কোন জমিদারের এক মোসাহেব ছিল। জমিদারবাবু একদিন তাকে জিজ্ঞেস করলেন- আলু কি ধরণের জিনিস বলতো ? মোসাহেবটি খুব আঁকুপাঁকু হয়ে হাত জোড় করে বলল- “হুজুর আপনার মুখেই শুনতে চাই ?” তখন জমিদারবাবু বললেন “আলু বর্তমানে যুগের একটি উপাদেয় খাদ্য।” কথা শেষ না হতেই মোসাহেবটি বলতে লাগল- আজ্ঞে হুজুর। উপাদেয় বলে উপাদেয়, মহান উপাদেয়। কথায় বলে গোল আলু-ভাতে দিন, সিদ্ধ করুন, চচ্চড়িতে দিন, ঝোলে ঝালে দামে দালনায় কালিয়া কোপ্তায়- সবেতেই গোল আলু চলে। পৃথিবীতে এমন বস্তু আর কি আছে। তখন জমিদারবাবু বললেন ‘তুই যাই বলিস আলু খেতে ভাল হেেলও এসব গরম জিনিস।” তখন মোসাহেটি সঙ্গে সঙ্গে বলতে লাগল- ‘ আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর গরম ? মহাগরম, অতি গরম। আজকাল হুজুর যে সব রোগ হচ্ছে পেট ফাঁপা, কলেরা, ডায়াবেটিস, ডাইরিয়া, থাইসিস্- এসব ব্যাধির কারণ দেখছেন কি হুজুর। সব রোগের মূলে জানবেন- ঐ এক গোল আলু।”
তারপর জমিদার বললেন- ‘আচ্ছা বেগুন সম্বন্ধে তোমার অভিমত কি ?” মোসাহেব বলল- “আজ্ঞে হুজুর আপনিই বলুন না। জমিদারবাবু বললেন, বেগুন মন্দ কি ? বেগুন ভাল তরকারী বলেই জানি। মোসাহেব তখন বলতে লাগল- ‘আজ্ঞে হুজুর। বেগুনের মতো কি আর কিছু আছে দুইটা বেগুনের ভাজা পেলে আর কি চাই ? মাখন কোথা লাগে। ঘরে যদি আর কিছুই না থাকে, কেবল একটা বেগুন থাকলেই ভদ্রলোকের সম্মান রক্ষা হয়। পোড়ান, ভাজুন, রাঁধুন সবেতেই বেগুন চলে। তার মধ্যে লাফা বেগুন ভগবানের অপূর্ব সৃষ্টি। তখন জমিদার বললেন- “যা হোক বেগুনে পুষ্টিকর কিছু নেই।” তক্ষুনি মোসাহেব বলতে লাগল-“আরে রাম রাম। হুজুর কথায় বলে বেগুন। তার কোন গুণ থাকলে কি বেগুন কখনো নাম হত ? একবারে গোবর। গোবরেরও তেজ আছে কিন্তু বেগুন তার চেয়েও অধম। বেগুনের কপালে আগুন। তাই তো তাকে পুড়িয়ে খেতে হয়। কচু-ওলের চেয়েও বেগুনে আরও দ্বিগুণ চুলকায়।” এবার জমিদার বললেন-‘তুমি তো দেখছি বেশ অদ্ভুত লোক হে। আমি যখন যা বলছি ভাল তখন তুমি বলছ খুব ভাল আমি যখন যা বলছি মন্দ’ তুমি দেখাচ্ছ অত্যাধিক, কি ব্যাপার ? তোমার নিজের কি কোনও ব্যক্তিত্ব নেই।’
তখন মোসাহেবটি আঁকুপাঁকু হয়ে আবার হাত জোড় করে জমিদার মশাইকে বলতে লাগল, “হুজুর ক্ষমা করুন, মার্জনা করুন- সত্যি বলতে কি, আমি তো আলু বেগুনের চাকর নই, আমি হুজুরের চাকর। আলু বেগুন আমায় কিছুই দিবেনা, হুজুরই আমাকে চাকরি দেন, তাই হুজুরের মতটাই আমার মত।”
। হিতোপদেশ।
সমাজে অনেক প্রকারের তোষামোদী মানুষ আছে, যাদের ভালমন্দ বিচার করার বুদ্ধি নেই। এরূপ ব্যক্তিত্বহীন মানুষেরা সমাজের সেই সব নেতৃবর্গের সমর্থন করে চলে যাদের কাছে কিছু সুখ-সুবিধা পাওয়া যায়। লাভ-পূজা-প্রতিষ্ঠা খোঁজাই তাদের জীবনের উদ্দেশ্য। তার জন্য তারা তথাকথিত নেতৃবর্গের তোষামোদ করতে থাকে। বহুজনের বাহবা পাওয়ার জন্যও তারা নাম করা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়। কিন্তু নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির সুখসুবিধা পাওয়া যাবে এই ভেবে কতক ব্যক্তি উকিঝুঁকি দেয় কিন্তু তাদের সুবিধাবাদী মনোভাবের জন্য সহজেই তার হয়ে ও অবজ্ঞাত হয়ে পড়ে। যাঁরা গুর্বানুগত্যে ভগবদ্ভজনে অংশগ্রহণ করবেন তাঁরা গল্পের মোসাহেবের মতো সুবিধাবাদী সুখসন্ধানী নন।