নারদ মুনি এবং এক শিকারী

ভগবানের নাম জপ করতে করতে নারদ মুনি একদিন গঙ্গায় স্নান করার জন্য বনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন এই সময় তিনি এক বীভৎস দৃশ্য দেখতে পেলেন।
নারদ মুনি- কে ভগবানের সৃষ্টির এই অবস্থা করলো? নিশ্চয়ই কোন দুর্বুদ্ধি বোকা এই ভয়ানক পাপ কর্ম করেছে, এবং তাঁকে অবশ্যই এর মূল্য দিতে হবে। কে এই ভুল কাজটি করল। কিছু আত্মা প্রাণীদের উপর এমন অত্যাচারের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যতকে অন্ধকারময় তৈরী করছে। প্রতি ধাপে ধাপেই এই ভয়ংকর অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। আহ্! ঐখানে সেই শিকারীটি। এই লোকটি পাগল হয়ে গেছে। আমি তাকে কিছু দিব্যজ্ঞানের কথা বলবো। আহ্! আর একটি হরিণ শিকারীর তীর দ্বারা বিদ্ধ হতে যাচ্ছে। নারদ মুনি কৃষ্ণ কর্তৃক প্রদত্ত তাঁর দিব্য বীণাতে টঙ্কার দিলেন আর তাতে সমস্ত পশুরা সেই স্থান পরিত্যাগ করলো।
শিকারী- এটি কিসের শব্দ? এটি কি ঘটছে? আমার সমস্ত পশুরাই এই স্থান থেকে চলে গেল।
নারদ মুনি- শিকারী, আমি তোমার কাছেই এসেছিলাম।
শিকারী- তুমি কে? আমি তো তোমার মত কাউকে চিনি না? তুমি আমার কাছে কি চাও? এর পূর্বে আমার হৃদয়ে এমন অপ্রাকৃত আনন্দ উপলব্ধি করিনি। ইনি নিশ্চয় একজন সৎ সাধু ব্যক্তি। যদিও আমি একজন শিকারী/বনমানুষ তবুও আমি তার বিরুদ্ধে কোন খারাপ চিন্তা করতে পারছি না।
আমি নারদ। আমি তোমার কাছে এসেছিলাম যদি তুমি আমাকে আমার পথ চিনতে সাহায্য কর।
আমি একজন শিকারী আর তুমি কিনা আমার সমস্ত বন্দী পশুকে তাড়িয়ে দিলে, তুমি কেন এমন করলে?
নারদ মুনি- আমি যখন এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন দেখলাম যে এই সমস্ত পশু যন্ত্রণায় চিৎকার করছে। এই হীন, পাপ কার্য কে করেছে?
শিকারী- পাপ কাজ! তুমি এসব কি বলছ?. আমিই তো এসব করেছি, এ সব কিছুই সঠিক আছে।
তুমি এই দুর্বল খরগোশটিকে অর্ধমৃত কর রেখেছ আর বলছ এসবই সঠিক? তুমি যদি এগুলোকে হত্যাই করতে চাও, তবে এদেরকে প্রথমেই মেরে ফেলছনা কেন? তুমি কি জানা না যে, অর্ধমৃত অবস্থায় রেখে তুমি এদেরকে আরো বেশি কষ্ট দিচ্ছ?
শিকারী- প্রভু, এতে পার্থক্য কোথায়, আমার পিতাই এই শিক্ষা প্রদান করেছেন। আর যখন আমি কোন খরগোশকে মৃত্যু যন্ত্রণায় কষ্ট পেতে দেখি, তা আমাকে আরো বেশি আনন্দ দান করে।
নারদ মুনি- শিকারী আমি তোমার কাছে শুধু একটি জিনিসই চাই, তাই বল তুমি আমাকে তা দান করবে।
শিকারী- আপনি কি কোন কিছু পুষতে চান? আপনি আমার বাড়িতে চলুন আমি আপনাকে হরিণ, বাঘ, যা চান না কেন তাই দিয়ে দিব। আপনি শুধু আমার সাথে কথা বলবেন।
নারদ মুনি- আমার এইসব কিছুই চাই না। আমি শুধু চাই যে, তুমি পশুদেরকে এভাবে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখ না। তাদের মেরে ফেল অথবা মুক্ত করে দাও। তাদেরকে এরকম অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রাখা চরম হিংসাত্মক কাজ।
শিকারী- কিন্তু প্রভু, মৃত বা অর্ধমৃত এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
নারদ মুনি- তবে শুন এই সকল পশুকে তুমি যত রকম দুঃখ যন্ত্রনা দিচ্ছ, তোমাকেও জন্ম জন্মান্তর ধরে তার জন্য কষ্ট ভোগ করতে হবে।
শিকারী- এসব কি বলছেন? তাহলে আমি যে সকল হরিণ মেরে রেখেছি, তার জন্য দুঃখ ভোগ করতে হবে?
