল্য, বাহুযুগল জানুদেশ পর্যন্ত আলম্বিত, কিশোর-শরীর, নর্তকবেশ, সেই শ্রীশচীতনয়কে আমি প্রণাম করি।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যখন অন্ততপক্ষে বঙ্গদেেেশর এই অঞ্চলটির অতিশয় অবনতি ঘটেছিল। কেবলমাত্র বঙ্গদেশের এই অংশটিই নয়, প্রকৃতপক্ষে সমগ্র ভারতেই নিদারুণ অবনতি হয়েছিল এবং ভারতবর্ষ এক সঙ্কটময় অবস্থার মধ্যে দিয়ে চলেছিল, আর যে কেউ অনুমান করতে পারবে যে, সেই সময়ে পৃথিবীর অবস্থাও হয়ে উঠেছিল বিশেষ দুর্বিপাকগ্রস্ত।
পাঁচশ বছর আগে যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হন, তখন ভারতবর্ষ ছিল মুসলমান কবলিত। কলিযুগ শুরু হওয়ার আগে, ভারতবর্ষ বৈদিক সংস্কৃতি চর্চা করা হতো এবং ভারতবর্ষের শাসকরাই সমগ্র পৃথিবী শাসন করতেন। সমগ্র সসাগরা এই পৃথিবীর সর্বশেষ স¤্রাট ছিলেন পরীক্ষিত মহারাজ। আর পরীক্ষিত মহারাজের শাসনাকাল থেকেই কলিযুগের সূচনা হয় এবং অবনতি শুরু হয়। অধর্মের ব্যাপকতা শুরু হয় এবং ধর্ম লোপ পেতে থাকে। অল্প দিনের মধ্যেই বৈদিক সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়, অথচ সেই বৈদিক সংস্কৃতি যা পূর্বে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিল সমগ্র পৃথিবীতে, তা আসুরিক প্রভাবে লোপ পেতে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে ধর্মের বিলুপ্তি ঘটেছিল ব্রাহ্মণ বংশজাত আসুরিক মানুষদেরই অত্যাচারে এবং কলিযুগের বিশৃঙ্খলার সুযোগে। ব্রাহ্মণ বংশজাত ঐ সমস্ত আসুরিক মানুষগুলিই ব্রাহ্মণ ধর্ম ও সংস্কৃতিকে বস্তুত ধ্বংস করে ফেলে। এই অপকর্মটি তারা করেছিল কলির প্ররোচনায়–যাতে কলির অনুপ্রবেশ সহজসাধ্য হয় এবং অধর্মের কায়েম হয়।
তারই ফলে, ভারতবর্ষ কেবল যে সমগ্র পৃথিবীর আধিপত্য থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে, তাই নয়– ভারতবর্ষ ক্রমে বৈদিক সংস্কৃতি-বিরোধী মুসলমানদেরও নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়েছিল। বাস্তবিকই, মুসলমানেরা সুনির্দিষ্টভাবেই প্রতিজ্ঞা করেছিল যে, তারা ভারতবর্ষের বৈদিক সংস্কৃতির একেবারে বিপরীতধর্মী কার্যকলাপে প্রবৃত্ত হয়ে ঐ সংস্কৃতির ঐতিহ্য ধ্বংস করে দেবে।
এই সম্পর্কে একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে–বৈদিক সংস্কৃতিতে ক্ষত্রিয়েরা গোঁফ রাখত, আর এই বৈদিক ধারার বিরোধিতা করবারই উদ্দেশ্যে মুসলমানেরা তাদের গোঁফ ফেলে দিয়ে দাড়ি রাখতে শুরু করেছিল।
তেমনই, বৈদিক সংস্কৃতি অনুযায়ী গাভীকে অতি পবিত্র প্রাণী রূপে গণ্য করা হয়ে থাকে আর মুসলমানেরা সেই গাভীকেই হত্যা করে বৈদিক সংস্কৃতির উপরে আঘাত হানতে শুরু করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরানের মধ্যে কোথাও উল্লেখ করা নেই যে, মুসলামানদের গাভী হত্যা করে জীবন ধারণ করতেই হবে। বরং, কোরান গ্রন্থে গাভীকে মর্যাদাই দেওয়া হয়েছে। আর, তা ছাড়া, গাভী হত্যার কোনও প্রশ্নই মুসলমানদের সংস্কৃতিতে উত্থাপনের অবকাশ ছিল না, কারণ মুসলামনদের আদি উৎপত্তিস্থান মধ্যপ্রাচ্যের মরু অঞ্চলে গাভী বলে কোনও প্রাণীই ছিল না। যদিও বা সেখানে কারও কাছে একটি গাভী থাকত, তবে তাঁকে লাখপতি ধনী বলে গণ্যমান্য করা হতো।
কিন্তু সেই মুসলমানেরা যখন ভারতবর্ষে এল, তারা বৈদিক সংস্কৃতিকে নষ্ট করে ফেলার মতলবে এমন একটা নীতি নির্ধারণ করল, যা বৈদিক সভ্যতার সম্পূর্ণ বিরোধী। ব্রাহ্মণেরা মাথার পিছনে শিখা রাখেন, তাই তার বিরুদ্ধাচরণ দেখিয়ে মুসলমানেরা তাদের মাথার সামনে চুলের ঝুঁটি রাখতে শুরু করেছিল। তাই লক্ষ্য করা গেছে, তারা বৈদিক সংস্কৃতির সম্পর্ণ বিরুদ্ধাচরণ করবার মনোবৃত্তি নিয়েই এদেশে সব কিছু করতে শুরু করে।
এই কারণেই মুসলমানেরা নির্বিচারে ব্রাহ্মণ হত্যা করে দারুণ মজা পেত এবং এমন একটা সময় এসেছিল, যখন এইভাবে সারা ভারতবর্ষ মুসলমানদের পদানত হয়ে পড়ে এবং তখনই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অবতীর্ণ হন। সেই সমস্ত হিন্দুরা, অর্থাৎ বৈদিক সংস্কৃতির ধারক ও বাহকেরা মুসলামানদের অত্যাচারে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েছিল।
তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আগমন হয় এবং তাঁর আগমনের সময়ে বঙ্গদেশ ছিল মুসলমান শাসনাধীন। এইভাবে অতি সংকটকালে, অতি কঠিন সময়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আবির্ভূত হয়ে প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেখিয়েছেন যে, তিনি যে-পথ অনুসরণ করতে শিক্ষা দিয়েছেন, আমরা নির্ভয়ে সেই পথ অনুসরণ করে ভগবানের বাণী প্রচার করে চলতে কোন বিষয়েই চিন্তিত হবার কোন কারণ নেই।
আমাদের জীবদ্দশাতেই আমরা তার প্রমাণ দেখতে পেয়েছি, আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছে– ইতিমধ্যেই কয়েক বছর আগেও আমাদের কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে ভক্তরা কিভাবে রাশিয়াতে নির্যাতিত হয়েছে, কিন্তু দেখেছি, ভক্তরা নানাভাবে অত্যাচারিত হলেও হতোদ্যম হননি। তাঁরা কৃষ্ণকথা প্রচার চালিয়ে গেছেন, কারণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁদের অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তাঁদের অন্তর থেকে। সেই প্রেরণা তাঁদের প্রাণে এমনই অসামান্য শক্তির সঞ্চার করেছে, যার ফলে দেখতে না দেখতে নাস্তিক কম্যুনিস্ট সরকার উৎখাত হয়ে গেছে রাশিয়া থেকে–কেবল রাশিয়া থেকেই নয়–সমগ্র পৃথিবীর অন্যান্য সমস্ত দেশ থেকেই নাস্তিকতার বিলুপ্তি ঘটতে শুরু করেছে।
অতি সঙ্কটময় পরিস্থিতির মাঝে স্বয়ং আবির্ভূত হয়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু আমাদের এই উপদেশ উপলব্ধি করবারই সুযোগ দিয়েছেন যে, সঙ্কটকালেই ধীর স্থির থেকে দৃঢ় মনোভাবনাপন্ন হয়ে তাঁর বাণী প্রচার করে যেতে হবে। তা হলে ক্রমেই বৈদিক সংস্কৃতি কেবলমাত্র এই বঙ্গদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে এবং বিশ্ববাসীর সমূহ অবনতি রোধ করতে পারবে।