সূত গোস্বামী বললেন– “হে ব্রহ্মজ্ঞগণ, এইভাবে দেবর্ষি নারদের জন্ম এবং কর্ম-বৃত্তান্ত শ্রদ্ধা সহকারে শ্রবণ করে সত্যবতী-তনয় ভগবানের শক্ত্যাবেশ অবতার শ্রীব্যাসদেব শ্রীনারদকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন– ‘হে দেবর্ষি, আপনার সেই গুহ্য ভগবত্তত্ত্বজ্ঞান বিষয়ে উপদেশদাতা পরিব্রাজকেরা যখন দূরদেশে গমন করলেন, তখন পূর্ব জীবনের সেই বাল্যাবস্থায় আপনি কি করেছিলেন ?’ ”
“হে ব্রহ্মার পুত্র, আপনি দীক্ষা গ্রহণের পর কিভাবে আপনার জীবন অতিবাহিত করেছিলেন এবং আপনার পূর্ব দেহ যথাসময়ে ত্যাগ করার পর কিভাবে আপনি এই দেহ প্রাপ্ত হন ?”
“হে মহির্ষি, যথাসময়ে কাল সব কিছু বিনাশ করে, তা হলে কিভাবে এই বিষয়-বস্তু কালের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে আপনার স্মৃতিতে এখনও উজ্জ্বলভাবে বিরাজ করছে। ”
শ্রীনারদ মুনি বললেন– “সেই মহর্ষিরা, যাঁরা আমাকে পারমার্থিক তত্ত্বজ্ঞান দান করেছিলেন, তাঁরা দূর দেশে গমন করলেন এবং আমি এইভাবে আমার জীবন অতিবাহিত করেছিলাম। ”
“আমার মাতা ছিলেন একজন অতি সাধারণ স্ত্রীলোক এবং তিনি ছিলেন দাসী; আমি ছিলাম তাঁর একমাত্র পুত্র। আমি ছাড়া তাঁর আর অন্য কোনও আশ্রয় ছিল না, তাই তিনি আমাকে তাঁর স্নেহের বন্ধনে আবদ্ধ করে রেখেছিলেন। তিনি যথাযথভাবে আমাকে প্রতিপালন করতে চাইতেন, কিন্তু যেহেতু তিনি স্বতন্ত্র ছিলেন না, তাই তিনি আমার জন্য কিছুই করতে পারতেন না। এই জগৎ সর্বতোভাবে পরমেশ্বর ভগবানের নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই সকলেই তাঁর হাতের কাঠের পুতুলের মতো। আমার বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন আমি ব্রাহ্মণদের বিদ্যালয়ে অবস্থান করছিলাম। আমি আমার মায়ের স্নেহের উপর নির্ভরশীল ছিলাম এবং আমার কোনই অভিজ্ঞতা ছিল না। ”
“এক সময়ে আমার অভাগিনী মা যখন রাত্রিবলো গো-দোহন করতে যাচ্ছিলেন, তখন মহাকালের প্রভাবে তাঁর পায়ের দ্বারা আহত একটি সর্প তাঁকে দংশন করে। সেই ঘটনাটিকে আমি ভক্তবৎসল ভগবানের বিশেষ কৃপা বলে মনে করে উত্তর দিকে যাত্রা করি। ”
“গৃহত্যাগ করার পর আমি বহু সমৃদ্ধশালী জনপদ, নগর, গ্রাম, গোচারণ ভূমি, খনি, ক্ষেত, উপত্যকা, বাগান, উপবন এবং বন অতিক্রম করেছিলাম। আমি স্বর্ণ, রৌপ্য এবং তাম্র আদি ধাতুতে পূর্ণ পাহাড় এবং পর্বত অতিক্রম করেছিলাম, এবং সুন্দর পদ্মফুলে সুশোভিত বিভ্রান্ত ভ্রমর এবং সঙ্গীতমুখর পাখিদের দ্বারা অলঙ্কৃত স্বর্গের দেবতাদের উপযুক্ত জলাশয় এবং স্থলভূমি অতিক্রম করেছিলাম। তারপর আমি নল, বাঁশ, শর, কুশ, লতাগুল্ম ইত্যাদিতে পূর্ণ অত্যন্ত দুর্গম অরন্যানী একাকী অতিক্রম করেছিলাম। আমি ভয়ঙ্কর অন্ধকারাচ্ছন্ন বিপদসঙ্কুল বনের মধ্য দিয়ে গিয়েছিলাম, যা ছিল সর্প, পেচক এবং শৃগালদের বিচরণক্ষেত্র। এইভাবে ভ্রমণ করে আমি দৈহিক এবং মানসিক উভয় দিক দিয়েই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম, এবং আমি তৃষ্ণার্ত এবং ক্ষুধার্ত হয়েছিলাম। তখন নদীতে এবং হৃদে স্নান করে এবং সেখানকার জল পান করে ও স্পর্শ করে আমি আমার শ্রান্তি দূর করেছিলাম। তারপর, জনমানবশূণ্য এক অরণ্যে একটি অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে উপবেশন করে আমি আমার বুদ্ধি দ্বারা মুক্ত পুরুষদের কাছ থেকে ঠিক যেভাবে শ্রবণ করেছিলাম, সেই বর্ণনা অনুসারে আমার অন্তরের অন্তঃস্থলে বিরাজমান পরমাত্মার ধ্যান করতে শুরু করেছিলাম। আমি যখন আমার হৃদয়ে পরমেশ্বর ভগবানের চরণারবিন্দের ধ্যান করতে শুরু করেছিলাম, তখন আমার চিত্তে এক অপ্রাকৃত ভাবের উদয় হয়েছিল, আমার চক্ষুদ্বয় অশ্রুপ্লাবিত হয়েছিল এবং অচিরেই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরি, আমার হৃদয়কমলে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ”
“হে ব্যাসদেব, সেই সময় প্রবল আনন্দের অনুভূতিতে অভিভূত হয়ে পড়ার ফলে আমার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পুলকিত হয়েছিল। আনন্দের সমুদ্রে নিমগ্ন হয়ে আমি সেই মুহূর্তে ভগবানকে এবং নিজেকেও দর্শন করতে পারছিলাম না। ভগবানের অপ্রাকৃত রূপ যথাযথভাবে মনের বাসনা পূর্ণ করে এবং সব রকমের মানসিক বৈষম্য দূর করে। তাঁর সেই রূপ দর্শন করতে না পেরে, অত্যন্ত প্রিয় বস্তু হারালে মানুুষ যেভাবে বিচলিত হয়ে পড়ে, সেইভাবে বিচলিত হয়ে আমি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। আমি ভগবানের সেই অপ্রাকৃত রূপ আবার দর্শণ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তাঁকে পুনরায় দর্শন করার আশায় একাগ্র চিত্তে হৃদয়াভ্যন্তরে দর্শণ করার চেষ্টা করা সত্ত্বেও তাঁকে আর আমি দেখতে পাইনি এবং এইভাবে অতৃপ্ত হয়ে আমি অত্যন্ত শোকাতুর হয়ে পড়েছিলাম। সেই নির্জন স্থানে আমার প্রচেষ্টা দর্শন করে সমস্ত জড় বর্ণনার অতীত যে পরমেশ্বর ভগবান, তিনি অত্যন্ত গম্ভীর ও শ্রুতিমধুর স্বরে আমার অন্তরের বেদনা উপশম করার জন্য বললেন, ‘হে নারদ, এই জীবনে তুমি আর আমাকে দর্শন করতে পারবে না। যাদের সেবা পূর্ণ হয়নি এবং যারা সব রকম জড় কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হতে পারেনি, তারা আমাকে কদাচিৎ দর্শন করতে পারে। হে নিষ্পাপ, তুমি কেবল একবার মাত্র আমার রূপ দর্শন করেছ এবং তা কেবল আমার প্রতি তোমার আসক্তি বৃদ্ধি করার জন্য, কেননা তুমি যতই আমাকে লাভ করার জন্য লালায়িত হবে, ততই তুমি সমস্ত জড় কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত হবে। অল্পকালের জন্যও যদি ভগবদ্ভক্ত সাধু-সেবা করা হয়, তা হলে আমার প্রতি সুদৃঢ় মতি উৎপন্ন হয়। তার ফলে সে দুঃখদায়ক এই জড় জগৎ ত্যাগ করার পর আমার অপ্রাকৃত ধামে আমার পার্ষদত্ব লাভ করে। আমার সেবায় নিবদ্ধ বুদ্ধি কখনই প্রতিহত হতে পারে না। সৃষ্টির সময় এমন কি প্রলয়ের সময়েও আমার কৃপায় তোমার স্মৃতি অপ্রতিহত থাকবে। ’ ”
“তারপর সেই পরম ঈশ্বর, যিনি শব্দের দ্বারা প্রকাশিত এবং চক্ষুর দ্বারা অদৃশ্য, কিন্তু পরম অদ্ভুত, তাঁর বাণী শেষ করলেন। গভীর কৃতজ্ঞতা অনুভব করে আমি নত মস্তকে তাঁকে আমার প্রণতি নিবেদন করেছিলাম। এইভাবে সব রকম সামাজিক লৌকিকাত উপেক্ষা করে আমি ভগবানের দিব্য নাম এবং মহিমা নিরন্তর কীর্তন করতে শুরু করি। ভগবানের অপ্রাকৃত লীলা এইভাবে কীর্তন এবং স্মরণ অত্যন্ত মঙ্গলজনক। এইভাবে ভগবানের মহিমা কীর্তন করতে করতে আমি সর্বতোভাবে তৃপ্ত হয়ে অত্যন্ত বিনীত এবং নির্মৎসর চিত্তে সমস্ত পৃথিবী পর্যটন করতে থাকি। ”
“হে ব্রাহ্মণ ব্যাসদেব, আমি যখন শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় সম্পূর্ণরূপে মগ্ন হয়েছিলাম, তখন আমার আর কোন আসক্তি ছিল না। সব রকমের জড় কলুষ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত হয়ে আমার মৃত্যু হয়েছিল, ঠিক যেভাবে তড়িৎ এবং আলোক যুগপৎভাবে দেখা যায়। ”
“পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গ করার উপযুক্ত একটি চিন্ময় শরীর লাভ করে আমি পঞ্চভৌতিক দেহটি ত্যাগ করি এবং তার ফলে আমার সমস্ত কর্মফল নিবৃত্ত হয়। কল্পান্তে যখন পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণ কারণ বারিতে শয়ন করলেন, ব্রহ্মা তখন সৃষ্টির সমস্ত উপাদানগুলি নিয়ে তাঁর মধ্যে প্রবেশ করলেন, এবং আমিও তখন তাঁর নিঃশ্বাসের মাধ্যমে তাঁর মধ্যে প্রবেশ করেছিলাম। ”
“৪৩০,০০,০০,০০০ সৌর বৎসরের পর ব্রহ্মা যখন ভগবানের ইচ্ছা অনুসারে পুনরায় সৃষ্টি করার জন্য মরীচি, অঙ্গিরা, অত্রি আদি ঋষিদের তাঁর দিব্য দেহ থেকে সৃর্ষ্টি করেন, তখন তাঁদের সঙ্গে আমিও আবির্ভূত হয়েছিলাম। তখন থেকে সর্বশক্তিমান বিষ্ণুর কৃপায় আমি অপ্রাকৃত জগতে এবং জড় জগতের ত্রিভুবনে অপ্রতিহতভাবে সর্বত্র ভ্রমণ করছি। কেন না আমি নিরন্তর ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় দৃঢ়ব্রত হয়েছি। এইভাবে আমি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কর্তৃক প্রদত্ত এই বীণা বাজিয়ে স্বরব্রহ্ম বিভূষিত ভগবানের মহিমা নিরন্তর কীর্তন করি। যখনই আমি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত শ্রুতিমধুর মহিমা এবং কার্যকলাপ কীর্তন করতে শুরু করি, তৎক্ষণাৎ তিনি আমার হৃদয় আসনে আবির্ভূত হন, যেন আমার ডাক শুনে তিনি চলে আসেন। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে দেখেছি যে, যারা সর্বদাই ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিষয়ভোগ-বাসনায় আতুর, তারা এক অতি উপযুক্ত নৌকায় করে ভবসিন্ধু পার হতে পারে– তা হচ্ছে নিরন্তর পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত মহিমা কীর্তন করা। যোগ-প্রণালীর দ্বারা ইন্দ্রিয়-সংযমের অনুশীলনের মাধ্যমে কাম এবং লোভের প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়া যেতে পারে, কিন্তু আত্মার আভ্যন্তরীণ পরিতৃপ্তির জন্য তা যথেষ্ট নয়; এই পরিতৃপ্তি কেবল পরমেশ্বর ভগবানের ভক্তিযুক্ত সেবার মাধ্যমেই লাভ করা যায়। ”
“হে ব্যাসদেব, তুমি নিষ্পাপ। তাই তোমার প্রশ্ন অনুসারে আমি আমার জন্ম এবং কার্যকলাপের কথা তোমাকে বললাম। তা তোমার সন্তুষ্টিবিধানেরও সহায়ক হবে। ”
সূত গোস্বামী বললেন– এইভাবে বাসবী-সূত ব্যাসদেবকে নির্দেশ দিয়ে শ্রীল নারদ মুনি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলেন এবং তাঁর বীণা বাজাতে বাজাতে তিনি তাঁর ইচ্ছাক্রমে বিচরণ করার জন্য সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। শ্রীল নারদ মুনির সাফল্য জয়যুক্ত হোক, কেন না তিনি পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা কীর্তন করেন, এবং তা করে তিনি আনন্দ আস্বাদন করেন এবং দুঃখ-দুর্দশাক্লিষ্ট জগতকে আনন্দ দান করেন। ”