আত্মজ্ঞান লাভের পন্থা

সততং কীর্তয়ন্তো মাং যতন্তশ্চ দৃঢ়ব্রতাঃ।
নমস্যন্তশ্চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপাসতে ॥
“নিরন্তর আমার মহিমা কীর্তন করে গভীর নিষ্ঠা সহকারে প্রয়াস করে, আমাকে প্রণতি নিবেদন করে মহাত্মারা গভীর ভক্তি সহকারে নিরন্তর আমার উপাসনা করেন। ”
(ভঃ গীঃ ৯/১৪)
শ্রীকৃষ্ণ এখানে বর্ণনা করেছেন, যথার্থ মহাত্মা কে।  যথার্থ মহাত্মা হচ্ছেন তিনি, যিনি নিরন্তর ভগবানের মহিমা ‘কীর্তন’ করার মাধ্যমে পরমেশ্বর ভগাবানের উপাসনা করেন। ‘কীর্তন’ করার অর্থ হচ্ছে বর্ণনা করা।  আপনি সঙ্গীতের মাধ্যমে বর্ণনা করতে পারেন; লেখার মাধ্যমে বর্ণনা করতে পারেন; কথা বলার মাধ্যমে বর্ণনা করতে পারেন।  যে-কোন রকমের বর্ণনা করাকে বলা হয় ‘কীর্তন’। ভগবদ্ভক্তি শুরু হয় ‘কীর্তন’ এবং ‘শ্রবণে’র মাধ্যমে।  আপনি যদি না শোনেন, তা হলে আপনি বর্ণনা করতে পারবেন না।  আপনি কি বর্ণনা করবেন ? আপনি যদি পরমেশ্বর ভগবান সম্বন্ধে কিছুই না জানেন, তা হলে কিভাবে আপনি তাঁর কথা বর্ণনা করবেন ? তাই শ্রবণ হচ্ছে ভক্তির প্রথম স্তর।

সমস্ত বৈদিক শাস্ত্রকে বলা হয় শ্রুতিশাস্ত্র।  শ্রুতি কথাটির অর্থ হচ্ছে শ্রবণের মাধ্যমে আহরণ করা।  আপনি যদি পরমেশ্বর ভগবান সম্বন্ধে জানতে চান, তা হলে কোন রকম জড় উপাধির প্রয়োজন হয় না।  জড়জাগতিক বিষয়ে জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না, আপনি যেখানে আছেন, সেখানেই থেকে সেই জ্ঞান আহরণ করতে পারেন।  তবে আপনাকে কেবল শ্রবণ করতে হবে।  ভগবান আপনাকে শ্রবণের শক্তি দিয়েছেন।  আপনি যদি প্রমাণিত সূত্র থেকে, অর্থাৎ যাঁরা ভগবত্তত্ত্ব সম্বন্ধে জানেন, তাঁদের কাছ থেকে শ্রবণ করেন, তা হলে আপনি ভগবান সম্বন্ধে পূর্ণ জ্ঞান লাভ করতে পারবেন– কেবলমাত্র শ্রবণ করার মাধ্যমে।  তাই শ্রবণ হচ্ছে প্রথম স্তর এবং তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পুরাকালে শিষ্য শ্রীগুরুদেবের কাছ থেকে শ্রবণ করত।  যেমন ভগবদ্গীতায় আপনারা দেখবেন যে, অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে শ্রবণ করছেন।  কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে তিনি বেদান্ত-দর্শন অধ্যয়ন করছিলেন না, তিনি কেবল শ্রবণ করেছিলেন।  আপনি যে-কোনও জায়গায় শ্রবণ করতে পারেন।  এমন কি যুদ্ধক্ষেত্রেও, আপনি প্রামাণিক সূত্র থেকে
তত্ত্বজ্ঞান শ্রবণ করতে পারেন।  তাই জ্ঞান আহরণের এই পন্থা চিরকাল ধরে চলে আসছে।

শ্রবণ করার অর্থ হচ্ছে জ্ঞান আহরণ করা- জ্ঞান তৈরী করা নয়।  কিছু লোক আছে যারা মনে করে, “আমি কেন ওর কাছ থেকে শুনব ? আমি তো নিজে-নিজেই চিন্তা করতে পারি।  আমি অনুমান করতে পারি, নানা রকম জল্পনা-কল্পনা করতে পারি।  আমি একটি নতুন কিছু চিন্তাধারা সৃষ্টি করতে পারি এবং তা আমার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে প্রচার করতে পারি। ”এটি হচ্ছে নির্বুদ্ধিতা।  এটি বৈদিক পন্থা নয়। বৈদিক পন্থা হচ্ছে শ্রবণ।

