চতুর্থ অধ্যায়- শ্রীনারদ মুনির আবির্ভাব

সূত গোস্বামীকে এইভাবে বলতে শুনে সেই দীর্ঘকালব্যপী যজ্ঞ অনুষ্ঠানে রত সমস্ত ঋষিদের মধ্যে সব চাইতে প্রবীণ এবং বিদ্বান শৌনক মুনি তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে বললেন- “হে সূত গোস্বামী, যাঁরা আবৃত্তি করতে পারেন এবং বলতে পারেন, তাঁদের মধ্যে আপনিই হচ্ছেন সব চাইতে ভাগ্যবান এবং শ্রদ্ধার্হ।  আপনি দয়া করে শ্রীমদ্ভাগবতের পবিত্র বাণী বর্ণনা করুন, যা মহান শক্তিশালী মহর্ষি শ্রীল শুকদেব গোস্বামী কর্তৃক পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। কোন্ সময়ে এবং কোন্ স্থানে তা প্রথম শুরু হয়েছিল, আর কেনই বা তার গ্রহণ করা হয়েছিল ? মহামুনি শ্রীকৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন ব্যাস কোথা থেকে এই শাস্ত্র প্রনয়ন করার অনুপ্রেরণা লাভ করেছিলেন ? তাঁর (ব্যাসদেবের) পুত্র ছিলেন এক মহান্ ভক্ত, এক অদ্বিতীয় তত্ত্বজ্ঞানী এবং তাঁর চিত্ত ছিল সর্বদাই পরমার্থ সাধনে একাগ্র।  তিনি সব রকম জড়-জাগতিক কার্যকলাপের উর্ধ্বে ছিলেন এবং যদিও তিনি জ্ঞানী ছিলেন, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে তাঁকে দেখে একজন মূঢ় লোক বলে মনে হত।  শ্রীল ব্যাসদেব যখন তাঁর পুত্রকে অনুসরণ করছিলেন, তখন নগ্ন অবস্থায় স্থানরতা সুন্দরী যুবতীরা, যাঁরা ব্যাসদেবের নগ্ন যুবক-পুত্রকে দেখে কোন রকম লজ্জা অনুভব করেননি, তাঁরা অনগ্ন ব্যাসদেবকে দেখে লজ্জাবশত তাঁদের বস্ত্র পরিধান করেছিলেন।  সেই সম্বন্ধে ব্যাসদেব যখন তাঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তখন সেই যুবতীরা উত্তর দিয়েছিলেন যে, তাঁর পুত্রের পবিত্র দৃষ্টিতে স্ত্রী এবং পুরুষে কোন ভেদ ছিল না, কিন্তু মহির্ষির দৃষ্টিতে সেই ভেদ ছিল।  কুরু এবং জাঙ্গল প্রদেশে উন্মাদ, মুক এবং জড়ের মতো বিচরণ করে তিনি যখন হস্তিনাপুর (আধুনিক দিল্লী) নগরে প্রবেশ করলেন, তখন পুরবাসীরা ব্যাসদেব-তনয় শ্রীল শুকদেব গোস্বামীকে কিভাবে চিনতে পারলেন ? কিভাবে মহারাজ পরীক্ষিতের সঙ্গে এই মহির্ষির সাক্ষাৎ হল, যার ফলে সমস্ত বেদের অপ্রাকৃত নির্যাস (শ্রীমদ্ভাগবত) তাঁর কাছে কীর্তিত হয়েছিল ? তিনি (শুকদেব গোস্বামী) গোদোহনকাল পর্যন্ত গৃহমেধিদের দুয়ারে অবস্থান করতেন এবং তিনি তা করতেন কেবল তাদের গৃহকে পবিত্র করার জন্য। ”

“কথিত আছে যে, অভিমন্যু-পুত্র মহারাজ পরীক্ষিত হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবানের এক মহান ভক্ত এবং তাঁর জন্ম এবং কার্যকলাপ অত্যন্ত অদ্ভুত।  দয়া করে অপনি আমাদের তাঁর কথা বলুন।  তিনি ছিলেন এক মহান সম্রাট এবং তাঁর রাজ্যের সমস্ত ঐশ্বর্যের তিনি ছিলেন অধীশ্বর।  তিনি এতই মহিমান্বিত ছিলেন যে, তিনি পান্ডু-বংশের মান বর্ধন করেছিলেন। তিনি কেন সব কিছু পরিত্যাগ করে গঙ্গার তীরে উপবিষ্ট হয়ে অনশনরত অবস্থায় মৃত্যুর প্রতীক্ষা করছিলেন ? তিনি ছিলেন এতই মহান এক সম্রাট যে, তাঁর সমস্ত শত্রুরা  তার পদতলে প্রণতি নিবেদন করে তাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্য তাদের সমস্ত ঐশ্বর্য সমর্পণ করত।  তিনি ছিলেন পূর্ণ যৌবনসম্পন্ন মহাবীর এবং তিনি ছিলেন অসীম রাজকীয় ঐশ্বর্ষের অধীশ্বর।  তিনি কেন সব কিছু, এমন কি তাঁর জীবন পর্যন্ত ত্যাগ করতে ইচ্ছা করেছিলেন।  যাঁরা পরমেশ্বর প্রতি ভক্তিপরায়ন, তাঁরা কেবল অপরের মঙ্গল সাধন, উন্নতি সাধন এবং সুখ-প্রদানের জন্য জীবন ধারণ করেন।  তাঁরা কোন রকম স্বার্থসিদ্ধির জন্য জীবন যাপন করেন না।  তাই মহারাজ (পরীক্ষিত) যদিও সব রকম জড়-জাগতিক বিষয়াসক্তি থেকে মুক্ত ছিলেন, তবু কেন তিনি তাঁর দেহত্যাগ করলেন, যা ছিল অন্যদের আশ্রয়স্বরূপ ? আমরা জানি যে, বেদের কয়েকটি অংশ ব্যতীত সমস্ত বিষয়ের অর্থ সম্বন্ধে আপনি বিশেষভাবে পারদর্শী এবং তাই আমরা আপনাকে যে প্রশ্নগুলি করেছি তার উত্তর আপনি স্পষ্টভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন। ”

শ্রীসূত গোস্বামী বললেন– “ত্রেতা এবং দ্বাপরের যুগপর্যায়ে বসু-দুহিতা সত্যবতীর গর্ভে পরাশর মুনির পুত্ররূপে মহর্ষির (ব্যাসদেবের) জন্ম হয়।  একসময়ে তিনি (ব্যাসদেব) সূর্যোদয়ের সময় সরস্বতী নদীর জলে প্রাতঃ স্নান করে একাকী উপবিষ্ট হয়ে ধ্যানস্থ হলেন।  মহর্ষি বেদব্যাস এই যুগের ধর্ম-বিপর্যয় দর্শন করলেন।  কালের অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে বিভিন্ন যুগে পৃথিবীতে তা হয়ে তাকে।  পূর্ণ জ্ঞানসম্পন্ন মহর্ষি তাঁর দিব্য দৃষ্টির দ্বারা এই যুগের প্রভাবে জড় জগতের অধঃপতন দর্শন করলেন।  তিনি দেখলেন যে, এই যুগের শ্রদ্ধাহীন জনসাধারনের আয়ু অত্যন্ত হ্রাস পাবে এবং সত্ত্বগুণের অভাবে তারা ধৈর্যহীন হয়ে পড়বে।  তাই তিনি সমস্ত বর্ণ এবং আশ্রমের মানুষের কি ভাবে মঙ্গলসাধন করা যায় সেই চিন্তা করলেন।  তিনি দেখলেন যে, বেদে নির্দেশিত যজ্ঞ-অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের বৃত্তি অনুসারে তার কার্যকলাপকে পবিত্র করা।  এই পক্রিয়াকে সরলীকৃত করার উদ্দেশ্যে তিনি এক বেদকে চার ভাগে ভাগ করেছিলেন, মানুষের মধ্যে তা বিস্তার করার জন্য।  জ্ঞানের আদি উৎস বেদকে চারটি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা হয়েছিল।  কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য এবং পুরাণে উল্লিখিত সত্য বর্ণনাগুলিকে পঞ্চম বেদ বলা হয়।  বেদকে চারটি ভাগে ভাগ করার পর, পৈল ঋষি হলেন ঋক্বেদের অধ্যাপক, জৈমিনি হলেন সামবেদের অধ্যাপক এবং বৈশম্পায়ন যজুর্বেদের দ্বারা মহিমান্তিত হলেন।  সুমন্তু মুনি অঙ্গিরা, যিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধা সহকারে সেবাপরায়ণ ছিলেন, তাঁকে বেদ দান করা হয়েছিল এবং আমার পিতা রোমহর্ষণ ঋষির হাতে পুরাণ এবং ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ অর্পণ করা হয়েছিল।  সেই সমস্ত তত্ত্বদ্রষ্টা ঋষিরা বিভিন্ন বেদকে তাঁদের শিষ্য, প্রশিষ্য এবং প্রশিষ্যের শিষ্যদের প্রদান করেছিলেন এবং এইভাবে গুরু-শিষ্য-পরম্পরায় অনন্ত শাখায় বেদ-অনুশীলন শুরু হয়।  এইভাবে অজ্ঞানীদের প্রতি অত্যন্ত কৃপালু মহর্ষি বেদব্যাস বেদ সংকলন করেন, যাতে অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন।  স্ত্রী, শুদ্র এবং দ্বিজোচিত গুণাবলীবিহীন ব্রাহ্মণ কুলোদ্ভুত মানুষদের বেদের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করার ক্ষমতা নেই, তাই তাদের প্রতি কৃপাপরবশ হয়ে মহর্ষি বেদব্যাস মহাভারত নামক ইতিহাস রচনা করলেন, যাতে তারা তাদের জীবনের পরম উদ্দেশ্যে লাভে সমর্থ হতে পারে। ”

“হে দ্বিজগণ, যদিও তিনি সমস্ত মানুষদের সর্বাঙ্গীণ কল্যান সাধনে সচেষ্ট হয়েছিলেন, তবুও তাঁর চিত্ত সন্তুষ্ট ছিল না।  হৃদয়ে অপ্রসন্ন হয়ে মহর্ষি তৎক্ষণাৎ গভীরভাবে বিচার করতে শুরু করলেন।  তিনি ধর্মতত্ত্ব সম্বন্ধে অবগত ছিলেন, তাই তিনি মনে মনে ভাবতে লাগলেন।  কঠোর ব্রত অবলম্বন করে নিষ্কপটভাবে আমি বেদ, গুরুবর্গ এবং যজ্ঞাগ্নির পূজা করেছি।  আমি তাঁদের নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করেছি এবং গুরুপরম্পরাক্রমে লব্ধ জ্ঞান মহাভারতের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেছি,  যাতে স্ত্রী, শুদ্র এবং অন্য সকলে (দ্বিজবন্ধুরা) ধর্মের পথ অবলম্বন করতে পারে।  যদিও আমি বৈদিক দর্শনে অভিপ্রেত সমস্ত যোগ্যতা অর্জন করেছি, তথাপি আমার হৃদয়ে আমি অপূর্ণতা অনুভব করছি।  আমি যে বিশেষভাবে ভগবদ্ভক্তি বর্ণনা করিনি, যা পরমহংসদের এবং অচ্যুত পরমেশ্বর ভগবানের অত্যন্ত প্রিয়, তাই হয়ত আমার এই অসন্তোষের কারণ। ”

“এইভাবে ব্যাসদেব যখন তাঁর অসন্তোষের জন্য অনুশোচনা করছিলেন তখন নারদ মুনি সরস্বতী নদীর তীরে তাঁর আশ্রমে এসে উপস্থিত হলেন।  শ্রীনারদ মুনির শুভাগমনে শ্রীল ব্যাসদেব শ্রদ্ধা সহকারে উঠে দাড়িয়ে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে যেভাবে সম্মান করা হয়, সেইভাবে তাঁকে অভ্যর্থনা করলেন। ”

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,963 hits