জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য

       মানব-সমাজকে আত্মিক বিনাশ থেকে রক্ষা করবার জন্যই এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে।  বর্তমানে যে-সব নেতাদের দ্বারা মানব-সমাজ ভুলপথে চালিত হচ্ছে, তাঁরা অন্ধ।  কারণ তাঁরা মনুষ্য-জন্মের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য কি তা জানেন না– সেই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হল আত্ম-উপলব্ধির এবং পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে যে আত্মিক সম্পর্কের কথা আমরা ভুলে গেছি, সেই সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা— সেটিই আজ সামাজিক নেতৃত্বের হারানো সূত্র।  কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন এই প্রয়োজনীয় বিষয়ে মানব-সমাজকে উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করছে।

বৈদিক শাস্ত্র অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ, অর্থাৎ পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক উপলব্ধি করাই হল জীবের সম্পূর্ণতা।  পারমার্থিক বিজ্ঞানের সমস্ত প্রবক্তা যে ভগবদ্গীতাকে বৈদিক জ্ঞানের সারভিত্তি বলে মেনে নিয়েছেন, তা থেকে আমরা জেনেছি, শুধু মানুষ নয়, সমস্ত জীবই পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন অংশ।  এই অংশগুলির কাজ হল পূর্ণ সত্তাকে সেবা করা, ঠিক যেমনভাবে হাত, পা, আঙ্গুল, কান ইত্যাদি দেহের অংশগুলি পূর্ণ দেহকে সেবা করে।  আমরা যে-সব জীব-সত্তা, ভগবানেরই বিভিন্ন অংশ, আমরাও তাঁকে সেবা করার জন্য কর্তব্য-সূত্রে আবদ্ধ।

প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জীবনধারা এমনই যে, আমরা সর্বদাই কাউকে না কাউকে সেবা করছি– আমাদের পরিবারবর্গকে, দেশকে, নয়তো সমাজকে।  যখন আমাদের কাউকেই সেবা করবার থাকে না, তখন অনেক সময়ে আমরা বেড়াল বা কুকুর পুষি, তাদের সেবা করার জন্য । এই সব থেকে প্রমাণিত হয়, আমরা সেবা করার জন্যই গড়ে উঠেছি, তবু যথাসাধ্য সেবা করা সত্ত্বেও, আমরা পরিতৃপ্ত হচ্ছি না।  আবার যাকে সেবা করছি, সে-ও পরিতৃপ্ত হচ্ছে না।  জড়জাগতিক পর্যায়ে, প্রত্যেকেই যেন বিষাদগ্রস্ত ও অপরিতৃপ্ত হয়ে আছে। এর কারণ, এই সেবা ঠিক পথে পরিচালিত হচ্ছে না।  যেমন, একটি গাছকে যদি আমরা সেবা করতে চাই, তা হলে অবশ্যই তার মূলে জল-সিঞ্চন করতে হবে।  যদি আমরা গাছের পাতায়, শাখা-প্রশাখায় জল ঢালি, তা হলে সামান্যই উপকার হবে।  যদি পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করা হয়, তা হলে অন্য সমস্ত অংশ আপনা থেকেই পরিতৃপ্তি লাভ করবে, এর ফলে সব রকম কল্যানমূলক কাজকর্ম এবং সমাজ, পরিবারবর্গ ও সমগ্র জাতির প্রতি সেবাকার্যগুলিও পরমেশ্বরের পরম পুরুষ-সত্তার সেবার মাধ্যমে উপলব্ধ হয়।

