চার কালা

এক গাঁয়ে একটি জন্মগত কালা ছেলে ছিল। ছেলেটি যখন বড় হল, তখন তার বিবাহের জন্য পাত্রীর খোঁজ শুরু হল। কালো ছেলেকে কেউ মেয়ে দিতে রাজী হল না। অবশেষে একজনের ঐরকম কালা মেয়ের সঙ্গে তার বিবাহের কথাবার্তা হল। উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে যথাসময়ে বিবাহ হল।
এখন এই দুই কালা একসঙ্গে বাস করে। কারও কথা কেউ বুঝতে পারে না। দিনরাত খালি ঝগড়া করে। কয়েক বৎসর পরেই তাদের একটি ছেলে হল। সে বড় হতে দেখা গেল সেও কালা। সুতরাং এখন তিন কালার বাড়ী। কারো কথা কেউ বুঝতে না পারায় তারা দিনরাত ঝগড়া করে।
ছেলেটি এখন বড় হয়েছে। তাকে তো বিবাহ দিতে হবে। ভাগ্যের এমনই বিড়ম্বনা, তার বিবাহ হল একটি কালা মেয়ের সঙ্গে। এখন চার কালার সংসার, দিনরাত ঝগড়া। এদের কাছে প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশিরা অস্থির হয়ে উঠেছে।
একদিন ছেলেটি দুটি গরু নিয়ে মাঠে চাষ করতে গেছে। এমন সময় একজন লোক এসে একটি গরুর গায়ে হাত দিয়ে বললেন-“তোমার এই গরুর মতো আমার একটি গরু হারিয়ে গেছে। তুমি কিতার সন্ধান জান?” ছেলেটি তাঁর কথা বুঝতে না পেরে রাগান্বিত হয়ে বকতে লাগল-“হ্যাঁ! এটা তোমার গরু? এটা আমার গরু। আমার শ্বশুর বাড়ীর গরু। আমার শ্বশুর বাড়ী থেকে দেওয়া গাইয়ের বাছুর। আমার বউ সাক্ষী আছে।” ভদ্রলোকটি গরুর গায়ে হাত দিয়ে বলতে লাগলেন-“আহা! তুমি ভুল বুঝছ কেন? এটা আমার নয়। এইরকমের একটি গরু হারিয়ে গেছে।” ছেলেটি আরও রেগে গিয়ে বলতে লাগল-“দাঁড়াও, আমার বউকে ডেকে আনি। সে সাক্ষী দেবে।” ভদ্রলোক কপালে চাপড় মেরে “হায়রে কপাল” বলে চলে গেলেন।
এদিকে ছেলেটি বাড়ী এসে তার বউয়ের হাত ধরে টানতে লাগল এবং বলতে লাগল- “চল! চল! চল! সাক্ষী দিবি চল।” মেয়েটি তার কথা বুঝতে না পেরে বলতে লাগল “ওগো! হাঁড়িতে যে ভাত নেই। এই তো কেবল খেয়ে গেলে। আবার ভাত কোথায় পাব?” ছেলেটি তার স্ত্রীর হাত ধরে টানতে লাগল- “ ও রে! চল! চল! চল! সাক্ষী দিবি চল। মেয়েটি কোন পথ না পেয়ে তার শ্বাশুড়ীর কাছে গিয়ে বলতে লাগল,-“ওগো! তোমার ছেলের কান্ড দেখ। এখনই তো ভাত খেয়ে গেছে। আবার এসে ভাত চাইছে। হাঁড়িতে যে ভাত নেই।”তখন শ্বাশুরী বৌমার কথা বুঝতে না পেরে, তার পূর্বদিনের কথা মনে পড়ে গেল। সে বলতে লাগল- “গতকাল বৌমার কাছ থেকে একটি শুচ নিয়েছিলাম। সেটি না হয় হারিয়ে গেছে। সেই শুচের জন্য এত চোখমুখ রাঙিয়ে বৌমা এসেছে আমাকে শাসন করতে? এতবড় শক্তি ও কোথায় পেল? এ্যাঁ?” শ্বাশুরড়ী কোমর বেধে ছুটল বুড়োর কাছে। বুড়ো মাঠে ক্ষেত পাহারা দিচ্ছে। বুড়ি রেগে গিয়ে বুড়োর কাছে বলল- “তোমার বৌমার কি ব্যবহার দেখ। কাল একটা শুচ নিয়েছিলাম। আজ কিনা বৌমা এসে আমার উপর গরম দেখাচ্ছে।” বুড়ো কপালে হাত চাপড়ে বলতে লাগল- “হায়রে আমার পোড়া কপাল। কত কষ্ট করে ক্ষেত তৈরী করেছি। বেলা হয়েছে, ক্ষিদে পেয়েছে, একখানি কাঁকুড় তুলে খেয়েছি। তাই দেখে বাড়ী থেকে বুড়ি এসেছে আমাকে শাসন করতে?”
ছেলে বলে স্ত্রীকে “চল! চল! চল! সাক্ষী দিবি চল। স্ত্রী বলে “ভাত নাই।” বুড়ি বলে- “বাজার থেকে না হয় শুচ এনেই দেব। এত গরম দেখাচ্ছে কেন?” বুড়ো বলে-“আমার ক্ষেতের কাঁকুড়ে আমি খেয়েছি। তুই বলার কে?” এই নিয়ে বাড়ীর মধ্যে ভীষণ ঝগড়া বেধে গেছে। চরজনের মধ্যে কেউ কারও কথা বুঝতে পারছে না। যে যার মতো বকেই চলেছে। প্রতিবেশীরাও কেউ কিছুই বলছে না। কিছুক্ষণ পর তারা কথার সূত্র পেয়ে সকলকে বুঝিয়ে দিয়ে তাদের গরম মাথা ঠান্ডা করলেন।
। হিতোপদেশ।
সাধু-শাস্ত্র-গুরুবাক্য যদি আমরা না শুনে নিজ নিজ মত পথ সৃষ্টি করি তাতে উক্ত গল্পের চার কালার ন্যায় উচ্ছৃঙ্খল হয়ে জীবন বিপথগামী হতে হবে। যদি প্রকৃত মঙ্গল চান তাহলে শ্রদ্ধাযুক্ত হয়ে সাধুসঙ্গে হরিকথা শুনতে হবেও নিজের জীবনে আচরণ করতে হবে। তাহলে সমস্যা সমাধান হয়ে আমাদের জীবনে শান্তি আসবে।
“সাধু-শাস্ত্র-কৃপায় যদি কৃষ্ণোন্মুখ হয়
সেই জীব নিস্তারে মায়া তাহারে ছাড়য়।।”

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,963 hits