আত্মা এবং তার দেহ


যথাজ্ঞস্তমসা যুক্ত উপাস্তে ব্যক্তমেব হি
ন বেদ পূর্বমপরং নষ্টজন্মস্মৃতিস্তথা ॥
“নিদ্রিত মানুষ যেমন তার স্বপ্নে দৃষ্ট দেহকে তার স্বরূপ বলে মনে করে সেই অনুসারে কার্য করে, ঠিক তেমনই জীব তার পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে লব্ধ এই জড় দেহটিকে তার স্বরূপ বলে মনে করে এবং তার অতীত এবং ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে পূর্ণরূপে অজ্ঞ থাকে। ”
(শ্রীমদ্ভাগবত ৬/১/৪৯)
অজ্ঞান যে কিভাবে জীবের চেতনাকে আচ্ছাদিত করে রাখে, এটি তার একটি খুব সুন্দর দৃষ্টান্ত।  আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখন আমরা আমাদের সম্বন্ধে আর সব কিছু ভুলে যাই– আমরা ভুলে যাই যে, আমি শ্রীযুক্ত অমুক, আমি অমুক দেশের অমুক স্থানের অধিবাসী, আমার ব্যাঙ্কে এত টাকা রয়েছে ইত্যাদি।  আমরা তখন সব কিছু ভুলে যাই।  আর তারপর আমরা যখন ঘুম থেকে জেগে উঠি, তখন সেই স্বপ্নটির কথা ভুলে যাই।  প্রতিদিনই আমাদের এই অভিজ্ঞতাটি হচ্ছে।  তবে আমাদের জাগ্রত অবস্থাতেই হোক্ বা স্বপ্নাবস্থাতেই হোক্, আমরা আমাদের নিজেদের কার্যকলাপ দর্শন করি।  স্বপ্ন দেখার সময় আমরা আমাদের কার্যকলাপের দর্শক এবং ততাকথিত জাগ্রত অবস্থাতেও আমরা আমাদের কার্যকলাপের দর্শক।  তাই আমরা, অর্থাৎ আমাদের আত্মা, যে এই এই অভিজ্ঞতাগুলি দর্শন করছে, সে কিন্তু সর্ব অবস্থাতেই অপরিবর্তনীয় থাকে, কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন হয় এবং আমরাও অতীতের সব কিছু ভুলে যাই।

তেমনই, আমরা মনে করতে পারি না যে, আমাদের পূর্ব জন্মে আমরা কি ছিলাম।  আর পরবর্তী জন্মেই বা আমরা কি হব, তা-ও আমরা জানি না।  কিন্ত এটা সত্য যে, আত্মারূপে আমরা অবিনশ্বর–নিত্য।  অতীতে আমাদের অস্তিত্ব ছিল, বর্তমানে আমাদের অস্তিত্ব আছে এবং ভবিষ্যতেও আমাদের অস্তিত্ব থাকবে।  সেই কথা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্গীতায় (২/১২) বিশ্লেষণ করেছেনঃ “হে অর্জুন! তুমি, আমি এবং এই যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের সামনে যারা সমবেত হয়েছে, আমরা সকলেই পূর্বেও ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব।” এটিই হচ্ছে পারমার্থিক জীবনের প্রাথমিক জ্ঞান–“আমি নিত্য, শাশ্বত– আমার কখনও বিনাশ হবে না”–এই জ্ঞান।

আত্মারূপে আমাদের জন্ম হয় না এবং মৃত্যুও হয় না, ( ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ)।  আমাদের এই জড় দেহটি ধ্বংস হলেও আমাদের কখনও বিনাশ হয় না (ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে)।  দেহটির বিনাশ প্রতিনিয়তই হচ্ছে।  আমাদের শৈশবের দেহটি বিনষ্ট হয়ে গেছে, এখন সেই দেহটির আর কোন অস্তিত্বই নেই।  আমাদের যৌবনের দেহটিও বিনষ্ট হয়ে গেছে, সেটিকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।  ঠিক তেমনই, আমাদের বর্তমান দেহটিও বিনষ্ট হয়ে যাবে, এবং তখন আমরা আরেকটি দেহ প্রাপ্ত হব (ততা দেহান্তরপ্রাপ্তিঃ)।

আত্মা যখন এক দেহ থেকে অন্য আরেক দেহে দেহান্তরিত হয়, তখন স্থুল দেহটি নষ্ট হয়ে যায়।  এই স্থুল দেহটি জড় পদার্থ দিয়ে গঠিত, এবং যা কিছু জড়, তার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।  সেটিই হচ্ছে জড় পদার্থের ধর্ম।  কিন্তু আত্মার কখনও বিনাশ হয় না।

এইভাবে আমাদের বিভিন্ন শরীরের দেহান্তর হচ্ছে।  বিভিন্ন শরীর রয়েছে কেন ? কেননা জীব বা আত্মা, প্রকৃতির বিভিন্ন গুণের সংস্পর্শে আসে এবং বিভিন্ন গুণের প্রভাব অনুসারে জীব বিভিন্ন রকমের স্থুল দেহ প্রাপ্ত হয়।

এইভাবে আমরা আমাদের পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে আমাদের বর্তমান শরীরটি প্রাপ্ত হয়েছি।  কর্মণা দৈবনেত্রেণ জন্তর্দেহোপপত্তয়ে–অর্থাৎ জীব তার পূর্বকৃত কর্ম অনুসারে বিশেষ বিশেষ শরীর প্রাপ্ত হয়।  আমাদের কর্ম অনুসারে প্রকৃতি আপনা থেকেই আমাদের উপযুক্ত শরীর দান করে।  যেমন, আমাদের রোগ হয়। প্রকৃতি নির্ধারণ করে।  তোমার এই রোগ হবে এবং তার ফলে তোমাকে কষ্ট পেতে হবে।  তেমনই, আমরা যতক্ষণ জড়া প্রকৃতির গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কর্ম করি, ততক্ষণ আমাদের এক দেহ থেকে আরেক দেহে দেহান্তরিত হতে হবেই।  প্রকৃতির নিয়ম এতই সুন্দরভাবে কাজ করে।

কিন্তু যখন আমরা অতি উন্নত মনুষ্য-জন্ম লাভ করি, তখন আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, “কেন আমি কষ্ট পাচ্ছি ?” আমরা যেহেতু মায়ার দ্বারা আচ্ছন্ন, তাই আমরা দুঃখকে সুখ বলে মনে করি।  ‘মায়া’ কথাটির অর্থ হচ্ছে যার অস্তিত্ব নেই।  আমরা মনে করছি যে, আমরা সুখ ভোগ করছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা দুঃখ ভোগ করছি।  এই জড় দেহটি আমরা প্রাপ্ত হই দুঃখ ভোগ করার জন্যই।  এই দেহটির জন্যই আমাদের দুঃখ-ভোগ করতে হয়।  হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা, প্রচন্ড গরম– এই অনুভূতিগুলি আমাদের এই দেহটি আছে বলেই।  কোন কোন বিশেষ অবস্থায় আমরা সুখ অনুভব করি।  কিন্তু ভগবদ্গীতায় (২/১৪) শ্রীকৃষ্ণ উপদেশ দিয়েছেনঃ
মাত্রাস্পর্শাস্তু কৌন্তেয় শীতোষ্ণসুখদুঃখদাঃ।
আগমাপায়িনোহনিত্যাস্তাংস্তিতিক্ষস্ব ভারত ॥
“এই দেহটিই হচ্ছে জড় সুখ এবং দুঃখের কারণ।  তারা আসে এবং চলে যায়, ঠিক যেভাবে ঋতুর পরিবর্তন হয়।  তাই সেই সম্বন্ধে বিচলিত না হয়ে সেইগুলি সহ্য করার চেষ্টা কর। ”

যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই জড় জগতে রয়েছি, ততক্ষণ সুখ এবং দুঃখ আসবে।  তাই সেইগুলির দ্বারা বিচলিত হওয়া উচিত নয়।  আমাদের প্রকৃত কর্তব্য হচ্ছে আত্মজ্ঞান লাভের চেষ্টা করা।  তা আমাদের করে যেতেই হবে এবং তা থেকে কখনই আমাদের বিরত হওয়া উচিত নয়।  আমাদের স্বরূপ সম্বন্ধে অবগত হওয়াই হচ্ছে মানব জীবনের উদ্দেশ্য।  যতক্ষণ এই জড় দেহটি রয়েছে, ততক্ষণ দুঃখ এবং তথাকথিত সুখ আসবে এবং চলে যাবে, কিন্তু আমাদের আসল কর্তব্য হচ্ছে সেই জ্ঞান লাভ করা, যার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, “আমার এই জড় শরীরটি আমার স্বরূপ নয়, আমার স্বরূপে আমি হচ্ছি চিন্ময় আত্মা।  এই জড় দেহটি আমি প্রাপ্ত হয়েছি আমার পূর্বকৃত কর্মের ফল অনুসারে। ”– সেটিই হচ্ছে যথার্থ জ্ঞান।

যথার্থ বিচক্ষণ মানুষ বিবেচনা করেন, “যেহেতু আমি হচ্ছি আত্মা এবং এই জড় দেহটি হচ্ছে আত্মার একটি আবরণ, তাই এক দেহ থেকে আরেক দেহে দেহান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি কি বন্ধ করা সম্ভব নয় ?”সেটিই হচ্ছে মনুষ্য-জীবন–এই জড় শরীরের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়র প্রচেষ্টা করার জীবন।

দুর্ভাগ্যবশত আজকের তথাকথিত সভ্য সমাজের মানুষেরা এই প্রশ্নগুলি করে না।  তারা উন্মাদের মতো তাদের ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধনে মত্ত, তাই তারা কান্ডজ্ঞানশূণ্য হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো কর্ম করে।  যে সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে–
নূনং প্রমত্তঃ কুরুতে বিকর্ম
যদিন্দ্রিয়প্রীতয় আপৃণোতি।
ন সাধু মন্যে যত আত্মনোহয়-
মসন্নপি ক্লেশদ আস দেহঃ ॥
(ভাঃ ৫/৫/৪)
“যে সমস্ত মানুষ তাদের ইন্দ্রিয়ের তৃপ্তিসাধনের জন্য কর্ম করে, তারা অবশ্যই উন্মাদ এবং তারা সব রকমের জঘন্য কর্মে লিপ্ত।  এইভাবে তারা এক দেহ থেকে আরেক দেহে দেহান্তরিত হওয়ার বন্দোবস্তটি পাকাপাকি করে রাখে এবং তার ফলে তারা নানা রকম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে। ”

আমরা বুঝতে পারি না যে, এই দেহটি সর্বদাই ‘ক্লেশদ’– তা সর্বদাই আমাদের দুঃখ দেয়।
সাময়িকভাবে আমরা মনে করতে পারি যে, আমরা সুখভোগ করছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই দেহটি হচ্ছে বেদনার আধার।  তার দৃষ্টান্তস্বরূপ এইটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে।  পূর্বে রাজা যখন কোন দুর্বৃত্তকে দন্ডদান করতেন, তখন তার হাত পা বেঁধে নদীর জলে ডোবান হত, তারপর যখন তার দম বন্ধ হয়ে মর-মর অবস্থা হত, তখন তাকে জল থেকে তুলে কিছক্ষণ শ্বাস নিতে দেওয়া হত এবং তারপর আবার তাকে জলে ডোবান হত।  এইভাবে দুর্বৃত্তদের শাস্তি দেওয়া হত।

তেমনই, এই জড় জগতে যে নগন্য সুখ আমরা ভোগ করছি, সেটি সেই দুর্বৃত্তের ক্ষণকালের জন্য নিঃশ্বাস নেওয়ার সুখেরই মতো।  এইভাবে এই জড় জগতে নিরন্তর গভীরভাবে দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করার মাঝে কেবল ক্ষণিকের জন্য যখন সেই দুঃখের নিবৃত্ত হচ্ছে, তখন আমরা সেটিকে সুখ বলে মনে করছি– সেটিই হচ্ছে জড় জগতের রীতি।

তাই শ্রীল সনাতন গোস্বামী, যিনি তাঁর পূর্ব জীবনে ছিলেন ভারতের মুসলমান নবাবের এক অত্যন্ত প্রতিপত্তিশালী মন্ত্রী, অত্যন্ত বিনীতভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে জিজ্ঞাসা করেন, “কে আমি, কেন আমায় জারে তাপত্রয় ?” এটিই হচ্ছে যথার্থ বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।  আমারা নিরন্তর দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করছি।  সেই দুঃখ-দুর্দশাগুলি তিন রকমের– দেহ এবং মন-জাত দুঃখ, অন্য জীব থেকে প্রাপ্ত দুঃখ এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়জাত দুঃখ।  আমরা এই দুঃখগুলি চাই না, কিন্তু সেইগুলি জোর করে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।  তাই যখন আমরা কোন সদ্গুরুর চরণাশ্রয় গ্রহণ করি, তখন আমাদের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, “আমি কেন দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছি ?”

প্রকৃতপক্ষে, এখন আমাদের অবস্থা একটি পশুর মতো, তাই আমরা এই প্রশ্নগুলি করতে পারি না।  পশুরা নানা রকম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে (সেকথা সকলেই জানে), কিন্তু পশু কখনও প্রশ্ন করতে পারে না, কেন সে দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছে।  কোন পশুকে যখন কসাইখানায় নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সে প্রশ্ন করতে পারে না, “আমাকে কেন জোর করে কসাইখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ?” কিন্তু কোন মানুষকে যখন হত্যা করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সে প্রবলভাবে প্রতিবাদ করেঃ “আমাকে কেন মারবার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ? কেন আমাকে মারা হবে ?” এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষ এবং পশুর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে যে, মানুষই কেবল প্রশ্ন করতে পারে, “কেন আমি কষ্ট পাচ্ছি ?”

আপনি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিই হোন অথবা পথের ভিক্ষুকই হোন, দুঃখ ভোগ আপনাকে করতেই হবে।  আপনি আপনার দেহটির জন্য কষ্ট পাচ্ছেন, এবং এমনভাবে কর্ম করছেন, যার ফলে আপনাকে আবার একটি জড় দেহ ধারণ করে আরো কষ্ট পেতে হবে।  আপনারা কষ্ট পাচ্ছেন, কারণ আপনাদের পূর্বজন্মে আপনারা ইন্দ্রিয় সুখ উপভোগের কার্যে লিপ্ত ছিলেন এবং সেই কর্ম অনুসারে এখনকার শরীরটি প্রাপ্ত হয়েছেন এবং এই জীবনে যদি পারমার্থিক উন্নতি সাধন করার চেষ্টা না করে ইন্দ্রিয়-তৃপ্তি সাধনের চেষ্টাতেই লিপ্ত থাকেন, তা হলে আপনাকে আর একটি জড় দেহ ধারণ করে আবার কষ্ট পেতে হবে।  প্রকৃতির অধ্যক্ষতায় মৃত্যুকালীন চিন্তা অনুসারে আপনি আর একটি জড় দেহ প্রাপ্ত হবেন এবং অন্য দেহটি পাওয়া মাত্রই আবার আপনার দুঃখ-দুর্দশা ও যন্ত্রনা শুরু হবে।  মাতৃগর্ভে অবস্থানকালেও কষ্ট পেতে হয়।  এতগুলি মাস একটি ছোট্ট থলির মধ্যে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে থাকাটা যে কী যন্ত্রণাদায়ক, সেটি আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি।  আর আজকাল তো মাতৃগর্ভেই কত শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে।  সুতরাং সেখানেই যে আমাদের মৃত্যু হবে না, তারও কোন নিশ্চয়তা নেই।  আর সেখান থেকে বেরিয়ে এলে আরও অধিক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়।  তাই যথার্থ বুদ্ধিমানের মতো আমাদের প্রশ্ন করা উচিত, “আমি কেন কষ্ট পাচ্ছি এবং কিভাবে আমি দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তি করতে পারি ?” আর যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা প্রশ্ন করছি, “আমি কেন দুঃখ পাচ্ছি ?” ততক্ষণ মানুষ পশুস্তরেই থেকে যায়–ততক্ষণ তাকে মানুষ বলে গণ্য করা যায় না।

দুঃখ-কষ্টের কারণ সম্বন্ধে অনুসন্ধান করাকে বলা হয় ‘ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসা’,–অর্থাৎ পরম সত্য সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা।  সেই সম্বন্ধে বেদান্ত-সূত্রের শুরুতেই বলা হয়েছে, অথাতো ব্রহ্ম-জিজ্ঞাসাঃ “এই মনুষ্য-জন্ম যখন লাভ হয়েছে, তখন ব্রহ্ম বা পরম সত্য সম্বন্ধে অনুসন্ধান করতে হবে।” তাই আমাদের এই মনুষ্য-জীবন লাভের সৌভাগ্যের সদ্ব্যবহার করতে হবে। সম্পূর্ণরূপে দুঃখ-নিবৃত্তির অনুসন্ধান না করে দুঃখ-দুর্দশাদায়ক জড় জীবনের বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা না করে, পশুর মতো জীবন যাপন করা উচিত নয়।

অবশ্য বেঁচে থাকার জন্য কঠোরভাবে সংগ্রাম করে সকলেই দুঃখ-নিবৃত্তির চেষ্টা করছে।  আমরা কেন অর্থ সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি ? কারণ আমরা মনে করছি, “আমার যদি অনেক টাকা থাকে, তা হলে দুঃখ-দুর্দশাগুলির নিবৃত্তি হবে। ”

এইভাবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলছে, এবং সকলেই ইন্দ্রিয়তৃপ্তি সাধন করার মাধ্যমে সুখী হওয়ার চেষ্টা করছে।  কিন্তু ইন্দ্রিয়তৃপ্তির মাধ্যমে কখনই যথার্থ আনন্দ লাভ করা যায় না।  যথার্থ আনন্দ হচ্ছে দিব্য আনন্দ, যা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করার মাধ্যমে লাভ করা যায়।  জড় সুখ হচ্ছে সেই দিব্য আনন্দের বিকৃত প্রতিফলন।

জড় সুখ অনেকটা মরুভূমির বুকে মরীচিকার মতো।  মরুভূমিতে জল নেই, কিন্তু মরুভূমির বুকে মরীচিকা দেখে তৃষ্ণার্ত পশু মনে করে যে, সেখানে জল রয়েছে, এবং সে তার পেছনে ছুটতে থাকে।  কিন্তু সে যতই সেই মরীচিকার দিকে ছুটে যায়, মরীচিকা ততই তার থেকে দূরে সরে যায়।  এইভাবে মরীচিকার পেছনে জলে অন্বেষণে ধাবিত তৃষ্ণার্ত পশুটির মৃত্যু হয়।

আমরা জনি যে মরুভূমিতে জল নেই– ‘জল’ বলে যা প্রতিভাত হয়, প্রকৃতপক্ষে তা হচেছ সূর্যালোকের প্রতিসরণ- কিন্তু পশু তা জানে না।  তেমনই, মানব-জীবনের কর্তব্য হচ্ছে ইন্দ্রিয় তৃপ্তি সাধনের মাধ্যমে সুখ-ভোগের প্রচেষ্টা থেকে বিরত হওয়া, এবং দিব্য আনন্দ আস্বাদনের চেষ্টা করা।

আমরা এই উচ্চ স্তরের আনন্দ উপভোগ করতে পারি কেবলমাত্র ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করার মাধ্যমে।  ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করা সহজ এবং তা করে আমরা জড় জগতের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত হতে পারি।

আমাদের হৃদয়ে সঞ্চিত সমস্ত আবর্জনাগুলিই হচ্ছে আমাদের দুঃখ-কষ্টের একমাত্র কারণ।  আমাদের অবস্থা হচ্ছে একটি আসামীর মতো, যার হৃদয় নানা রকম কলুষে পরিপূর্ণ।  সে মনে করে, “আমি যদি এই জিনিসগুলি পাই, তা হলে আমি সুখী হব। ” এবং সে তার জীবন বিপন্ন করেও অন্যায়ভাবে সেই সমস্ত জিনিসগুলি অপহরণ করার চেষ্টা করে।  একটি চোর জানে যে, সে যদি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, তা হলে তাকে দন্ড ভোগ করতে হবে, কিন্ত তবুও সে চুরি করতে যায়।  কেন ? ন্যূনং প্রমত্তঃ–সে ইন্দ্রিয় সুখ ভোগ-বাসনায় নিশ্চয় উন্মত্ত হয়ে গেছে– সেই জন্যই।

তাই আমাদের হৃদয়কে সব রকম কলুষিত বাসনা থেকে মুক্ত করতে হবে, যেগুলি আমাদের ইন্দ্রিয়-তৃপ্তির জন্য প্রচেষ্টা করতে বাধ্য করছে।  এরই ফলে আমাদের কষ্ট পেতে হচ্ছে।  এই যুগে হৃদয়কে নির্মল করার প্রক্রিয়া অত্যন্ত সরল–কেবলমাত্র ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করার মাধ্যমে তা সম্ভব।  এটিই হচ্ছে চৈতন্য মহাপ্রভুর দান।  চেতোদর্পণমার্জনং ভবমহাদাবাগ্নি নির্বাপণম্।  আপনি যদি ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীতন করেন, তা হলে এক দেহ থেকে আরেক দেহে দেহান্তরিত হয়ে দুঃখভোগ থেকে মুক্তিলাভ করতে পারেন।  এই ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করা খুবই সহজ।  এই মহামন্ত্র উচ্চারণের ব্যাপারে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদির কোন রকম বাধ্যবাধকতা নেই।  পরমেশ্বর ভগবানের কৃপায় সকলেরই জিহ্বা এবং কর্ণ রয়েছে।  তাই সকলেই এই ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’–
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে ॥
কীর্তন করতে পারেন। ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করুন এবং দিব্য আনন্দে মগ্ন হোন।  অসংখ্য ধন্যবাদ।

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,963 hits