জ্ঞান আহরণের দুটি পন্থা রয়েছে– আরোহ পন্থা এবং অবরোহ পন্থা।  আরোহ পন্থার অর্থ হচ্ছে ওপরে ওঠার চেষ্টা করা– নিজের শক্তির দ্বারা নিজেকে উন্নত স্তরে অধিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা; আর অবরোহ পন্থার অর্থ হচ্ছে উন্নত পর্যায়ভুক্ত কোন ব্যক্তির কাছ থেকে, ভগবত্তত্ত্বজ্ঞান সম্পন্ন কোন ব্যক্তির কাছ থেকে বিশুদ্ধ জ্ঞান লাভ করা।  তাই আরোহ পন্থাকে বৈদিক জ্ঞান আহরণের উপায় বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।  বৈদিক জ্ঞানলাভের পন্থা হচ্ছে অবরোহ পন্থা- শিক্ষার্থী শিষ্য সদ্গুরুর কাছ থেকে বিনীতভাবে শ্রবণ করার মাধ্যমে এই জ্ঞান আহরণ করেন।  এইভাবে আমরা যথার্থ জ্ঞান লাভ করতে পারি।

ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে (৪/২) আপনারা পড়েছেন, এবং পরম্পরাপ্রাপ্তম্ ইমং রাজর্ষয়ো বিদুঃ।  এইভাবে গুরু-শিষ্য পরম্পরার ধারায় এই পরম তত্ত্বজ্ঞান লাভ করা যায়। ভগবান বলেছেন, “সর্বপ্রথমে আমি এই জ্ঞান সূর্যদেব বিবস্বানকে দিয়েছিলাম, বিবস্বান তারপর তার পুত্র মনুকে তা দান করেন।  মনু তা দান করেন, তাঁর পুত্র ইক্ষ্বাকুকে। ”সেই সময় ইক্ষ্বাকু ছিলেন এই পৃথিবীর রাজা।  এইভাবে ইক্ষ্বাকুর কাছ থেকে এই জ্ঞান প্রবাহিত হচ্ছিল–পিতা থেকে পুত্রতে, অথবা গুরু থেকে শিষ্যতে।

এখন যেহেতু সেই গুরু-পরম্পরা ছিন্ন হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণ তাই বলেছেন, “সেই পুরাতন জ্ঞান আমি আবার তোমাকে দান করছি, অর্জুন– কারণ তুমি আমার ভক্ত, তুমি আমার প্রিয় বন্ধু। ” সুতরাং এটিই হচ্ছে পন্থা।  শ্রবণ করা হচ্ছে প্রাথমিক স্তর।  শ্রবণের প্রক্রিয়াটি এতই শক্তিশালী যে, কেবলমাত্র প্রামাণিত সূত্র থেকে শ্রবণ করার মাধ্যমে পূর্ণ সিদ্ধি লাভ করা যায়– কেবলমাত্র শ্রবণ করার মাধ্যমেই।

অবশ্য বিনীতভাবে শ্রবণ করতে হবে।  জ্ঞানে প্রয়াসমুদপাস্য নমস্তু এব।  এটি শ্রীমদ্ভাগবতের একটি শ্লোক।  “নির্বোধের মতো নিজের চেষ্টায় পরম তত্ত্বজ্ঞান লাভ করার চেষ্টা কোর না। ” তোমাদের বুদ্ধি সীমিত, তোমাদের ইন্দ্রিয়গুলি অসম্পূর্ণ।  তোমরা নিজেদের ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করে এবং বুদ্ধির উপর নির্ভর করে কোন কিছুই যথাযথভাবে জানতে পারবে না।  তাই আরোহ পন্থার মাধ্যমে পরমেশ্বর ভগবানকে জানার চেষ্টা বর্জন করতে হবে।

আজকাল সকলেই মনে করছে, “ওঃ, আমি মনগড়া একটি মত তৈরি করব।  কেন আমি অন্য কারও বশ্যতা স্বীকার করতে যাব ? আমি নিজেই বিবেচনা করব আমি কে এবং আমার কি করা কর্তব্য। ” সেটিই হচ্ছে।  কিন্তু সেটি বৈদিক পন্থা নয়।  বৈদিক পন্থা হচ্ছে শ্রবণ– নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে শ্রবণ।  তাই আমরা যদি আমাদের নিজেদের চেষ্টার মাধ্যমে পরমতত্ত্বকে জানার পন্থা বর্জন করি এবং বিনীত হই, তা হলেই আমরা দিব্য জ্ঞান লাভে সার্থক হব।  ‘বিনীত’ হওয়ার অর্থ হচ্ছে আমাদের অক্ষমতা সম্বন্ধে অবগত হওয়া।  বদ্ধ অবস্থায় আমরা সাধারণত চারটি ত্রুটির দ্বারা প্রভাবিত থাকি।  প্রথমে আমরা ভুল করি।  জড় জগতে বদ্ধ অবস্থায় কেউই বলতে পারে না, “আমি ভুল করব না”, বা “আমি কোন ভুল করি না”।  সেটি কখনই সম্ভব নয়।  ভুল আমাদের হবেই।  ভুল করাই মানুষের ধর্ম।  সুতরাং এটি আমাদের একটি অপূর্ণতা।

দ্বিতীয়ত আমরা প্রমাদগ্রস্থ।  যা অলীক, তাকে আমরা বাস্তব বলে মনে করি।  যেমন, আমরা আমাদের শরীরটিকে আমাদের স্বরূপ বলে মনে করি।  আমাদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, আমরা কে, তখন আমরা উত্তর দিই, “ও, আমি আমেরিকান”, “আমি ইউরোপীয়ান” ইত্যাদি।  কিন্তু আমেরিকান বলতে কি বোঝায় ? এই শরীরগুলি আমেরিকান, কিন্তু আমরা ত নই।  কারন আমরা আমাদের এই শরীর নই।  সুতরাং এটি প্রমাদ বা মোহ।

তারপর আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি ভ্রান্ত।  আমাদের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে আমরা কত গর্ব করি, কিন্তু যখনই আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়, তখন আমরা আর কিছুই দেখতে পাই না।  তাই আমাদের এই দৃষ্টিশক্তি আপেক্ষিক।  আর তেমনই, আমাদের আর সব কটি ইন্দ্রিয়ও আপেক্ষিক।  তাই সেইগুলি ভ্রান্ত।

আমরা সকলেই প্রতারণা করতে চাই।  আমরা কিছুই জানি না, কিন্তু আমরা অন্যদের বোঝাতে চাই যে, আমরা সব কিছুই জেনে বসে আছি।  সেই ধরনের মহামূর্খ প্রতারকগুলি আবার একদল শিষ্য যোগাড় করে তাদের নানা রকম মনগড়া তথ্য শিক্ষা দিচ্ছে।  সেটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়।

পরমতত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে হয় তত্ত্বদ্রষ্টা গুরুদেবের কাছ থেকে এবং তারপর সেই জ্ঞান অন্যদের দান করতে হয়।  শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শিক্ষা দান করেছিলেন, আর আমরা সেই জ্ঞান আজও প্রচার করে চলেছি।  আর যাঁরা অর্জুনের মতো বিনীতভাবে সেই জ্ঞান শ্রবণ করছেন– তাঁরা ভগবদ্গীতার যথার্থ শিক্ষার্থী।

তাই আমাদের ভ্রান্ত ইন্দ্রিয় এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরমতত্ত্ব উপলব্ধি করার চেষ্টা সম্পূর্ণ অর্থহীন।  আমাদের শ্রবণ করতে হবে সেটিই বৈদিক পন্থা।  পুরাকলে শিষ্য গুরুগৃহে যেতেন সেই জ্ঞান আহরণ করার জন্য।  তাকে বলা হত গুরুকুল।  প্রত্যেক ব্রাহ্মণ, প্রতিটি ব্রহ্মজ্ঞানী পুরুষ, প্রতিটি বিপ্র (অথবা বৈদিক তত্ত্বজ্ঞান সম্বন্ধে পারদর্শী ব্যক্তি) কয়েকজন ব্রহ্মচারীকে শিষ্যরূপে বরণ করে শিক্ষা দান করতেন।  সেই সমস্ত শিক্ষার্থীরা ব্রহ্মচর্য পালন করে গুরুগৃহে অবস্থান করতেন এবং গুরুদেব তাঁদের বৈদিক শাস্ত্রসম্ভূত তত্ত্বজ্ঞানসমূহ প্রদান করতেন।  সেটিই যথার্থ পন্থা।

সুতরাং আরোহ পন্থার মাধ্যমে কখনই পরমতত্ত্বজ্ঞান লাভ করার চেষ্টা করা উচিত নয়।  জ্ঞানে প্রয়াসমুদপাস্য।  ‘উদপাস্য’ কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘বর্জন করে’ এবং নমস্ত এব– বিনীতভাবে।  নমস্ত এব জীবন্তি সম্মুখরিতম্ ভবদীয় বার্তাম্– কেউ যদি তত্ত্বদ্রষ্টা পুরুষের কাছে বিনীতভাবে শ্রবণ করেন– ঠিক যেভাবে অর্জুন পরমপুরুষ শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে শ্রবণ করেছিলেন– তা হলে অনায়াসে জীবনের পরম সিদ্ধি লাভ করা যায়।

শ্রীকৃষ্ণের প্রতিনিধি– কৃষ্ণভক্তের কাছ থেকেও শ্রবণ করা যায়।  যেমন, শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর প্রতিনিধি করেছিলেন।  কেন ? শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ভক্তোহসি–“কারণ তুমি আমার ভক্ত। ” ভগবানের ভক্ত না হলে তাঁর প্রতিনিধি হওয়া যায় না।  যে মনে করে, “আমি ভগবান”– সে কখনই ভগবানের প্রতিনিধি হতে পারে না।

যেমন ধর, তুমি একজন ব্যবসায়ী এবং তুমি তোমার প্রতিনিধিকে পাঠিয়ে ব্যবসা কর।  এখন, তোমার প্রতিনিধি যদি তোমার খরিদ্দারের কাছে গিয়ে বলে, “আমিই মালিক”, তা হলে কতদিন আর সে তোমার চাকরি করতে পারবে ? যখনই তুমি জানতে পারবে যে, সেই মূর্খ লোকটি নিজেকে তোমার প্রতিষ্ঠানের মালিক বলে প্রচার করে বেড়াচ্ছে তৎক্ষণাৎ তুমি তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেবে।  কারণ সেই লোকটি হচ্ছে প্রতারক– সে মালিক নয়।  তেমনই যে বলে, “আমি ভগবান”– সে একটি প্রতারক এবং তার কাউকে
শিক্ষা দেওয়া উচিত নয়।

কেউ মনে করতে পারে যে, সে নিজে নিজেই ভগবত্তত্ত্ব জ্ঞান লাভ করতে পারে।  সেটি ভিন্ন বিষয়।  “আমি ভগবান” বলে জাহির করার পিছনে ভগবানের গুণগুলি সম্বন্ধে বলা হচ্ছে।  আমরা যেহেতু ভগবানের বিভিন্ন অংশ, তাই গুণগতভাবে আমরা ভগবানের অংশ বিশেষ।

যেমন, একটি সোনার কণাও সোনা।  সেটি সোনা ছাড়া আর কিছু নয়।  তেমনই, আমরা যদি পরমেশ্বর ভগবানের বিভিন্ন অংশ. তাই গুণগতভাবে আমরা ভগবানের সঙ্গে এক। তাই আমি যদি আমার গুণাবলী বিশ্লেষণ করি, তা হলে আমি ভগবানের সম্বন্ধেও জানতে পারি, কারণ তার মাধ্যমে আমরা ভগবানের গুণাবলী জনতে পারি, কিন্তু তা বলে ভগবানের আয়তন আমরা জানতে পারি না।

যেমন ধর, তুমি কিছু ভাল চাল পেলে।  প্রথমে কতটা চাল রয়েছে তা নিয়ে তুমি বিবচেনা কর না, কিন্তু এক মুঠো চাল দেখে তুমি বুঝতে পার যে, সেগুলি কি রকম চাল, তারপর তুমি তা কিনতে পার, এবং তারপর তুমি তোমার লেনদেন কর– “আপনার কাছে কত চাল আছে ? আপনার কাছ থেকে আমি কতটা চাল কিনতে পারি ?” সুতরাং আয়তন হচ্ছে আর একটি ভিন্ন বিষয়।  কিন্তু গুণ দেখে তুমি বিবেচনা করতে পার, তুমি কতটা চাল কিনবে।  তেমনই, গুণগতভাবে আমরা ভগবানের সঙ্গে এক, কিন্তু আয়তনগতভাবে ভিন্ন। ভগবান হচ্ছেন মহান, আর আমরা সেই তুলনায় নিতান্তই ক্ষুদ্র।

তাই আমরা কখনই দাবি করতে পারি না, “আমি ভগবান। ” তুমি নিজেকে ভগবান বলে জাহির কর, আর কেউ যদি এসে তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, “আপনি যদি ভগবান হন, তা হলে আপনি আমাকে আপনার সর্বশক্তিমত্তা প্রদর্শন করুন,” তখন তা তোমার পক্ষে সম্ভব হয় না।  তাই তুমি দাবি করতে পার না যে, “আমি ভগবান।” কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ প্রমাণ করে গেছেন যে, তিনি ভগবান।  কিভাবে ? ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়ে অর্জুন যখন তাঁকে অনুরোধ করেন, “হে কৃষ্ণ! তুমি কি দয়া করে আমাকে তোমার বিশ্বরূপ প্রদর্শণ করবে ?”– শ্রীকৃষ্ণ তখন তাঁকে তা দেখিয়েছিলেন।

এটি সমস্ত জগতের কাছে অর্জুনের চিরস্থায়ী বাণী–“ভবিষ্যতে বহু মূর্খ লোক যখন নিজেদের ভগবান বলে জাহির করবার চেষ্টা করবে, তখন তাদের দ্বারা প্রতারিত হয়ো না। তাদের জিজ্ঞাসা কর, “দয়া করে আপনার বিশ্বরূপ প্রদর্শণ করুন।  যদি তারা তা পারে, তখন তাদের ভগবান বলে স্বীকার কর।  কিন্তু কখনই কোন মূর্খ ভন্ড প্রতারককে ভগবান বলে স্বীকার করো না।”

সেটিই হচ্ছে সব চাইতে বড় অপূর্ণতা।  মানুষ জড় জগতের কঠোর নিয়মের দ্বারা আবদ্ধ– একটু দাঁত ব্যাথা হলে সে যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে থাকে- অথচ সে নিজেকে ভগবান বলে জাহির করতে চায়।  মূর্খ লোকেরাই এই ধরনের মানুষের দ্বারা প্রতারিত হয়।  ভগবান হচ্ছে পরমেশ্বর। ভগবান ছাড়া আর কেউই পরমেশ্বর হতে পারে না এবং কেউই ভগবানের সমকক্ষ হতে পারে না।

বৈদিক শাস্ত্রে ভগবানকে অসমোর্ধ্ব বলে বর্ণনা করা হয়েছে।  ‘অসম’ মানে “যার সমান কেউ নেই। ” কেউই ভগবানের সমকক্ষ হতে পারে না এবং কেউই ভগবানের থেকে মহৎ হতে পারে না।  সকলেই ভগবানের অধস্তন– তা সে যত মহৎই হোক্ না কেন।  এই সম্পর্কে একটি সুন্দর শ্লোক রয়েছে–শিব-রিরিঞ্চি-নূতম্। শিব মানে হচ্ছে দেবাদিদেব মহাদেব, এবং বিরিঞ্চি হচ্ছেন ব্রহ্মা।  এই জড় জগতে তাঁরাই সমস্ত দেবতাদের মধ্যে সর্বোত্তম।  কিন্তু তাঁরাও পরমেশ্বর ভগবান বা বিষ্ণুকে তাঁদের সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করেন।  তাই পরমেশ্বর ভগবানের সমকক্ষ কেউই হতে পারে না।  তাই ভগবানের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা না করে অথবা আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞান বা অপূর্ণ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা ভগবানকে জানবার চেষ্টা না করে আমাদের তাঁর শরণাগত হওয়া উচিত।  জ্ঞানে প্রয়াসমুদপাস্য–“অবোধ মূর্খের মতো জল্পনা-কল্পনার মাধ্যমে আমি ভগবানকে জানতে পারি”,– এই ধরনের প্রয়াস না করে বিনীতভাবে সদ্গুরুর শরণাগত হয়ে তাঁর কাছ থেকে দিব্যজ্ঞান লাভ করার চেষ্টা করা উচিত।

পরম প্রামাণিক তত্ত্ব কোথা থেকে লাভ করা যায় ? শ্রীকৃষ্ণ– ভগবান– অথবা তাঁর প্রতিনিধির কাছ থেকে।  যেমন, বৃন্দাবনের ষড়্ গোস্বামীগণ।  তাঁরা ছিলেন ভগবানের প্রতিনিধি।  তাই তাঁরা হচ্ছেন, এই জ্ঞান লাভের এক নির্ভরযোগ্য সূত্র।  তেমনই, ভগবানের যথার্থ প্রতিনিধি বা তাঁর অবতারের কাছ থেকে এই জ্ঞান লাভ করা যায়।  তাঁরা কখনই বলেন না, “আমি ভগবান।” পক্ষান্তরে তাঁরা বলেন, “আমি ভগবানের দাস। ” সেটিই ভগবানের প্রতিনিধির যোগ্যতা।  তিনি কখনও বলেন না, “আমি ভগবান”।  তিনি সব সময় বলেন, “আমি ভগবানের দাস,” অথবা “আমি ভগবানের সেবক। ” তিনিই ভগবানের যথার্থ প্রতিনিধি।

তাই তাঁর কাছ থেকে বিনীতভাবে আমাদের শ্রবণ করতে হবে।  স্থানে-স্থিত্বা– স্থানে-স্থিত্বা কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘স্বস্থানে স্থিত হয়ে’।  যেমন, তোমরা ভগবদ্গীতা শ্রবণ করছ। তোমরা কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ কেরানী।  তোমরা কে কি, তাতে কিছু আসে যায় না।  তোমাদের বৃত্তি যাই হোক না কেন, তোমাদের জাতি যাই হোক্ না কেন, তোমাদের ধর্ম যাই হোক না কেন, তাতে কিছু আসে যায় না।  ভগবদ্গীতার বাণী আহরণ করার ক্ষেত্রে সেইগুলি কেন প্রতিবন্ধক নয়।  তাতে কোন ক্ষতি নেই।  সেই জ্ঞান তোমরা লাভ করতে পারবে।  তুমি যদি খ্রিস্টান হও, তা হলে তুমি সেই জ্ঞান লাভ করে আরও ভাল খ্রিস্টান হতে পারবে, আরও ভাল আমেরিকান হতে পারবে।  আমরা আমেরিকানদের ভারতীয় করতে চাই না, কিংবা ভারতীয়দেরও আমেরিকান বানাতে চাই না, অথবা খ্রিস্টানদের হিন্দু বানাতে চাই না।  সেটি আমাদের উদ্দেশ্য নয়।  আমরা কেবল ভগবত্তত্ত্ব-বিজ্ঞান দান করছি– কৃষ্ণতত্ত্ব-বিজ্ঞান দান করছি– কৃষ্ণভাবনার অমৃত বিতরণ করছি।

এই জ্ঞান যে-কেউই লাভ করতে পারে।  যেমন, তোমরা যখন কলেজে যাও, তখন কেউ প্রশ্ন করে না যে, তুমি আমেরিকান না ভারতীয়, না আফ্রিকান।  স্কুলে, কলেজে, অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকলেই জ্ঞান লাভ করতে পারে।  তেমনই, এই কৃষ্ণভাবনার অমৃত ভগবত্তত্ত্ব-বিজ্ঞান যে-কেউই লাভ করতে পারে।  স্থানে স্থিতা- আমাদের বৃত্তি পরিবর্তন করার কোন প্রয়োজন নেই।  শ্রুতিগতাম্ তনুবাক্ মনোভিঃ– কেবলমাত্র কায়, মন এবং বাক্যের দ্বারা যথার্থ বুদ্ধিমত্তা সহকারে নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে বিনীতভাবে শ্রবণ করার মাধ্যমে এই জ্ঞান করতে হয়।

তোমরা যদি তা কর, তা হলে–প্রায়শ অজিতঃ জিতোহসি ত্রৈলোক্যাম্–অজিত যে ভগবান, তাঁকে তোমরা জয় করতে পারবে।  ভগবানের আরেক নাম হচ্ছে অজিত।  অর্থাৎ, যিনি হচ্ছেন অজেয়।  যেহেতু সকলেই ভগবানের অধীন তাই কে তাঁকে পরাভূত করবে ? ভগবানের কি কথা– আমরা ভগবানের শক্তিকে পর্যন্ত জয় করতে পারি না।  আমরা সকলেই এখন ভগবানে মায়া-শক্তির অধীন।  সেই মায়া-শক্তিকে পর্যন্ত আমরা জয় করতে পারি না।  সুতরাং আমরা ভগবানকে জয় করব কি করে ? তা কখনই সম্ভব নয়।  তাই ভগবানের আরেক নাম অজিত।  কিন্তু সেই অজিত যে ভগবান, তিনি কখনও কখনও পরাজিত হন।  কিভাবে ? বিনীতভাবে ভগবানের কথা শ্রবণ করে এবং যথাযথভাবে সেই জ্ঞান লাভ করার চেষ্টা করার মাধ্যমে।  সেটিই হচ্ছে পন্থা।

ভগবান খ্রিস্টান নন, অথবা হিন্দু নন, অথবা মুসলমান নন, অন্য কিছু নন।  ভগবান হচ্ছেন ভগবান।  তোমরা যদি ভগবদ্গীতা বিনীতভাবে কেবল শ্রবণ কর এবং বুদ্ধির দ্বারা তাঁর সেই নির্দেশ পালন করার চেষ্টা কর, তা হলেই তোমরা ভগবানকে জানতে পারবে।  তাঁকে এত ভালভাবে জানতে পারবে যে, অজিত যে ভগবান, তিনিও তোমার কাছে পরাভূত হবেন।  তোমরা তাঁকে জয় করতে পারবে কেবলমাত্র এই সরল পন্থার মাধ্যমে।  তাই শ্রবণের এত গুরুত্ব এবং তাই তা হচ্ছে ভক্তিযোগের প্রাথমিক স্তর।  তারপর তুমি যা জানবে, তা যদি তুমি কীর্তন কর, তা হলে এই পারমার্থিক জ্ঞানের পথে তুমি উন্নতি সাধন করতে পারবে।  আজ এখানে আমরা যা আলোচনা করলাম–তা যদি যথাযথভাবে তোমরা শ্রবণ করে থাক এবং তা যদি তোমাদের বন্ধু-বান্ধবদের কাছে বা আত্মীয়-স্বজনদের কাছে তোমরা পুনরাবৃত্তি কর– তা হলে তোমরা সেই জ্ঞানে অধিষ্ঠিত হবে।  তাকে বলা হয় কীর্তন। শ্রবণম্-কীর্তনম্–শ্রবণ এবং কীর্তন।

দিন-রাত আমরা কত কিছু শ্রবণ করছি।  টেলিভিশন, রেডিওতে, খবরের কাগজে এত কিছু আমরা শ্রবণ করছি।  কিন্তু সেই শ্রবণ আমাদের পারমার্থিক জ্ঞান লাভে কোন সাহায্য করবে না। শ্রবণম্ কীর্তনম্ বিষ্ণুঃ- বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের কথা শ্রবণ করতে হবে।  কৃষ্ণকীর্তনম্– কীর্তনাৎ এব কৃষ্ণস্য মুক্তসঙ্গ পরং-ব্রজেৎ।  তোমরা যদি কেবল তাই কর– তা হলে তোমরা এই জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত হবে, এবং তোমরা পরম প্রকৃতিতে ভগবানের রাজ্যে উন্নীত হবে।  এই যুগের পন্থা হচ্ছে– শ্রবণ এবং কীর্তন।  অন্য কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পারমার্থিক জীবনের সিদ্ধি লাভ করা সম্ভব নয়।  তোমরা যথাযথভাবে যজ্ঞানুষ্ঠান করতে পার না।  তোমরা মননের মাধ্যমে বা ধ্যান করার মাধ্যমে জ্ঞান লাভ করতে পার না। তোমরা অষ্টাঙ্গ যোগ অভ্যাস করতে পার না।  কিছুই করতে পার না।  তোমরা কেবল বিনীতভাবে ভগবত্তত্ত্ব-বিজ্ঞান নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে শ্রবণ করতে পার।  সেটি করার চেষ্টা কর এবং তাতেই সিদ্ধিলাভ হবে।

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,943 hits