আপনারা সাঁতার জানেন

 ভৈরবী নদীর তীরে নিত্যানন্দপুর নামে একটি গ্রাম ছিল। তথায় কাঙ্গালী নামে এক সুদরিদ্র মাঝি বাস করতেন। কাঙ্গালী চিরকালই আর্থিক দিক থেকে কাঙ্গাল। কিন্তু সরলতার কাঙ্গালী নহে। শুধু সাধারণের চোখে জাগতিক অর্থের কাঙ্গালী।
কাঙ্গালী ভৈরবী নদীতে খেয়া দেয়। তাতে যা আয় হয় সেইটুকুই নিয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট থাকতে হত। এক সময় জ্যৈষ্ঠ মাসের অবেলায় অর্থাৎ ৬টা কি সাড়ে ৬ টার সময় কাঙ্গালী নৌকায় বসে আপন মনে ভগবানের চরণে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে গান গাইতে লাগলেন-
“সংসার তটিনী,  স্রোত নহে শেষ
মরণ নিকটে ঘোর
সব সমাপিয়া ভজিব তোমায়
এ আশা বিফল মোর।”
শরণাগতির এই পদটি গান গাইতে লাগলেন। এমন সময় তিনজন ভদ্রলোক আসলেন পার হবার জন্য। কাঙ্গালীর তন্ময়তা ভেঙ্গে গেল। শরণাগতি গ্রন্থখানি রেখে দিয়ে নৌকা চালাতে লাগলেন।
ভদ্রলোক তিনজন এলোমেলো আলোচনা করতে লাগলেন। মাঝিকে বললেন একজন ভদ্রলোক-“তোমার নাম কি মাঝি?”
কাঙ্গালী বলল- আমার নাম কাঙ্গালী।
ভদ্রলোক বললেন- বাড়ী কোথায় ?
কাঙ্গালী বললেন- নিত্যানন্দপুরে। এই প্রকার কথাবার্তা চলতে চলতে আকাশে একটু মেঘ দেখা গেল।
ভদ্রলোক বললেন- ‘মাঝি! মেঘ কেমন করে হয় জান?
মাঝি বললেন-‘আজ্ঞে না’।
ভদ্রলোক বললেন- ‘বজ্রপতন হয় কেন জান?’
মাঝি বললেন-‘আজ্ঞে না।’
ভদ্রলোক বললেন-“কাঙ্গালী! তোমার জীবন বৃথা। তুমি দুনিয়ার কোন সংবাদ রাখ না।” আর একজন বললেন- “কাঙ্গালীর জীবন মাটি হয়ে গেল। এ জনম তোমার বৃথাই গেল। তোমাকে তো বর্তমান যুগে জীবন্মৃত বললেই চলে।”
এই প্রকার ভদ্রলোকত্রয় কাঙ্গালীকে নানাভাবে ব্যঙ্গ, বিরূপ উপহাস করতে লাগলেন। ইতিমধ্যে প্রবলবেগে ঝড় উঠল। সঙ্গে সঙ্গে নদীতে ঢেউ উঠতে লাগল। এখন কাঙ্গালী ভীষণ তরঙ্গমালা মধ্যেও নৌকা সামলাতে সামলাতে বাবুগণকে বললেন- “বাবু আপনারা কি সাঁতার জানেন?” বাবুরা তখন হতভম্ব হয়ে বললেন- ‘না। আমরা কেউই জানি না! তাড়াতাড়ি নৌকা তীরে নিয়ে চল।” মাঝি বললেন-“আপনারা যদি সাঁতার না জানেন, তাহলে আপনাদের তিনজনেরই জীবন মাটি। আপনারা সাবধান হোন। এখন আপন আপন জীবন রক্ষা করুন।”
। হিতোপদেশ।
এই আখ্যানের মধ্যে যিনি কাঙ্গালী নামে অভিহিত, তিনি অন্য কেউ নন-স্বয়ং পতিত পাবন বৈষ্ণব ঠাকুর। তিনি জীবদুঃখে অত্যন্ত দুঃখী হয়ে জীবকে ভৈরবী নদীর ন্যায় বিশাল ভয়ানক সংসার সমুদ্র থেকে পার করবার জন্য কাঙ্গালী বেশে ভিখারীর বেশে নাম তরণী নিয়ে প্রত্যেক জীবের নিকটে গিয়ে বলেন- (কেন)
মায়ার স্রোতে যাচ্ছ ভেসে
খাচ্ছ হাবুডুবু ভাই
রাধাকৃষ্ণ বল সঙ্গে চল
এইমাত্র ভিক্ষা চাই।
কিন্তু আমরা মায়ামুগ্ধ জীবগণ জ্ঞান গরিমায় মত্ত হয়ে, বিজ্ঞানে মৃত্যুনিবারক উপায় আবিষ্কার, কৃত্রিম উপায়ে সন্তান উৎপাদন প্রভৃতি দেখেশুনে ভগবানের কর্তৃত্ব অস্বীকার করি। গুরু বৈষ্ণবের চির শান্তির বাণী আমাদের কর্ণগোচর হয় না। তাঁদের পাত্তাই দিই না। যখন আধ্যাত্মিক, আধিদৈবিক ও আধিভৌতিক ত্রিবিধ তাপে দগ্ধীভূত হয়ে কোন পথ খুঁজে না পাই, তখন আমরা ঐ বাবুত্রয়ের ন্যায় কাঙ্গালীরূপ বৈষ্ণব ঠাকুরের চরণে শরণ লই।

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits