‘গোবিন্দ’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে যিনি গাভী এবং ইন্দ্রিয়গুলিকে আনন্দ দান করেন। ভগবানের বহু অবতার রয়েছেন, কিন্তু গোবিন্দ হচ্ছেন আদি পুরুষ। তিনি ভগবানের অবতার নন, তিনি হচ্ছেন স্বয়ং ভগবান, সমস্ত অবতারের অবতারী। গোবিন্দ কোন নির্বিশেষ জ্যোতি অথবা শূণ্য নন, তিনি হচ্ছেন সর্বতোভাবে পূর্ণ এক পুরুষ। সব কিছুর যিনি উৎস, তিনি যদি পুরুষ না হন, তা হলে ব্যক্তিত্ব-বিশিষ্ট এত জীব– মানুষ, পশু, দেবতা, গাছপালা– ব্রহ্মান্ড জুড়ে মূর্ত হল কি করে ? প্রতিটি জীবই হচ্ছে ব্যক্তিত্ব-বিশিষ্ট এক-একটি আত্মা। তা হলে সব কিছুর যিনি উৎস, তিনি কিভাবে ব্যক্তিত্বহীন অথবা নির্বিশেষ হবেন ? তিনি অবশ্যই সবিশেষ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ, তা না হলে তিনি এই জড় জগতে প্রতিফলিত হতে পারেন না। তাই ব্রহ্মা বলেছেন, গোবিন্দমাদিপুরুষং ত্বমহং ভজামি। ব্রহ্মা হচ্ছেন এই ব্রহ্মান্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব এবং ব্রহ্মসংহিতায় তিনি বলেছেন যে, যিনি তাঁর উৎস, তিনিও হচ্ছেন একজন পুরুষ। “আমি আদিপুরুষ গোবিন্দের ভজনা করি,” সেই কথা তিনি ব্রহ্মসংহিতায় প্রতিটি শ্লোকে ব্যক্ত করেছেন।
নির্বিশেষবাদের দ্বারা আজ সমস্ত পৃথিবী বিভ্রান্ত হচ্ছে। কেউই আসলে কিছু জানে না, কিন্তু তারা মনোধর্ম-প্রসূত জল্পনা-কল্পনার দ্বারা এক নির্বিশেষবাদের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এই নির্বিশেষবাদের ভিত্তি কি ? আমাদের বাস্তবিক অভিজ্ঞতার প্রতি পদক্ষেপে এই মতবাদ বিধ্বস্ত হচ্ছে। প্রতিটি জীবই হচ্ছে এক-একটি ব্যক্তিগত সত্তা, এবং যিনি হচ্ছেন সব কিছুর উৎস, যাঁর থেকে সব কিছু প্রকাশিত হচ্ছে, তিনিও অবশ্যই একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ– আদি পুরুষ। সেটি হচ্ছে ব্রহ্মার উক্তি, যিনি এই ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করেন এবং যিনি এই ব্রহ্মান্ড সম্বন্ধে সব কিছু অবগত। এই ব্রহ্মান্ড সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত, এবং তার ঊর্ধ্বে যা কিছু তা আমাদের কাছে সম্পূর্ণরূপে অজ্ঞাত। কিন্তু ব্রহ্মার অবস্থা তেমন নয়; ব্রহ্মা আদি কবি অর্থাৎ এই ব্রহ্মান্ডের রচিয়িতা আদি তত্ত্বদ্রষ্টা। তেনে ব্রহ্ম হৃদা য আদিকবয়ে মুহ্যন্তি যৎ সুরয়ঃ। (শ্রীমদ্ভাগবত ১/১/১)। সব কিছুর যিনি উৎস, তিনি কখনও নির্বিশেষ হতে পারেন না। তিনি এই ব্রহ্মান্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মারও উৎস। আমরা কখনও দেখিনি নির্বিশেষ, নিরাকার, ব্যক্তিত্বহীন কোন কিছু থেকে কোন কিছুর প্রকাশ হতে। আমার পিতা একজন ব্যক্তি এবং আমি একজন ব্যক্তি। আমরা যদি আমাদের বংশ-তালিকা দেখি, তা হলে দেখব যে, একজন ব্যক্তি থেকে আর একজন ব্যক্তির জন্ম হয় এবং আমরা যদি এইভাবে সৃষ্টির আদি পর্যন্ত খুঁজে দেখতে পারি, তা হলে দেখব, আমাদের পরম পিতা হচ্ছেন সেই আদি পুরুষ গোবিন্দ, স্বয়ং ব্রহ্মা যাঁর মহিমা কীর্তন করেছেন। শূণ্য থেকে ব্রহ্মান্ডের প্রকাশ হয় না, এমন কি এক দলা কাদা থেকেও এই ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি হয়নি, এই জগতের সৃষ্টি হয়েছে এক স্বভিজ্ঞ পুরুষ থেকে।