প্রত্যেক মানুষেরই কর্তব্য ভগবানের সঙ্গে তার স্বাভাবিক সম্পর্কের সূত্র বুঝতে চেষ্টা করা এবং সেই মতো কাজ করা।  তা যদি সম্ভব হয়, তা হলে আমাদের জীবন সফল হবে। মাঝে মাঝে অবশ্য আমাদের মনে বিদ্রোহ-বোধ জাগে এবং আমরা বলি, “ভগবান বলে কিছু নেই,” কিংবা “আমি ভগবান”, অথবা এমন ভাবি, “আমি ভগবানের পরোয়া করি না। ” কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই বিদ্রোহী মনোবৃত্তি আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।  ভগবান আছেন, এবং আমরা তাঁকে প্রতি মুহূর্তেই দেখতে পাই।  আমাদের জীবনৎকালে যদি আমরা ভগবানকে দেখতে অস্বীকার করি, তা হলে তিনি নিষ্ঠুর মৃত্যুরূপে আমাদের সামনে আবির্ভূত হবেন।  আমরা যদি তাঁকে কোনও একটি বিশেষ রূপে দেখতে না চাই, তা হলে অন্য কোনও রূপে তাঁকে অবশ্যই দেখতে পাব।  ভগবানের বিভিন্ন রূপ আছে, কারণ সমগ্র মহা-জাগতিক অভিপ্রকাশের আদি মূল তিনিই।  একদিক দিয়ে ভাবলে দেখা যায় তাঁকে এড়িয়ে চলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন কোনও অন্ধ ধর্মীয় গোঁড়ামি নয়, কোনও  নব্য নেতার বিদ্রোহ ঘোষণাও নয়।  বরং বলা চলে, পরম ঈশ্বরের সঙ্গে, পরম ভোক্তার সঙ্গে সম্পর্ক-সূত্র অনুসারে আমাদের চিরন্তন প্রয়োজনের ব্যাপারে এই আন্দোলন জনগণ অনুমোদিত, বিজ্ঞানসম্মত এক ভাবানুষঙ্গের শুদ্ধ প্রয়াস।  কৃষ্ণভাবনামৃত শুধু তাঁর সঙ্গে আমাদের চিরন্তন সম্পর্কের কথাই প্রচার করছে এবং তাঁর প্রতি আমাদের কর্তব্য সাধনের প্রক্রিয়ার কথাই ঘোষণা করছে।  অতএব, সেই পথে কৃষ্ণভাবনামৃত আমাদের বর্তমান মানব-রূপী অস্তিত্বের চরম পরিপূর্ণতা ও সার্থকতা অর্জনের সামর্থ্য সৃষ্টি করতে চাইছে।

সর্বদা আমাদের মনে রাখতে হবে, আত্মার দেহান্তর চক্রের মধ্য দিয়ে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের পর মানব-জীবনের এই বিশেষ রূপটি অর্জিত হয়েছে।  জীবনের এই বিশেষ রূপটিতে, অর্থনৈতিক অর্থাৎ জীবিকা-নির্বাহ সমস্যার সমাধান নি¤œস্তরের পশুরূপী জীবনের চেয়ে অনেক সহজসাধ্য হয়েছে।  এই জগতে শুকর, কুকুর, উট, গাধা এবং কত রকম পশুরূপী জীবন সৃষ্টি হয়েছে, যাদের জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনগুলি আমাদের মতোই দরকারি, কিন্তু ঐসব পশু এবং অন্যান্য নিম্নস্তরের জীবদের জীবিকা-সমস্যার সমাধান করতে হয় আদিম পদ্ধতিতে, যে ক্ষেত্রে প্রকৃতির নিয়মানুসারে আরামদায়ক জীবন-যাপনের সব রকম সুবিধা দেওয়া হচ্ছে মানব-সত্তাকে।

কোন শুকর বা অন্য পশুদের চেয়ে মানুষকে বেঁচে থাকার বেশি সুযোগ দেওয়া হচ্ছে ? একজন সাধারণ কেরানির চেয়ে বেশি আরামপ্রদ জীবনের সুযোগ-সুবিধা কেন দেওয়া হয় একজন উচ্চ বেতনভোগী সরকারী অফিসারকে ? এর উত্তর খুবই সোজা– কোন সাধারণ কেরানির চেয়ে অনেক বেশি দায়িত্বপূর্ণ কর্তব্য সম্পাদন করতে হয় একজন বিশিষ্ট অফিসারকে।

ঠিক সেইরকম, মানব- সত্তাকেও পশুদের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চ পর্যায়ের কর্তব্য-কর্মে নিযুক্ত থাকতে হয়।  সেই ক্ষেত্রে পশুরা সকল সময়ে কেবল তাদের ক্ষুধার্ত উদর-পূর্তির কাজেই ব্যতিব্যস্ত থাকে।

কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে সভ্যতার আধুনিক পশুসুলভ অপকর্ষমান আজ উদর-পূর্তির সমস্যাকেই শুধু বাড়িয়ে তুলেছে। যখন আমরা অধ্যাত্ম-জীবনের কথা নিয়ে ঐ ধরনের রুচিবর্জিত পশুদের কাছে যাই, তারা বলে, তারা কেবল উদরের তৃপ্তির জন্যই কাজ করতে চায় এবং বলে, পরমেশ্বরের খোঁজ নিয়ে কাজ নেই।  তবু দেখি, খুব কাজ করার এত আগ্রহ তাদের থাকা সত্ত্বেও, সব সময়েই বেকার-সমস্যা রয়েছে, এবং প্রকৃতির নিয়মানুসারে সংঘটিত আরও কত রকমের বাধা-বিপত্তি রয়েছে তাদের জীবনধারায়।  তবুও তারা এখনো পরমেশ্বরকে স্বীকার করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বর্জন করে চলতে চাইছে।

শুকর বা কুকুরের মতো কঠোরভাবে কেবল কাজ করে যাওয়ার জন্যই আমরা এই মনুষ্যরূপী জীবন লাভ করিনি, আমাদের জন্ম হয়েছে জীবনের সর্বোচ্চ পরিপূর্ণতা অর্জন করার জন্য।  যদি আমরা ঐ পরিপূর্ণতা অর্জন করতে না চাই, তা হলে আমাদের ঐরকম করে পশুর মতো খেটে চলতে হবে, কারণ প্রকৃতির বিধানেই আমরা তা করতে বাধ্য হব।  যে যুগ এখন চলছে, এই কলিযুগের শেষ পর্যায়ে মানুষকে এক টুকরো রুটির জন্য গাধার মতো কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।  সেই পর্যায়ের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে, এবং প্রতি বছরই সামান্য মাত্র পারিশ্রমিকের বিনিময়ে আরও কঠিন কাজ করার প্রয়োজন জাগতেই থাকবে।  তবুও মনে রাখতে হবে, পশুর মতো কঠোর পরিশ্রম করার জন্য মানুষের সৃষ্টি হয়নি, এবং মানুষ যদি মানব-সত্তার উপযোগী কর্তব্য-কর্ম সম্পাদনে বিফল হয়, তা হলে প্রকৃতির নিয়মানুসারে তাকে জীবন-চক্রের নিম্নতর প্রজাতির পর্যায়ে দেহান্তরিত হতে হবে। ভগবদ্গীতায় অতি বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, কেমনভাবে প্রকৃতির বিধান অনুযায়ী আত্মা জন্মগ্রহণ করে এবং জড় জগতের জড় বস্তু আদি উপভোগের জন্য উপযুুক্ত দেহ এবং ইন্দ্রিয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি লাভ করে।

ভগবদ্গীতায় এই কথাও বলা হয়েছে যে, যারা ভগবানের সান্নিধ্য লাভের পথে সম্পূর্ণরূপে অগ্রসর হতে পারেনি, অর্থাৎ যারা কৃষ্ণভাবনামৃত অর্জনে সম্পূর্ণ সফলতা লাভ করতে পারেনি– তাদের কোন আধ্যাত্মিক ভাবসমৃদ্ধ ব্রাহ্মণ পরিবারে অথবা ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধ বৈশ্য পরিবারে জন্মগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়।  অধ্যাত্ম-জীবনধারায় অসফল অথবা উদ্যোগী মানুষদেরই যদি মহৎ অভিভাবকের ঘরে জন্মলাভের এমন সুযোগ দেওয়া হয়, তা হলে যাঁরা এই পথে যথাযথভাবে সফলতা লাভ করেছেন, তাঁদের কত সৌভাগ্য ! অতএব, পরমেশ্বরের কাছে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ-প্রচেষ্টা অর্ধসমাপ্ত থাকলেও তার সুফল-পরিণামে পরবর্তী জীবনে উন্নত পর্যায়ে জন্মলাভের সুনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়।

অধ্যাত্ম ভাবসম্পন্ন এবং ঐশ্বর্য-সমৃদ্ধ দু’ধরনের পরিবারগোষ্ঠীই আধ্যাত্মিক উন্নতির পক্ষে উপকার সাধনের উপযুক্ত ক্ষেত্র, কারণ মানুষ তার বিগত জন্ম-স্তরে যে পর্যায়ে উন্নতি অর্জনের প্রয়াসে ক্ষান্ত হতে বাধ্য হয়, ঠিক সেই পর্যায় থেকেই আরও উন্নতির পথে অগ্রসর হওয়ার খুব ভাল সুযোগ– এই দু’ধরনের পারিবারিক পরিবেশই সে পেয়ে থাকে। আধ্যাত্মিক উপলব্ধির পথে ভাল পরিবারগোষ্ঠী যে বাতাবরণ সৃষ্টি করে থাকে, আধাত্মিক জ্ঞান অর্জনের পক্ষে তা বিশেষ অনুকূল।  ঐ ধরনের সৌভাগ্যবান সুজন্মা মানুষদের ভগবদ্গীতা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তাঁদের সৌভাগ্য তাঁদের অতীত ভক্তিমূলক পুণ্য কর্মের কাছে ঋণী।  দুর্ভাগ্যের বিষয়, ঐসব পরিবারগোষ্ঠীর সন্তানেরা ভগবদ্গীতা পড়ে না, কারণ তারা মায়ার প্রভাবে বিপথগামী হয়ে আছে।

স্বচ্ছল পরিবারে জন্মলাভের ফলে জীবনের শুরু থেকেই পর্যাপ্ত অন্ন-সংস্থানের সমস্যার সমাধান হয়েই থাকে এবং পরে অপেক্ষাকৃত সহজভাবে, আরও স্বচ্ছন্দভাবে জীবন যাপন করা চলে।  এই রকম জীবন-সংস্থানের ফলে যে-কোনও মানুষেরই চিন্ময় উপলব্ধির পথে এগিয়ে যাওয়ার সু-সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।  কিন্তু দুর্ভাগ্যের ফলে যা হয়– বর্তমান যন্ত্র এবং যান্ত্রিকভাবানপন্ন মানুষে পরিপূর্ণ লৌহ-যুগের প্রভাবে অর্থবান ঘরের ছেলেরা ইন্দ্রিয় সুখভোগের পথে বিপথগামী হচ্ছে এবং চিন্ময় আধ্যাত্মিক উদ্দীপনী সুযোগগুলি বিস্মৃত হয়ে থাকছে।  অতএব প্রকৃতি তার স্বাভাবিক প্রাকৃতিক নিয়মে এইসব সোনার সংসারে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে।  রাক্ষসরাজ রাবণের রাজত্বকালে যে লঙ্কা ছিল স্বর্ণপুরী, তা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।  প্রকৃতির নিয়ম যে তাই !

ভগবদ্গীতায় কৃষ্ণভাবনামৃত-সম্পর্কিত অতীন্দ্রিয় বিজ্ঞানের প্রারম্ভিক চর্চার সূচনা করা হয়েছে এবং এই ভগবদ্গীতার ব্যাখ্যাদি পরামর্শ ও বিবেচনা করেই সমস্ত দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন রাষ্ট্রীয় নেতাদের অর্থনৈতিক এবং অন্যান্য কর্মসূচী প্রণয়ন করা কর্তব্য।  স্থিতিহীন পরিবেশ-মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেবলই ভারসাম্য রক্ষার কৌশল অবলম্বন করে কখনই আমরা অর্থনৈতিক সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারব না।  প্রকৃতির নিয়মানুসরে জীবের যে-সমস্ত চরম বিপর্যয়গুলির সৃষ্টি হচ্ছে, বরং আমরা সেইগুলির সমাধান করতে পারলেই সব কিছুর প্রকৃত সমাধান হবে।  আধ্যাত্মিক গতিষ্ণুতা না থাকলে সভ্যতা জড়ত্ব প্রাপ্ত হয়।  আত্মা দেহকে পরিচালনা করে, এবং প্রাণময় দেহ পরিচালনার করে জগৎকে।  আমরা দেহটাই জানি, তা নিয়ে ভাবি, কিন্তু দেহকে যে আত্মা পরিচালিত করছে, সেই আত্মা সম্পর্কে কোন জ্ঞানই আমাদের নেই।  আত্মা ব্যতীত দেহ অচল কিংবা মৃত।

মানব-দেহ এক অতুলনীয় মাধ্যম, যার সাহায্যে আমরা জীবনের চরম সার্থকতা লাভ করতে পারি।  জড় অস্তিত্বের অজ্ঞানতার বারিধি পাড়ি দিতে হলে এই দেহরূপী দুর্লভ এবং মূল্যবান তরণীকে নির্ভর মানতেই হবে।  এই তরণীতে এক বিশেষ অভিজ্ঞ মাঝির সহযোগিয়া পাওয়া যায়– সেই মাঝি হলেন– আধ্যাত্মিক গুরু।  ঈশ্বরের অনুগ্রহে, ঐ তরণী অনুকূল বাতাস ভর করে জলরাশি অতিক্রম করে চলে।  এই সব সুযোগ-সুবিধা থাকতে অজ্ঞানতার সমুদ্র অতিক্রমের এমন সুযোগ কে ছাড়তে চায় ? এমন সুযোগ যদি কেউ অবহেলা করে, তা হলে জানতে হবে যে, সে নিতান্তই আত্মহত্যা করতে চলেছে।

ট্রেনের প্রথম শ্রেণীর কামরায় চড়ে ভ্রমণ করাটা নিশ্চয়ই খুবই আরামদায়ক, কিন্তু যদি সেই ট্রেন লক্ষ-পথে চলতে না পেরে স্থিত হয়ে থাকে, তা হলে বাতানুকূল কামরায় কি লাভ হল ? এই যুগের সভ্যতা জড়জাগতিক দেহ-সুখের, আরাম তৃপ্তির খুব বেশি চিন্তা করে।  কেউ চিন্তা করে না পরমেশ্বরের কাছে কিভাবে পৌঁছানো যায়; জীবনের সেই প্রকৃত লক্ষ্যপথের খবর কেউ জানে না।  আমাদের দেখতে হবে আমরা যে গাড়িতে চড়ে পথ চলছি, সেটি প্রকৃত লক্ষ-পথের দিকে এগিয়ে চলছে কিনা; কেবল একটি আরামপ্রদ কামরায় বসে থাকলেই হবে না।  জীবনের প্রাথমিক প্রয়োজনের কথা ভুলে গিয়ে কেবল এই জড়জাগতিক দেহ-সুখের আয়োজন করে শেষ পর্যন্ত লাভ হয় না কিছুই, কারণ আমাদের জীবনের আসল কাজ হল, যে দিব্য পরিচয় আমরা ভুলে গেছি, তার পুনরুদ্ধার করা।

মানব-জীবনের তরণী এমনভাবে তৈরী, যাতে পারমার্থিক লক্ষের দিকেই তাকে ভেসে চলতে হবে।  দুর্ভাগ্যবশত, এই দেহটি পাঁচ রকম কঠিন-শৃঙ্খলে জড়িত হয়ে জাগতিক সচেতনতায় আবদ্ধ হয়ে আছে।  সেই শৃঙ্খল পাঁচটি হলঃ ১) আধ্যাত্মিক চিন্ময় তত্ত্বগুলি সম্পর্কে অজ্ঞতার ফলে জড়জাগতিক দেহের প্রতি আসক্তি, ২) দেহগত সম্পর্ক-সূত্রে আত্মীয় পরিজনের প্রতি আসক্তি, ৩) জন্মস্থান এবং বাড়ি-ঘর-দোর, আসবাবপত্র, বিষয়-আশয়, দলিল-দস্তাবেজ ইত্যাদি জড়-জাগতিক সম্পদের প্রতি আসক্তি, ৪) যে জড়জাগতিক বিজ্ঞান, শাস্ত্র ও আধ্যাত্মিক চিন্তা আলোকের প্রভাবে সর্বদাই রহস্যজনক হয়ে আছে, তার প্রতি আসক্তি, এবং ৫) যে ভগবান এবং তাঁর ভক্তবৃন্দ বিভিন্ন ধর্ম এবং ধর্মীয় আচার-আচরণগুলিকে পবিত্র করে রেখেছেন, তাঁদেরই ভুলে গিয়ে ঐ সব ধর্মাচরণে আসক্তি।

মানব-দেহকে এই যে সব বন্ধন-আসক্তি আবদ্ধ করে রাখে, এইগুলির বিশদ আলোচনা ব্যাখ্যা করা আছে ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ে। এইগুলিকে সুদীর্ঘ মূল-আবদ্ধ বটবৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়, পৃথিবীর বুকে যার আধিপত্য ক্রমবর্ধমান ! এই রকম শক্ত একটি বটবৃক্ষকে সমূলে উৎপাটন করা খুবই কঠিন কাজ।  কিন্তু ভগবান এর পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন এইভাবে–
ন রূপমস্যেহ তথোপলভ্যতে
নান্তো ন চাদির্ন চ সংপ্রতিষ্ঠা।
অশ্বত্থমেনং সুবিরূঢ়মূলম্–
অসঙ্গশস্ত্রেণ দৃঢ়েন ছিত্ত্বা ॥
ততঃ পদং তৎ পরিমার্গিতব্যং
যস্মিন্ গতা ন নিবর্তন্তি ভূয়ঃ।
তমেব চাদ্যং পুরুষং প্রপদ্যে
যতঃ প্রবৃত্তিঃ প্রসৃতা পুরাণী ॥
“এই মহীরুহের প্রকৃত রূপ এই জগতে কেউ উপলব্ধি করতে পারে না।  কেউ জানে না এর কোথায় শেষ, কোথায় শুরু কিংবা কোথায় এর ভিত্তি।  কিন্তু সঙ্কল্পবদ্ধ হয়ে অনাসক্তির অস্ত্র দিয়ে এই গাছ কেটে ফেলতেই হবে।  এই কাজ করতে হলে সেইখানে যেতে হবে, যেখানে কেউ একবার গেলে আর ফেরে না, এবং যে পরমেশ্বর ভগবানের থেকে সব কিছুর শুরু হয়েছে, যাঁর মাঝে অনন্তকাল ধরে সব কিছুর অস্তিত্ব রয়েছে, তাঁর কাছে সেইখানে আত্মসমর্পণ করতে হবে। ”
(ভগবদ্গীতা ১৫/৩-৪)
বিজ্ঞানীরা কিংবা চিন্তাশীল দার্শনিকেরা মহা-জাগতিক রহস্য-পরিস্থিতি সম্পর্কে এখনও কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেননি।  এই যাবৎ তাঁরা কেবল নানা ধরনের তত্ত্ব সূত্র উপস্থাপনই করেছেন।  তাঁদের মধ্য কয়েকজন বলেন, এই জড় জগৎ প্রকৃতই বাস্তব।  অন্যরা বলেন এই জগতের অস্তিত্ব চিরন্তন।  এইভাবে জড়-জাগতিক পন্ডিতেরা নানা রকম অভিমত পোষণ করে থাকেন, কিন্তু এইসব পন্ডিত, বিজ্ঞানী অথবা দার্শনিকেরা কেউই এই যাবৎ মহা-জাগতিক পরিমন্ডলের শুরু বা শেষ কিছুই খুঁজে পাননি।  তাঁদের মধ্যে কেউ বলতে পারেন না, কখন এর উদ্ভব হয়েছিল বা মহাশূণ্যে এই ব্রহ্মান্ড কেমন করে ভেসে আছে।  তাঁরা তত্ত্বগতভাবে কয়েকটি বিধিনিয়মের প্রস্তাবনা করেছেন– যেমন, মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই নিয়ম তাঁরা বাস্তব ক্ষেত্রে কাজে লাগাতেই পারলেন না।  প্রকৃত সত্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবে প্রত্যেকেই কোন প্রকারে খানিকটা নাম-যশ আহরণের উদ্দেশ্যে নিজস্ব এই মতবাদ খাড়া করে দিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন।  কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই জড় জগৎ রহস্যে পরিপূর্ণ।  এই ব্যাপারে শুধু মাত্র কয়েকটি তত্ত্ব-মতবাদ প্রচার করে দিলেই এর সুরাহা হবে না।

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits