শ্রীমদ্ভাগবত গ্রন্থের ৬ষ্ঠ স্কন্ধের অন্তভুক্ত ২য় অধ্যায়ে বৈকুন্ঠদূতেরা যমদূতদের কাছে শ্রীভগবানের পবিত্র নাম জপের মহিমা বর্ণনা করেছেন। সেখানে বিষ্ণুদূতেরা বলেছেন, “এই যুগে ভগববদ্ভক্তদের মধ্যেও অনেক পাপকর্ম করা হয়ে থাকে, ফলে, অপাপবিদ্ধ মানুষকেও যমালয়ে শাস্তি ভোগের জন্য যেতে হয়। দেশের জনগণ যারা সহায়-সম্বলহীন হয়ে দেশের সরকারের কৃপার ওপরে নির্ভর করে নিরাপত্তা ও শান্তির ভরসায়। কিন্তু সেই সরকারই যদি সেই সহায়হীনতার সুযোগ নিয়ে নাগরিকদের ক্ষতি করতে চায়, তবে তারা যাবে কোথায়?”
এই প্রসঙ্গে বিষ্ণুদূতেরা কান্যকুব্জ (বর্তমান কনৌজ) শহরের অধিবাসী ব্রাহ্মণ সন্তান অজামিলের পাপময় জীবনে কৃষ্ণনামের অত্যাশ্চর্য শুভ পরিণাম ব্যক্ত করেছেন।
অজামিলের মা-বাবা তাকে বেদ পুরাণাদি অধ্যয়ন করিয়ে, বিধিবদ্ধ জীবন যাপনে শিক্ষিত করে তোলেন। কিন্তু অজামিল তার পূর্বজন্মের কর্মফলে সম্ভাবনাময় এক ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও ঘটনাক্রমে এক বারনারীতে আসক্ত হয়ে পড়ে।
তার ফলে, সেই বারণারীর গর্ভে অজামিল দশটি পুত্রসন্তান লাভ করে। তাদের মধ্যে সর্বশেষ কনিষ্ট পুত্রটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘নারায়ণ’।
অজামিলের মৃত্যু শয্যায় যমদূতেরা যখন তার পাপকর্মের শাস্তিদানের জন্য যমালয়ে তার আত্মাকে টেনে নিয়ে যেতে এসেছিল, তখন অজামিল মৃত্যুভয়ে এবং বিকটাকার যমদূতদের দেখে মহা আতঙ্কে চিৎকার করে ‘নারায়ণ’ বলে তার কনিষ্ট পুত্রটিকে ডেকে উঠেছিল, কারণ সেই পুত্রটিই ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়পুত্র।
এইভাবে সে মৃত্যুকালে ভগবান বিষ্ণু তথা শ্রীনারায়নের নাম স্মরণ করতে পেরেছিল, যদিও তা ভক্তিভরে ভগবানের নাম স্মরণ করা নয়।
কিন্তু শ্রীনারায়নের পবিত্র নামটি আকুলভাবে উচ্চারণ করা মাত্রই তৎক্ষণাও ভগবান শ্রীবষ্ণিুর আজ্ঞাবাহকেরা সেখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন।
তখন যমদূত এবং বিষ্ণুদূতদের মধ্যে আলোচনার সূত্রপাত হয়েছিল বলে শ্রীমদ্ভাগবতে তিনটি অধ্যায়ব্যাপী বিস্তারিত বর্ণনা সহ তাৎপর্য ব্যাখ্যাত হয়েছে।
শ্রীভগবানের পবিত্র নামের সর্বশক্তিমত্তা বিষয়ক সেই আলোচনা শ্রবণ করার ফলে মহাপাপী অজামিল পাপমুক্ত হয়েছিল এবং সে উপলব্ধি করতে পেরেছিল–পাপকর্মের সুদূরপ্রসারী কর্মফল কী ভয়ানক এবং সেই সঙ্গে আরও একটি সত্য তার হৃদয়ঙ্গম হয়েছিল যে, ভগববদ্ভক্তির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভগবানের মহিমা শ্রবণ কীর্তন করবার সুযোগ পেলে মহাপাপীও কিভাবে অচিরে জীবনের সর্বোত্তম সার্থকতা অর্জন করতে পারে।
অজামিলের মৃত্যুকালে একবার মাত্র আকুলভাবে ‘নারায়ণ’ নাম উচ্চারণ করার ফলে বিষ্ণুদূতেরা উপস্থিত হয়ে যমদূতদের বাধা দিয়ে বলেছিলেন, “একটিবার শ্রীনারায়ণের নাম গ্রহণ করে অজামিল তার পাপজীবনের কর্মফল থেকে মুক্ত হয়ে গেছে। শুধুমাত্র ইহজীবনের পাপের কর্মফলই নয়, বিগত অনেক অনেক হাজার হাজার পূর্বজন্মের সমস্ত পাপের কর্মফল তার খন্ডিত হয়ে গিয়েছে। এই ভাবেই তার সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে গিয়েছে।
“কেউ যদি শাস্ত্রবিধি অনুসারে বিভিন্ন সংস্কারাদি উদযাপনের মাধ্যমে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে উদ্যোগী হয়, তা হলে তার সমস্ত পাপের কর্মফল বাস্তবিকই খন্ডিত হয়ে যেতে পারে না– কিন্তু যদি কেউ ভক্তিভরে আকুলভাবে পরমেশ্বর ভগবানের পবিত্র নাম জপ কীর্তন করে, তা হলে মুহূর্তের মধ্যেই তার সমস্ত পাপের কর্মফল মুছে যেতে পারে। শ্রীভগবানের পবিত্র নাম জপের মাধ্যমে তাঁর মহিমা স্মরণ করতে পারলে সৌভাগ্য লাভ হয়। অতএব অজামিল নিঃসন্দেহে সমস্ত পাপের কর্মফল থেকে মুক্ত হয়েছে এবং যমরাজের কাছে তার শাস্তিভোগের আর দরকার নেই।”
এই বলে বিষ্ণুদূতেরা অজামিলকে যমদূতের বন্ধন থেকে মুক্ত করে তাকে বৈকুন্ঠধামে সসম্মানে নিয়ে যেত চেয়েছিলেন।
অজামিলের এইভাবে ভগবানের নাম স্মরণ করা নিতান্তই নামাভাস’ মাত্র। কিন্তু তারও মহিমা ভাগবতে বর্ণনা করা হেেছ এই কাহিনীর মাধ্যমে।
অজামিল তার এই অপ্রত্যাশিত সৌভাগ্যলাভে বিস্মিত হয়েছিল এবং ভগবানের নাম গ্রহণের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করে বিষ্ণুদূতদের কাছে তার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছিল। সেই সঙ্গে অজামিল তার পূর্বকৃত পাপকর্মাদির জন্য তীব্র অনুশোচনা ব্যক্ত করেছিল।
বিষ্ণুদূতের সান্নিধ্যলাভের ফলে অজামিল তার স্বরূপ শুদ্ধ চেতনা ফিরে পেয়েছিল এবং সর্বস্ব পরিত্যাগ করে হরিদ্বারে গিয়ে ভগববদ্ভক্তি সেবায় অনন্যমনা হয়েছিল এবং সে নিত্য ভগবৎ-চিন্তায় আত্মনিয়োগ করে। পরে, বিষ্ণুদূতেরা তাকে স্বর্ণ-সিংহাসনে পরমাদরে উপবেশন করিয়ে বৈকুন্ঠলোকে নিয়ে গিয়েছিলেন।
বিষ্ণুদূতেরা এই প্রসঙ্গে যমদূতদের তিরস্কার করে বলেছিলেন, “ভগবানের আশ্রয় যে গ্রহণ করেছে, তাকে শাস্তিদানের যে কোনও প্রচেষ্টাই নিতান্ত অধর্ম। অবশ্য, ধর্মাচরণের জন্য যারা ভারপ্রাপ্ত, তারা অনেকেই অপাপবিদ্ধ মানুষকে অযথা এভাবে শাস্তি প্রদান করে থাকে, তা প্রায়ই দেখা যায়।”
সাধারণ মানুষ ধর্ম আর অধর্মের পার্থক্য খুব ভালভাবে বুঝতে পারে না। যথার্থ জ্ঞানবুদ্ধিবর্জিত নিরীহ মানুষেরা ঠিক যেন প্রভুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকা অজ্ঞ পশুদেরই মতো। দেশের নেতারা যদি বাস্তবিকই সহৃদয়তার সঙ্গে এই ধরনের অজ্ঞ মানুষদের প্রতি কৃপাপরবশ হন এবং তাদের ভগববদ্ভক্তির পথ প্রদর্শণ করতে পারেন, তবে মানুষ সহজে ধর্মপথে অবিচল থাকতে শেখে।
ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করলে ভগবান “সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি” (গীতা ১৮/৬৬) বলে পাপীতাপীকে উদ্ধার করবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন–তেমনি, সকল দেশের নেতাদেরও জনগণকে ভরসা দেওয়া উচিত যে, সকলে ভক্তিভরে ভগবানের নাম স্মরণ করে সকল কাজে প্রবৃত্ত হলে তাদের সকল ত্রুটি মার্জনা করা হবে।
কারণ আগুন যেভাবে শুকনো ঘাসকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়, তেমনি ভগবানের পবিত্র নাম অজান্তে উচ্চারণ করলেও, অবধারিতভাবে সর্বপাপ ক্ষয় করতে পারে।
কোনও ওষুধের যথার্থ অন্তর্নিহিত গুণাবলীর বিস্তারিত পরিচয় না জেনেও মানুষ ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সেই ওষুধ গ্রহণ করলে, তার সুফল সে লাভ করতে যেমন পারে, তেমনই ভগবানের পবিত্র নামের মহিমা কিভাবে চিত্তশুদ্ধি আনে, তার রহস্য না বুঝলেও, ভগবানের নাম জপ করলে তার সুফল লাভ অবশ্যম্ভাবী।
বৈষ্ণবেরা নিত্য ভগবানের নাম জপ করেন এবং পরম ভক্তিভরে ভগবানের মহিমা স্মরণ করে থাকেন বলে, তাঁরাও এইভাবে বিষ্ণুদূতের কাছে সুরক্ষা লাভের অধিকারী হন। এই কারনেই কোনও বৈষ্ণবজনের শাস্তিবিধান মহা অপরাধ বলে শাস্ত্রে স্বীকৃত হয়েছে।
অজামিল অবশ্য নারায়ণের নাম স্মরণে এতখানি সৌভাগ্য লাভে যথেষ্ট বিস্মিত হয়ে অনুশোচনা করেছিল–সে কেন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণপুত্র হওয়া সত্ত্বেও বারনারী সংসর্গের মাধ্যমে পুত্র সন্তান সৃষ্টির মতো গর্হিত পাপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল।
ভগবদ্ভক্তি এইভাবেই পাপময় পরিবেশে মানুষের মনে অনুশোচনা জাগিয়ে তাকে সৎপথে আকৃষ্ট করে থাকে। কৃষ্ণভাবনা এইভাবেই মানুষকে অনুশোচনার মাধ্যমে আত্ম উপলব্ধির পথে উদ্ধুব্ধ করতে পারে। অজামিল একবারমাত্র শ্রীনারায়ণের নামাভাসের ফলে বিষ্ণুদূতদের কৃপা লাভের মাধ্যমে এইভাবে অনুশোচনা এবং আত্ম উপলব্ধির পরম সুযোগ পেয়েছিল।
বৈদিক সভ্যতা সংস্কৃতি অনুযায়ী, ভগবদ্ভক্ত তথা যথার্থ ব্রাহ্মণের সর্বপ্রকার রক্ষণাবেক্ষণ তথা সুরক্ষার বিধান দেওয়া হয়েছে। সেইভাবে বৃদ্ধ মানুষ, স্ত্রীলোক, শিশু ও গাভীদেরও সুরক্ষা প্রদান করা সংস্কৃতিবান সমাজে প্রত্যেকেরই একান্ত কর্তব্য।
মানুষকে বোঝানো উচিত যে, ভগবদ্বিমুখ হলে ভগবানের কৃপা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। তখন মায়াপিশাচীর কবলিত হতে হয় এবং মতিচ্ছন্ন হতে শুরু করে। তার ফলে মানুষ জড় জগতকে ভোগ করতে চায়–যেমন হয়েছিল অজামিলের।
কেবল ব্রাহ্মণ হলেই হল না–নিত্য ভগবদ্ সেবায় ভক্তিভরে আত্মনিয়োগ করা দরকার। তা না হলে ব্রাহ্মণত্বের অহঙ্কার জাগে এবং সেই অহঙ্কারের পরিণামই হল–‘আমি ভোক্তা’। এই ভাবের উদয়। তা থেকেই আসে ভোগ বুদ্ধির বন্ধন। মনের মধ্যে ভোগতৃষ্ণা জাগলে মন বহির্মুখী হয়ে সব কিছু ভোগের পেছনে ছুটতে চায়। তার ফলে ভগবানের কথা স্বভাবতই মানুষ ভুলে যায়।
ভগবদ্মুখী হলে, কৃষ্ণভাবনাময় হয়ে থাকলে মন, বুদ্ধি এবং অহঙ্কার থেকে মানুষের মুক্তি হয়। এই কারণেই গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উপদেশ দিয়েছেন–মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদযাজী মাং নমস্কুরু। (গীতা ১৮/৬৫) ভগবানের চিন্তায় চিত্ত স্থির করতে হয়, ভগবানের ভক্ত হত হয়, ভগবানের পূজা করতে হয় এবং ভগবানকে নমস্কার জানাতে হয়–এইভাবে ভগবানের আশীর্বাদ লাভ করা যায়, যার ফলে ভগবান সর্ব বিষয়ে মানুষকে রক্ষা করেন।
এইভাবে নিত্যনিয়ত ভগবানের চিন্তায় নিবিষ্ট থাকলে জড় মন হয়ে যায় চিন্ময় চেতনাবিশিষ্ট শুদ্ধ, এবং তাতে স্বরূপসিদ্ধি লাভ হয় অর্থাৎ জড় দেহটি সূক্ষ্ম দেহের স্বরূপে অবস্থিত হয়। তখন ভোগের ইচ্ছা থাকে না, অহঙ্কার থাকে, ‘আমি ভোক্তা’। এই দুষ্ট মনোভাব থাকে না।
এইভাবে যিনি স্বরূপসিদ্ধি লাভ করেন, তাঁর দেহটিও চিন্ময় হয়ে ওঠে। আগুনে একটি লোহা থাকলে সেটি আর লোহ থাকে না– আগুন হয়ে যায়।
তাই মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে, আমাদের এই দেহটি ভগবান সৃষ্টি করেছেন ভগবানেরই সেবার জন্য। সুতরাং ভগবৎ সেবার মাধ্যমেই এই জড় দেহ সার্থকতা অর্জন করতে পারে–একথা সর্বযুগে সর্বদেশে শ্রেষ্ঠ ভগববদ্ভক্তরা বারে বারে বলে গিয়েছেন।
আমরা সকলেই ভগবানের দাস–একথা মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হবে–নিত্য কৃষ্ণদাস। যিনি আমাদের সব কিছু দিয়েছেন, তাঁর দাসত্ব স্বীকার করলেই ভাল। শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আমাদের এই অমূল্য উপলব্ধি অর্জনে সাহায্য করেছেন। সেই শিক্ষা থেকে আমরা যেন বঞ্চিত না হই।