এই ব্রহ্মান্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মা– আদি পুরুষের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করেন; সেই কথা শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত হয়েছে। ব্রহ্ম শব্দটির অর্থ হচ্ছে জ্ঞান। কেউ প্রশ্ন করতে পারে, ব্রহ্মা যদি এই ব্রহ্মান্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব হন, তা হলে তিনি কার কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করলেন ? তাঁর গুরু কে ছিলেন, যিনি তাঁকে তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করেছিলেন ? শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হচ্ছে যে, তাঁর হৃদয়ে এই জ্ঞান প্রকাশিত হয়। ভগবান সকলেরই হৃদয়ে বিরাজ করছেন এবং যদিও সেই সময় ব্রহ্মা ছিলেন প্রথম এবং একমাত্র জীব, কিন্তু আদি পুরুষ ভগবান তাঁর হৃদয়ে বিরাজমান ছিলেন। সেই কথা ভগবদ্গীতাতেও বলা হয়েছে–
ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রাময়ন্ সর্বভূতাদি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া ॥
“হে অর্জুন ! পরমাত্মারূপে আমি সকলেরই হৃদয়ে বিরাজ করি এবং মায়ার দ্বারা যন্ত্রারূঢ় পুত্তলিকার মতো জীবকে ভ্রমণ করাই।” (ভগবদ্গীতা ১৮/৬১)
যারা ভগবদ্ভক্ত নয়, তারা বুঝতে পারে না শ্রীকৃষ্ণ বা ভগবান কিভাবে হৃদয়ের মধ্যে থেকে নির্দেশ দেন, কিন্তু যাঁরা ভক্ত, তাঁরা তা বুঝতে পারেন। তাই ভক্তরা তাঁদের অন্তরে ভগবানের নির্দেশ শ্রবণ করার চেষ্টা করেন। সুতরাং ভগবানের নির্দেশ শুনতে হলে এই বিশেষ যোগ্যতাটির প্রয়োজন। তাঁকে অবশ্যই ভগবানের ভক্ত হতে হবে। ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ নির্দেশ দিয়েছেন, যাঁরা তাঁর ভক্ত, তিনি তাঁদের বুদ্ধিযোগ দান করেন , যার মাধ্যমে তাঁরা তাঁকে জানতে পারেন।
তেষাং সততযুক্তানাং ভজতাং প্রীতিপূর্বকম্।
দদামি বুদ্ধিযোগং তং যেন মামুপযান্তি তে ॥
(ভগবদ্গীতা ১০/১০)
তেষাম্ সততযুক্তানাম্ কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘যারা সর্বদাই সেবায় যুক্ত’। ভগবানের ভক্তরা সর্বদাই প্রীতি সহকারে ভগবানের সেবায় যুক্ত থাকেন। ভগবানের ভক্তরা সব সময়ই এই মনে করে আনন্দ পান যে, “শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার এটি একটি সুযোগ। ” তাঁরা যতই ভগবানের সেবায় যুক্ত হন, ততই আনন্দ উপভোগ করেন এবং পারমার্থিক পথে উন্নতি সাধন করেন। এই সেবায় অবসর গ্রহণের কোন প্রশ্নই ওঠে না। আমরা যখন কোন জড়জাগতিক কাজ করি তখন আমরা ক্লান্ত হয়ে চিন্তা করি, “ওঃ আমি এত কাজ করেছি, এখন আমি কিছু দিনের জন্য ছুটি নেব। ” কিন্তু কেউ যখন ভগবদ্ভক্তির চিন্ময় সেবায় যুক্ত হন, তিনি তখন ক্লান্ত হওযার পরিবর্তে আরও বেশি শক্তি লাভ করেন এবং ভাবেন, “আমি আরও বেশি করে সেবা করব। ” এই ধরনের নিষ্ঠাবান ভক্তদের ভগবান হৃদয়াভ্যন্তর থেকে নির্দেশ দান করেন– “এটি কর, এবং তা হলে তুমি অচিরেই আমার কাছে ফিরে আসবে। ” যারা তাঁর প্রতি উন্মুখ হতে চায় না, তাদেরও তিনি নির্দেশ দেন, “তুমি এটি করতে চাও ? ঠিক আছে, আমি সমস্ত বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। তুমি যদি চুরি করতে চাও– ঠিক আছে, চুরি কর।” আমরা যদি কৃষ্ণোন্মুখ হতে না চাই, আমরা যদি সম্পূর্ণভাবে তাঁকে ভুলে যেতে চাই, তা হলে তিনি আমাদের সমস্ত সুযোগ দেবেন, কারণ তিনি সর্বদা আমাদের কামনা-বাসনাগুলি চরিতার্থ করছেন। কিন্তু ভগবদ্গীতায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি আমাদের স্মৃতি দান করেন এবং তিনি আমাদের বিস্মৃতি দান করেন।
সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনঞ্চ।
বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো বেদন্তকৃদ্বেদবিদেব চাহম্ ॥
“আমি অন্তর্যামী রূপে সকলেরই হৃদয়ে বিরাজ করছি। আমার থেকেই জীবের স্মৃতি, জ্ঞান এবং বিস্মৃতি লাভ হয়। আমি হচ্ছি বেদবেত্তা এবং বেদান্তের প্রণেতা, এবং সমস্ত বেদে একমাত্র জ্ঞাতব্য বিষয় হচ্ছি আমিই।”
(ভগবদ্গীতা ১৫/১৫)
সাধারণ মানুষেরা বুঝতে পারে না ভগবান কি করে একজন পুরুষ হতে পারেন। তারা মনে করে, তা হলে ভগবান আমারই মতো একজন মানুষ হবেন। তাই কোন কোন শাস্ত্রে ভগবানের ব্যক্তিত্ব বা সবিশেষত্ব অস্বীকার করা হয়েছে, কারণ মূর্খ লোকেরা ভগবানের ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে শ্রবণ করা মাত্রই মনে করে, “ভগবান নিশ্চয়ই আমারই মতো একজন ব্যক্তি।” তাই বলা হয়েছে, ভগবান ব্যক্তি নন, এবং কোন কোন ধর্মে, যেমন ইহুদী ধর্মে, মূর্তি বা চিত্ররূপে ভগবানের প্রতিকৃতি পূজা করা অনুমোদন করা হয়নি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, ভগবানের কোনই ব্যক্তিত্ব– ভগবানের কোন রূপ নেই। যখন বলা হয় যে, ভগবান কোন ব্যক্তি নন, তখন আমাদের বুঝতে হবে যে, তিনি আমাদের মতো একজন সাধারণ ব্যক্তি নন। প্রকৃতপক্ষে তিনি হচ্ছেন সবিশেষ পুরুষ, কিন্তু তিনি এক ভিন্ন ধরনের পুরুষ। ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ— তিনি হচ্ছেন নিত্য-শাশ্বত-সনাতন পুরুষ। তাঁর শরীর আমাদের মতো মরণশীল নয়। তাঁর শরীর পূর্ণ জ্ঞানময়, কিন্তু আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞান। আর তিনি ঈশ্বর, পরম নিয়ন্তা, আর আমরা হচ্ছি নিয়ন্ত্রিত। তাই ভগবান আমাদের মতো
হচ্ছেন কি করে ?
আমরা যেহেতু বুঝতে পারি না যে যে ভগবান, পরম সত্য, সবিশেষ হন কি করে, তাই আমাদের ব্রহ্মান্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব আদি কবি ব্রহ্মার কাছ থেকে শিক্ষালাভ করতে হবে। আমরা ব্রহ্ম-সম্প্রদায়ভুক্ত অর্থাৎ ব্রহ্মার থেকে শুরু করে যে গুরু-পরম্পরা, সেই গুরু-শিষ্য পরম্পরায় অবস্থিত; তাই ব্রহ্মার নির্দেশ অনুসারে আমাদের আদি পুরুষ গোবিন্দের ভজনা করতে হবে। আমরা সেই আদি পুরুষকে না-ও জানতে পারি, কিন্তু আমরা যদি পূর্বতন আচার্যদের পদাঙ্ক অনুসরণ করি, তা হলে আমাদের কোন অসুবিধাই হবে না। গোবিন্দ ব্রহ্মাকে তাঁর হৃদয়াভ্যন্তর থেকে তত্ত্বজ্ঞান দান করেছিলেন, ব্রহ্মা সেই জ্ঞান তার শিষ্য নারদ মুনিকে দান করেছিলেন, নারদ মুনি সেই জ্ঞান তাঁর শিষ্য ব্যাসদেবকে দান করেছিলেন, ব্যাসদেবের শিষ্য মধ্বাচার্য সেই বাণীর পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, তারপর ঈশ্বরপুরী এবং তারপর তাঁর শিষ্য শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, তারপর গোস্বামীগণ। এইভাবে এই জ্ঞান গুরু-পরম্পরার সূত্রে প্রাপ্ত হয়। স্তরে স্তরে গুরু থেকে শিষ্যতে এই জ্ঞান প্রবাহিত হয়। অবিকৃতভাবে যখন এই বাণীর পুনরাবৃত্তি করা হয়, তখন যথাযথাভাবে এই জ্ঞান সঞ্চারিত হয়।
শাস্ত্র থেকে আমরা জানতে পারি যে, আদিপুরুষ বিভিন্ন অবতারে নিজেকে প্রকাশ করেন। এই সমস্ত অবতারেরা বিভিন্ন রূপে প্রকাশিত হন এবং তাঁদের লীলাবিলাসের কাহিনী শ্রীমদ্ভাগবতে বর্ণিত হয়েছে। এক সময় শ্রীকৃষ্ণ বরাহরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং গর্ভসমুদ্র থেকে তাঁর দশনাগ্রে পৃথিবীকে উত্তোলিত করেছিলেন। ব্রহ্মান্ডের যে অর্ধভাগে জল রয়েছে, দৈত্য হিরণ্যাক্ষ পৃথিবীকে সেখানে ফেলে দেয় এবং শ্রীকৃষ্ণ বরাহরূপে কেবল পৃথিবীকে উদ্ধারই করেননি, তিনি সেই দৈত্যটিকে সংহারও করেছিলেন। অন্য আরেকটি সময় ভগবান একটি ছোট্ট মৎস্যরূপে একটি ছোট্ট পাত্রে আবির্ভূত হন এবং কালক্রমে তিনি বর্ধিত হতে থাকায় তাঁকে একটি জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও সেই মৎস্যটি বড় হতে থাকেন এবং অবশেষে বিরাট আকৃতি ধারণ করে, তিনি মনুকে বলেন, “প্রলয়ের কাল সমুপস্থিত হয়েছে। সমস্ত বেদ একত্রিত করে তুমি একটি নৌকায় সেগুলি রাখ এবং আমি সেইগুলি রক্ষা করব। ” তাই জয়দেব গোস্বামী তাঁর প্রার্থনায় গেয়েছেন, “হে ভগবান! আপনি মীন-রূপ ধারণ করে প্রলয়ের প্লাবন থেকে বেদ উদ্ধার করেছিলেন। বৈষ্ণব কবি জয়দেব গোস্বামী শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর আবির্ভাবের প্রায় সাতশ’ বছর পূর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং তিনি তাঁর প্রার্থনায় ভগবানের বিভিন্ন অবতারের মহিমা কীর্তন করেছেন। জয়দেব গোস্বামী ছিলেন এক মহান ভক্ত এবং তিনি ‘গীতগোবিন্দ’ নামক ভগবান শ্রীকৃষ্ণের লীলা-বিষয়ক একটি অতি প্রসিদ্ধ কাব্য রচনা করেন। তাঁর অন্য একটি প্রার্থনায় তিনি ভগবানের কূর্ম অবতারের মহিমা কীর্তন করেছেন। এক সময় দেবতা এবং অসুরেরা মন্দর পর্বতে মন্থনদন্ড করে সমুদ্র-মন্থন করেছিলেন। সেই মন্থন-দন্ডটি ভগবানের কূর্ম-রূপের পৃষ্ঠে অবস্থান করেছিল। তাই জয়দেব গোস্বামী গেয়েছেন, “আপনি কূর্মরূপে আবির্ভূত হয়ে মন্থনদন্ড ধারণ করেছিলেন।”
আর এক অবতরণে ভগবান নৃসিংহ রূপ ধারণ করেন পঞ্চম বর্ষীয় বালক প্রহ্লাদ মহারাজকে তাঁর নাস্তিক পিতার অত্যাচার থেকে রক্ষা করার জন্য। প্রহ্লাদের পিতা হিরণ্যকশিপুর প্রাসাদে একটি স্তম্ভ থেকে ভগবান নরসিংহ রূপে সেই অবতরণে আবির্ভূত হন। হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়েছিল যে, সে কোন মানুষ বা পশুর হাতে নিহত হবে না। তাকে বধ করবার জন্য তাই ভগবান নরসিংহ রূপ ধারণ করেছিলেন, যে রূপে তিনি মানুষও নন, আবার পশুও নন। আমরা অনেক সময়ই ভাবি যে, আমরা চালাকি করে ভগবানকে প্রতারণা করব, কিন্তু ভগবান আমাদের থেকে বেশি বুদ্ধিমান, তাই তাঁকে কখনও ঠকানো যায় না।
আর একটি অবতরণে ভগবান বামনদেব রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বলি মহারাজ তখন ত্রিভুবন জয় করে দেবতাদের স্বর্গচ্যুত করেছিলেন। তাই দেবতাদের পুনরায় স্বর্গে অধিষ্ঠিত করবার জন্য বামনদেব বলি মহারাজের কাছে ত্রিপাদভূমি ভিক্ষা করেছিলেন। সেই ব্রাহ্মণ-বালককে বলি মহারাজ তা দিতে সম্মত হন। বামনদেব তখন তাঁর এক পদের দ্বারা ব্রহ্মান্ডের ঊর্ধ্বভাগ অধিকার করেন এবং অপর পদের দ্বারা ব্রহ্মান্ডের বাকি অর্ধাংশ অধিকার করেন। বলি মহারাজ তখন তাঁকে বলেন, “আপনার তৃতীয় পদ স্থাপন করার আর কোন জায়গায়ই তো নেই, সুতরাং আপনি আমার মাথার উপর আপনার তৃতীয় পদটি স্থাপন করুন। ” ভগবান তখন বলি মহারাজের মস্তকে তাঁর শ্রীপাদপদ্ম স্থাপন করে তাঁকে পাতাললোকে প্রেরণ করে কৃপা করেন।
আর এক সময় স্বেচ্ছাচারী ক্ষত্রিয় রাজাদের দন্ডদান করার জন্য তিনি পরশুরাম রূপে আবির্ভূত হয়ে একুশবার পৃথিবীকে নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। মহাভারত থেকে জানা যায় যে, তখন কিছু ক্ষত্রিয় পালিয়ে গিয়ে ইউরোপে বসতি স্থাপন করে এবং এখনকার ইউরোপীয়রা সেই ক্ষত্রিয়দেরই বংশধর।
শ্রীরামচন্দ্র রূপে অবতরণ করে তিনি দশমুখ বিশিষ্ট অসুর রাবণকে সংহার করেন এবং আদর্শ রাজা রূপে পৃথিবী শাসন করেন।
শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলরাম রূপে তিনি অবতরণ করেন। তাঁর সেই রূপ অত্যন্ত মনোরম, তাঁর অঙ্গকান্তি দুধের মতো সাদা এবং তাঁর পরনে নীল বসন। এক সময় তিনি যমুনা নদীর প্রতি ক্রোধান্বিত হন এবং যমুনাকে তাঁর হলের দ্বারা আকর্ষণ করতে উদ্যত হন। তখন যমুনা অত্যন্ত ভীতা হয়ে তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেন।
বুদ্ধদেব রূপে তিনি অকাট্য যুক্তির দ্বারা বৈদিকতত্ত্ব খন্ডন করেন এবং তাই তাঁকে নাস্তিক বলে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বুদ্ধদেব হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণের অবতার। বৈদিক নির্দেশের অজুহাতে তখন যে অসংখ্য পশুহত্যা হচ্ছিল তা বন্ধ করার জন্য তিনি বেদের নিন্দা করে মানুষকে বেদ-বিমুখ করেন, এবং অহিংসার বাণী প্রচার করেন।
এই কলিযুগের শেষে ভগবান কল্কি অবতার রূপে আবির্ভূত হবেন। বেদের বর্ণনা অনুসারে থেকে ৪,২৭,০০০ বছর পর কল্কি অবতার আবির্ভূত হবেন এবং সমস্ত নাস্তিকদের নিধন করবেন। শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতার মাধ্যমে তাঁর উপদেশ দিয়ে গেছেন, কিন্তু কল্কি অবতারে তিনি কোন উপদেশ দেবেন না। কলিযুগের শেষে মানুষ এত অধঃপতিত হয়ে যাবে যে, তারা কোন উপদেশ গ্রহণে অভিলাষী হবে না; তাই তখন তাদের হত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না। ভগবান যখন কাউকে নিধন করেন, তখন সে মুক্তি লাভ করে। সেটি হচ্ছে ভগবানের সর্বমঙ্গলময়তার একটি প্রকাশ; তিনি রক্ষা করুন, অথবা হত্যা করুন, উভয়ই চরম মঙ্গলদায়ক। তাই কলিযুগের শেষে কল্কি অবতার রূপে অবতরণ করে তিনি সকলকে সংহার করবেন এবং তারপর আবার সত্যযুগ শুরু হবে।
এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, ভগবান কেবল আদি পুরুষই নন, তিনি অসংখ্য অবতার রূপে বিভিন্ন সময়ে ব্রহ্মান্ডের বিভিন্ন স্থানে নিজেকে প্রকাশ করেন। তাঁর সেই প্রকাশ তাঁর থেকে অভিন্ন।
ভগবান নিজেকে এইভাবে প্রকাশিত করলেও আমরা প্রায়ই তাঁর অস্তিত্ব অস্বীকার করে বলি, “ভগবান নেই,” অথবা “আমিই ভগবান”, অথবা “আমি ভগবানের কোন পরোয়া করি না। ” ভগবৎ-বিদ্বেষই এই যুগের মানুষদের স্বাভাবিক মনোভাব, কিন্তু তা সত্ত্বেও ভগবান রয়েছেন এবং সর্বদাই আমরা তাঁকে দর্শন করতে পারি। আমরা যদি ভগবানের সচ্চিদানন্দঘন সবিশেষ রূপ অস্বীকার করি, তা হলে তিনি আমাদের সামনে নৃশংস মৃত্যুরূপে আবির্ভূত হবেন।
ভগবদ্গীতায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কিভাবে আমরা ধীরে ধীরে ভগবানকে জেনে প্রত্যক্ষভাবে তাঁকে দর্শন করতে পারি। ভগবদ্গীতায় পরমেশ্বর ভগবান নিজেই বলেছেন, “আমি হচ্ছি জলের স্বাদ, আমি হচ্ছি চন্দ্রের জ্যোৎস্না, আমি হচ্ছি আকাশের শব্দ এবং সমস্ত পুরুষেদের মধ্যে আমিই সর্বশ্রেষ্ঠ। ” কেউ যদি ঐকান্তিকভাবে ভগবানকে জানতে চান, অথবা ভগবত্তত্ত্ব বিজ্ঞান জানতে চান, তা হলে তিনি ভগবদ্গীতার নির্দেশ অনুসরণ করে কত রকমভাবে ভগবানকে জানতে পারেন। সকলেই জল প্রতিদিন খায়, তাই আমরা যদি মনে রাখতে পারি যে, সেই জলের স্বাদ হচ্ছেন ভগবান, তা হলে ভগবত্তত্ত্ব জ্ঞানের বিকাশ হতে শুরু করে। এমন কে আছে, যে চন্দ্র অথবা সূর্যকে দর্শন করেনি ? এমন কে আছে যে আকাশের শব্দতরঙ্গ শোনেনি ? এই রকম কতভাবে আমরা ভগবানকে দেখতে পারি এবং তাঁর কথা শুনতে পারি এবং তাঁকে অনুভব করতে পারি। সকলেই প্রতি মুহূর্তে ভগবানকে দর্শন করছেন, কিন্তু নাস্তিকেরা দাবী করে তারা তাঁকে দেখতে পায় না, কারণ তিনি নেই।
ভগবৎ-চেতনা ছাড়া বা কৃষ্ণভক্তি ছাড়া শান্তি লাভ করা যায় না। সকলেই শন্তির অন্বেষণ করছে, কিন্তু কিভাবে যে শান্তি লাভ করা যায়, তা কেউই জানে না। তাই এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কল্যাণ সাধন করছে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পরমেশ্বর ভগবানের নাম সমন্বিত মহামন্ত্রঃ ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’ কীর্তন করার মাধ্যমে অত্যন্ত সহজভাবে ভগবত্তত্ত্ববিজ্ঞান উপলব্ধি করার পন্থা প্রদান করে গেছেন। বেদে বলা হয়েছে যে, এই যুগের মানুষ এত অধঃপতিত যে, অন্য কোন উপায়ে এই যুগের মানুষ ভগবানকে জানতে পারে না; তাই অন্যান্য যুগে ধ্যান, অর্চনা এবং যজ্ঞের মাধ্যমে যে ফল লাভ করা যেত, তা কেবল ভগবানের দিব্য নাম কীর্তন করার মাধ্যমেই লব্ধ হয়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যিনি হচ্ছেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, পরমেশ্বর ভগবানের দিব্য নাম পরমেশ্বর ভগবান থেকে অভিন্ন; তাই ভগবানের সমস্ত শক্তি ভগবানের দিব্য নামেই রয়েছে। পারমার্থিক স্তরে নাম এবং নামীতে কোন ভেদ নেই; তাই ভগবানের দিব্য নাম এবং ভগবানের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলে গেছেন যে, ভগবানের এই নাম গ্রহণে কোন নিয়ম-কানুনের বাধ্য-বাধ্যকতা নেই, এবং যে কোনও স্থানে, যে কোন সময়ে এই নাম কীর্তন করা যায়। এই যুগে সকলেই কতকগুলি অন্ধের অনুসরণ করছে, তাই মানব সমাজের যথার্থ উদ্দেশ্য যে কি, তা কেউই জানে না। অধ্যাত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমে এবং পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবার মাধ্যমে জীবন সার্থক হয়। এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন সেই উদ্দেশ্য সাধন করে মানব সমাজকে যথার্থ জ্ঞান দান করার প্রচেষ্টা করছে। বৈদিক শাস্ত্রে বিশ্লেষন করা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই জীবনের চরম সিদ্ধি। ভগবদ্গীতা থেকে আমরা জানতে পারি যে, প্রতিটি জীবই– কেবল মানুষই নয়, পশু, পাখি এবং তার থেকেও নিম্নস্তরের জীবেরাও– সকলেই পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন অংশ। অংশের কাজই হচ্ছে পূর্ণের সেবা করা, ঠিক যেমন আমার এই হাতটির কর্তব্য হচ্ছে আমার দেহটির সেবা করা। তেমনই, জীব যেহেতু ভগবানের বিভিন্ন অংশ, তাই তাদের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানের সেবা করা।
প্রকৃতপক্ষে আমরা সর্বদাই কারো না কারো সেবা করছি। আমরা নিরন্তর হয় আমাদের দেহের সেবা করছি অথবা আমাদের দেহের সম্পর্কে সম্পর্কিত কোন কিছুর সেবা করছি– যেমন পরিবার, সমাজ, দেশ ইত্যাদি। আর কারো যদি সেবা করার মতো কেউ না থাকে, তা হলে সে একটি কুকুর বা বেড়াল পুষে তাদের সেবা করে। তবে আমাদের স্বাভাবিক বৃত্তি হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করা।
পরমেশ্বর ভগবানের সেবা না করে আমরা থাকতে পারি না, এবং পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করাকে বলা হয় সনাতন ধর্ম বা জীবের স্বাভাবিক ধর্ম। জড়জাগতিক স্তরে সব চাইতে ভালভাবে সেবা করেও আমরা নিজেরা সন্তুষ্ট হতে পারি না এবং যাকে সেবা করা হচ্ছে, তাকেও সন্তুষ্ট করা যায় না। জগতে সকলেই নৈরাশ্যগ্রস্ত, কারণ এখানে আমাদের সেবা করার প্রবৃত্তি যথাযথভাবে পরিচালিত হয় না। আমরা যদি একটি গাছের সেবা করতে চাই, তা হলে আমাকে সেই গাছের গোড়ায় জল দিতে হবে, গাছের ডালপালায় বা পাতায় জল দিলে হবে না। তেমনই, উদরকে খাদ্য দিলে সমস্ত শরীরের পুষ্টি হয়। তাই আমাদের বুঝতে হবে, আমরা যদি পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করি, তা হলে তাঁর বিভিন্ন অংশগুলিও তৃপ্ত হবে। তাই, পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করার মাধ্যমেই যথার্থভাবে সমাজের, দেশের এবং পরিবারের পূর্ণাঙ্গ সেবা হয়ে থাকে।
ব্রহ্মা তাঁর শিষ্য নারদ মুনিকে বলেন, “বৈদিক শাস্ত্রসমূহ ভগবান নিজেই প্রণয়ন করেছেন, এবং তাদের চরম উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের পরিচিতি প্রকাশ করা। যেমন, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কর্তব্য হচ্ছে পূর্ণ শরীরের সেবা করা। বিভিন্ন গ্রহণগুলিও পরমেশ্বর ভগবানেরই জন্য এবং বিভিন্ন যজ্ঞের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁর প্রীতিসাধন করা। সমস্ত ধ্যান এবং ধারণার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁকে জানা। সমস্ত তপশ্চর্যার উদ্দেশ্য হচ্ছে তাঁর দর্শন লাভ করা এবং মুক্তিলাভ করে তাঁর ধামে প্রবেশ করা (শ্রীমদ্ভাগবত ২/৫/১৫-১৬)। ব্রহ্মার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা সেই চরম মুক্তি লাভ করতে পারি, ব্রহ্মা আদি সমস্ত দেবতাদের আরাধ্য পরমেশ্বর ভগবানের দর্শন লাভ করতে পারি।