ওঁ অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জনশলাকয়া।
চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ ॥
“অজ্ঞানের অন্ধকারে আমার চক্ষু অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু জ্ঞানের অঞ্জন পরিয়ে যিনি আমার সেই চক্ষু উন্মীলিত করলেন, আমার সেই পরমারাধ্য গুরুদেবকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাই। ”
এই জড় জগতে সকলেই অজ্ঞানের অন্ধকারে জন্মগ্রহণ করেছে। প্রকৃতপক্ষে, এই জড় জগৎটাই অন্ধকারাচ্ছন্ন। সূর্যের আলোকে, চন্দ্রের আলোকে, আগুন অথবা বিদ্যুতের আলোকের প্রভাবে সাময়িকভাবে তা আলোকিত হতে পারে; কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে জড় জগৎ হচ্ছে অন্ধকার। এটি একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য। তাই ব্রহ্মা থেকে শুরু করে একটি পিপীলিকা পর্যন্ত সকলেই এই জড় জগতে অজ্ঞানের অন্ধকারে জন্মগ্রহণ করেছে।
বেদে তাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তমসো মা জ্যোতির্গময়ঃ- “অজ্ঞানের অন্ধকারে আর থেকো না, জ্ঞানের আলোকে এস। ” এই জন্য একজন সদ্গুরুর সাহায্যের প্রয়োজন হয়। সদ্গুরুর কর্তব্য হচ্ছে যে-সমস্ত মানুষ অজ্ঞানের অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, জ্ঞানের অঞ্জন পরিয়ে তাদের চক্ষু উন্মীলিত করা, এবং মানুষের কর্তব্য হচ্ছে সেই ধরনের সৎ-গুরুদেবের চরণে সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করা।
মানুষকে অন্ধকারে থাকতে দেওয়া উচিত নয়, তাদের আলোকে নিয়ে আসা উচিত। তাই প্রতিটি সমাজেই কোন না কোন রকম ধর্মীয় সংগঠন দেখা যায়। হিন্দু ধর্ম, মুসলমান ধর্ম, খ্রিস্টান ধর্ম অথবা বৌদ্ধ ধর্মের উদ্দেশ্য কি ? তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে আলোকে নিয়ে আসা। সেটিই হচ্ছে ধর্মের উদ্দেশ্য।
আর সেই আলোকটি কি ? সেই আলোক হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবান। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে, ধর্ম তু সাক্ষাদ্ ভগবৎ-প্রণীতম্–“পরমেশ্বর ভগবানের প্রদত্ত আইনই হচ্ছে ধর্ম। ” প্রতি রাষ্ট্রেরই আইন আছে, যা সকলকে পালন করতে হয়। রাষ্ট্রপ্রধান কতকগুলি আইন প্রণয়ন করেন, এবং আপনি যদি সৎ নাগরিক হন, তা হলে আপনি সেই আইন কানুনগুলি পালন করে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারেন। স্থান, কাল এবং পাত্রের পার্থক্য অনুসারে এই আইন-কানুনগুলি ভিন্ন হতে পারে- ভারতবর্ষের আইন সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার আইনের মতো না হতেও পারে– কিন্তু প্রত্যেকটি দেশেই কতকগুলি আইনকানুন আছে, যা সকলকে মেনে চলতে হয়। তা না হলে তাকে সমাজের সব চাইতে নিকৃষ্ট স্তরের মানুষ ‘আসামী’ বলে গণ্য করা হয়; এবং সেই জন্য তাকে দন্ডদান করা হয়। এটিই হচ্ছে সাধারণ রীতি।
তেমনই ধর্ম মানে হচ্ছে ভগবানের আইন। কোন মানুষ যদি ভগবানের আইন মেনে না চলে, তা হলে সে একটি পশু ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিটি শাস্ত্রের, প্রতিটি ধর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে পশুর স্তর থেকে মানুষের স্তরে উন্নীত করা। তাই যে মানুষের কোন ধর্ম বিশ্বাস নেই, ভগবৎ-বিশ্বাস নেই, সে পশুর থেকে কোন অংশেই উন্নত নয়। বৈদিক শাস্ত্রে সেই কথাই বলা হয়েছে–
আহার-নিদ্রা-ভয়-মৈথুনঞ্চ
সামান্যমেতৎ পশুভির্নরাণাম্।
ধর্মো হি তেষামধিকো বিশেষো
ধর্মেন হীনাঃ পশুভিঃ সমানাঃ ॥
আহার, নিদ্রা, ভয় এবং মৈথুন– এই চারটি প্রবৃত্তি মানুষ ও পশু উভয়ের মধ্যেই দেখা যায়। একটি মানুষ এবং একটি পশুর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, মানুষ ভগবত্তত্ত্ব সম্বন্ধে অনুসন্ধান করাতে পারে, কিন্তু একটি পশু তা পারে না। এটিই হচ্ছে পার্থক্য। তাই যে মানুষ ভগবানকে জানতে চায় না, সে একটি পশুর থেকে কোন অংশেই উন্নত নয়।
দুর্ভাগ্যবশত, প্রতিটি সমাজেই মানুষ ভগবানকে ভুলে যেতে চেষ্টা করছে। কিছু মানুষ খোলাখুলিভাবে বলে যে, ভগবান নেই, কেউ আবার বলে, ভগবান যদি থাকেন তা হলে তিনি মরে গেছেন, ইত্যাদি। গগনচুম্বী সব বাড়ি বানিয়ে তারা তথাকথিত এক অতি উন্নত সভ্যতা তৈরি করেছে, কিন্তু তারা ভুলে গেছে যে, তাদের সমস্ত উন্নতি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কৃপার উপর নির্ভরশীল। এটি হচ্ছে মানব সভ্যতার সব চাইতে বড় সংকট।
ভগবানকে ভুলে যাওয়ার ফলে সমাজের যে কি অবস্থা হয়, সেই সম্বন্ধে একটি খুব সুন্দর কাহিনী রয়েছে।
একটি ইঁদুর একটি বিড়ালের দ্বারা খুব উৎপীড়িত হচ্ছিল। তাই সেই ইঁদুরটি যোগসিদ্ধিসম্পন্ন এক সাধুর কাছে গিয়ে তাঁকে বলল, “দেখুন, আমি অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত।”
— “তোমার অসুবিধাটা কিসের ?”
ইঁদুরটি বলল, “একটি বেড়াল সব সময় আমাকে তাড়া করে, তাই আমি একদম শান্তিতে থাকতে পারি না। ”
–“তা হলে তুমি কি চাও ?”
–“দয়া করে আমাকে একটি বেড়ালে পরিণত করে দিন। ”
–“ঠিক আছে, তুমি একটি বেড়াল হয়ে যাও। ” এবং ইঁদুরটি তৎক্ষণাৎ একটি বেড়ালে পরিণত হল।
কয়েকদিন পর সেই বেড়ালটি সেই সাধুর কাছে এসে বলল, “হে সাধুবাবা, আমার আবার অসুবিধা হচ্ছে। ”
–“তোমার অসুবিধা কিসের ?”
— “কুকুরগুলো সব সময় আমাকে তাড়া করে। ”
–“তা হলে তুমি কি চাও ?”
–“আমাকে একট কুকুরে পরিণত করে দিন। ”
–“ঠিক আছে, তুমি একটি কুকুর হয়ে যাও। ” এবং বেড়ালটি তখন একটি কুকুরে পরিণত হল।
কয়েকদিন পর সেই কুকুরটি এসে বলল, “আমি আবার বিপদে পড়েছি। ”
— “কিসের বিপদ ?”
–“শিয়ালেরা প্রায়ই আমাকে তাড়া করে। ”
— “ঠিক আছে, তা হলে তুমি কি চাও ?”
–“আমি একটি শিয়াল হতে চাই। ”
–“ঠিক আছে, শিয়াল হয়ে যাও,” কুকুরটি তৎক্ষণাৎ একটি শিয়ালে পরিণত হল।
তারপর একদিন সেই শিয়ালটি এসে বলল, “বাঘেরা আমাকে তাড়া করে। ”
–“তা তুমি কি চাও ?”
–“আমি একটি বাঘ হতে চাই। ”
–“ঠিক আছে, বাঘ হয়ে যাও। ” এবং শিয়ালটি তৎক্ষণাৎ বাঘে পরিণত হল, এবং সেই সাধুর দিকে তাকিয়ে তখন সে বলল, “আমি এখন আপনাকে খাব। ”
–“ওঃ, তুমি আমাকে খাবে ? আমি তোমাকে বাঘে পরিণত করলাম, আর এখন তুমি আমাকে খেতে চাও ?”
–“হ্যাঁ। আমি এখন একটা বাঘ হয়েছি এবং আমি আপনাকে খাব। ”
সেই সাধুটি তখন তাকে অভিশাপ দিলেন, “তুমি আবার ইঁদুর হয়ে যাও। ” এবং সেই বাঘটি তৎক্ষণাৎ একটি ইঁদুরে পরিণত হয়ে গেল।
আমাদের মানব সমাজটাও ঠিক এই রকম। সেদিন আমি ‘The world Almanac’ পড়ছিলাম। সেখানে বলা হয়েছে যে, আর একশ’ বছরের মধ্যে মানুষ মাটির নীচে বসবাস করবে– ঠিক ইঁদুরের মতো। বৈজ্ঞানিক প্রগতি মানুষ মারার জন্য পারমানবিক বোমা তৈরী করছে, এবং তা যখন ফাটাবে, তখন মানুষকে ইঁদুরের মতো মাটির নিচে গিয়ে থাকতে হবে। বাঘ থেকে ইঁদুর। তাই হবে– সেটিই প্রকৃতির নিয়ম।
তুমি যদি রাষ্ট্রের আইন অমান্য কর, তা হলে তোমাকে দুর্দশা ভোগ করতে হবে। তেমনই, তুমি যদি পরমেশ্বর ভগবানের আইন অমান্য করতে থাকা, তা হলে তোমাকে তার দন্ড-ভোগ করতেই হবে। আবার ইঁদুরে পরিণত হতে হবে। পারমাণবিক বোমা যখন ফাটবে, তখন এই পৃথিবীর উপরিভাগে যা কিছু রয়েছে, তা সব ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই সমস্ত কথা চিন্তা করতে আমাদের ভাল না লাগতে পারে– সেইগুলি অত্যন্ত অপ্রীতিকর– কিন্তু তাই ঘটতে চলেছে।
‘সত্যং গৃহ্যাৎ প্রিয়ম্ গৃহ্যান্ মা প্রিয়ঃ সত্যম্ প্রিয়ম্’– সামাজিক রীতি হচ্ছে তুমি যদি সত্য কথা বলতে চাও, তা হলে তা যেন প্রীতিকরভাবে বলা হয়। কিন্ত আমরা সামাজিকতা করি না। আমরা ভগবানের সেবক, ভগবানের বাণীর প্রচারক, এবং আমাদের সত্যি কথা বলতেই হবে, তা সেটা আপনাদের কাছে প্রীতিকর হোক্ বা না হোক্।
ভগবদ্বিহীন সমাজ কখনও সুখী হতে পারে না। সেটি হচ্ছে বাস্তব সত্য। তাই আমরা এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের সূচনা করেছি যাতে মানুষের হৃদয়ে ভগবৎ-চেতনার উন্মেষ হয়। দয়া করে ভগবানকে ভালবাসার চেষ্টা করুন; সেটিই আমাদের সরল অনুরোধ। প্রেম আপনার হৃদয়ে রয়েছে– কাউকে না কাউকে আপনারা ভালবাসতে চান। একজন যুবক চায় একজন যুবতীকে ভালবাসতে, আর যুবতী চায় কোন যুবককে ভালবাসতে। সেটি স্বাভাবিক, কারণ সকলের হৃদয়ে ভালবাসার প্রবৃত্তি রয়েছে। কিন্ত আমরা এমন একটি পরিবেশের সৃষ্টি করেছি, সেখানে আমাদের ভালবাসা নিরাশ হচ্ছে। সকলেই নৈরাশ্যগ্রস্ত– স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে- সকলেই। সর্বত্রই নৈরাশ্য, কারণ আমাদের ভালবাসার প্রবৃত্তি যথাযথ বিকশিত হচ্ছে না। কেন ? কেননা, আমরা পরমেশ্বর ভগবানকে ভালবাসতে ভুলে গেছি। সেটিই আমাদের রোগ।
তাই প্রতিটি ধর্মেরই উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে– ভগবানকে ভালবাসতে শিক্ষা দেওয়া। সেটিই হচ্ছে সমস্ত ধর্মের উদ্দেশ্য। আপনি খ্রিস্টানই হোন বা হিন্দু হোন বা মুসলমান হোন, আপনার ধর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবানকে ভালবাসতে শিক্ষা দেওয়া, কেননা সেটিই হচ্ছে আপনার স্বরূপগত বৃত্তি-আপনার স্বভাব।
শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধে (১/২/৬) বলা হয়েছে, স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে। সাধারণত মানুষ ধর্মকে এক ধরনের বিশ্বাস বলে মনে করে। কিন্তু ধর্ম কথাটির প্রকৃত অর্থ হচ্ছে “স্বাভাবিক বৃত্তি। ” যেমন, চিনির ধর্ম বা স্বাভাবিক বৃত্তি হচ্ছে মিষ্টতা। আপনাকে যদি কতকগুলি সাদা পাওডার দেওয়া হয় এবং আপনি যদি তা দেখেন যে, তা মিষ্টি নয়, তাহলে আপনি তৎক্ষণাৎ বলবেন, “ও, এটা চিনি নয়, এটা অন্য কিছু। ” সুতরাং মিষ্টতা হচ্ছে চিনির ধর্ম। তেমনই লবণ হচ্ছে কটু, এবং লঙ্কা হচ্ছে ঝাল।
তা হলে আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিটি কি ? আমরা হচ্ছি চিন্ময় জীব, এবং আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি যে কি, সেটি আমাদের জানা উচিত। সেই প্রবৃত্তিকেই বলা হয় ধর্ম– তবে সেই ধর্ম খ্রিষ্ট ধর্ম, হিন্দু ধর্ম, অমুক ধর্ম, তমুক ধর্ম নয়– আমাদের নিত্য বৃত্তি হচ্ছে আমাদের ধর্ম।
আর সেই ধর্মটি কি ? আমাদের সেই স্বাভাবিক ধর্মটি হচ্ছে, আমরা কাউকে ভালবাসতে চাই, এবং তাই আমরা তার সেবা করত চাই। সেটিই হচ্ছে আমাদের ধর্ম, সেটিই হচ্ছে আমাদের সত্তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আপনারা আপনাদের আত্মীয়-স্বজনদের ভালবাসেন, আপনাদের দেশকে ভালবাসেন। আর যেহেতু আপনারা তাদের ভালবাসেন, সেই জন্য আপনারা তাদের সেবা করতে চান। ভালবাসার বশবর্তী হয়ে কারোর সেবা করার প্রবৃত্তিই হচ্ছে আপনাদের স্বভাব, আপনাদের ধর্ম। আপনি খ্রিস্টান হোন, মুসলমান হোন অথবা হিন্দু হোন, তাতে কিছু যায় আসে না, সেই প্রবৃত্তিটি স্বাভাবিকভাবেই আপনার মধ্যে থাকে। আজ আপনি খ্রিষ্টান হতে পারেন, তারপর কাল আপনি হিন্দু হয়ে যেতে পারেন, কিন্তু আপনার সেবা করার এই প্রবৃত্তি, ভালবাসার স্পৃহা আপনার মধ্যে সব সময়েই থাকবে। তাই প্রেম এবং সেবার প্রবৃত্তিই হচ্ছে আপনার ধর্ম। সেটিই হচ্ছে বিশ্বজনীন ধর্ম।
এখন, আপনার এই সেবা করার প্রবৃত্তি এমভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যার ফলে আপনি সম্পূণভাবে সন্তুষ্ট হতে পারেন। আপনার এই ভালবাসার প্রবৃত্তি যেহেতু আজ অপাত্রে অর্পণ করা হচ্ছে, তাই আপনি সুখী হতে পারছেন না। আপনি নিরাশ এবং বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। শ্রীমদ্ভাগবতে এই ভালবাসার প্রবৃত্তি পূর্ণরূপে কিভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে, তা বর্ণনা করা হয়েছে–
স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে।
অহৈতুক্যপ্রতিহতা যয়াত্মা সুপ্রসীদতি ॥
সেই ধর্মই হচ্ছে যথার্থ ধর্ম, যা আমাদের ভগবানকে ভালবাসতে শিক্ষা দেয়। সেই ধর্ম অনুশীলনের ফলেই আমরা সম্পূর্ণরূপে তৃপ্ত হতে পারি।
আমরা যখন সম্পূর্ণরূপে আমাদের ভগবৎ-প্রেম বিকশিত করতে পারি, তখনই আমাদের অস্তিত্ব স্বার্থক হয়। তখন আমরা আমাদের মধ্যে পূর্ণতা অনুভব করতে পারি। আমরা সকলেই তৃপ্তির অন্বেষণ করছি–পূর্ণ তৃপ্তির। কিন্তু সেই পূর্ণ তৃপ্তি লাভ করা যায় কেবল ভগবানকে ভালবাসার মাধ্যমে। ভগবানকে ভালবাসা প্রতিটি জীবের স্বাভাবিক ধর্ম। আপনি খ্রিস্টান হোন অথবা হিন্দু হোন অথবা মুসলমান হোন, তাতে কিছু যায় আসে না। আপনাদের সেই ভগবৎ-প্রেম বিকশিত করার চেষ্টা করুন। তা যদি করেন, তবে আপনি যথার্থ ধর্মের অনুশীলন করছেন। তা না হলে তথাকথিত সমস্ত ধর্ম অনুষ্ঠানের ফলে কেবল শ্রমেরই অপচয় হয় (শ্রম এব হি কেবলম্)। সারা জীবন ধরে নানা রকম আচার-অনুশীলন করার পর যদি ভগবৎ-প্রেম লাভ না করা যায়, তা হলে বুঝতে হবে যে, তাতে কেবল শ্রম ও সময়েরই অপচয় হয়েছে।
কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন হচ্ছে সমস্ত ধর্মের সর্বোচ্চ স্তর। আমরা খ্রিস্টানদের আহ্বান করছি, হিন্দুদের আহ্বান করছি– সকলকে আহ্বান করছি– তাঁরা যেন দয়া করে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং ভগবানকে ভালবাসতে চেষ্টা করেন। এই পন্থাটি অত্যন্ত সরল– কেবল ভগবানের নাম– হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে– কীর্তন করা।
আমার অধিকাংশ শিষ্যরাই আমেরিকান, এবং তারা হয় খ্রিস্টান, নয়তো ইহুদী পরিবার থেকে এসেছে। তাদের কেউই হিন্দু পরিবার থেকে আসেনি। সুতরাং তাদের ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করার যে পন্থা আমি প্রদর্শণ করিয়েছি– সেটা বিশ্বজনীন। তা হিন্দু অথবা ভারতীয় নয়।
‘মন্ত্র’ কথাটি ‘মন’ এবং ‘ত্র’ এই দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। তার অর্থ হচ্ছে, যা আমাদের মনকে ত্রাণ করে। তাই আপনি যদি এই মন্ত্র– হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে– কীর্তন করেন, তা হলে অচিরেই আপনি বুঝতে পারবেন যে, আপনি অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন।
আমি আর আপনাদের অধিক সময় নিতে চাই না। কেবল ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করার গুরুত্ব সম্বন্ধে আপনাদের বোঝাতে চাই। আপনারা পরীক্ষা করে দেখুন– এক সপ্তাহ ধরে এই ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করুন, এবং নিজেরাই দেখুন কতখানি পারমার্থিক উন্নতি আপনি লাভ করেছেন। আমরা সেই জন্য কোন পয়সা চাই না, সুতরাং তাতে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু তাতে এক মহৎ লাভ আছে, আমরা তা হলপ করে বলতে পারি। তাই দয়া করে– হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে– কীর্তন করুন এবং সুখী হন।
অসংখ্য ধন্যবাদ।