রোমহর্ষণ-পুত্র উগ্রশ্রবা (সূত গোস্বামী) শৌনকাদি ব্রাহ্মণদের সেই সব প্রশ্নে সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত হয়ে তাঁদের ধন্যবাদ জানালেন এবং তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করলেন।
শ্রীল সূত গোস্বামী বললেন– “আমি সেই মহর্ষিকে (শুকদেব গোস্বামী) আমার প্রণতি নিবেদন করছি, যিনি সমস্ত জীবের হৃদয়ে প্রবেশ করতে পারেন। তিনি যখন সন্ন্যাস অবলম্বন করার জন্য উপনয়ন অনুষ্ঠান হওয়ার আগেই গৃহত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলেন, তখন তাঁর পিতৃদেব শ্রীল ব্যাসদেব তাঁর বিরহে কাতর হয়ে তাঁকে ‘হে পুত্র! হে পুত্র! বলে আহ্বান করেছিলেন, তখন তাঁর ভাবনায় তন্ময় বৃক্ষরাজিও বিরহকাতর পিতার ব্যথায় ব্যথিত হয়ে প্রত্যুত্তর করেছিল। সংসাররূপ গভীর অন্ধকার উত্তীর্ণ হওয়ার অভিলাষী বিষয়াসক্ত মানুষদের কাছে কৃপা করে যিনি স্বীয় প্রভাব-জ্ঞাপক সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সারভূত অনুপম আত্মতত্ত্ব প্রকাশক দীপ-সদৃশ সর্বপুরাণ-রহস্য শ্রীমদ্ভাগবত বলেছিলেন, সেই মুনিগণের গুরু ব্যাস-তনয় শ্রীল শুকদেবকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। সংসার-বিজয়ী গ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবত উচ্চারণ করার পূর্বে পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণ, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ নর-নারায়ণ ঋষি নামক ভগবৎ-অবতার, বিদ্যাদেবী সরস্বতী এবং ব্যাসদেবকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি। ”
“ হে ঋষিগণ, আপনারা আমাকে যথার্থ প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করেছেন। আপনাদের প্রশ্নগুলি অতি উত্তম, কেন না সেগুলি কৃষ্ণ-বিষয়ক এবং তাই তা জগতের মঙ্গল সাধন করে। এই ধরনের পরিপ্রশ্নের দ্বারাই কেবল আত্মা সম্পূর্ণরূপে প্রসন্ন হয়। সমস্ত মানুষের পরম ধর্ম হচ্ছে সেই ধর্ম যার দ্বারা ইন্দ্রিয়জাত জ্ঞানের অতীত শ্রীকৃষ্ণে অহৈতুকী এবং অপ্রতিহতা ভক্তি লাভ করা যায়। সেই ভক্তিবলে অনর্থ নিবৃত্তি হয়ে আত্ম যথার্থ প্রসন্নতা লাভ করে। ভক্তি সহকারে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করা হলে অচিরেই শুদ্ধ জ্ঞানের উদয় হয় জড়জাগতিক বিষয়ের প্রতি অনাসক্তি আসে। স্বীয় বৃত্তি অনুসারে বর্ণাশ্রম পালন রূপ স্ব-ধর্ম অনুষ্ঠান করার ফলেও যদি পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা শ্রবণ-কীর্তনে আসক্তির উদয় না হয়, তা হলে তা বৃথা শ্রম মাত্র। সমস্ত ধর্মের উদ্দেশ্যই হচ্ছে চরম মুক্তি লাভ করা। তা কখনও জড় বিষয় লাভের আশায় অনুষ্ঠান করা উচিত নয়। অধিকন্তু, তত্ত্বদ্রষ্টা মহির্ষিরা নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, যাঁরা পরম ধর্ম অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়েছেন, তাঁরা যেন কখনই ইন্দ্রিয়-সুখভোগের উদ্দেশ্যে জড়-জাগতিক লাভের প্রত্যাশী না হন। ইন্দ্রিয় সুখভোগকে কখনই জীবনের উদ্দেশ্য বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। সুস্থ জীবন যাপন করা অথবা আত্মাকে নির্মল রাখার বাসনাই কেবল করা উচিত, কেননা মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে পরম-তত্ত্ব সম্বন্ধে অনুসন্ধান করা। এ ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য নিয়ে কর্ম করা উচিত নয়। যা অদ্বয় জ্ঞান, অর্থাৎ এক এবং অদ্বিতীয় বাস্তব বস্তু, জ্ঞানীগণ তাকেই পরমার্থ বলেন। সেই তত্ত্ববস্তু ব্রহ্ম, পরমাত্মা ও ভগবান– এই ত্রিবিধ সংজ্ঞায় সংজ্ঞিত বা কথিত হন। অপ্রাকৃত বস্তুতে সুদৃঢ় ও নিশ্চয় বিশ্বাসযুক্ত মুনিগণ জ্ঞান এবং বৈরাগ্যযুক্ত হয়ে শাস্ত্র শ্রবণজনিত উপলব্ধি অনুসারে ভগবানের প্রতি প্রেমময়ী সেবার দ্বারা তাঁদের শুদ্ধ হৃদয়ে পরমাত্মারূপে সেই তত্ত্ববস্তুকে দর্শন করেন। ”
“হে দ্বিজশ্রেষ্ঠ, তাই সিদ্ধান্ত করা হয়েছে যে, স্বীয় প্রবণতা অনুসারে বর্ণাশ্রম ধর্ম পালন করার মাধ্যমে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীহরির সন্তুষ্টি-বিধান করাই হচ্ছে স্ব-ধর্মের চরম ফল। তাই একাগ্র চিত্তে, নিরন্তর ভক্তবৎসল ভগবানের মহিমা শ্রবণ কীর্তন, স্মরণ এবং তাঁর আরাধনা করা কর্তব্য। পরমেশ্বর ভগবানের অনুস্মরণ রূপ তরবারি দ্বারা যথার্থ জ্ঞানী পুরুষেরা কর্ম-বন্ধন ছেদন করেন। তাই সেই ভগবানের কথায় কেই বা রতিযুক্ত হবে না ?”
“ হে ব্রাহ্মণ ঋষিগণ, সব রকমের পাপ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত ভগবদ্ভক্তদের সেবা করার ফলে মহৎ-সেবা সাধিত হয়। এই ধরনের সেবার ফলে কৃষ্ণকথা শ্রবণে আসক্তির উদয় হয়। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, যিনি পরমাত্মারূপে সকলের হৃদয়েই বিরাজ করেন এবং যিনি হচ্ছেন সাধুবর্গের সুহৃদ, তিনি তাঁর পবিত্র কথা শ্রবণ এবং কীর্তনে রতিযুক্ত ভক্তদের হৃদয়ের সমস্ত ভোগ-বাসনা বিনাশ করেন। নিয়মিতভাবে শ্রীমদ্ভাগবত শ্রবণ করলে এবং ভগবানের শুদ্ধ ভক্তের সেবা করলে হৃদয়ের সমস্ত কলুষ সম্পূর্ণরূপে বিনষ্ট হয় এবং তখন উত্তম শ্লোকের দ্বারা বন্দিত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রেমময়ী ভক্তি সুদৃঢ়রূপ প্রতিষ্ঠিত হয়। যখন হৃদয়ে নৈষ্ঠিকী ভক্তির উদয় হয়, তখন রজ ও তমোগুণের প্রভাবজাত কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি রিপুসমূহ হৃদয় থেকে বিদুরিত হয়ে যায়। তখন ভক্ত সত্ত্বগুণে অধিষ্ঠিত হয়ে সম্পূর্ণরূপে প্রসন্ন হন। এইভাবে শুদ্ধ-সত্ত্বে অধিষ্ঠিত হয়ে ভক্তিযোগে যুক্ত হওয়ার ফলে যাঁর চিত্ত প্রসন্ন হয়েছে, তিনি সবরকম জড়-বন্ধন মুক্ত হয়ে ভগবত্তত্ত্ব-বিজ্ঞান উপলব্ধি করেন। আত্মার আত্মা পরমাত্মা ভগবানকে দর্শন হলে হৃদয়গ্রন্থি ছিন্ন হয়, সমস্ত সংশয় দূর হয় এবং সমস্ত কর্মফল ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তাই সমস্ত পরমার্থবাদীরা চিরকাল গভীর আনন্দ সহকারে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করে আসছেন, কেন না এই ধরনের প্রেমময়ী সেবা আত্মাকে অনুপ্রাণিত করে। পরমেশ্বর ভগবান সত্ত্ব, রজ এবং তম নামক জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত। জড় জগতের সৃষ্টি, পালন এবং বিনাশের জন্য তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণ এবং শিব এই তিনটি গুণজাত রূপ ধারণ করেন। এই তিনটি রূপের মধ্যে সমস্ত মানুষই সত্ত্বগুণজাত রূপ বিষ্ণুর থেকে আত্যন্তিক মঙ্গল লাভ করতে পারেন। কাঠ হচ্ছে মৃত্তিকার বিকার, কিন্তু ধোঁয়া কাঠ থেকে শ্রেয়। আর অগ্নি তার থেকেও শ্রেয়, কেননা অগ্নি দ্বারা (বৈদিক যজ্ঞের মাধ্যমে) উচ্চতর জ্ঞান লাভ করা যায়। তেমনই, রজোগুণ তমোগুণ অপেক্ষা শ্রেয়; কিন্তু স্বত্ত্বগুণ সর্বশ্রেষ্ঠ, কেন না সত্ত্বগুণের দ্বারা আমরা পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে পারি। ”
“পূর্বে সমস্ত মহির্ষিরা পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করেছিলেন, কেন না তিনি জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণের অতীত। তাঁরা জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে আত্যন্তিক মঙ্গল সাধনের জন্য তাঁর আরাধনা করেছিলেন। যাঁরা সেই সমস্ত মহাত্মাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন, তাঁরাও এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন। যাঁরা মুক্তিলাভের জন্য ঐকান্তিকভাবে আগ্রহী, তাঁরা অবশ্যই অসুয়ারহিত এবং তাঁরা সকলের প্রতি শ্রদ্ধাপরায়ণ। তথাপি তাঁরা ভয়ঙ্কর আকৃতি বিশিষ্ট দেব-দেবীদের ত্যাগ করে কেবল পরমেশ্বর ভগবান শ্রীবিষ্ণু এবং তাঁর অংশ অবতারদের নিত্য আনন্দময় রূপের আরাধনা করেন। যারা রজ ও তমোগুণের অধীন, তারা পিতৃপুরুষ, ভূত এবং প্রজাপতিদের পূজা করে, কেন না তারা স্ত্রী, ঐশ্বর্য, শক্তি এবং সন্তান-সন্ততি আদি জড় বিষয়-ভোগের বাসনার দ্বারা প্রভাবিত। ”
“বৈদিক শাস্ত্রে জ্ঞানের পরম উদ্দেশ্য হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। যজ্ঞ সম্পাদনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবানের প্রীতি-বিধান এবং যোগের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁকে জানা। সমস্ত সকাম কর্মের চরম ফল তিনিই দান করেন। পরম জ্ঞান এবং সমস্ত তপশ্চর্যার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁকে জানা এবং তাঁর প্রতি প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হওয়াই হচ্ছে ধর্মের উদ্দেশ্য। তিনি হচ্ছেন জীবনের পরম উদ্দেশ্য। এই পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং নির্গুণ হয়ে প্রথমে কার্য-কারণাত্মিকা ত্রিগুণময়ী স্বীয় বহিরঙ্গা শক্তি মায়াকে নিরীক্ষণ করে এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন। জড় জগৎ সৃষ্টি করার পর ভগবান (বাসুদেব) নিজেকে বিস্তার করে তার মধ্যে প্রবেশ করেন। যদিও তিনি জড়া প্রকৃতির গুণগুলির মধ্যে অবস্থিত এবং যদিও মনে হয় যে এই জড় জগতে তাঁর সৃষ্টি হয়েছে, তবুও তিনি তাঁর অপ্রাকৃত স্তরে অধিষ্ঠিত এবং পূর্ণ জ্ঞানময়। আগুন যেমন কাঠের মধ্যে নিহিত থাকে, তেমনই পরমেশ্বর ভগবান পরমাত্মারূপে সব কিছুর মধ্যে পরিব্যাপ্ত। যদিও তিনি অদ্বিতীয় পরম পুরুষ, তবুও মনে হয় তিনি যেন নানারূপে প্রকাশিত হয়েছেন। পরমাত্মা প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত তাঁর সৃষ্ট জীবেদের দেহে প্রবেশ করেন এবং সুক্ষ্ম মনের দ্বারা তাদের এই সমস্ত গুণগুলির প্রতিক্রিয়া ভোগ করান। এইভাবে সমস্ত জগতের পতি দেবতা, মনুষ্য এবং পশু অধ্যুষিত সমস্ত গ্রহ লোকগুলি প্রতিপালন করেন। বিভিন্ন অবতারে তিনি তাঁর লীলা-বিলাস করে বিশুদ্ধ-সত্ত্বেও অধিষ্ঠিত জীবসমূহকে উদ্ধার করেন। ”