এই জগতে সকলেই দুঃখের নিবৃত্তি-সাধন এবং সুখের অন্বেষণ করছে। জীবের বদ্ধ অবস্থায় তিন রকমের দুঃখ রয়েছে– আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক। মন এবং দেহজাত দুঃখকে বলা হয় আধ্যাত্মিক দুঃখ। যেমন, দেহে ক্রিয়াকলাপে যখন কোন গোলমাল দেখা দেয়, তখন আমাদের অসুখ করে অথবা বেদনা হয়। আরেক রকমের আধ্যাত্মিক দুঃখ উৎপন্ন হয় মন থেকে। যেমন, যখন আামাদের প্রিয়জনের মৃত্যু হয়, তখন আমরা মনোবেদনা অনুভব করি। এটিও এক রকমের দুঃখ। সুতরাং দেহের অসুখ অথবা মনের বেদনা হচ্ছে আধ্যাত্মিক দুঃখ।
তারপর রয়েছে আধিভৌতিক দুঃখ– অর্থাৎ, অন্য জীব থেকে প্রাপ্ত দুঃখ। যেমন, মানুষ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ নিরীহ পশু হত্যা করছে। পশুরা তাদের কথা বোঝাতে পারে না, কিন্তু তারা গভীর বেদনা অনুভব করে। ঠিক তেমনই, আমরাও অন্যান্য জীবদের থেকে দুঃখ পেয়ে থাকি।
অবশেষে রয়েছে আধিদৈবিক দুঃখ– অর্থাৎ, প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির পরিচালক– বিভিন্ন দেবতাদের দ্বারা প্রাপ্ত দুঃখ। দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, বন্যা, মহামারী– এই ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলি হচ্ছে আধিদৈবিক দুঃখ। এইভাবে আমরা সর্বদাই নানা রকম দুঃখ ভোগ করে থাকি। ভগবানের বিধানে এই জড় জগৎ আমাদের দুঃখ পাওয়ার জন্যই তৈরী হয়েছে। আমরা নানারকমভাবে জোড়াতালি দিয়ে দুঃখ-নিবৃত্তির চেষ্টা করি। সকলেই দুঃখ-নিবৃত্তির চেষ্টা করছে। এই জড় জগতে অস্তিত্বের উদ্দেশ্যেই হচ্ছে দুঃখ-নিবৃত্তি।
আমাদের দুঃখ-নিবৃত্তির জন্য আমরা নানাভাবে চেষ্টা করি। এক ধরনের দুঃখ-নিবৃত্তির পন্থা আধুনিক বৈজ্ঞানিকেরা প্রদর্শন করছেন, আর একটি পন্থা প্রদর্শণ করছেন দার্শনিকেরা, আস্তিকেরা অন্য আর একটি পন্থা প্রদর্শণ করছেন, ঠিক তেমনই আবার নাস্তিকেরা বা সকাম কর্মীরা তাদের নিজ নিজ মত অনুসারে অন্যান্য পন্থাগুলিও প্রদর্শণ করছেন। এই রকম কত সমস্ত মতবাদ রয়েছে। কিন্তু কৃষ্ণভাবনামৃতের দর্শন অনুসারে কেবল চেতনাকে কৃষ্ণময় করার মাধ্যমে সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার কবল থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
আমাদের সমস্ত দুঃখের কারণ হচ্ছে অবিদ্যা বা অজ্ঞানতা। আমরা ভুলে গেছি যে, আমরা হচ্ছি শ্রীকৃষ্ণের নিত্য সেবক বা দাস। আমাদের স্বরূপগত কৃষ্ণভাবনা যখন ভোগবাঞ্চার দ্বারা কলুষিত হয়– যখন আমরা জড় বিষয়ের উপর আধিপত্য করার বাসনা করি– তখনই গোলমাল বাঁধে। তৎক্ষণাৎ আমরা মায়ার দ্বারা আবদ্ধ হয়ে পড়ি। এই জড় জগতের সকলেই মনে করছে, “আমি পূর্ণরূপে এই জগৎকে ভোগ করতে পারি। ” একটি ক্ষুদ্র পিপীলিকা থেকে শুরু করে শ্রেষ্ঠ জীব ব্রহ্মা পর্যন্ত সকলেই এই জড় জগতের উপর আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করছে।
কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনে আমাদের মনোভাব ঠিক তার বিপরীত। আমরা শ্রীকৃষ্ণের দাসের দাসের দাসের দাস হওয়ার চেষ্টা করি (গোপীভর্তুঃ পদকমলয়োর্দাসদাসানুদাসঃ)। প্রভু হওয়ার পরিবর্তে আমরা শ্রীকৃষ্ণের দাস হতে চাই।
এখন হয়তো কেউ বলতে পারে যে, এটি হচ্ছে দাসত্বের মনোভাব–“আমি দাস হতে যাব কেন ? আমি প্রভু হব। ” কিন্তু তারা জানে না যে, এই মনোভাব–“আমি প্রভু হব”– হচ্ছে সমস্ত দুঃখের কারণ। এটি আমাদের বুঝতে হবে। এই জড় জগতে প্রভু হওয়ার নামে আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে পড়ি।
সেবা না করে আমরা থাকতে পারি না। এই সভায় উপস্থিত সকলেই কারো না কারো ভৃত্য। কৃষ্ণভাবনাময় এই সমস্ত ছেলে-মেয়েরা শ্রীকৃষ্ণের দাসত্ব বরণ করে নিয়েছে। তাই তাদের সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিন্তু অন্যরা মনে করছে, “আমি কেন ভগবানের দাস হতে যাব ? আমি প্রভু হবে। ” প্রকৃতপক্ষে, কেউই প্রভু হতে পারে না। আর কেউ যদি প্রভু হওয়ার চেষ্টা করে, তা হলে পরিনামে সে তার ইন্দ্রিয়ের দাস হয়ে পড়ে। সে তার কামের দাস হয়ে পড়ে– এইভাবে কত কিছুর দাস হয়ে পড়ে।
এর থেকে আর একটু উচ্চস্তরে- মানুষ, মনুষ্য-জাতির দাস হয়ে পড়ে, সমাজের দাস হয়ে পড়ে, দেশের দাস হয়ে পড়ে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা সকলেই প্রভু হওয়ার চেষ্টা করছে। সেটিই হচ্ছে রোগ। রাষ্ট্রপতি-পদপ্রার্থীরা আবেদন করছে, “আমি খুব ভাল করে দেশের সেবা করব। দয়া করে আমাকে আপনার ভোটটি দিন। ” কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে কোন-না-কোনভাবে দেশের প্রভু হয়ে বসা। এটিই হচ্ছে মায়া।
তাই আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক তত্ত্বটি হৃদয়ঙ্গম করতে হবে– সব সময়ই আমরা হচ্ছি ভৃত্য। কেউ বলতে পারে না, “আমি মুক্ত, আমি প্রভু। ” কেউ যদি সেই কথা মনে করে, তা হলে বুঝতে হবে যে, সে মায়াচ্ছন্ন। এই সভায় কেউ কি বলতে পারেন যে, তিনি কারো দাস নন ? না, কারণ আমাদের স্বরূপে আমরা সকলেই হচ্ছি দাস।
আমরা শ্রীকৃষ্ণের দাসত্ব করতে পারি অথবা ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করতে পারি। তবে অসুবিধাটা হচ্ছে এই যে, আমরা যখন আমাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করি, তখন আমাদের দুঃখ-দুর্দশাগুলি বৃদ্ধি পায়। এখন আপনারা কোন মাদক দ্রব্য গ্রহণ করে কিছুটা সুখ অনুভব করতে পারেন, এবং মাদক দ্রব্যের প্রভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আপনারা মনে করতে পারেন যে, আপনারা কারোরই সেবক নন, আপনারা মুক্ত কিন্তু এই ধারণাটি কৃত্রিম। যখনই আপনার নেশা ছুটে যাবে, তখনই দেখতে পাবেন যে, আপনি একজন ভৃত্য।
এইভাবে জোর করে আমাদের দাসে পরিণত করা হচ্ছে, কিন্তু আমরা দাসত্ব করতে চাই না। এখন এর সমাধান কিভাবে হতে পারে ? কৃষ্ণভাবনামৃতের মাধ্যমে। আপনি যদি শ্রীকৃষ্ণের দাসত্ব বরণ করে নেন, তৎক্ষণাৎ প্রভু হওয়ার উচ্চাকাক্সক্ষা চরিতার্থ হয়। যেমন, এখানে আমরা শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুনের একটি ছবি দেখতে পাচ্ছি– (শ্রীল প্রভুপাদ কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে শ্রীকৃষ্ণ এবং অর্জুনের একটি ছবি দেখান)– শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। অর্জুন হচ্ছেন একজন মানুষ। কিন্তু অর্জুন তাঁর সখারূপে শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসেন, এবং তাই অর্জুনের সেই বন্ধুত্বের জন্য শ্রীকৃষ্ণ তাঁর রথের সারথি হয়েছিলেন, তাঁর সেবা করেছিলেন। তেমনই, আমরা যখন শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের ভালবাসার সম্পর্কের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করি, তখন আমাদের প্রভুত্ব করার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়। আপনি যদি শ্রীকৃষ্ণের সেবায় ব্রতী হন, তখন দেখবেন যে, শ্রীকৃষ্ণও আপনার সেবা করছেন। সেটি উপলব্ধির বিষয়।
তাই আমরা যদি এই জড় জগতের দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে চাই, আমাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে চাই, তা হলে শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে হবে। তাকেই বলা হয় কৃষ্ণভাবনামৃত।
শ্রীল রূপ গোস্বামী তার ভক্তিরসামৃতসিন্ধু গ্রন্থে ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব সম্বন্ধে একটি খুব সুন্দর শ্লোকের উল্লেখ করেছেন– কামাদীনাং কতি ন কতিধা পালিতা দুর্নিদেশা। — এখানে একজন ভক্ত শ্রীকৃষ্ণকে বলছেন যে, তিনি বহুকাল ধরে তাঁর ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করেছেন (কামাদীনাং কতি না কতিধা)। তিনি বলছেন, “কাম আদির নির্দেশনায় যা করা উচিত নয়, তা আমি করছি। ভৃত্য তার অনিচ্ছাসত্ত্বেও নানা রকম কাজ করতে বাধ্য থাকে। সেইগুলি সে করতে বাধ্য হয়। তাই ভক্ত এখানে স্বীকার করেছেন যে, কামের নির্দেশনায় তিনি নানা রকম পাপকর্ম করেছেন।
এখন কেউ সেই ভক্তকে বলতে পারেন, “ঠিক আছে, তুমি তোমার ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করেছ। কিন্তু এখন তুমি তা করছ না। সুতরাং এখন সব কিছু ঠিক আছে। ” কিন্তু অসুবিধাটা হচ্ছে–তেষাং জাতা ময়ি ন করুণা ন ত্রপা নোপশান্তিঃ। ভক্তটি বলছেন, “আমি আমার ইন্দ্রিয়ের এত সেবা করেছি, কিন্তু তবুও আমি দেখছি যে, তারা সন্তুষ্ট নয়। এটি হচ্ছে আমার দুর্দৈব। আমার ইন্দ্রিয়গুলি সন্তুষ্ট নয়, আর আমিও সন্তুষ্ট নই। আমার ইন্দ্রিয়গুলি আমাকে মুক্তি দিচ্ছে না, তাদের দাসত্ব থেকে অবসর গ্রহণ করতে দিচ্ছে না। এটিই হচ্ছে আমার অবস্থা। আমি আশা করেছিলাম যে, এত বছর ধরে ইন্দ্রিয়গুলির সেবা করার ফলে তারা নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট হবে। কিন্তু না, তারা তা হয়নি। তারা এখনও আমাকে খাটাচ্ছে। ”
এক সময় আমার এক শিষ্য আমাকে বলেছিল যে, তার মা বৃদ্ধ বয়সে বিবাহ করছেন। আর একজন বলেছিল যে, তার ঠাকুরমাও আবার বিবাহ করছেন। দেখুন, পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর বছর বয়স, তবুও ইন্দ্রিয়গুলি এতই প্রবল যে, তারা প্ররোচিত করছে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ ! তোমাকে বিয়ে করতেই হবে !” ইন্দ্রিয়গুলি যে, কত প্রবল তা একটু বোঝার চেষ্টা করুন। এমন নয় যে, কেবল যুবক যুবতীরাই তাদের ইন্দ্রিয়ের দাস। পঁচাত্তর বছর, আশি বছরের বৃদ্ধরাও, এমন কি মৃত্যুমুখী মানুষেরাও তাদের ইন্দ্রিয়ের দাস। ইন্দ্রিয়গুলি কখনও তৃপ্ত হয় না।
এটিই হচ্ছে জড় জগতের অবস্থা। আমরা সকলেই আমাদের ইন্দ্রিয়ের দাস। কিন্তু ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করে কখনই সন্তুষ্ট হওয়া যায় না, ইন্দ্রিয়গুলির সন্তুষ্টি বিধান করা সম্ভব নয়, আর তারাও আমাদের প্রতি কৃপাপরায়ণ হয় না। তাই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে।
তাই শ্রীকৃষ্ণের দাসত্ব বরণ করে নেওয়াটাই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ পন্থা। ভগবদ্গীতায় (১৮/৬৬) শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন–
সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যোমোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥
আপনারা কত জন্ম-জন্মান্তর ধরে চুরাশি লক্ষ বিভিন্ন প্রজাতিতে আপনাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করে এসেছেন। পাখিরা তাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করছে, পশুরা তাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করছে, দেবতারা তাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করছে–এইভাবে এই জড় জগতের সকলেই ইন্দ্রিয়-সুখ ভোগের প্রয়াসী। তাই শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, “কেবল আমার কাছে আত্মসমর্পণ কর। কেবল আমার সেবা করতে মনস্থ কর, তা হলে আমি তোমার দায়িত্ব গ্রহণ করব। তখন আর তোমাকে তোমার ইন্দ্রিয়ের হুকুম তামিল করতে হবে না। ”
ইন্দ্রিয়ের হুকুম তামিল করতে গিয়ে আমরা বিভিন্ন ধরনের শরীর প্রাপ্ত হচ্ছি। আপনারা মনে করবেন না যে, আপনারা সকলেই এক স্তরে রয়েছেন। না, কর্ম অনুসারে বিশেষ শরীর লাভ হয়। আর এই ধরনের ভিন্ন ভিন্ন শরীরে ভিন্ন ভিন্ন স্তরের ইন্দ্রিয়-সুখ ভোগ হয়। শুকরও ইন্দ্রিয়-সুখ ভোগ করে, কিন্তু তা অত্যন্ত নিম্ন মানের। শূকর এত কামুক যে, সে তার মা, বোন অথবা কন্যার সঙ্গে কামক্রীড়ায় লিপ্ত হতেও ইতস্তত করে না। মানব সমাজেরও এমন কিছু মানুষ রয়েছে, যারা তাদের মা অথবা বোনের সঙ্গে কামক্রীড়ায় লিপ্ত হতে ইতস্তত বোধ করে না। ইন্দ্রিয়গুলি এতই প্রবল।
তাই আমাদের বুঝতে চেষ্টা করতে হবে যে, ইন্দ্রিয়ের হুকুম তামিল করার ফলেই আমাদের নানা রকম দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করতে হচ্ছে। আমরা যে ত্রিতাপ-দুঃখ ভোগ করছি– যে-দুঃখের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম করছি– তা সবই ইন্দ্রিয়ের হুকুম তামিল করতে গিয়েই হচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি শ্রীকৃষ্ণের সেবায় ব্রতী হই, তা হলে আর আমাদের ইন্দ্রিয়ের হুকুম তামিল করতে হবে না। শ্রীকৃষ্ণের একটি নাম হচ্ছে ‘মদনমোহন’– তিনি মদন বা কামদেবকে পরাভূত করেন। আপনারা যদি আপনাদের ইন্দ্রিয়ের প্রতি আসক্তিকে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আসিক্তিতে রূপান্তরিত করেন, তা হলে আপনারা তৎক্ষণাৎ সব রকমের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত হবেন।
তাই প্রভু হওয়ার এই প্রচেষ্টা–‘যা কিছু আমি দেখছি, সেই সব কিছুরই অধীশ্বর আমি। ”– এই ধারণা পরিত্যাগ করতে হবে। স্বরূপত আমরা সকলেই হচ্ছি দাস। এখন আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়ের দাসত্ব করছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমাদের শ্রীকৃেষ্ণর দাসত্ব করা উচিত। আর আমরা যখন শ্রীকৃষ্ণের দাসত্ব করি, তখন আমাদের ঐকান্তিকতা অনুসারে শ্রীকৃষ্ণ ধীরে ধীরে আমাদের কাছে তার স্বরূপ উদ্ঘাটন করেন। তারপর সেবার বিনিময় শুরু হয় এবং তা অত্যন্ত মধুর। আপনারা তাঁকে বন্ধুরূপে অথাব প্রভুরূপে অথবা প্রেমিকরূপে ভালবাসতে পারেন। শ্রীকৃষ্ণকে কতভাবে ভালবাসা যায়।
তাই আপনাদের শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসার চেষ্টা করতেই হবে, এবং তখন আপনারা দেখবেন যে, তাতে কি এক অপূর্ব আনন্দ লাভ করা যায়। সম্পূর্ণভাবে তৃপ্ত হওয়ার এছাড়া আর অন্য কোনও উপায় নেই। অনেক অর্থ উপার্জন করলেও আপনি শান্তি পাবেন না। কলকাতায় আমি এক ভদ্রলোককে জানতাম যার মাসিক আয় ছিল যাট হাজার টাকা, কিন্তু তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। কেন? কেননা তাঁর সেই ধন-সম্পদ তাকে শান্তি দিতে পারেনি। তিনি অন্য কিছুর অন্বেষণ করছিলেন।
তাই আমি আপনাদের সকলের কাছে বিনীতভাবে অনুরোধ করব যে, আপনারা জীবনের এই অপূর্ব সুন্দর আশীর্বাদ, কৃষ্ণভাবনামৃত সম্বন্ধে অবগত হওয়ার চেষ্টা করুন। কেবলমাত্র ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করার ফলে ধীরে ধীরে আপনাদের হৃদয়ে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অপ্রাকৃত প্রেম বিকশিত হবে, এবং যখন আপনারা শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসতে শুরু করবেন, তখন আপনাদের সমস্ত দুঃখ-দুর্দশার নিবৃত্তি হবে এবং আপনারা তখন পূর্ণ শান্তি অনুভব করতে পারবেন।
অসংখ্য ধন্যবাদ। কারোর কি প্রশ্ন আছে ?
প্রশ্নঃ আমরা যখন জড়-শক্তিকে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করি, তখন কি হয় ? তা কি তখন চিন্ময় হয়ে যায় ?
শ্রীল প্রভুপাদঃ তামার তার যখন বিদ্যুৎ-শক্তির সংস্পর্শে আসে, তখন আর তা তামা থাকে না– তখন তা বিদ্যুৎ হয়ে যায়। তেমনই, আপনি যখন আপনার শক্তি শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিযুক্ত করেন, তখন আর তা জড় শক্তি থাকে না, তখন তা চিন্ময় শক্তিতে পরিণত হয়। তাই যখনই আপনি শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত হন, তখন আপনি জড়া শক্তির বন্ধন থেকে মুক্ত হন। ভগবদ্গীতায় (১৪/২৬)শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন–
মাং চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।
স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে ॥
“কেউ যখন ঐকান্তিকভাবে আমার সেবায় যুক্ত হয়, তৎক্ষণাৎ সে জড় স্তর অতিক্রম করে ব্রহ্মভূত অথবা চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত হয়।”
তাই আপনি যখন আপনার শক্তি দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত হন, তখন আর আপনি জড় স্তরে নেই। শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত সব কিছুই চিন্ময়। যেমন, আমরা প্রতিদিন ফল-প্রসাদ বিতরণ করি। এখন, কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, “এই ফলগুলির সঙ্গে অন্য ফলের কি পার্থক্য ? অন্য যে কোন ফলের মতো এইগুলিও বাজার থেকে কেনা হয়েছে। আমরা বাড়িতে তো ফল খাই। তা হলে এর মধ্যে কি পার্থক্য রয়েছে ?” না, যেহেতু আমরা এই ফল শ্রীকৃষ্ণকে নিবেদন করি, তাই তা তৎক্ষণাৎ চিন্ময় হয়ে ওঠে। তার ফল কি হয় ? কেবল, এই কৃষ্ণ-প্রসাদ আহার করতে থাকুন, আর তা হলে আপনি দেখবেন যে, আপনি কিভাবে কৃষ্ণভাবনামৃতের পথে অগ্রসর হচ্ছেন।
আর একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে– আপনি যদি খুব বেশি দুধ খান, তা হলে আপনার পেটে গোলমাল হতে পারে। আর আপনি যদি কোন ডাক্তারের কাছে যান (বিশেষ করে একজন আয়ুর্বেদিক ডাক্তারের কাছে), তিনি আপনাকে দই থেকে তৈরী একরকম ওষুদ দেবেন, এবং একটু ওষুধ-মিশ্রিত সেই দই খেয়ে আপনার পেটের রোগ সেরে যাবে। এখন দই হচ্ছে দুধেরই রূপান্তর। আপনার রোগের কারণ হচ্ছে দুধ, আর নিরাময়ও হচ্ছে দুধের দ্বারা। তা কিভাবে সম্ভব ? তা সম্ভব হচ্ছে কেননা আপনি একজন বিচক্ষণ ডাক্তারের নির্দেশনায় সেই ওষুধ গ্রহণ করছেন। তেমনই, আপনি যদি জড় শক্তিকে সদ্গুরুর নির্দেশ অনুসারে শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিয়োগ করেন, তা হলে সেই জড় শক্তি, যা আপনার বন্ধনের কারণ ছিল, তা অপনাকে সব রকমের দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্ত করে চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত করবে।
প্রশ্নঃ আপনি সব কিছু এত সহজভাবে বোঝান কি করে ?
শ্রীল প্রভুপাদঃ কেননা এই দর্শনটি হচ্ছে সহজ। ভগবান মহান। আপনি মহান নন। তাই কখনও দাবি করবেন না যে, আপনি ভগবান। কখনও বলবেন না যে, ভগবান নেই। ভগবান অনন্ত, আর আপনি অণু-সদৃশ। তা হলে আপনার অবস্থা কি রকম ? আপনাকে ভগবানের সেবা করতে হবে, শ্রীকৃষ্ণের সেবা করতে হবে। সেটিই হচ্ছে সরল সত্য। শ্রীকৃষ্ণের বিরুদ্ধাচরণ করাটা হচ্ছে মায়া। কেউ যখন বলে যে, সে ভগবান, বা ভগবান বলে কিছু নেই, কিংবা ভগবান মরে গেছে, তখন বুঝতে হবে যে, সে মায়াচ্ছন্ন।
কোন মানুষকে যখন ভূতে পায়, তখন সে নানা রকম আজে-বাজে কথা বলে। তেমনই, কোন মানুষ যখন মায়া পিশাচীর দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন সে বলে, “ভগবান মরে গেছে। আমি ভগবান। তুমি ভগবানকে খুঁজছ কেন ? রাস্তা-ঘাটে তোমার সামনে অনেক ভগবান ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে সমস্ত মানুষ এই ধরনের কথা বলে, তাদের সকলকে ভূতে পেয়েছে।
তাই ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ উচ্চারণ করে তাদের সেই ভূত ছাড়াতে হবে। সেটিই হচ্ছে নিরাময়ের উপায়। কেবল তাদের শুনতে দিন, তা হলেই তারা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠবে। কোন মানুষ যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, তখন তার কানের কাছে চিৎকার করে তাকে জাগানো যায়। তেমনই ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্রই’ কেবল সুপ্ত মানব-সমাজকে জাগরিত করতে পারে। বেদে বলা হয়েছে, উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্ নিবোধত–“হে মনুষ্যগণ, জেগে ওঠো “আর ঘুমিও না। তুমি এখন সৌভাগ্যক্রমে এই মনুষ্য-শরীর প্রাপ্ত হয়েছ। তার সদ্ব্যবহার কর, মায়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হও। ” সেটিই হচ্ছে বেদের বাণী, সুতরাং ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করে যাও। মায়া-ঘুম থেকে তোমাদের দেশবাসীদের জাগিয়ে তোল এবং তাদের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে মুক্ত হতে সাহায্য কর।
শাস্ত্রে ভগবানকে সচ্চিদানন্দ বিগ্রহ বলে বণনা করা হয়েছে। ‘সৎ’ মানে ‘নিত্য’, ‘চিৎ’ মানে ‘পূর্ণ জ্ঞানময়’ এবং আনন্দ’ শব্দটির অর্থ তো সকলেই জানেন। আর বিগ্রহ মানে হচ্ছে ‘কোন বিশেষ ব্যক্তি’। তাই এক এবং অদ্বিতীয় পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন নিত্য আনন্দময় এবং পূর্ণ জ্ঞানময় পুরুষ। এটি হচ্ছে পরমেশ্বর ভগাবানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা, এবং কেউই তাঁর সমান অথবা তাঁর থেকে বড় নয়।
জীব হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানে ক্ষুদ্র সংস্করণ এবং তাই তাদের কার্যকলাপে অমরত্ব লাভের বাসনা, জ্ঞান আহরণের আকাঙ্ক্ষা এবং বিভিন্নভাবে সুখ ভোগের প্রচেষ্টা দেখা যায়। এই তিনটি মানুষের মধ্যে স্বল্প পরিমানে দেখা যায় কিন্তু ভুবর্লোক, স্বর্গলোক, জনলোক , তপলোক, মহর্লোক, ব্রহ্মলোক আদি উচ্চতর লোকের অধিবাসীরা এই গুণগুলি শত শত গুণ বেশি পরিমানে উপভোগ করেন।
যদিও এই জড় জগতের উচ্চতর লোকে আনন্দ উপভোগের মান এই পৃথিবীর থেকে হাজার হাজার গুণ বেশি, কিন্তু তবুও পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গ-সুখ ভোগের আনন্দের কাছে তা অতি নগণ্য। বিভিন্ন রসের (সম্পর্কের) মাধ্যমে ভগবানের প্রতি যে প্রেমময়ী সেবা, তার কাছে ব্রহ্মানন্দও সমুদ্রের কাছে একবিন্দু জলের মতো।
প্রতিটি জীবই জড় জগতের সর্বোচ্চ স্তরের আনন্দ উপভোগের উচ্চাকাঙ্ক্ষা করে। কিন্তু তা স্বত্ত্বেও এখানে সকলেই অসুখী। উপরিউক্ত লোকগুলিতে দীর্ঘ আয়ু এবং অতি উন্নত মানের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য লাভ হলেও, সেই অসুখী ভাব বা নিরানন্দ সেখানেও রয়েছে।
সেটিও হচ্ছে জড় জগতের নিয়ম। দীর্ঘ আয়ু লাভ করলেও এবং সুখভোগের মান সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করলেও প্রকৃতির নিয়মানুসারে সকলকেই অসুখী থাকতে হয়। তার কারণ হচ্ছে আমাদের স্বরূপগত আনন্দ জড় কার্যকলাপ-প্রসূত সুখ থেকে ভিন্ন। জীব হচ্ছে সচ্চিদানন্দময় বিগ্রহের অতি ক্ষুদ্র এক-একটি অংশ, এবং তাই তাদের মধ্যেও আনন্দ উপভোগের প্রবণতা রয়েছে, যা হচ্ছে গুণগতভাবে দিব্য। কিন্তু জড় জগতের বিরুদ্ধ পরিবেশে এই অপ্রাকৃত আনন্দ লাভের প্রয়াস সর্বদাই ব্যর্থ হচ্ছে।
একটি মাছকে জল থেকে তুলে এনে ডাঙ্গায় সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দিলেও সে যেমন সুখী হতে পারে না, ঠিক তেমনই অণু-সদৃশ সচ্চিদানন্দময় জীব তার প্রাপ্ত মস্তিষ্ক-প্রসূত সমস্ত জাগতিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কখনই যথার্থভাবে সুখী হতে পারে না। তাই জীবকে অবশ্যই একটি ভিন্ন ধরনের সুখ প্রদান করতে হবে– এক অপ্রাকৃত সুখ, যাকে বলা হয় দিব্য আনন্দ। এই দিব্য আনন্দ উপভোগ করাই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, জড়-সুখ ভোগ নয়।
দিব্য আনন্দ উপভোগ করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা মঙ্গলজনক, কিন্তু কেবল জড়-ভোগ ত্যাগ করার মাধ্যমে তা লাভ করা যায় না। শ্রীপাদ শঙ্করাচার্য কর্তৃক প্রবর্তিত জাগতিক কর্ম পরিত্যাগ করার পন্থা মুষ্টিমেয় কয়েকজন মানুষের ক্ষেত্রে কার্যকরী হতে পারে, কিন্তু শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রবর্তিত ভক্তিযোগের পন্থা হচ্ছে এই দিব্য আনন্দ লাভের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সব চাইতে নিশ্চিত পন্থা। প্রকৃতপক্ষে, তা জড় জগতের অবস্থারও আমূল পরিবর্তন সাধন করে।
জড় সুখ-ভোগের আকাঙ্ক্ষাকে বলা হয় কাম, এবং কামপরায়ণ সমস্ত কার্যকলাপ পরিণামে অবশ্যই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সাপের শরীর অত্যন্ত শীতল। কিন্তু কোন মানুষ যদি সাপের শরীরের সেই শীতলতা উপভোগ করার জন্য সেই সাপটিকে মালার মতো গলায় জড়াতে যায়, তা হলে সর্প-দংশনে তার মৃত্যু অনিবার্য। জড় ইন্দ্রিয়গুলিও সাপের মতো, এবং তথাকথিত জড় সুখ ভোগের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হলে পারমার্থিক চেতনার মৃত্যু হয়। তাই যথার্থ বুদ্ধিমান মানুষদের কর্তব্য হচ্ছে আনন্দের প্রকৃত ৎস খুঁজে বার করা।
এক সময় একটি মূর্খ লোককে তার এক বন্ধু আখের রসের মিষ্টতার কথা বলে। সেই লোকটি তখন জিজ্ঞাসা করে আঁখ দেখতে কেমন, এবং তার বন্ধুটি তাকে জানায় যে আখ দেখতে অনেকটা বাঁশের মতো। সেই মূর্খ লোকটি তখন আখের রসের মিষ্টতা আস্বাদন করার আশায় একটি শুষ্ক বংশ-দন্ড চর্বন করতে থাকে, ফলে আখের রসের মিষ্টতা আস্বাদনের পরিবর্তে তার মুখ ক্ষত-বিক্ষত হয়।
দুঃখ-দুর্দশাপূর্ণ অনিত্য এবং পরিবর্তনশীল এই জড় জগতে নিত্য আনন্দ লাভের প্রচেষ্টারত মায়ামুগ্ধ জীবের অবস্থাটাও অনেকটা সেই রকম। ভগবদ্গীতায় এই জগৎকে দুঃখালয় বলা হয়েছে। সুখের আকাক্সক্ষা করা ভাল, কিন্তু তথাকথিত বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টার দ্বারা জড়ের মাধ্যমে সুখ-ভোগের প্রচেষ্টা হচ্ছে মায়ারই কারসাজি। মূর্খ মানুষেরা তা বুঝতে পারে না। ভগবদ্গীতায় (৬/১৩) বর্ণনা করা হয়েছে, জড় সুখ ভোগের কামনার দ্বারা উদ্ধুব্ধ হয়ে মানুষ চিন্তা করে, “আমার এত টাকা রয়েছে, এবং আমার পরিকল্পনা অনুসারে আমি আরও সম্পদ লাভ করব। আমার এখন এত রয়েছে, এবং ভবিষ্যতে তা আরও বর্ধিত হবে। ”
নাস্তিক বা ভগবদ্বিমুখ সভ্যতা হচ্ছে ইন্দ্রিয় সুখ-ভোগের এক বিরাট আয়োজন, এবং সকলেই একটি অর্থহীন তামাশা বজায় রাখার জন্য উন্মাদের মতো অর্থোপার্জনের চেষ্টা করছে। সকলেই অর্থোপার্জন করতে চায়, কারণ অর্থ হচ্ছে ইন্দ্রিয় সুখ-ভোগের বিষয়গুলি আহরণ করার মাধ্যম। অর্থ-সঞ্চয়ের এই উন্মাদ পরিবেশে শান্তি লাভের আশা করা একটি অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ইন্দ্রিয় সুখ-ভোগের উন্মাদনার আভাসও থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তিলাভের কোনও সম্ভাবনা নেই। তার কারণ, প্রকৃতপক্ষে সকলেই পরমেশ্বর ভগবানের নিত্য দাস এবং তাই ব্যক্তিগতভাবে আমরা কোন কিছু উপভোগ করতে পারি না। আমাদের পরমেশ্বর ভগবানের অপ্রাকৃত সেবায় যুক্ত হতে হবে, এবং তার ফলেই কেবল আমরা আমাদের বহু আকাক্সিক্ষত শান্তি লাভ করতে পারি। দেহের একটি অংশ স্বতন্ত্রভাবে নিজে নিজে আনন্দ উপভোগ করতে পারে না; তা কেবল পূর্ণ দেহের সেবা করতে পারে এবং সেই সেবার ফলে তৃপ্তি লাভ করতে পারে। কিন্তু এখন সকলেই স্বার্থপর কার্যকলাপে লিপ্ত, এবং কেউই পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করতে প্রস্তুত নয়। এটিই হচ্ছে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ার মূল কারণ।
সর্বোচ্চপদে অধিষ্ঠিত পরিচালক থেকে শুরু করে সর্ব নিম্নস্তরের ঝাড়–দার পর্যন্ত সকলেই অন্যায়ভাবে অর্থ আহরণের চেষ্টায় কর্ম করছে। কিন্তু কেবলমাত্র নিজের স্বার্থে কর্ম করা অন্যায় এবং ধ্বংসাত্মক। এমনকি ব্যক্তিগত লাভের জন্য পারমার্থিক পন্থায় অনুশীলন করাও অন্যায়।
এই রকম অন্যায়ভাবে অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টার ফলে পৃথিবীতে আজ অর্থের অভাব না থাকলেও শান্তির প্রবল অভাব হয়েছে। যেহেতু মানুষের সমস্ত শক্তি অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে ভ্রান্তভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তই জনসাধারণের অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে ভ্রান্তভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তাই জনসাধারণের অর্থ উপার্জনের ক্ষমতা অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তার ফলে এমন এক অবৈধ এবং অদম্য মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হয়েছে যে, পৃথিবী জুড়ে আজ এক প্রবল অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে এবং তার ফলে এই ধরণের অর্থ আহরণের দুর্দমনীয় প্রয়াসকে ধ্বংস করার জন্য তারাই প্রচুর অর্থ ব্যয়ে বিভিন্ন মরণাস্ত্র সৃষ্টি করছে।
ধনমদে মত্ত বড় বড় সমস্ত দেশের নেতারা সুখ এবং শান্তি উপভোগ করার পরিবর্তে এখন আধুনিক যুগের সমস্ত মরণাস্ত্র থেকে নিজেদের কিভাবে রক্ষা করবে, তার বড় বড় সমস্ত পরিকল্পনা করছে, এবং এই ধরনের ভয়ঙ্কর সমস্ত অস্ত্রশস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য তারা প্রচুর পরিমাণে অর্থ সমুদ্রের জলে নিক্ষেপ করছে। কেবল অসংখ্য টাকা খরচ করেই এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে না, তাতে অসংখ্য নিরীহ প্রাণীও হত্যা করা হচ্ছে। তার ফলে এই সমস্ত দেশগুলি ভীষণভাবে কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এটিই হচ্ছে জড় জগতের ভ্রান্তি। ইন্দ্রিয়-সুখ ভোগের আশায় প্রচুর শক্তি ক্ষয় করে অর্থ উপার্জন করা হয়, এবং তারপর তা মানুষকে ধ্বংস করার কাজে ব্যয় করা হয়। ভগবানের সেবায় ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে মনুষ্য জাতির শক্তি প্রকৃতির নিয়মে এইভাবে নষ্ট হচ্ছে, কারণ প্রকৃতপক্ষে পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন সমসন্ত শক্তির অধীশ্বর। সম্পদ আসে মা লক্ষ্মীর কাছ থেকে। বৈদিক শাস্ত্রে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, নার বা সমস্ত জীবের পরম উৎস নারায়ণের সেবা না করে লক্ষ্মীদেবীকে ভোগ করা যায় না– আর তাই ভ্রান্তভাবে যদি কেউ তাঁকে ভোগ করতে চায়, তা হলে সে প্রকৃতির নিয়মে প্রবলভাবে দন্ডভোগ করে; তখন সেই ধন-সম্পত্তি শান্তি আর সমৃদ্ধির কারণ হওয়ার পরিবর্তে ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অবৈধভাবে সঞ্চিত এই অর্থ এখন নানা রকম রাষ্ট্রীয় এবং অন্তরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ-তহবিলের জন্য জনসাধারণের কাছ থেকে কররূপে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং তা অর্থহীনভাবে ব্যয় করা হচ্ছে। মানব জীবনের দুটি মৌলিক কর্তব্য– সুন্দরভাবে পরিবার প্রতিপালন এবং পারমার্থিক জ্ঞান আহরণ করার জন্যই কেবল অর্থ সংগ্রহ করে মানুষ আর সন্তুষ্ট নয়। এখন সে তার অন্তহীন কামনা-বাসনাগুলি চরিতার্থ করার জন্য অপর্যাপ্ত টাকা চায়, এবং তার অবৈধ বাসনাগুলি যত বেশি, সেই অনুপাতে ডাক্তার, উকিল, কর-সংগ্রহকারী, সংঘ, প্রতিষ্ঠান, তথাকথিত ধর্মীয় নেতা এবং দুর্ভিক্ষ, ভূমিকম্প, মহামারী আদি নানা রকম দুর্যোগরূপে মায়ার প্রতিনিধিরা তাদের টাকা-পয়সা নিয়ে নিচ্ছে।
একটি কৃপন, যে মায়ার প্ররোচনায় এক কপি ‘ভগবৎ-দর্শন’ পত্রিকা কিনতে ইতস্তত করেছিল, তাকে এক সপ্তাহের চিকিৎসার জন্য পঁচিশ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছিল এবং তারপর মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। তেমনই, আবার যে মানুষটি ভগবানের সেবায় এক পয়সা দিতে অস্বীকার করেছিল, তাকে তার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মামলা করে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার অপচয় করতে হয়েছিল। এটিই হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম। অর্থ যদি ভগবানের সেবায় নিয়োগ না করা হয়, তা হলে প্রকৃতির নিয়মে মামলা-মোকদ্দমা, রোগ ইত্যাদি রূপে সেই টাকা হারাতে হয়। এই সত্য দর্শন করার ক্ষমতা মূর্খদের নেই, তাই যথাযথভাবেই ভগবানের আইন তাদেরই মোহাচ্ছন্ন করে।
প্রকৃতির নিয়ম আমাদের জীবন-ধারণের অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করতে দেয় না। আমাদের জীবপ-যাপনের জন্য যতটুকু প্রয়োজন তা সরবরাহ করার প্রভূত আয়োজন প্রকৃতি করে রেখেছে; কিন্তু মানুষের অন্তহীন কামনা-বাসনা সমস্ত জীবের পরম পিতা ভগবানের সৃষ্ট সেই আয়োজনগুলিতে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে।
ভগবান একটি লবনের সমুদ্রের আয়োজন করে রেখেছেন, কারণ জীবের জীবন-ধারণের জন্য লবণের প্রয়োজন রয়েছে। তেমনই, ভগবান অপর্যাপ্ত পরিমাণে বায়ু এবং আলোকের আয়োজন করে রেখেছেন, যেগুলি জীবন-ধারণের জন্য অপরিহার্য। মানুষ যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু লবণ সেই ভান্ডার থেকে গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করতে পারে না। সে যদি রান্নায় প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ দেয়, তা হলে তা খাওয়া যায় না; আর সে যদি প্রয়োজনের থেকে কম লবণ দেয়, তা হলেও তা আবার সম্পূর্ণ বিস্বাদ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, সে যদি যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু গ্রহণ করে, তা হলে খাদ্য সুস্বাদু হয় এবং সে-ও সুস্থ হয়। আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ খাওয়া যেমন ক্ষতিকারক, তেমনই আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ সংগ্রহের প্রচেষ্টাও ক্ষতিকারক। সেটিই হচ্ছে প্রকৃতির নিয়ম।