ধর্মের ভিত্তিতে আপনাদের সমাজ গড়ে তুলুন

      ভদ্রমহোদয় ও ভদ্রমহিলাগণ, কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের এই অনুষ্ঠানে যোগদান করার জন্য আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।  কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন মানব-সমাজের প্রতিটি মানুষের জীবনকে সার্থক করার চেষ্টা করছে।  আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে মানব-জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য কি।  সমস্ত পৃথিবীর মানুষদের সেই উদ্দেশ্য সম্বন্ধে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টাই আমরা করছি।

লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের পর মানব-জন্ম লাভ হয়।  পদ্ম পুরাণের বর্ণনা অনুসারে চৌরাশী লক্ষ বিভিন্ন যোনি রয়েছে, অর্থাৎ চৌরাশী লক্ষ রকমের বিভিন্ন জীব-শরীর রয়েছে। জীবনের শুরু হয় জলচর প্রাণী থেকে।  বৈদিক শাস্ত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সৃষ্টির আদিতে সব কিছু জলমগ্ন ছিল।  এই জড় জগৎ পাঁচটি স্থুল উপাদানের দ্বারা গঠিত।  সেইগুলি হচ্ছে মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু এবং আকাশ।  এছাড়াও রয়েছে আরও তিনটি সুক্ষ্ম উপাদান– মন, বুদ্ধি এবং অহংকার।  এই আবরণগুলির আড়ালে রয়েছে আত্মা, যা এই আটটি উপাদানের দ্বারা আচ্ছাদিত।  ভগবদ্গীতায় সেই কথা বিশদভাবে বর্ণণা করা হয়েছে।

এমন নয় যে, কেবল মানুষেরই আত্মা রয়েছে।  আমরা সকলেই প্রকৃতপক্ষে আত্মা– পশু, পক্ষী, কীট, পতঙ্গ, সরীসৃপ, বৃক্ষ, লতা ইত্যাদি।  এই শরীরগুলি হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন পোশাকের মতো, এবং আত্মা সেই ভিন্ন ভিন্ন শরীরের দ্বারা আবৃত, ঠিক যেমন আপনাদের মধ্যে কেউ সাদা পোশাক পরে আছেন, কেউ সবুজ পোশাক পরে আছেন, কেউ লাল পোশাক পরে আছেন।  কিন্তু সেই পোশাকটি নিয়ে আমরা ততটা মাথা ঘামাই না; আমরা জীবের যথার্থ স্বরূপ– আত্মাকে নিয়ে চিন্তা করি। ভগবদ্্গীতায় বলা হয়েছে–
বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পন্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ ॥

“যিনি যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী মহাত্মা, তিনি বিদ্যা এবং বিনয়সম্পন্ন একজন ব্রাহ্মণ, একটি গাভী, একটি হাতি, একটি কুকুর এবং একজন কুকুর ভোজী চন্ডাল, এদের সকলকেই সমদৃষ্টিতে দর্শন করেন। ”
(ভগবদ্গীতা ৫/১৮)
যিনি যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী, তিনি গায়ের রঙ, বুদ্ধিমত্তা অথবা জাতির পরিপ্রেক্ষিতে ভেদাভেদ দর্শন করেন না।  তিনি প্রতিটি জীবকেই আত্মারূপে দর্শন করেন।  এই আত্মার আয়তন ক্ষুদ্র। শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণনা করা হয়েছে–
কেশাগ্র-শতভাগস্য শতাংশঃ সাদৃশাত্মকঃ।
জীবঃ সুক্ষ্ম স্বরূপোহয়ং সংখ্যাতীতো হি চিৎ কণাঃ ॥
“অসংখ্য চিৎ-কণা রয়েছে, যার আয়তন হচ্ছে কেশাগ্রের দশ সহস্র ভাগের এক ভাগ। ” — আত্মাকে মাপার কোন রকম যন্ত্র আমাদের নেই বলে আত্মার ক্ষুদ্রত্ব এইভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।  অর্থাৎ, আত্মা পরমানুর থেকেও অনেক, অনেক ছোট।  আর সেই অতি ক্ষুদ্র চিৎ-কণাটি আপনাদের সকলের মধ্যে রয়েছে– আমার মধ্যে রয়েছে, একটি হাতির মধ্যে রয়েছে, সমস্ত মানুষের মধ্যে রয়েছে, বড় বড় সমস্ত পশুর মধ্যে রয়েছে, আবার অতি ক্ষুদ্র একটি পিপীলিকার মধ্যেও রয়েছে, গাছের মধ্যে রয়েছে, সব জায়গায় রয়েছে।  কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এই আত্মার আয়তন পর্যন্ত অনুমান করতে পারে না, আর এই আত্মা যে শরীরের কোথায় রয়েছে, আধুনিক ডাক্তারেরাও তা জানে না, তাই জড় বৈজ্ঞানিকেরা বলে, আত্মা বলে কিছু নেই।  কিন্তু তাদের সেই অনুমান সত্য নয়, আত্মা রয়েছে।  এই আত্মার উপস্থিতির ফলেই একটি মৃতদেহের সঙ্গে একটি জীবন্ত দেহের এত পার্থক্য।  আত্মাটি দেহ থেকে বেরিয়ে গেলেই দেহটি মরে যায়।  তখন আর তার কোন মূল্য থাকে না।  আত্মা চলে গেলেই যে দেহের মৃত্যু হয়, সেটি সমস্ত বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিকদের স্বীকার করতেই হবে।  মৃতদেহটির তখন আর কোন উপযোগিতা থাকে না, তাই তৎক্ষণাৎ সেটি পুড়িয়ে ফেলা অথবা কবর দেওয়া হয়।  তাই আমাদের বুঝতে হবে যে, যথার্থ মূল্যবান বস্তুটি হচ্ছে আত্মা, দেহটি নয়।
আত্মার যে দেহান্তর হয়, সেই সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করে ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে–
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায়
নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণি।
তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্য-
ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ॥
“মানুষ যেমন পুরাতন বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র ধারণ করে, তেমনই আত্মা পুরাতন, অকেজো শরীরটি ত্যাগ করে নতুন শরীর ধারণ করে। ” (ভগবদ্গীতা ২/২২)

আমাদের কাপড় যখন পুরানো হয়ে যায়, তখন সেটি ফেলে দিয়ে আমরা একটি নতুন কাপড় পরি; তেমনই আত্মা তার বাসনা অনুসারে তার বসন পরিবর্তন করে।  আত্মা যেহেতু ভগবানের বিভিন্ন অংশ, তাই তার মধ্যেও ভগবানের গুণাবলি রয়েছে।  ভগবান হচ্ছেন পরম ইচ্ছাময়, পরম শক্তিমান, পরম স্বাধীন।  আমরা তাঁর অংশ হওয়ার ফলে এই সমস্ত গুণগুলি আমাদের মধ্যেও খুব অল্প পরিমাণে বর্তমান।  আমাদের মধ্যেও ইচ্ছা করার, অনুভব করার এবং আকাঙ্ক্ষা করার ক্ষমতা রয়েছে।  বেদে বলা হয়েছে, সমস্ত চেতন বস্তুর মধ্যে ভগবানই হচ্ছেন পরম চেতন বস্তু  (চেতনশ্চেতনানাম্)।  তিনি সমস্ত জীবের সমস্ত প্রয়োজনগুলি মেটাচ্ছেন।

জীব অসংখ্যা, কিন্তু ভগবান হচ্ছেন এক।  তিনিও আমাদের মতোই চেতনাময়, কিন্তু তিনি হচ্ছেন পরম চেতনাময়, আর আমরা হচ্ছি সেই চেতনার অতি ক্ষুদ্র অংশ।  সোনার একটি ছোট্ট টুকরো যেমন সমস্ত স্বর্ণখনির মধ্যে গুণগতভাবে এক, ঠিক তেমনই সমুদ্রের এক বিন্দু জলের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, তার মধ্যে সমুদ্রের বিশাল জলরাশির সমস্ত উপাদানগুলি বর্তমান।  তেমনই, ভগবানের বিভিন্ন অংশ হওয়ার ফলে গুণগতভাবে আমরাও ভগবানের সঙ্গে এক।  সেই দিব্য বস্তুটি, আত্মা বা চেতন বস্তুটি, ক্রমান্বয়ে জলচর-শরীর থেকে বৃক্ষ-শরীরে, বৃক্ষ-শরীর থেকে কীট-পতঙ্গের শরীরে, কীট-পতঙ্গের শরীর থেকে সরীসৃপের শরীরে, তারপর পক্ষী-শরীরে, এবং তারপর পশু-শরীরে দেহান্তরিত হয়।  ডারউইন- এর বিবর্তনবাদ আত্মার এই দেহান্তরের আংশিক বিশ্লেষণ মাত্র।  ডারউইন এই তথ্যগুলি বৈদিক শাস্ত্র থেকে গ্রহণ করেছিল, কিন্তু আত্মা সম্বন্ধে তার কোন ধারণাই ছিল না।  আত্মা জলচর শরীরে থেকে বৃক্ষ এবং লতার শরীরে দেহান্তরিত হয়, তারপর ক্রমান্বয়ে কীট-পতঙ্গের শরীরে, পক্ষীর শরীরে, পশু-শরীরে দেহান্তরিত হয়ে অবশেষে সে মনুষ্য-শরীর প্রাপ্ত হয়।  অসভ্য থেকে সভ্যতার ক্রম অনুসারে মনুষ্য-শরীরেরও আবার বিভিন্ন স্তর রয়েছে।  সভ্য মনুষ্য-শরীরই হচ্ছে বিবর্তনের চরম পরিণতি, সেটি হচ্ছে সন্ধি-স্থল– সেখান থেকে আবার বিবর্তনের চক্রে অধঃপতিত হওয়ার বা দিব্য স্তরে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  সেটি আমাদেরই বিচার করে নিতে হবে।  সেই কথা ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে।

মনুষ্য-জীবন হচ্ছে উন্নত চেতনা-বিশিষ্ট জীবন।  তাই কুকুর, বেড়াল অথবা শুয়োরের মতো জীবন যাপন করে আমাদের এই দুর্লভ মনুষ্য-জন্মের অপচয় করা উচিত নয়।  সেই নির্দেশই শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে।  এই শরীরটি যদিও কুকুর-বেড়ালের শরীরের মতোই নশ্বর, কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে এই যে, এই শরীরটি পাওয়ার ফলে আমরা এই জীবনেই আমাদের চরম পূর্ণতা লাভ করতে পারি।  আমরা সকলেই পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন অংশ, কিন্তু কোন কারণে আমরা এই জড় জগতে পতিত হয়েছি; এখন আমাদের চেষ্টা করতে হবে যাতে আমরা আমাদের প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারি।  সেটিই হচ্ছে জীবনের পরম পূর্ণতা।

এই জড় জগতের উর্ধ্বে আরেকটি জগৎ রয়েছে, সেটি হচ্ছে চিৎ-জগৎ, যে সম্বন্ধে ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে–

পরস্তস্মাত্তু ভাবোহন্যোহব্যক্তোহব্যক্তাৎসনাতনঃ।
যঃ স সর্বেষু ভূতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি ॥
“এই ব্যক্তি এবং অব্যক্ত প্রকৃতির ঊর্ধ্বে আরেকটি প্রকৃতি রয়েছে, যা হচ্ছে পরম এবং যার কখনও বিনাশ হয় না।  এই জগতের বিনাশ হলেও সেই জগৎটি যথাযথভাবে বর্তমান থাকে। ”
(ভগবদ্গীতা ৮/২০)
এই জড় জগতে সব কিছুরই সৃষ্টি হয়, কিছুকালের জন্য তা স্থায়ী হয়, কোন কিছু উৎপাদন করে, হ্রাসপ্রাপ্ত হয় এবং অবশেষে বিনষ্ট হয়।  মৈথুনের মাধ্যমে কোন এক সময় আমাদের শরীর সৃষ্টি হয়েছিল।  পিতার ঔরষে মাতৃগর্ভে আত্মা একটি শরীর প্রাপ্ত হয়।  আত্মা আশ্রয় নেয় বলেই ছোলার দানার মতো একটি পিন্ড ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হয়ে তাতে হাত-পা ইত্যাদি প্রকাশ পায়।  সাত মাসে সেই শরীরটি অবয়ব প্রাপ্ত হয় এবং নবম মাসে মাতৃগর্ভ থেকে তা বেরিয়ে আসে।  আত্মার উপস্থিতির ফলেই শিশু-শরীরটি ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হতে থাকে।  আত্মা যদি না থাকে, তা হলে তা বর্ধিত হতে পারে না– তখন মৃত শিশু প্রসব হয়।  সেই মৃত শরীরটি রাসায়নিক পদার্থে সংরক্ষণ করা যায়, কিন্তু তার বৃদ্ধি হয় না।  বৃদ্ধি মানে হচ্ছে দেহের পরিবর্তন।  আমাদের সকলেরই এক সময় শিশু-শরীর ছিল, কিন্তু সেই শরীর আজ আর নেই।  শিশু-শরীরটি এক সময় বালকের শরীরে পরিণত হয়, বালক-শরীর যুবক-শরীরে পরিণত হয়, তারপর সেই যুবক-শরীর এক সময় বৃদ্ধ-শরীরে পরিণত হয়, তারপর এক সময় শরীরটি নষ্ট হয়ে যায়।  এই জড় জগৎ, এই বিশাল ব্রহ্মান্ড সেইভাবেই কাজ করে চলেছে।  এক সময় তা সৃষ্টি হয়, তা বর্ধিত হয়, স্থিত হয় এবং অবশেষে তা লীন হয়ে যায়।  এটিই হচ্ছে জড় জগতের ধর্ম।  কোন এক সময়ে তার প্রকাশ হয় এবং অবশেষে কোন এক সময়ে তা বিনষ্ট হয়ে যায় (ভূত্বা ভূত্বা প্রলীয়তে)।

ভাব মানে হচ্ছে প্রকৃতি।  আরেকটি প্রকৃতি রয়েছে, যার কখনও বিনাশ হয় না, যা হচ্ছে নিত্য-শাশ্বত সনাতন।  জীব রূপে, আত্মারূপে আমরাও নিত্য-শাশ্বত-সনাতন।  সেই কথা ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে–
ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচি-
ন্নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো
ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥
“আত্মার জন্মও হয় না, মৃত্যুও হয় না।  সে অজ, নিত্য, শাশ্বত, মৃত্যু-রহিত এবং পুরাতন।  এই দেহকে হত্যা করা গেলেও আত্মাকে হত্যা করা যায় না।
(ভগবদ্গীতা ২/২০)
ভগবানের যেমন জন্ম অথবা মৃত্যু নেই, আত্মারও তেমন জন্ম বা মৃত্যু নেই।  কিন্তু যেহেতু আমরা মনে করি আমি হচ্ছি আমার এই শরীরটি, তাই আমাদের মনে হয় যে, আমাদের জন্ম হচ্ছে এবং মৃত্যু হচ্ছে।  এই ধরনের চিন্তাধারাকে বলা হয় মায়া এবং দেহকে আমাদের স্বরূপ বলে মনে করার এই যে মোহ, তা থেকে মুক্ত হওয়া মাত্রই আমরা ব্রহ্মভূত স্তরে অধিষ্ঠিত হই।  তখন আমরা বুঝতে পারি অহং ব্রহ্মাস্মি অর্থাৎ ‘আমার স্বরূপ আমার এই শরীরটি নয়; আমি হচ্ছি পরমব্রহ্মের বিভিন্ন অংশ-আত্মা। ’এই উপলব্ধির স্তরকে বলা হয় ব্রহ্ম-উপলব্ধির স্তর।  ব্রহ্ম-উপলব্ধি হলেই আমরা যথার্থভাবে প্রসন্ন হতে পারি।

তাই নয় কি ? আপনারা যদি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন যে, আপনার কখনও জন্ম হয় না এবং মৃত্যুও হয় না–আপনারা হচ্ছেন নিত্য, তা হলে কি আপনারা অত্যন্ত আনন্দিত হবেন না ? হ্যাঁ, অবশ্যই হবেন।  এইভাবে ব্রহ্মভূত স্তরে অধিষ্ঠিত হলে তখন আর কোন রকম আকাঙ্ক্ষা অথবা অনুশোচনা থাকে না।  এই জগতে সকলেই নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা এবং অনুশোচনা করে চলেছে।  আপনারা, আফ্রিকাবাসীরা এখন ইউরোপীয়ান এবং আমেরিকানদের মতো হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছেন, আর ইউরোপীয়ান এবং আমেরিকানরা তাদের সাম্রাজ্য হারিয়ে এখন অনুশোচনা করছে।  এইভাবে একদল আকাক্সক্ষা করছে এবং আরেক দল অনুশোচনা করছে।  এই জড় জগতে যে জীবন তা আকাঙ্ক্ষা এবং অনুশোচনার সমন্বয়।  যা আমাদের নেই, তার জন্য আমরা আকাঙ্ক্ষা করছি, আর যা আমরা হারিয়েছি, তার জন্য অনুশোচনা করছি।  সেটি হচ্ছে জড় জগতের ধর্ম।  কিন্তু আমরা যদি বুঝতে পারি যে, আমরা পরমেশ্বর ভগবানের (পরমব্রহ্মের) অংশ এবং আমরা ব্রহ্ম, তা হলে তখন আমরা এই আকক্সক্ষা এবং অনুশোচনা অতিক্রম করতে পারব।

রাষ্ট্রসংঘ যে তথাকথিত বিশ্ব-ভাতৃত্বের অথবা ঐক্য সাধনের চেষ্টা করছে, তা তখনই সম্ভব হবে যখন আমরা পারমার্থিক স্তরে বা ব্রহ্মোপলব্ধির স্তরে অধিষ্ঠিত হব।  এই ব্রহ্মভূত স্তরই হচ্ছেন মানব-জীবনের উদ্দেশ্য।  গাধার মতো অক্লান্ত পরিশ্রম করে বা কুকুর অথবা শুয়োরের জীবন যাপন করা মানব-জীবনের উদ্দেশ্য নয়।  শুয়োর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিষ্ঠার অন্বেষণ করে, এবং সেটি পেলে তা খেয়ে সে কামার্ত হয় এবং কোন রকম বাছবিচার না করে কামক্রীড়ায় লিপ্ত হয়।  একটি শুয়োর তার মায়ের সঙ্গে অথবা তার বোনের সঙ্গে মৈথুন করতেও দ্বিধা করে না।  সেটিই হচ্ছে শুয়োরের জীবন। কিন্তু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, গাধার মতো পরিশ্রম করা অথবা শুয়োরের মতো ইন্দ্রিয় তৃপ্তির প্রয়াস করা মানব-জীবনের উদ্দেশ্য নয়।  মানব-জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা’।  অর্থাৎ, “আমি এই জড় জগতের বস্তু নই।  আমি হচ্ছি চিন্ময় আত্মা, আমি শাশ্বত-সনাতন, কিন্তু কোন কারনে আমি জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যধি-সমন্বিত এই বদ্ধ জীবদ্দশায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছি। ” মানব-জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে জড় জগতের চারটি দুঃখ- জন্ম, মৃত্যু, জরা এবং ব্যাধি থেকে মুক্ত হওয়া। গাধার মতো পরিশ্রম করে বা শুয়োরের মতো ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধন করে হঠাৎ এক সময় মরে যাওয়া মানব-জীবনের উদ্দেশ্য নয়।  সেই কথাটি আপনারা একটু বিবচেনা করে দেখুন।

যে সমস্ত মানুষ আত্মায় বিশ্বাস করে না, তারা হচ্ছে সব চাইতে দুর্ভাগা।  তারা জানে না, তারা কোথা থেকে এসেছে এবং তারা কোথায় যাচ্ছে।  আত্মা-সম্বন্ধীয় জ্ঞানই হচ্ছে সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই জ্ঞান চর্চার কোন বিভাগ নেই।  কিন্তু এই শরীরটি কি ? একটি মৃত শরীরের সঙ্গে একটি জীবন্ত শরীরের পার্থক্য কোথায় ? এই শরীরটি জীবন্ত হলো কি করে ? এই শরীরটি কি এবং তার উদ্দেশ্যই বা কি ? এই সমস্ত প্রশ্ন নিয়ে আজকাল আর কেউ আলোচনা করে না।  কিন্তু এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা মানুষকে বোঝাবার চেষ্টা করছি যে, তাঁদের স্বরূপে তাঁরা  তাঁদের দেহ নন, তাঁরা হচ্ছেন আত্মা।  কুকুর বেড়ালের মতো জীবন যাপন করা মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য নয়।  সেটিই হচ্ছে আমাদের শিক্ষা।

আত্মার বিবর্তণ হচ্ছে এবং আমরা বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছি– সংগ্রাম করছি আমাদের নিত্য-শাশ্বত জীবনে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য।  সেই নিত্য জীবন লাভ করা সম্ভব। এই মানব-জীবনে আপনারা যদি যথাসাধ্য চেষ্টা করেন, তা হলে পরবর্তী জীবনে আপনারা চিন্ময় দেহ লাভ করবেন।  সেই চিন্ময় দেহ আপনাদের মধ্যে রয়েছে, এবং এই জড় জগতের কলুষ থেকে মুক্ত হলেই এই চিন্ময় দেহ বিকশিত হবে।  সেটিই হচ্ছে মানব-জীবনের উদ্দেশ্য।  সাধারণ মানুষ জানে না যে, তাদের যথার্থ স্বার্থ কি।  মানুষের যথার্থ স্বার্থ হচ্ছে, “ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আমাকে ভগবানের রাজ্যে ফিরে যেতে হবে”– এই সম্বন্ধে অবগত হওয়া।

এখানে যেমন আমাদের একটি সমাজ-ব্যবস্থা রয়েছে, ভগবদ্ধামে ভগবানেরও তেমন সমাজ-ব্যবস্থা রয়েছে।  সেখানে আপনি তাঁর সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন।  এমন নয় যে, এই দেহটি শেষ হয়ে গেলে আমরা শূণ্য হয়ে যাব।  সেটি একটি ভ্রান্ত ধারণা।  ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনকে বলেছিলেন–
ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ।
ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃ পরম্ ॥
“এমন কোন সময় ছিল না, যখন আমি ছিলাম না অথবা তুমি ছিলে না অথবা এই সমস্ত রাজারা ছিল না; এবং ভবিষ্যতেও এমন কোন সময় হবে না, যখন আমরা থাকব না। ”
(ভগবদ্গীতা ২/১২)

নিত্য জীবন লাভ করা অত্যন্ত সহজ, আবার একই সঙ্গে সেটি খুব কঠিনও।  সেটি কঠিন, কারণ সাধারণত মানুষ আত্মার দেহান্তরে বিশ্বাস করে না।  কিন্তু আমরা যদি যথার্থ তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করি, তা হলে সেই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সরল হয়ে যাবে।  আমাদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘে আমরা পরম পুরুষ শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করি– আমরা জড়া প্রকৃতির কর্ম-বন্ধনে আবদ্ধ কোন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এই জ্ঞান গ্রহণ করি না।  বদ্ধ জীবের কাছ থেকে আহরিত জ্ঞান অবশ্যই ভ্রান্ত হবে।  বদ্ধ জীবদের ভ্রান্তিগুলো কি রকম ? সে ভুল করতে বাধ্য, সে প্রমাদগ্রস্থ, সে অপরকে অবশ্যই প্রতারণা করতে চায় এবং তার ইন্দ্রিয়গুলি ভ্রান্ত।  যে মানুষ অপরকে প্রতারণা করতে চায় এবং ইন্দ্রিয়গুলি ভ্রান্ত, সে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারে না।

আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি সীমিত ও ত্রুটিযুক্ত হলেও তা নিয়ে আমাদের খুব গর্ব।  আমাদের চোখ দিয়ে আমরা সব কিছু দেখতে চাই।  তাই কেউ কেউ কখনও বলে, “আপনি কি আমাদের ভগবানকে দেখাতে পারেন ? ” এই প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর হচ্ছে, “হ্যাঁ। ” প্রতি মুহূর্তেই আপনি ভগবানকে দর্শন করতে পারেন।  শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, রসোহহম্ অপ্সু কৌন্তেয়। অর্থাৎ “আমি হচ্ছি জলের স্বাদ। ” জল সকলেই পান করে, সুতরাং জলের স্বাদ সম্বন্ধে সকলেই অবগত– তাই আমরা যদি চিন্তা করি এই স্বাদ হচ্ছেন ভগবান,  তা হলেই ভগবানকে জানার প্রক্রিয়া শুরু হয়। শ্রীকৃষ্ণ আরও বলেছেন, প্রভাস্মি শশী সূর্যয়োঃ– অর্থাৎ “আমিই হচ্ছি সূর্য এবং চন্দ্রের প্রভা। ” আমরা প্রতিদিন সকলেই সূর্য-রশ্মি এবং চন্দ্র-কিরণ দর্শন করি, এবং আমরা যদি চিন্তা করি সূর্য এবং চন্দ্রের এই প্রভা আসছে কোথা থেকে, তা হলেই আমরা ভগবানকে জানতে পারি।

আমরা যদি ভগবৎ চেতনাময় হতে চাই, ভগবানকে জানতে চাই, তা হলে সেটি মোটেই কোন কঠিন কাজ নয়।  আমাদের কেবল নির্দিষ্ট পন্থাটি অনুসরণ করতে হবে। ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে– ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা (ভগবদ্গীতা ১৮/৫৫) আমাদের কেবল যথাযথভাবে ভগবানকে জানার চেষ্টা করতে হবে।  আমাদের কেবল তাঁর আবির্ভাব, তিরোভাব এবং কার্যকলাপ বুঝতে হবে।  যখন আমরা তাঁকে যথাযথাভাবে জানতে পারি, তখনই আমরা তাঁর রাজ্যে প্রবেশ করতে পারি।  যিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জেনেছেন, তাঁকে এই দেহ ত্যাগ করার পর এই জগতে আর একটি জড় শরীর ধারণ করার জন্য ফিরে আসতে হয় না।  শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন মাম্ এতিঃ– “সে আমার কাছে ফিরে আসে।” সেটিই হচ্ছে আমাদের উদ্দেশ্য।

তাই কুকুর-বেড়ালের মতো জীবনযাপন করে সময়ের অপচয় করা উচিত নয়।  স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ জীবনযাপন আমাদের করতে হবে, তবে সেই সঙ্গে আমাদের কৃষ্ণভাবনাময় হতে হবে।  তার ফলেই আমরা যথাযথভাবে সুখী হতে পারব।  ভগবানকে না জানলে ভগবৎ-চেতনাময় না হলে সুখ এবং শান্তির কোন সম্ভাবনা থাকে না।  যথার্থ শান্তি লাভের পন্থা ভগবদ্গীতায় বর্ণিত হয়েছে।

আপনারা যদি যথার্থই ভগবানকে জানতে চান, তা হলে তাঁকে জানা খুবই সহজ।  ভগবান হচ্ছেন সব কিছুর অধীশ্বর– ঈশাবাস্যম্-ইদম্ সর্বং।  কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা মনে করছি,–“আমিই হচ্ছি মালিক”, যেমন আপনাদের দেশে ইংরেজরা কিছুদিন মালিকানা দাবি করেছিল।  এখন আপনারা তার মালিকানা দাবি করছেন– আর ভবিষ্যতে যে কে মালিক হবে, তা কে জানে ? কিন্তু আসল মালিক যে কে, সেটি কেউই জানে না।  জায়গাটি হচ্ছে ভগবানের সম্পত্তি, কিন্তু আমরা মনে করছি, “আমি হচ্ছি মালিক। এটি আমার সম্পত্তি এবং ওটি আমার সম্পত্তি। ” যেমন ইউরোপীয়ানরা আমেরিকায় যাওয়ার আগেও আমেরিকা ছিল, কিন্তু এখন আমেরিকানরা মনে করছে, “আমরাই হচ্ছি এই দেশটির মালিক। ” তেমনই, তাদের আগে রেড ইন্ডিয়ানরা মনে করত, “ আমরাই হচ্ছি এই দেশটির মালিক। ” কিন্তু আসল কথা হচ্ছে, কোন মানুষই প্রকৃত মালিক নয়; প্রকৃত মালিক হচ্ছেন ভগবান।
ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ
তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনম্ ॥
অর্থাৎ, “এই ব্রহ্মান্ডে স্থাবর এবং জঙ্গম সব কিছুই ভগবানের সম্পত্তি এবং সবই ভগবানের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।  ভগবান সকলেরই প্রয়োজন অনুসারে বরাদ্দ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তাই সকলেরই কর্তব্য হচ্ছে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু গ্রহণ করা, এবং সব কিছুই যে কার সম্পত্তি, সেটি জেনে অন্য কোন কিছুর প্রতি লোভ না করা উচিত। ”
(ঈশোপনিষদ ১)
এই জ্ঞানেরই অভাব এখন আমাদের মধ্যে প্রবলভাবে দেখা দিয়েছে।  শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সকলের পরমেশ্বর– পরম ভোক্তা, কারণ তিনিই হচ্ছেন সব কিছুর মালিক এবং পরম পিতা।  আমরা যদি কেবল এতটুকু জানতে পারি, তা হলেই আমরা ভগবানকে জানতে পারি।  আমরা যদি বৈদিক শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে ভগবানকে জানতে পারি, তা হলে আমরা দেখব তখন আর দলাদলি বা ঝগড়া বিবাদ থাকবে না।  তখন সমস্ত জগৎ শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

ভগবানের সম্পত্তি ব্যবহার করার অধিকার সকলেরই রয়েছে, যেমন পিতার সম্পত্তি ভোগ করার অধিকার সন্তানদের রয়েছে।  শাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, গৃহে যদি একটি ছোট্ট পশুও থাকে, তাকেও খাবার দিতে হবে।  সেটিই হচ্ছে পারমার্থিক সাম্যবাদ।  কেউই ক্ষুধার্ত থাকবে না, এমন কি একটি সাপও নয়।  সাপকে আমরা ভয় পাই, কিন্তু আমরা যদি দেখি যে, আমাদের গৃহে একটি সাপ বাস করছে, তা হলে আমাদের কতর্ব্য হচ্ছে সেই সাপটিকেও কিছু খেতে দেওয়া।  এটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনা, সমঃ সর্বেষু ভূতেষু (ভগবদ্গীতা ১৮/৫৪)।  যিনি যথার্থ তত্ত্বদ্রষ্টা, তিনি প্রতিটি জীবের প্রতি সমদৃষ্টিসম্পন্ন।  তাই ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, কেউ যখন ভগবানের বিভিন্ন অংশরূপে সকলকেই সমদৃষ্টিতে দর্শন করেন, তখন তাঁর প্রকৃত ভক্ত-জীবন শুরু হয়।  এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন যথাযথভাবে সকলকে বোঝাতে চেষ্টা করছে তাদের প্রকৃত পরিচয় কি এবং তাদের জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য কি? হৃদয়ের এই পবিত্রকরণ অনায়াসেই সাধন করা যায়।  কেবল হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র–
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥
কীর্তন করার মাধ্যমেই তা সাধন করা হয়।  এই আন্দোলনে দেখা যায় বিভিন্ন দেশের ধর্মাবলম্বী ছেলে-মেয়েরা যুক্ত হয়েছে, কিন্ত কোন বিশেষ দেশ বা কোন তথাকথিত ধর্মবিশ্বাসের প্রতি তারা আর আসক্ত নয়।  আমাদের আসল উদ্দেশ্য নিজেকে জানা এবং ভগবানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের কথা জানা।  ভগবান হচ্ছেন পরম ঈশ্বর, এবং আমরা সকলেই হচ্ছি তাঁর সেবক।  তাই আসুন, আমরা সকলে ভগবদ্গীতার নির্দেশ অনুসারে ভগবানের সেবায় যুক্ত হই।  যখন আমরা বুঝতে পারি যে, ভগবান সব কিছুর মালিক, তখন পৃথিবীর সমস্ত সমস্যার তৎক্ষনাৎ সমাধান হবে।  আমরা আশা করি না যে, সকলেই এই অতি উচ্চ দর্শন হৃদয়ঙ্গম করতে পারবে, কিন্তু প্রতিটি দেশের বুদ্ধিমান মানুষেরা যদি এই দর্শন বোঝবার চেষ্টা করে, তা হলেই যথেষ্ট হবে। ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছেঃ

যদ্ যদাচরতি শ্রেষ্ঠস্তত্তদেবেতরো জনঃ।
স যৎ প্রমাণং কুরুতে লোকস্তদনুবর্ততে ॥
“শ্রেষ্ঠ মানুষ যেরকম আচরণ করেন, জনসাধারণ তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেইভাবেই আচরণ করে; এবং তাঁর আচরণের দ্বারা তিনি যা প্রমাণ করেন, জনসাধারণ তারই অনুগমন করে।”                                (ভগবদ্গীতা ৩/২১)

তাই আমরা পৃথিবীর সব চাইতে বুদ্ধিমান মানুষদের আহ্বান জানাচ্ছি, তাঁরা যেন কৃষ্ণভাবনামৃত দর্শন হৃদয়াঙ্গম করে, তা সমস্ত পৃথিবী জুড়ে প্রচার করেন।  আমরা এখন আফ্রিকার দেশগুলিতে এসেছি এবং আমরা সমস্ত বুদ্ধিমান আফ্রিকানদের আহ্বান জানাচ্ছি এই দর্শন হৃদয়ঙ্গম করে তা বিতরণ করার জন্য।  আপনারা আপনাদের উন্নতি সাধনের চেষ্টা করছেন, তাই পারমার্থিক জীবনে উন্নতি সাধন করুন, কারণ সেই উন্নতিই হচ্ছে যথার্থ উন্নতি।  কুকুর-বেড়ালের মতো আচরণ করছে যে সমস্ত আমেরিকান এবং ইউরোপীয়ান, তাদের অনুকরণ করবেন না।  ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা কখনও স্থায়ী হয় না।  পারমানবিক বোম ইতিমধ্যেই তৈরী হয়ে রয়েছে এবং যে মুহূর্তে পরবর্তী বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবে, তখন সমস্ত গগণচুম্বী বাড়িগুলি এবং অন্য সব কিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে।  মানব-জীবনের যথার্থ দৃষ্টিকোন থেকে, পারমার্থিক দৃষ্টিকোন থেকে এটি বোঝবার চেষ্টা করুন।  এটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন।  তাই আমরা আপনাদের অনুরোধ করব এই দর্শন বোঝবার চেষ্টা করুন।
আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits