আমরা পরমেশ্বর ভগবান আদি পুরুষ গোবিন্দের আরাধনা করি। কিছুক্ষণ আগে যে গানটি আমরা গাইলাম– “গোবিন্দমাদি পুরুষং ত্বমহং ভজামি” সেই সঙ্গীত তাঁর কাছে, পৌঁছুচ্ছে; তিনি তা শুনছেন। কেউ বলতে পারে না যে, তিনি তা শুনছেন না। বিশেষ করে এই বিজ্ঞানের যুগে, যখন আমরা হাজার হাজার মাইল দূরের বার্তা রেডিওর মাধ্যমে শুনতে পাই, তখন আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি যে, গোবিন্দ, শ্রীকৃষ্ণ আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা অবশ্যই শুনতে পান।
আমরা যেমন হাজার হাজার মাইল দূর থেকে প্রেরিত দৃশ্য টেলিভিশনের মাধ্যমে দেখতে পাই, তেমনই আমরা যদি নিজেদের যথাযথভাবে তৈরী করতে পারি, তা হলে আমরা আমাদের হৃদয়ে নিরন্তর গোবিন্দকে দর্শন করতে পারি। সেই কথা ব্রহ্মসংহিতায় (৫/৩) বলা হয়েছেঃ
প্রেমাঞ্জনচ্ছুরিতভক্তিবিলোচনেন সন্ত সদৈব….।
আপনার হৃদয়ে একটি টেলিভিশন রয়েছে, এমন নয় যে, সেই টেলিভিশন-সেট্টি আপনাদের কিনতে হবে। — সেটি আপনাদের হৃদয়েই রয়েছে, এবং ভগবানও সেখানে রয়েছেন। আপনারা তাঁকে দেখতে পারেন, আপনারা তাঁর কথা শুনতে পারেন, আপনারা তাঁর সাথে কথা বলতে পারেন–যদি ঠিকমতো সেই যন্ত্রটিকে কার্যকরী করে তুলতে পারেন। তার সেই কার্যকরী করে তোলার পন্থাটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত।
এখন, সেই টেলিভিশনটি সারাতে হলে একজন সুদক্ষ কারিগর দরকার। তেমনই, কৃষ্ণভাবনামৃত লাভ করতে হলেও একজন সুদক্ষ পথপ্রদর্শকের সাহায্য প্রয়োজন। তখন হৃদয়ের যন্ত্রটি কার্যকর হবে এবং তখন আপনারা শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন করতে সক্ষম হবেন। সেটিই হচ্ছে যোগের পূর্ণতা।
শাস্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে সেই পূর্ণতা লাভ করা যায়। সাধু-শাস্ত্র-গুরুবাক্য চিত্তেতে করিয়া ঐক্যঃ পারমার্থিক জ্ঞান পূর্ণরূপে লাভ করা যায় এই তিনটি সমান্তরাল পথের অনুবর্তী হওয়ার মাধ্যমে– সাধু (ভগবত্তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষ), শাস্ত্র (প্রামাণিক বৈদিক গ্রন্থ) এবং গুরু (কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা পথপ্রদর্শক)। রেল লাইনে আমরা দেখতে পাই দুটি সমান্তরাল লাইন রয়েছে এবং সেই লাইন দুটি যদি ঠিক থাকে, তা হলে রেলগাড়িটি খুব স্বচ্ছন্দের তার উপর দিয়ে গন্তব্যস্থলের দিকে এগিয়ে যায়। কৃষ্ণভাবনামৃতে অনুরূপ তিনটি সমান্তরাল পথ রয়েছে, সাধু-সঙ্গ, বৈদিক শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সদ্গুরুর চরণাশ্রয় গ্রহণ। আপনারা যদি আপনাদের কৃষ্ণভাবনার গাড়িটি এই তিনটি সমান্তরাল পথের উপর রাখেন, তা হলে তা নির্বিঘ্নে আপনাদের শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিয়ে যাবে।
এখন, ভগবদ্গীতায় পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই তাঁর পরিচয় প্রদান করেছেন। কিন্তু আপনি যদি বলেন, “শ্রীকৃষ্ণ যে এই কথাগুলি বলেছেন তা আমি বিশ্বাস করব কি করে ? কেউ হয়তো শ্রীকৃষ্ণের নাম করে এগুলি লিখেছে। ” না। যেহেতু সমস্ত মহাত্মারা ভগবদ্গীতাকে স্বীকার করেছেন, তাই আমাদেরও তা মেনে নিতে হবে। ব্যাসদেব, নারদ থেকে শুরু করে রামানুজাচার্য, মধ্বাচার্য, বিষ্ণুস্বামী, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রমুখ সমস্ত আচার্যবর্গ স্বীকার করেছেন–“হ্যাঁ, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখ-নিঃসৃত বাণী। ” সুতরাং এটিই হচ্ছে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রামাণিকতার প্রমাণ যে, সমস্ত সাধুরা ভগবদ্গীতাকে শাস্ত্ররূপে স্বীকার করেছেন, তাই এটি শাস্ত্র। সেটিই হচ্ছে প্রমাণ।
এটি সাধারণ জ্ঞান। আইনজ্ঞরা যদি কোন গ্রন্থকে আইনের গ্রন্থ বলে স্বীকার করে নেন, তা হলে আমাদের বুঝতে হবে যে, সেটি প্রমাণিক আইনের গ্রন্থ। আপনারা তখন বলতে পারেন না, “কেন আমি এই বইটিকে আইনের বই বলে মেনে নেব ?” তার প্রমাণ হচ্ছে যে, আইনজ্ঞরা এটিকে স্বীকার করে নিয়েছেন। তেমনি চিকিৎসকেরা যদি কোন গ্রন্থকে প্রামাণিক বলে মেনে নেন, তা হলে আমাদেরও বুঝতে হবে যে, সেটি যথার্থই চিকিৎসা শাস্ত্রের গ্রন্থ। ঠিক সেইভাবেই, যেহেতু সাধুরা ভগবদ্গীতাকে শাস্ত্র বলে মেনে নিয়েছেন, তাই আমরা তা শাস্ত্র বলে মেনে নিতে অস্বীকার করতে পারি না। সুতরাং এগুলি হচ্ছে দুটি পথ- সাধু এবং শাস্ত্র। তার পরের পথটি হচ্ছেন গুরু। গুরু কে? যিনি শাস্ত্রের অনুসরণ করেন এবং শাস্ত্র বিশ্লেষণ করেন, তিনিই হচ্ছেন গুরু। সাধু শাস্ত্রকে প্রতিপন্ন করেন, আর গুরু শাস্ত্রের অণুসরণ ও বিশ্লেষণ করেন। সুতরাং, সাধু, শাস্ত্র এবং গুরু সর্বদই একমত। শাস্ত্রে যা বলা হয়েছে, সাধুরা তা স্বীকার করেন, আর শাস্ত্রে যা বলা হয়েছে, গুরু তা অনুসরণ এবং বিশ্লেষণ করেন, তিনি কেবল শাস্ত্রের কথাই বলেন। শাস্ত্র হচ্ছে মাধ্যম, ঠিক যেমন আদালতে আইনের বই হচ্ছে মাধ্যম। তাই সাধু, শাস্ত্র এবং গুরু– আমরা যখন এই তিনটি সমান্তরাল পথ অনুসরণ করি, তখন আমাদের জীবন সার্থক হয়।
ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের প্রথমেই শ্রীকৃষ্ণ যোগ সম্বন্ধে বলেছেন। প্রথম ছটি অধ্যায়ে তিনি জীবের স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন। যতক্ষণ পর্যন্ত তা না জানা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত যোগ বা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পন্থা শুরু হতে পারে না। যেমন আপনি কোন অফিসে কাজ করছেন। আপনার পদটি যতক্ষণ পর্যন্ত না পাকা হচ্ছে– যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি জানতে পারছেন কি কাজ আপনাকে করতে হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি কোন কিছুই ভালমতো করতে পারেন না। টাইপিস্ট, কেরানি, পিয়ন– এরা সকলেই এদের কাজ খুব ভালভাবে করে চলেছে, কারণ তারা জানে তাদের কর্তব্য কি। তাই যোগ অনুশীলন করতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত হতে হবে, এবং তা ভগবদ্গীতার প্রথম ছটি অধ্যায়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
সুতরাং, ‘যোগ’ কথাটির অর্থ হচ্ছে স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত হয়ে কর্ম করা। তার গ্রহণ স্তরটি হচ্ছে ইন্দ্রিয় সংযম (যোগমিন্দ্রিয় সংযমঃ)। সকলেই তাদের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তি সাধনের প্রচেষ্টায় ব্যস্ত। দোকানদারেরা ব্যস্ত, গাড়ির চালকেরা ব্যস্ত- সকলেই অত্যন্ত ব্যস্ত। তাদের এই ব্যস্ততা কিসের জন্য ? তাদের কার্যকলাপ পুঙ্খানুপঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তি সাধন করা। সকলেই তাদের এই ইন্দ্রিয়-তৃপ্তি সাধনের চেষ্টা করছে– সেইি হচ্ছে জড়জাগতিক জীবন। আর পারমার্থিক জীবন বা যোগ মানে হচ্ছে ইন্দ্রিয় সংযম করা এবং আত্মরূপে আমাদের স্বরূপ উপলব্ধি করা।
পারমার্থিক জীবনের শুরু তখনই হয়, যখন অমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, “আমি কে ? আমি এখানে কেন এসেছি ? কেন আমি নানাভাবে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছি ? তার কি কোন নিরাময় রয়েছে ?”এই প্রশ্নগুলি যখন মনে জাগে, তখন আমাদের পারমার্থিক জীবনের শুরু হয়। আর মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে পাওয়া। পশুরা ইন্দ্রিয় তৃপ্তি ছাড়া আর কিছু জানে না। তাদের কোন রকম বোধশক্তি নেই, তাদের চেতনা উন্নত নয়। যেমন, গ্রীনলেক পার্কে অনেকগুলো হাঁস রয়েছে। যখন কেউ সেখানে কিছু খাবার নিয়ে যায়, তখন তারা সেখানে ছুটি এসে চিৎকার করতে থাকেঃ “প্যাঁক, প্যাঁক, প্যাঁক। ” আর তারপর খাওয়া হয়ে গেলে, তারা যৌনক্রীড়ায় লিপ্ত হয়। এটিই তাদের জীবন। কুকুর এবং বেড়ালের জীবনও সেই রকম, আর মানুষও যদি প্রশ্ন না করে, “আমি কে ”, তাহলে তার জীবনও সেই রকমই। কেউ যদি কেবল তার ইন্দ্রিয়ের আবেদনগুলির দ্বারাই পরিচালিত হয়, তা হলে সে কুকুর বেড়ালের চেয়ে কোন অংশে উন্নত নয়।
তাই ভগবদ্গীতায় প্রথম ছটি অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ বিশ্লেষণ করেছেন যে, জীবন হচ্ছে এক-একটি চেতনার স্ফুলিঙ্গ। সেই স্ফুলিঙ্গটি কোথায়, তা খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন, কারণ তা অত্যন্ত ক্ষুদ্র। কোন অণুবীক্ষণ যন্ত্রের দ্বারা তাকে দেখা যায় না। কিন্ত তা আপনাদের শরীরে রয়েছে। তা আপনাদের শরীরে রয়েছে বলেই আপনারা চলাফেরা করছেন, আপনারা কথা বলছেন, আপনারা পরিকল্পনা করছেন– আপনারা এত কিছু করছেন সেই চেতনের স্ফুলিঙ্গটির প্রভাবেই।
আমরা পরামাত্মার অতি ক্ষুদ্র অংশ, ঠিক যেমন সূর্যের এক-একটি রশ্মি হচ্ছে সূর্যের অতি ক্ষুদ্র অংশ। সূর্য-রশ্মিগুলি একত্রিত হয়ে সূর্য-কিরণ প্রকাশিত হয়। তেমনই, আমরা হচ্ছি ভগবানের অতি ক্ষুদ্র অংশ, যেহেতু আমরা ভগবানের বিভিন্ন অংশ, তাই আমাদের মধ্যেও ভগবানের গুণগুলি রয়েছেঃ চিন্তা করার ক্ষমতা, অনুভব করার ক্ষমতা, ইচ্ছা করার ক্ষমতা, সৃষ্টি করার ক্ষমতা– সব কিছু। আপনাদের মধ্যে যা কিছু রয়েছে, তা ভগবানের মধ্যেও রয়েছে। তাই যেহেতু আমাদের সকলেরই ব্যক্তিত্ব রয়েছে, তাই ভগবানের ব্যক্তিত্ব রয়েছে। অতি সীমিতভাবে আমার মধ্যে কত গুণ রয়েছে, আর ভগবানের মধ্যেও সেই সমস্ত গুণগুলিই রয়েছে-অন্তহীনভাবে। এটিই হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃতের বিজ্ঞান।
আমরা ক্ষুদ্র, অতি নগন্য, কিন্তু তবুও আমাদের মধ্যে কত গুণ রয়েছে, কত আকাক্সক্ষা রয়েছে, কত কার্যকলাপ রয়েছে, কত বুদ্ধি রয়েছে। তা হলে কল্পনা করে দেখুন ভগবানের কামনা, কার্যকলাপ এবং বুদ্ধিমত্তা কি রকম হতে পারে। সুতরাং গুণগতভাবে ভগবান এবং জীব এক, কিন্তু আয়তনগতভাবে আমরা ভিন্ন। তিনি মহৎ, আমরা ক্ষুদ্র। তিনি অসীম, কিন্তু আমরা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র।
স্ফুলিঙ্গ যখন আগুনের মধ্যে থাকে তখন তা খুব উজ্জ্বলভাবে জ্বলতে থাকে, কিন্তু তা যখন আগুণ থেকে বেরিয়ে আসে তখন তা নিভে যায়। তেমনই আমরা যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের স্ফুলিঙ্গসদৃশ, তাই আমরা যখন তাঁর সঙ্গে যুক্ত থাকি, তখন আমাদের জ্যোতি প্রকাশ পায়। আর তার থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়লে আমাদের জ্যোতি নিষ্প্রভ হয়ে যায় অথবা আমরা আচ্ছিাদিত হয়ে পড়ি। চিৎ-স্ফুলিঙ্গ কখনও নিভে যায় না। তা যদি নিভে যেত, তা হলে আমাদের চেতনা প্রকাশ পাচ্ছে কি করে ? না, তা নিভে যায় না; তা আচ্ছাদিত হয়ে পড়ে। আগুন যখন আচ্ছাদিত থাকে, তখন তার তাপ অনুভব করা যায়, যদিও সরাসরিভাবে আগুনকে দেখা যায় না। তেমনই, চিৎ-স্ফুলিঙ্গ যখন জড় আবরণ দেহের দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে, তখন সেই স্ফুলিঙ্গ প্রভাব অনুভব করা যায়– চেতনা-সমন্বিত কার্যকলাপ– কিন্তু সরাসরিভাবে স্ফুলিঙ্গটি দেখা যায় না। সরাসরিভাবে চিৎ-স্পুলিঙ্গটি দেখতে হলে, আপনাদের চিন্ময় প্রকৃতি আবরণ মুক্ত করতে হলে, আপনাদের যোগ অনুশীলন করতে হবে।
ভগবদ্গীতার সপ্তম অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ যোগ পদ্ধতি সম্বন্ধে বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ময্যাসক্তমনাঃ পার্থ যোগং যুঞ্জন্মদাশ্রয়। আপনাদের মনকে সর্বদা শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় মগ্ন রাাখতে হবে। সেই যোগ পদ্ধতি আমরা কৃষ্ণভাবনামৃত রূপে পরিবেশন করছি। সেটি কোন কঠিন কাজও নয়। শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সুন্দর, পরম আকর্ষক এবং তাঁর নানা রকম দিব্য কার্যকলাপ রয়েছে। বৈদিক শাস্ত্র শ্রীকৃষ্ণের লীলাবিলাসের কাহিনীতে পূর্ণ, আর ভগবদ্গীতা শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে পূর্ণ। ভগবান যে মহৎ, কেবল সেই কথা জানাটি হচ্ছে শান্তরসে ভগবানকে জানা। ভগবান যে কত মহৎ, তা জনতে হলে আপনাদের উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে উন্নীত হতে হবে। অবশ্য শ্রীকৃষ্ণ যে কত মহৎ, তা পূর্ণরূপে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, কারণ আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি সর্বদাই অসম্পূর্ণ বা সীমিত, তবুও যতদূর সম্ভব আমাদের চেষ্টা করতে হবে। আপনারা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কার্যকলাপ সম্বন্ধে, তাঁর ভগবত্তা সম্বন্ধে শ্রবণ করতে পারেন এবং সেই সম্বন্ধে কোন সন্দেহ থাকলে প্রশ্ন করতে পারেন, এমন কি তর্কও করতে পারেন এবং তারপর বিচার করতে পারেন। তখন আপনারা নিঃসন্দেহে জানতে পারেন ভগবান কি ?
তাই যথার্থ যোগ হচ্ছে, ময্যাসক্তমনাঃ- নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের কথা চিন্তা করা। ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে শ্রীকৃষ্ণ বিশ্লেষণ করেছেন, যিনি সর্বদাই তাঁর চিন্তায় মগ্ন, তিনিই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ যোগী। আপনাদের দেশে যোগ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে, কিন্তু সর্বোত্তম যোগী যে কে, তা অপনারা জানেন না। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্ গতেনান্তরাত্মনা- অর্থাৎ, “হাজার হাজার যোগীদের মধ্যে যিনি নিরন্তর তাঁর হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণকে দর্শণ করছেন, তিনিই হচ্ছেন সর্বোত্তম যোগী।”
তাই আপনাদের সেই সর্বোত্তম যোগ-প্রণালী গ্রহণ করতে হবে, যার বর্ণনা করে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ময্যাসক্তমনাঃ–“তোমার মনকে আমার প্রতি আসক্ত করো। ” মন হচ্ছে আসক্তির কেন্দ্র, এবং সাধারণত আমরা কোন বিশেষ ব্যক্তির প্রতি আসক্ত হই– কোন ছেলে বা কোন মেয়ের প্রতি আসক্ত হই। কিন্তু নির্বিশেষবাদে কোন ‘কিছুর’ প্রতি আসক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তাই যোগের শুরু হয় মনকে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আসক্ত করার মাধ্যমে, নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের কথা চিন্তা করার মাধ্যমে, যা পরিণামে কৃষ্ণপ্রেমে পর্যবসিত হয়। যেমন (একটি ছবির দিকে দেখিয়ে), এখানে আমরা এই ছবিটিতে দেখতে পাচ্ছি রাধারাণী কৃষ্ণপ্রেমে আকুল হয়ে শ্রীকৃষ্ণকে মালা নিবেদন করছেন, আর শ্রীকৃষ্ণ একটি বাঁশি বাজাচ্ছেন। আপনারা এই ছবির কথা নিরন্তর চিন্তা করতে পারেন; তা হলে মনের সেই অবস্থাকে বলা হয় সমাধি। নির্বিশেষ কোন কিছুর, শূণ্য কোন কিছুর চিন্তা করার কি প্রয়োজন ? আপনারা যদি শূণ্যের চিন্তা করার চেষ্টা করেন, তা হলে প্রথম থেকেই কোন আলো বা কোন রঙ ইত্যাদির চিন্তা আপনাদের মাথায় আসবে। মনকে সব সময়ই কিছু-না-কিছুর কথা চিন্তা করতে হবে। কোন রূপের চিন্তা আপনারা পরিহার করবেন কি করে ? সেটি সম্ভব নয়। তাই পরম রূপ শ্রীকৃষ্ণের চিন্তাতেই মনকে একাগ্রীভূত করুন না কেন ?
ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ– পরম ঈশ্বর ভগবান হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর একটি শরীর রয়েছে। কি রকম শরীর ? সচ্চিদানন্দ, অবিনশ্বর, পূর্ণ জ্ঞানময় এবং পূর্ণ আনন্দময় শরীর। আমাদের মতো জড় শরীর নয়। আমাদের শরীর হচ্ছে অজ্ঞানময়, দুঃখময় এবং নশ্বর–শ্রীকৃষ্ণের শরীরের ঠিক বিপরীত। তাঁর শরীর নিত্য, কিন্তু আমার এই শরীরটি দুঃখময়। সব সময়ই আমরা কোন-না কোন রকম ক্লেশ ভোগ করছি। মাথা ব্যথা, দাঁত ব্যথা, অমুক ব্যথা, তমুক ব্যথা। কেউ-না-কেউ সর্বদাই আমাদের দুঃখ দিচ্ছে, আমরা প্রচন্ড তাপ অনুভব করছি– কত রকমের দুঃখ আমরা নিরন্তর অনুভব করছি। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের রূপ, শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ সৎ, চিৎ এবং আনন্দময়।
তাই কৃষ্ণভাবনামৃতের অর্থ হচ্ছে নিরন্তর শ্রীকৃষ্ণের নাম, রূপ, লীলা ইত্যাদির চিন্তা করা। কিভাবে আমরা এই যোগ, কৃষ্ণভাবনামৃতের অনুশলীন করতে পারি ? ময্যাসক্তমনাঃ পার্থ যোগ যুঞ্জন্মদাশ্রয়ঃ। মদাশ্রয় মানে হচ্ছে, “আমার সঙ্গে যে যুক্ত রয়েছে তার আশ্রয় গ্রহণ করা। ” যে মুহূর্তে আপনারা শ্রীকৃষ্ণের কথা চিন্তা করবেন, তখনই আপনারা সরাসরিভাবে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত হবেন। কিন্তু আপনারা যদি কৃষ্ণতত্ত্ববেত্তা সদ্গুরুর আশ্রয় গ্রহণ না করেন, তা হলে দীর্ঘকাল ধরে শ্রীকৃষ্ণের চিন্তায় মনকে নিবদ্ধ করা যায় না; তখন মনের সেই একাগ্রতা হবে সাময়িক। তাই আপনারা যদি কৃষ্ণভাবনায় মনকে নিরন্তর একাগ্র করতে চান, তা হলে এমন কারও কাছ থেকে আপনাদের শ্রবণ করতে হবে, যিনি শ্রীকৃষ্ণকে জানেন এবং তাঁর নির্দেশ অনুসারে আমাদের জীবন গড়ে তুলতে হবে। তা হলেই যথাযথভাবে আপনারা সেই যোগ অনুশীলন করতে পারবেন।
আমি আগেই বলেছি, যোগের পূর্ণতার কথা শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতার ষষ্ঠ অধ্যায়ের শেষ শ্লোকে বর্ণনা করেছেন। যোগিনামপি সর্বেষাং মদ্ গতেনান্তরাত্মনা–“যে নিরন্তর আমার
কথা চিন্তা করছে, সে-ই হচ্ছে সর্বোত্তম যোগী। তাই শ্রীকৃষ্ণকে আমাদের হৃদয়ে ধারণ করতে হবে, নিরন্তর তাঁর কথা চিন্তা করতে হবে। কিভাবে ? শ্রীকৃষ্ণ তার বিশ্লেষণ করে বলেছেন–
ময্যাসক্তমনাঃ পার্থ যোগং যুঞ্জন্মদাশ্রয়ঃ।
অসংশয়ং সমগ্রং মাং যথা জ্ঞাস্যসি তচ্ছৃণু ॥
(ভগবদ্গীতা ৭/১)
“আমার আশ্রয়ে, আমার প্রতিনিধির আশ্রয়ে নিরন্তর আমার কথা চিন্তা কর। তা হলে তুমি নিঃসংশয় হয়ে আমাকে যথাযথাভাবে জানতে পারবে, এবং তখন তোমার জীবন সার্থক হবে। ” ‘অসংশয়ং’ মানে হচ্ছে, সবরকম সন্দেহরহিত হয়ে। আপনাদের মনে যদি শ্রীকৃষ্ণের ভগবত্তা সম্বন্ধে কোন সন্দেহ থাকে, তা হলে প্রশ্ন করুন এবং সেই প্রশ্নের মাধ্যমে তাঁকে জানার চেষ্টা করুন। শ্রীকৃষ্ণ যে পরমেশ্বর ভগবান, সেই সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনাদের মনে যদি কোন সন্দেহ থাকে, তা হলে গুরুদেবকে প্রশ্ন করে আপনারা সেই সন্দেহের নিরসন করতে পারেন।
কৃষ্ণভাবনামৃত বা সর্বশ্রেষ্ঠ যোগ-প্রণালীর অনুশীলন করুন, তা হলে আপনারা নিঃসন্দেহে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারবেন এবং তখন আপনাদের জীবন সার্থক হবে। অসংখ্য ধন্যবাদ!