পঞ্চম অধ্যায়- ব্যাসদেবকে শ্রীমদ্ভাগবত সম্বন্ধে দেবর্ষি নারদের নির্দেশ

সূত গোস্বামী বললেন– “তখন দেবর্ষি (নারদ) সুখে উপবিষ্ট হয়ে স্মিত হেসে পরাশর-পুত্র ব্যাসদেবকে সম্বোধন করে জিজ্ঞাসা করলেন- তুমি কি তোমার দেহ অথবা মনকে তোমার স্বরূপ বলে মনে করে সন্তুষ্ট হয়েছ ? তোমার প্রশ্নগুলি ছিল পূর্ণ এবং তোমার অধ্যয়নও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে, আর তুমি যে সমস্ত বৈদিক নির্দেশ বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে মহৎ এবং অদ্ভুত মহাভারত রচনা করেছ সে সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নেই।  তুমি নির্বিশেষ ব্রহ্মতত্ত্ব পূর্ণরূপে উপলব্ধি করেছ এবং তৎসংলগ্ন জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করেছ।  তথাপি হে প্রভু, তুমি কেন নিজেকে অকৃতার্ত বলে মনে করে বিষাদগ্রস্থ হয়েছ ?”

শ্রীল ব্যাসদেব বললেন– “আপনি আমার সম্বন্ধে যা বলেছেন তা সম্পূর্ণ সত্য, কিন্তু এ সমস্ত সত্ত্বেও আমার হৃদয় সন্তুষ্ট হচ্ছে না।  তাই আমি আপনাকে আমার এই অসন্তোষের মূল কারণ জিজ্ঞাসা করছি, কেন না স্বয়ম্ভুব (ব্রহ্মা) সন্তান আপনি অসীম জ্ঞানের অধিকারী।  হে প্রভু! সমস্ত গোপন তত্ত্ব সম্বন্ধে আপনি অবগত, কেননা আপনি এ জড় জগতের পালনকর্তা পরমেশ্বর ভগবানের উপাসনা করেন, যিনি জড় জগতের তিনটি গুণের অতীত।  সূর্যের মতো আপনি ত্রিভুবনের সর্বত্র বিচরন করতে পারেন এবং বায়ুর মতো আপনি সকলের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারেন।  আপনি অন্তর্যামীর মতো সর্বব্যাপ্ত।  তাই দয়া করে আপনি খুঁজে দেখুন ধর্ম আচরণে এবং ব্রত পালনে নিষ্ণাত থাকা সত্ত্বেও আমার অক্ষমতা কোথায়। ”

শ্রীনারদ মুনি বললেন– “তুমি পরমেশ্বর ভগবানের অত্যন্ত মহিমান্বিত এবং নির্মল কীর্তি যথার্থভাবে কীর্তন করনি। যে দর্শন পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত ইন্দ্রিয়গুলির সন্তুষ্টি বিধান করে না, তা অর্থহীন।  হে মহান ঋষি, যদিও তুমি ধর্ম আদি চতুর্বর্গ অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছ, কিন্তু তুমি পরমেশ্বর ভগবান বাসুদেবের মহিমা বর্ণনা করনি।  যে বাণী জগৎ পবিত্রকারী ভগবানের মহিমা বর্ণনা করে না, তাকে সন্ত পুরুষেরা কাকেদের তীর্থবলে বিবেচনা করেন।  ভগবদ্ধামে নিবাসকারী পরমহংসরা সেখানে কোন রকম আনন্দ অনুভব করেন না।  পক্ষান্তরে যে সাহিত্য অন্তহীন পরমেশ্বর ভগবানের নাম, রূপ, যশ, লীলা ইত্যাদির বর্ণনায় পূর্ণ, তা দিব্য শব্দ-তরঙ্গে পরিপূর্ণ এক অপূর্ব সৃষ্টি, যা এই জগতের উদ্ভ্রান্ত জনসাধারণের পাপ-পঙ্কিল জীবনে এক বিপ্লবের সূচনা করে।  এই অপ্রাকৃত সাহিত্য যদি নিভুলভাবে রচিত নাও হয়, তবুও তার সৎ এবং নির্মল চিত্ত সাধুরা শ্রবণ করেন, কীর্তন করেন এবং গ্রহণ করেন।  আত্মোপলব্ধির জ্ঞান সব রকমের জড় সংসর্গবিহীন হলেও তা যদি অচ্যুত ভগবানের মহিমা বর্ণনা না করে তা হলে তা অর্থহীন।  তেমনই যে সকাম কর্ম শুরু থেকেই ক্লেশদায়ক এবং অনিত্য, তা যদি পরমেশ্বর ভগবানের ভক্তিযুক্ত সেবার উদ্দেশ্যে সাধিত না হয় তা হলে তার কি প্রয়োজন ?”

“হে ব্যাসদেব, তোমার দৃষ্টি সর্বতোভাবে পূর্ণ।  তোমার যশ নিষ্কলঙ্ক। তুমি দৃঢ়ব্রত এবং সত্যপ্রতিষ্ঠ।  তাই জনসাধারণের জড় বন্ধন মোচন করার জন্য তুমি সমাধিমগ্ন হয়ে পরমেশ্বর ভগবানের লীলাসমূহ দর্শণ করতে পার।  ভগবানকে ছাড়া তুমি আর যা কিছু বর্ণনা করতে চাও, তা সবই বিভিন্ন রূপ, নাম এবং পরিণামরূপে মানুষের চিত্তকে উদ্বিগ্ন এবং উত্তেজিত করবে, ঠিক যেভাবে একটি আশ্রয়বিহীন নৌকা বায়ুর দ্বারা তাড়িত হয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়।  জনসাধারণ স্বাভাবিকভাবেই ভোগের প্রতি আসাক্ত এবং ধর্মের নামে তুমি তাদের তাতে আরও অনুপ্রাণিত করেছে।  তা বিশেষভাবে নিন্দনীয় এবং অবিবেচকের মতো কাজ হয়েছে।  তোমার দ্বারা এইভাবে নির্দেশিত হয়ে তারা ধর্মের নামে প্রবৃত্তি মার্গে লিপ্ত হবে এবং নিবৃত্তি মার্গ আর অনুসরণ করবে না। ”

“পরমেশ্বর ভগবান অসীম।  জড় সুখভোগের বাসনা থেকে বিরত, অত্যন্ত বিচক্ষণ ব্যক্তিরাই কেবল এই পারমার্থিক তত্ত্বজান উপলব্ধি করার যোগ্য।  তাই যারা জড় বিষয়াসক্তির ফলে এই স্তরে অধিষ্ঠিত হতে পারেনি, তোমার মতো মহৎ আশ্রয়সম্পন্ন ব্যক্তির কর্তব্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের কাহিণী বর্ণনা করার মাধ্যমে তাদের পথ-প্রদর্শণ করা।  ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়ার জন্য যিনি জাগতিক কর্তব্য  পরিত্যাগ করেছেন, অপক্ক অবস্থায় যদি কোন কারণে তাঁর পতনও হয়, তবুও তাঁর বিফল হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না।  পক্ষান্তরে, অভক্ত যদি সর্বতোভাবে নৈমিত্তিক ধর্ম-অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়, তবুও তাতে তার কোন লাভ হয় না।  যে সমস্ত মানুষ যথার্থই বুদ্ধিমান এবং পামার্থিক বিষয়ে উৎসাহী, তাদের কর্তব্য হচ্ছে, সেই চরম লক্ষ্যে উন্নীত হওয়ার জন্য প্রয়াস করা, যা এই ব্রহ্মান্ডের সর্বোচ্চ লোক (ব্রহ্মলোক) থেকে শুরু করে সর্বনিম্ন লোক (পাতাল লোক) পর্যন্ত ভ্রমণ করেও লাভ করা যায় না।  ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে লব্ধ যে জড় সুখ, তা কালের প্রভাবে আপনা থেকেই লাভ হয়, ঠিক যেমন আকাক্সক্ষা না করলেও আমরা দুঃখভোগ করে থাকি। ”
“হে প্রিয় ব্যাস, কোন না কোন কারণে কৃষ্ণভক্তের পতন হলেও তাঁকে কখনই অন্যদের মতো (সকাম কর্মী ইত্যাদি) সংসার-চক্রে পতিত হতে হয় না, কেন না, যে মানুষ একবার পরমেশ্বর ভগবানের শ্রীপাদপদ্মে অমৃত আস্বাদন করেছেন, তিনি নিরন্তর ভগবানের স্মরণ করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারে না।  পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং এই বিশ্ব, তথাপি তিনি তার অতীত।  তাঁর থেকেই এই জগৎ প্রকাশিত হয়েছে, তাঁকে আশ্রয় করেই এই জগৎ বর্তমান এবং প্রলয়ের পর তাঁর মধ্যেই তা লীন হয়ে যায়।  তুমি সে সবই জান।  আমি কেবল সংক্ষেপে তোমাকে তা বলেছি।  তুমি পূণদ্রষ্টা।  তুমি আত্মার দ্বারা অন্তর্যামী পরমাত্মা ভগবানকে জানতে পার, কেন না তুমি ভগবানের কলা-অবতার।  যদিও তুমি জন্মহীন, তবুও সমস্ত মানুষের মঙ্গল সাধনের জন্য তুমি এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছ।  তাই দয়া করে তুমি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দিব্য লীলাসমূহ অত্যন্ত উজ্জ্বলভাবে বর্ণনা কর। তত্ত্বদ্রষ্টা, মহর্ষিরা যথাযথভাবে সিদ্ধান্ত করেছেন যে তপশ্চর্যা, বেদপাঠ, যজ্ঞ, মন্ত্রোচ্চারণ এবং দান আদির একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে উত্তমশ্লোক, ভগবানের অপ্রাকৃত লীলাবিলাসের বর্ণনা করা। ”

“হে মুনিবর, পূর্বকল্পে আমি বেদজ্ঞ ঋষিদের পরিচর্যারত এক দাসীর পুত্ররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলাম।  বর্ষকালের চারটি মাসে তাঁরা যখন একত্রে বসবাস করছিলেন, তখন আমি তাদের সেবায় নিযুক্ত ছিলাম।  যদিও তাঁরা ছিলেন সমদর্শী, সেই বেদজ্ঞ মুনিরা তাঁদের অহৈতুকী করুণার প্রভাবে অামাকে আশীর্বাদ করেছিলেন।  যদিও আমি তখন ছিলাম একটি বালক মাত্র, কিন্তু তবুও আমি ছিলাম সংযত এবং সব রকম শিশুসুলভ খেলাধুলার প্রতি উদাসীন।  তদুপরি, আমি দুরন্ত ছিলাম না এবং আমি প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলতাম না।  একবার কেবল অনুমতি গ্রহণ পূর্বক আমি তাঁদের উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করেছিলাম এবং তার ফলে আমার সমস্ত পাপ তৎক্ষনাৎ বিদূরিত হয়েছিল।  তার ফলে আমার হৃদয় নির্মল হয় এবং সেই সময় পরমার্থবাদীদের আচরণের প্রতি আমি আকৃষ্ট হই। ”

“হে ব্যাসদেব, সেখানে সেই ঋষিরা প্রতিদিন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চিত্তাকর্ষক কার্যকলাপের বর্ণনা করতেন।  তাঁদের অনুগ্রহে আমি তা শ্রবণ করতাম।  এইভাবে নিবিষ্ট চিত্তে তা শ্রবণ করার ফলে প্রতি পদে পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা শ্রবণে আমার রুচি বৃদ্ধি পেতে থাকে।  হে মহর্ষি, পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি রুচি লাভ করা মাত্রই ভগবানের মহিমা শ্রবণে আমি স্থির মতিসম্পন্ন হয়েছিলাম।  সেই রুচি যত বৃদ্ধি পেতে থাকে, ততই আমি বুঝতে পারি যে, আমার অজ্ঞানতার ফলে আমাকে এই স্থুল এবং সুক্ষ্ম শরীর গ্রহণ করতে হয়েছে, কেন না ভগবান এবং জীব উভয়ই প্রপঞ্চাতীত।  এইভাবে বর্ষা এবং শরৎ — এই দুটি ঋতুতে সেই মহান ঋষিদের দ্বারা কীর্তিত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির কীর্তন শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।  ভগবদ্ভক্তির প্রতি আমার প্রবৃত্তি যখন প্রবাহিত হতে শুরু করল, তখন রজ এবং তমোগুণের আবরণ বিদূরিত হয়ে গেল।  আমি সেই ঋষিদের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়েছিলাম।  আমার ব্যবহার ছিল নম্র এবং তাঁদের সেবা করার ফলে আমার সমস্ত পাপ মোচন হয়েছিল।  আমার হৃদয়ে তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ছিল।  আমি আমার সমস্ত ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করেছিলাম এবং আমার দেহ ও মনের দ্বারা আমি অবিচলিতভাবে তাঁদের আজ্ঞা পালন করেছিলাম।  দীনবৎসল সেই ভক্তিবেদান্তরা যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁরা স্বয়ং ভগবান প্রদত্ত পরম গুহ্যজ্ঞান আমাকে দান করেছিলেন।  সেই গুহ্যতম জ্ঞানের প্রভাবে আমি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা এবং ধ্বংসকর্তা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শক্তির প্রভাব স্পষ্টভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলাম।  তা জানার ফলে সহজেই তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া যায় এবং তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করা যায়। ”

“হে ব্রাহ্মন, শাস্ত্রজ্ঞরা বলে গেছেন যে ত্রিতাপ দুঃখ নিরাময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে সমস্ত কর্ম সমর্পণ করা।  হে ভগবান-নিষ্ঠ ব্যাসদেব, যেই দ্রব্যের প্রভাবে রোগ জন্মায়, সেই দ্রব্যই যখন অন্য দ্রব্য বা ঔষধের সঙ্গে রসায়ন-যোগে মিশ্রিত হয়, তখন তা গ্রহণ করার ফলে সেই রোগের কি নিবৃত্তি হয় না ? মানুষের নৈমিত্তিক কাম্য কর্মসমূহ সংসার-বন্ধন বা যোনি-ভ্রমণের কারণ।  কিন্তু সেই সমস্ত কর্মই যখন পরমেশ্বর ভগবানের উদ্দেশ্যে সমর্পিত হয়, তখন তা কর্মরূপী বৃক্ষকে বিনাশ করতে সমর্থ হয়।  এই জীবনে পরমেশ্বর ভগবানের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য  যে কর্ম করা হয়, তাকে বলা হয় ভক্তিযোগ বা পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী সেবা এবং সব রকমের জ্ঞান তখন তার অধীন তত্ত্বরূপে আপনা থেকেই প্রকাশিত হয়।  ভক্ত যখন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উপদেশ অনুসারে কর্ম করেন, তখন তিনি পুনঃ পুনঃ শ্রীকৃষ্ণের গুণ ও নামসমূহ কীর্তন করেন এবং স্মরণ করেন। ”

“প্রণবস্বরূপ হে শ্রীকৃষ্ণ, আপনি বাসুদেব, সঙ্কর্ষণ, প্রদ্যুম্ন ও অনিরুদ্ধ এই চতুর্ব্যূহাত্মক; আপনাকে মনের দ্বারা নমস্কার ও ধ্যান করি।  এইভাবে যিনি বাসুদেব আদি চার মূর্তির নামাত্মক মন্ত্রের দ্বারা মন্ত্রোক্ত চিন্ময়রূপী অথবা প্রাকৃত মূর্তিরহিত যজ্ঞেশ্বরকে পূজা করেন, তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত জ্ঞানবান। ”

“হে ব্রাহ্মণ, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাকে বেদগুহ্য জ্ঞান দান করেন এবং তারপর অণিমা আদি দিব্য ঐশ্বর্য দান করেন এবং সেগুলির প্রতি আমার অনাসক্তি দর্শন করে তিনি আমাকে প্রেম প্রদান করেছিলেন।  তাই দয়া করে তুমি সর্বশক্তিমান ভগবানের কার্যকলাপের কাহিনী বর্ণনা কর, যা তুমি তোমার বিশাল বৈদিক জ্ঞান থেকে জানতে পেরেছ।  কেন না, তা জানলে মহান বিদ্বানদের সব কিছু জানা হয় এবং সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষেরা যারা নিরন্তর জড়জাগতিক দুঃখ ভোগ করছে, তাদের দুঃখ-দুর্দশার সমাপ্তি হয়।  এ ছাড়া দুঃখ নিবৃত্তির আর কোন উপায় নেই। ”

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,963 hits