নারদমুনি- আত্মার কখনো মৃত্যু হয় না। তা শুধু মাত্র দেহ থেকে অন্য দেহে গমন করে এবং সকল পশুর আত্মা তোমার উপর খুবই রাগান্বিত হয়ে রয়েছে। তাদের স্থান থেকে নিজে চিন্তা করে দেখ, কতটা নির্দয়ের মত তাদেরকে তুমি শাস্তি দিয়েছ।
শিকারী- আমি তবে কি শুকরগুলোকে যেভাবে বর্শার আঘাতে মেরেছিলাম, তাদের মতই দুঃখের সম্মুখীন হতে হবে। যখন সে শুকরগুলোর কাছে গেল তখন শুকরগুলো বলতে লাগলো-
১ম শুকর- এই পশু হত্যাকারী কোথায় তোমার বর্শা আর তীর।
২য় শুকর- তুমি যতগুলো আত্মাকে কষ্ট দিয়েছ তোমাকে তাদের প্রত্যেক দেহ ধারণ করতেই হবে, এবং একই রকম যন্ত্রনা ভোগ করতে হবে।
৩য় শুকর- যখন আমি সূর্যোলোকে নিজেকে উত্তপ্ত করেছিলাম তুমি আমাকে পিছন থেকে তীর বিদ্ধ করে মেরেছিলে।
অন্য শুকর- একটি বর্শা শিকারীর শরীরে ঢুকিয়ে বলে উঠল মনে করে দেখ একটি ছোট বাচ্চা শুকরকে তুমি প্রিয়া নদীর তীরে এই ভাবেই হত্যা করেছিলে।
সে তখন যে সকল খরগোশকে তীর বিদ্ধ করে মেরেছিল তাদের কথা স্মরণ করলো। একটি খরগোশ বলল তুমি মনে করে দেখ, আমাকে তুমি বগল দাবা করে মেরে রেখেছিলে। মনে কর শিকারী, তুমি তখন ভেবেছিলে এই সকল সঠিক, এটিই স্বাভাবিক।
শিকারী- কিন্তু, আমি এই কষ্ট ভোগ করতে পারবনা।
নারদ মুনি- কিন্তু এটাই ঘটবে। তোমাকে প্রত্যেক পাপ কর্মের জন্য তার ফল ভোগ করতেই হবে।
শিকারী -হে প্রভু, আমি তাহলে কিভাবে এই পাপময় কর্ম থেকে মুক্তি পেতে পারি?
আমি আপনার কাছে এই মিনতি নিবেদন করছি, দয়া করে আমাকে এই অবস্থায় বিপদ থেকে রক্ষা করুন। আমাকে পথ প্রদর্শণ করান।
নারদ মুনি- আমি তোমাকে প্রকৃত পথ দেখাতে পারি, কিন্তু তোমাকে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
শিকারী -অবশ্যই প্রভু, আমি তা থেকে বিরত হবো না।
নারদ মুনি- তাহলে তুমি তোমার ধনুক ভেঙ্গে ফেল।
তার ধনুক ভেঙ্গে ফেলে সেই শিকারীটি এবার নারদ মুনির নির্দেশনা শুনতে লাগল। সে তার সমস্ত বল, সম্পদ-সমৃদ্ধি ফেলে মাত্র একটি বসন পরে নারদের কাছে আসল।
শিকারী- আমার অতীত ছিল রাতের ভয়ংকর স্বপ্নের মত এবং এখন আমি জাগ্রত হতে চাই।
কিন্তু কিভাবে এই বদ স্বভাবগুলো থেকে মক্তি পেতে পারি।
হে শিকারী তুমি কি জান না কৃষ্ণ কত দয়াময়। তিনিই তোমাকে সকল রকম ব্যবস্থা করে দিবেন। তুমি শুধু তাঁর চরণে আত্মসমর্পণ কর। শিকারী ও তার স্ত্রী নদীর তীরে একটি ছোট্ট কুটির তৈরী করল।
শিকারীর স্ত্রী- তুমি আমাকে অনেক আনন্দ দান করেছ। এখন কৃপা করে নারদ মুনি যা তোমাকে বলেছে তা আমাকে বল। তুমি এখন যা করছ তাই প্রকৃত মুক্তির পথ এবং আমরা এখনই কেবল মাত্র বনের অন্য পশুর থেকে আলাদ হতে পারি।
শিকারী- তুমি আমাকে আমার আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশনা পালনে সাহায্য কর। তুমি আমার সাথে যোগদান কর আর আমার গুরুদেব যে পারমার্থিক সেবা প্রদান করেছেন তাতে অংশগ্রহণ কর।
শিকারী এবার ‘হরেকৃষ্ণ’ মহামন্ত্র নাম জপ করতে শুরু করল এবং তারা অন্যের দয়া নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করত। তারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছুই গ্রহণ করত না।
তিনি তার বাড়িতে পরম পবিত্র তুলসী মহারাণীকে প্রতিদিন জলদান করতেন। এসব দেখে পাশের বাড়ির লোকেরা বলাবলি করতে লাগল-
আমাদের বাড়ির জানালা থেকে আমরা প্রায়ই দেখি যে তোমার স্বামী ভগবৎ ভজনা করছে, আর দেখ এমন তাঁর মুখমন্ডল কেমন জ্যোতির্ময় এবং উৎফুল্ল দেখাচ্ছে।
স্ত্রী- এটি সার্বিকভাবে নারদ মুনির কৃপা, ঐ তুলসী গাছটি দেখ। আমার স্বামী নারদ মুনির কাছ থেকে শুনেছে যে, শুধুমাত্র তুলসী গাছে জল সেচনের দ্বারা নিজেদের পবিত্র করে তুলতে পারা যায়। কারণ তুলসী মহারাণী ভগবানের পরমা প্রিয়া, দেখ দেখ, শিকারী এখন ভক্তে পরিণত হয়ে গেছে। গ্রামবাসী প্রত্যহ তার জন্য কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসত।
ভক্তবৃন্দ- সে সকল কিছুই বুঝতে পারছে, আমি বলছিলাম না আমরা খুবই ভাগ্যবান কারন আমরা এখন এমন একজনের সাক্ষাৎ পেয়েছি যিনি নারদ মুনির শিষ্য।
আর এরপর থেকে দশ থেকে বিশ জন প্রত্যেক দিন সেই শিকারীর সাথে প্রসাদ গ্রহণ করত।
ভক্তবৃন্দ- সবই তোমার কৃপা, আমরা তোমাকে আর কখনো পশুদের শত্রু বলব না। আমরা তোমাকে একজন সাধু বলে ডাকতে পারি। আর তোমার জন্য কিছু ফল নিয়ে এসেছিলাম।
শিকারী- দয়া করে আমাকে নারদ মুনির শিষ্য বলে ডাকলেই চলবে। আমি এর বেশি কিছুই নই।
একদিন নারদ মুনি এবং তার বন্ধু পর্বত মুনি সেই বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।
নারদ মুনি- পর্বত মুনি আমার এক শিষ্য এরই পাশে কোথাও বাস করে তো দেখি এখন সে কি করছে?
পর্বত মুনি- আমি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তদের খবুই ভালবাসি এবং তাদের দর্শনে আনন্দ উপভোগ করি, নারদ দয়া করে আমাকে সেখানে নিয়ে যাও। তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও। ঐ যে সেই শিকারী, দেখ দেখ।
শিকারী নারদ মুনিকে দেখে বললেন, “ঐ যে দেখ, আমার শ্রদ্ধেয় পরমারাধ্য শ্রী গুরুদেব আসছেন।” যখন শিকারী মাঠ পার হতে যাচ্ছিল সে দেখলো তার পায়ের ঠিক নিচে কিছু পিঁপড়া। সে বলল হে আমার প্রিয় বন্ধুরা তোমরা ভয় পেয় না, আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করব না। এই দৃশ্য দেখে নারদ মুনি বললেন তুমি সত্যই বলিহারি শিকারী, তুমিই প্রকৃত ভক্ত। এটিই কাম্য যে, কোন কৃষ্ণ ভক্ত কোন ভাবেই জীবকে কষ্ট দিতে চায় না, এমনকি একটি পিঁপড়াকেও না। শিকারী নারদ মুনির চরণে দন্ডবৎ হয়ে বললেন, “গুরুদেব আমার পিঁপড়া ব্যাথা পেত তাই কৃপা পূর্বক সেই পিঁপড়াগুলোকে সরে যেতে দিন।”
নারদ মুনি- সকল কিছু কি ঠিক মত চলছে?
শিষ্য- হ্যাঁ গুরুদেব। দেখুন তুলসী মহারাণী কিভবে বর্ধিত হচ্ছে।
মহামুনি নারদ আপনি দয়া করে আমাদের সাথে প্রসাদ গ্রহণ করুন।
পর্বত মুনি- আমি দেখছি যে তুমি এখানে ভাল আছো এবং তোমার ভক্তি জীবন খুব ভালোভাবে চলছে এবং তোমার এমন হৃদ্যতায় আমি খুব খুশি হয়েছি।
শিষ্য- মহতী আপনি জানেন যে আমরা মহানাম থেকে সকল সময়ই কৃপা পেয়ে থাকি আর এই মহামন্ত্র নারদ মুনিই আমাকে দান করেছেন। আপনি জানেন যে এই মহামন্ত্র খুবই সুমধুর আর তাই আমরা সকল সময়ই এই মহামন্ত্র জপ করতে থাকি।
পূর্বের শিকারী এবং তার স্ত্রী হরিনামের উল্লাসে মাতোয়ারা হয়ে পড়ল। তারা তাদের এই অনুভূতিকে কৃষ্ণনামের মাধ্যমে উপভোগ করতে লাগল।
নারদ মুনি- সকল প্রশংসাই সমস্ত গৌরভক্তবৃন্দের। সকল প্রশংসাই ভগবান রাধাকৃষ্ণের।
পর্বত মুনি- নারদ মুনি সত্যিই তুমি একটি পরশ পাথর। তোমার স্পর্শেই আজ এই ঘৃণ্য শিকারী মানব জীবনের পরম প্রাপ্তি কৃষ্ণ প্রেম লাভ করেছে।
নারদ মুনি- তুমি কি ঠিক মত প্রসাদ পাচ্ছ প্রিয় শিষ্য?
শিষ্য- হ্যাঁ, গুরুদেব, আমি প্রত্যহ বিশজন ভক্তকে নিয়ে একত্রে প্রসাদ পাচ্ছি।
পর্বত মুনি- ঠিক আছে, এখন তুমি এবং তোমার স্ত্রী ভালভাবে কৃষ্ণ ভক্তি যাজন করো, কৃষ্ণ তোমাদের মঙ্গল এবং সুখী করুন।
শিকারী- মহৎ সাধুরা সকল সময় কৃষ্ণের কথাই বলেন। যিনি পরম ঈশ্বর ভগবান এবং দেবদেবীরাও তাঁকে জানেন, যিনি সমস্ত কিছুর পরম নিয়ন্তা। কিন্তু আমি এতই অধম যে, আমি কৃষ্ণকে জানতেও পারলাম না, ,আমি শুধুমাত্র আমার আধ্যাত্মিক গুরুর সেবা পূজা করতে পারি, যিনি আমাকে তাঁর পরম কৃপায় এই অজ্ঞতার অন্ধকারকে দূর করে, আমাকে দিব্য চক্ষুদান করেছেন।
কীর্তন- ভগবানের পবিত্র নামের গুণে শিকারীর বাড়ির আঙ্গিনা মধুর পরিবেশের সৃষ্টি, ঠিক যেন শুষ্ক মরুভূমিতে বসন্তের এক পশলা বৃষ্টি। সবাই হরিবোল হরিবোল বলে চিৎকার করে  উঠল।
। হিতোপদেশ।
লব মাত্র সাধু সঙ্গে সর্বসিদ্ধি হয়।

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits