শ্রীল সূত গোস্বামী বললেন– “সৃষ্টির আদিতে পরমেশ্বর ভগবান প্রথমে তাঁর পুরুষ-অবতারে বিরাট রূপে নিজেকে প্রকাশ করেন এবং মহত্তত্ত্ব, অহঙ্কার এবং পঞ্চতন্মাত্র আদি জড় সৃষ্টির সমস্ত উপাদানগুলি প্রকাশ করেন। এইভাবে জড় জগৎকে সৃষ্টি করার জন্য তিনি প্রথমে ষোলটি তত্ত্ব সৃষ্টি করেন। ”
“পুরুষাবতারের এক অংশ গর্ভোদকে শয়ন করে যোগনিদ্রা বিস্তার করেন। তাঁর নাভি থেকে একটি পদ্ম বিকশিত হয় এবং সেই পদ্ম থেকে প্রজাপতিদের পতি ব্রহ্মা জন্মগ্রহণ করেন। সমগ্র বিশ্ব-ব্রহ্মান্ড পুরুষের বিরাট শরীরে অবস্থিত, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট এই জড় উপাদানের সঙ্গে তাঁর কোন সম্পর্ক নেই। তাঁর শরীর পরম উৎকর্ষ সহকারে পরা -প্রকৃতিতে অবস্থিত। ভক্তরা তাঁদের বিজ্ঞান-চক্ষুর দ্বারা পরম চমৎকার অসংখ্য হস্ত-পদ-মুখ যুক্ত পুরুষের দিব্য রূপ দর্শন করেন। সেই শরীরে অসংখ্য মস্তক, কর্ণ, চক্ষু, এবং নাসিকা রয়েছে। সেগুলি অসংখ্য মুকুট, উজ্জ্বল, কুন্ডল এবং মালিকার দ্বারা শোভিত। এই রূপ (দ্বিতীয় পুরুষাবতার) ব্রহ্মান্ডে প্রকাশিত অসংখ্য অবতারদের উৎস এবং অবিনশ্বর বীজ। এই রূপের অংশ এবং কলা থেকে দেবতা, মনুষ্য আদি বিভিন্ন জীবের সৃষ্টি হয়েছে। ”
“সৃষ্টির আদিতে প্রথমে ব্রহ্মার চারজন অবিবাহিত পুত্র (চতুঃসন বা কুমারেরা) ছিলেন, যাঁরা ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে পরম সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। এই পৃথিবী যখন রসাতলে পতিত হয়েছিল, তখন এই বিশ্বের মঙ্গলের জন্য পৃথিবীকে উদ্ধার করতে ইচ্ছুক হয়ে সমস্ত যজ্ঞের পরম ভোক্তা যজ্ঞেশ্বর বিষ্ণু দ্বিতীয় অবতারে বরাহ রূপ ধারণ করেছিলেন। ঋষিকল্পে পরমেশ্বর ভগবান দেবর্ষি নারদরূপে তার তৃতীয় শক্তাবেশ অবতারে আবির্ভূত হন। বেদের যে সমস্ত বর্ণনা ভগবদ্ভক্তি এবং নিষ্কাম কর্ম সম্বন্ধে জীবকে অনুপ্রাণিত করে, তিনি সেগুলো সংকলন করেছিলেন। চতুর্থ অবতারে ভগবান ধর্মরাজের পত্নীর গর্ভে নর এবং নারায়ন নামক যমজ পুত্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁরা ইন্দ্রিয়-সংযমের আদর্শ প্রদর্শন করার জন্য কঠোর তপস্যা করেছিলেন। পঞ্চম অবতারে তিনি ঋষিশ্রেষ্ঠ শ্রীকপিল নামে অবতরণ করেন। তিনি আসুরি নামক ব্রাহ্মণকে সৃষ্টির উপাদানসমূহ বিশ্লেষণ করে সাংখ্য দর্শণ প্রদান করেন, কেননা কালের প্রভাবে সেই জ্ঞান লুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পরম পুরুষের ষষ্ঠ অবতার হচ্ছেন মহর্ষি অত্রির পুত্র ভগবান দত্তাত্রেয়। মাতা অনসুয়ার প্রার্থনায় তিনি তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তিনি অলর্ক, প্রাহ্লাদ এবং অন্য অনেককে পারমার্থিক জ্ঞান দান করেছিলেন। সপ্তম অবতার হচ্ছেন প্রজাপতি রুচি ও তার পত্নী আকুতির পুত্র যজ্ঞ। স্বায়ম্ভুব মন্বন্তরে তিনি এই ব্রহ্মান্ড পালন করেছিলেন এবং তাঁর পুত্র যাম আদি দেবতারা তাঁকে সেই কার্যে সাহায্য করেছিলেন। ভগবানের অষ্টম অবতার হচ্ছেন মহারাজ নাভি ও তাঁর পত্নী মেরুদেবীর পুত্র মহারাজ ঋষভদেব। এই অবতারে ভগবান পূর্ণ সিদ্ধি লাভের পন্থা প্রদর্শণ করেছিলেন, যে পন্থা সর্বতোভাবে জিতেন্দ্রিয় এবং সমস্ত বর্ণ ও আশ্রমের মানুষদের দ্বারা পূজিত পরমহংসরা অবলম্বন করে থাকেন। ”
“হে বিপ্রগণ, ঋষিদের দ্বারা প্রার্থিত হয়ে নবম অবতারে ভগবান পৃথুরূপে রাজদেহ ধারণ করেছিলেন। এই পৃথিবীর ওষধীসমূহকে তিনি দোহন করেছিলেন। তাই পৃথিবী তখন পরম কমনীয় হয়ে উঠেছিল। চাক্ষুষ মন্বন্তরে যখন মহাপ্লাবন হয় এবং সমস্ত পৃথিবী জলের অতল তলে নিমজ্জিত হয়, তখন ভগবান মৎস্যরূপ ধারণ করে বৈবস্বত মনুকে একটি নৌকার উপর রেখে তাঁকে রক্ষা করেছিলেন। একাদশ অবতারে ভগবান কূর্মরূপ পরিগ্রহ করে তাঁর পৃষ্টে মন্দরাচল পর্বতকে ধারণ করেছিলেন, যা সমুদ্র-মন্থনকারী দেবতা এবং দানবেরা মন্থন-দন্ডরূপে ব্যবহার করেছিল। দ্বাদশ অবতারে ভগবান ধন্বন্তরিরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং ত্রয়োদশ অবতারে তিনি মোহিনীরূপে অসুরদের সম্মোহিত করে দেবতাদের অমৃত পান করতে দিয়েছিলেন। চতুর্দশ অবতারে ভগবান নৃসিংহরূপে আবির্ভূত হয়ে তাঁর নখের দ্বারা দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর সুদৃঢ় শরীর বিদীর্ণ করেছিলেন, ঠিক যেভাবে একজন সূত্রধর এরকা তৃণ বিদীণ করে। পঞ্চদশ অবতারে ভগবান বামনরূপ ধারণ করে দৈত্যরাজ বলির যজ্ঞস্থানে গমন করেছিলেন। যদিও তিনি দেবতাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ত্রিভুবন অধিকার করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তবুও তিনি কেবল ত্রিপাদ ভূমি ভিক্ষা করেছিলেন। ষোড়শ অবতারে ভগবান ভৃগুপতিরূপে অবতীর্ণ হয়ে ক্ষত্রিয় রাজাদের দেব-দ্বিজ বিদ্বেষী দেখে তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে পৃথিবীকে একুশবার ক্ষত্রিয়শূণ্য করেছিলেন। তারপর সপ্তদশ অবতারে ভগবান শ্রীব্যাসদেবরূপে পরাশর মুনির পত্নী সত্যবতীর গর্ভে আবির্ভূত হন। মানবকুলের ভিতর বুদ্ধিমত্তার স্বল্পতা দর্শণ করে তিনি তাদের কল্যানের জন্য বেদবৃক্ষের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছিলেন। অষ্টাদশ অবতারে ভগবান শ্রীরামচন্দ্ররূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। দেবতাদের অভীষ্ট সিদ্ধির জন্য তিনি সেতুবন্ধন তথা রাবন-বধ আদি কার্য সম্পাদন করে তাঁর অলৌলিক শক্তি প্রদর্শণ করেছিলেন। ঊণবিংশতি এবং বিংশতি অবতরণে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবলরাম এবং শ্রীকৃষ্ণরূপে বৃষ্ণিকুলে (যদু-বংশে) আবির্ভূত হয়ে পৃথিবীর ভার গ্রহণ করেছিলেন। তারপর কলিযুগের প্রারম্ভে ভগবান ভগবদ্বিদ্বেষী নাস্তিকদের সম্মোহিত করার জন্য বুদ্ধদেব নামে গয়া প্রদেশে অঞ্জনার পুত্ররূপে আবির্ভূত হবেন। তারপর দ্বাবিংশ অবতারে যুগ সন্ধিকালে, অর্থাৎ কলিযুগের অন্তে নৃপতিরা যখন দস্যুপ্রায় হয়ে যাবে, তখন ভগবান কল্কি অবতার নামে বিষ্ণুযশ নামক ব্রাহ্মণের পুত্ররূপে অবতরণ করবেন। ”
“ হে ব্রাহ্মণগণ, বিশাল জলাশয় থেকে যেমন অসংখ্য নদী প্রবাহিত হয়, ঠিক তেমনই ভগবানের থেকে অসংখ্য অবতার প্রকাশিত হন। সমস্ত ঋষি, মনু, দেবতা এবং মনুর বংশধরেরা যাঁর বিশেষ শক্তিসম্পন্ন তাঁরাও হচ্ছেন ভগবানের অংশ এবং কলা। প্রজাপতিরাও এই অংশ ও কলার অন্তর্গত। পূর্বোলিখিত এই সমস্ত অবতারেরা হচ্ছেন ভগবানের অংশ অথবা কলা অবতার, কিন্ত শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং। যখন নাস্তিকদের অত্যাচার বেড়ে যায, তখন আস্তিকদের রক্ষা করার জন্য ভগবান এই ধরাধামে অবতীর্ণ হন। যে মানুষ মনোযোগ সহকারে ভগবানের রহস্যপূর্ণ প্রকট অর্থাৎ অবতরণের কথা সকাল এবং সন্ধ্যায় ভক্তিপূর্বক পাঠ করেন, তিনি জড় জগতের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হন। ”
“ জড় জগতে ভগবানের যে বিরাট রূপের ধারণা তা কল্পনাপ্রসূত। তা অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের (এবং নব্য ভক্তদের) ভগবানের রূপ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করার জন্য। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ভগবানের কোন প্রাকৃত বা জড় রূপ নেই। মেঘ এবং ধুলিকনা বায়ুর দ্বারা বাহিত হয়, কিন্তু অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা বলে যে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন এবং বায়ু ধুলাচ্ছন্ন। তেমনই, তারা আত্মায় জড় শরীরের ধারণা আরোপ করে। এই স্থুল রূপের ধারণার উর্ধ্বে আরেকটি সুক্ষ রূপ রয়েছে। যার কোন পরিণত রূপ নেই এবং যা দেখা যায় না, যাকে শোনা যায় না এবং যা অপ্রকাশিত। এই সুক্ষ্ম স্তরের উর্ধ্বে হচ্ছে জীবের স্বরূপ, তা না হলে সে বারংবর জন্মগ্রহণ করতে পারত না। আত্মোপলব্ধির দ্বারা কেউ যখন হৃদয়ঙ্গম করতে পারে যে স্থুল এবং সুক্ষ্ম শরীরের সঙ্গ শুদ্ধ আত্মার কোন সম্পর্ক নেই, তখন সে নিজেকে এবং পরমেশ্বর ভগবানকে দর্শন করে। ভগবানের কৃপায় যখন মায়াশক্তির প্রভাব প্রশমিত হয় এবং জীব পূণ জ্ঞানপ্রাপ্ত হন, তখন তিনি আত্মজ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত হন এবং স্বীয় মহিমায় অধিষ্ঠিত হন। এইভবে বিদ্বানেরা সেই জন্মরহিত এবং প্রাকৃত কর্মরহিত ভগবানের জন্ম এবং কর্মের বর্ণনা করেন, যা বৈদিক শাস্ত্রেও অনাবিষ্কৃত। তিনিই হচ্ছেন হৃদয়েশ্বর। ”
“যাঁর চরিত্র সর্বদাই নির্মল এবং নিষ্কলঙ্ক, সেই ভগবান ষড় ইন্দ্রিয়ের এবং ষড় ঐশ্বর্যের অধীশ্বর। তিনি কোনভাবে প্রভাবিত না হয়ে এই বিশ্ব সৃষ্টি করেন, পালন করেন এবং ধ্বংস করেন। তিনি প্রতিটি জীবের অন্তরে বিরাজ করেন এবং তিনি সর্ব অবস্থাতেই সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন। নটবৎ অভিনয়পরায়ণ পরমেশ্বর ভগবানের নাম, রূপ এবং লীলাবিলাসের অপ্রাকৃত স্বভাব বিকৃত মনোভাবাপন্ন মূর্খ মানুষেরা জানতে পারে না। তারা তাদের জল্পনা-কল্পনায় অথবা বাক্যের মাধ্যমে তা ব্যক্ত করতে পারে না। যাঁরা দুরন্তবীর্য রথচক্রধারী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীপাদপদ্মে অনুকূলভাবে অহৈতুকী এবং অপ্রতিহতা সেবাপরায়ন, তাঁরাই কেবল জগতের সৃষ্টিকর্তার পূর্ণ মহিমা, শক্তি এবং দিব্য ভাব সম্বন্ধে অবগত হতে পারেন। ”
“এই ধরনের প্রশ্ন করার মাধ্যমেই কেবল এই জগতে সফল হওয়া যায় এবং পূর্ণ জ্ঞান লাভ করা যায়। কেন না এই ধরনের প্রশ্ন জগৎপতি পরমেশ্বর ভগবানের প্রতি অপ্রাকৃত প্রেম বিকশিত করে এবং জন্ম-মৃত্যুর ভয়ানক আবর্ত থেকে জীবকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করে। ”
“এই শ্রীমদ্ভাগবত হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের বাক্সময় বিগ্রহ এবং তার সংকলন করেছেন ভগবানের অবতার শ্রীল ব্যাসদেব। তাঁর উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্ত মানুষের পরম মঙ্গল সাধন করা এবং এটি সর্বতোভাবে সার্থক, পূর্ণ আনন্দময় এবং সর্বতোভাবে পরিপূর্ণ। শ্রীল ব্যাসদেব সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র এবং এই ব্রহ্মান্ডের ইতিহাসের সারতত্ত্ব আহরণ করার পর সমস্ত আত্মজ্ঞানীদের মুকুটমনিস্বরূপ তাঁর পুত্রকে তা দান করেছিলেন। ব্যাসদেবের পুত্র শুকদেব গোস্বামী গঙ্গার তটে প্রায়োপবেশনে উপবিষ্ট এবং মহান ঋষিদের দ্বারা পরিবেষ্টিত মহারাজ পরীক্ষিতকে শ্রীমদ্ভাগবত শুনিয়েছিলেন। ভগবান যখন তাঁর লীলা সংবরণ করে ধর্ম ও তত্ত্বজ্ঞানসহ নিজ ধামে গমন করলেন, তখন সূর্যের মতো উজ্জ্বল এই পুরানের উদয় হয়েছে। কলিযুগের অন্ধকারে আচ্ছন্ন ভগবৎ-দর্শনে অক্ষম মানুষেরা এই পুরান থেকে আলোক প্রাপ্ত হবে। ”
“হে তত্ত্বজ্ঞানী ব্রাহ্মণগণ, (মহারাজ পরীক্ষিতের সমক্ষে) শুকদেব গোস্বামী যখন শ্রীমদ্ভাগবত কীর্তন করেন, তখন নিবিষ্ট চিত্তে আমি তা শ্রবণ করেছিলাম এবং তাই সেই মহান শক্তিশালী বিপ্রর্ষির কৃপায় আমি শ্রীমদ্ভাগবত হৃদয়ঙ্গম করেছিলাম। এখন তাঁর কাছ থেকে আমি যা শুনেছিলাম, তা আমার উপলব্ধি অনুসারে আপনাদের শোনাতে চেষ্টা করব। ”