এক গাঁয়ে মাঝে মধ্যে হরি সভা হত। কোনও কারনে সভার সভ্যদের মধ্যে ঝগড়া সৃষ্টি হয়। তখন থেকে তারা দুই দলে ভাগ হয়ে যায়। এক দল কোনও পর্ব উপলক্ষে এক পেশাদারী কীর্তনীয়াকে ডেকে আনল হরিসংকীর্তনের জন্য। কীর্তনীয়া বেচারা কীর্ত্তন করতে করতে খোল বাজাতে বাজাতে খুব হাব ভাব দেখিয়ে মুর্ছা গেল। এইভাবে এক ঘন্টা ধরে হাত পা ছড়িয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেল। জনসাধারণের কাছে সে ‘পরম ভক্ত’ বলে সম্মান লাভ করল।
এই দলের এত সম্মান হয়েছে দেখে অন্য দলের লোকদের মনে হিংসা জাগল। তারা কোনও এক গ্রাম থেকে মোটা চেহারার এক গাঁজাখুর ভাবুক গায়ককে নিয়ে এল। তাকে চার আনার গাঁজা দেওয়ার কথা হয়েছে। তারপর যদি সেই দুই তিন ঘন্টা বেশী ভাব দেখাতে পারে, তবে আরও অনেক বকশিস পাবে বলে বিবেচনা করা হল। গায়ক তখন অতি উৎসাহের সঙ্গে নৃত্য-কীর্ত্তন শুরু করল। করতালি বাজাতে না বাজাতে সে এমন ভাব দেখাল যে তার চোখে জল নেমে এল। শরীর কাঁপতে লাগল, মুর্ছিত লোকের মতো মাটিতে গড়াগড়ি দিতে শুরু করল। কিন্তু প্রচন্ড রোদের তাপ সে সহ্য করতে পারছিল না। উত্তপ্ত মাটিতে খুব কষ্ট করে কোন মতে আধঘন্টার মতো গড়াগড়ি দিয়ে সে উঠে পড়ল। সর্বাঙ্গে ঘাম আর ধুলো। তখন দলপতি মশাই মাথা “হেট” করে বলতে লাগলেন, “হায়! হায়! তোমাকে যে জন্য আনা হল, তার কিছুই করলে না। আমাদের মুখে চুন-কালি পড়ল। আমাদের নাম যশ সব ডোবালে। তখন ভেকধারী গায়ক মুখ কাঁচুমাচু করে হাত জুড়ে বলতে লাগল, “মশাই, দেখুন! ‘চার আনার ভাব’ আর কতক্ষণ থাকে? অনেক কষ্ট করেছি।”
। হিতোপদেশ।
যাঁরা ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে পরম নিষ্ঠাপরায়ণ, যাঁদের জাগতিক কোনও কিছুরই প্রতি আকাঙ্ক্ষা নেই, সেই শুদ্ধভক্তদের অঙ্গে কখনও সাত্ত্বিক বিকার লক্ষ্য করা যায়। যেমন চোখে জল, কম্পন, মূর্চ্ছা, যাওয়া ইত্যাদি। বাহ্যজ্ঞান থাকতে সেইসব তাঁরা গোপন রাখতে চেষ্টা করেন। কিন্তু যারা কপটী, নিজেদের নাম যশ ধন ও প্রতিষ্ঠা লাভের ভিখারী, তাদের এরূপ লোক দেখানো ভাবভঙ্গিমাতে ভক্তির নামে ভন্ডামি প্রকাশ পায়।