আমাদের এই কৃষ্ণভাবনামৃত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার জন্য আপনাদের সকলকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনাদের সংস্থাটির নাম ইন্টারন্যাশানাল স্টুডেন্টস্ সোসাইটি (আন্তর্জাতিক ছাত্র সংঘ) আন্তর্জাতিক সংঘ বহু রয়েছে। যেমন, রাষ্ট্রসংঘ। এই রকম আন্তর্জঅতিক সংঘ তৈরা করাটা খুবই ভাল, তবে আমাদের জানতে হবে, আন্তর্জাতিক সংঘের মূল ভাবধারাটি কি হওয়া উচিত– কাকে কেন্দ্র করে এই আন্তর্জাতিক সংঘ গড়ে তোলা উচিত।
আপনি যদি পুকুরে একটি পাথরের নুড়ি ছোঁড়েন, তার ফলে কতকগুলি ঢেউয়ের বৃত্ত সৃষ্টি হবে। এই বৃত্তগুলি পুকুরের পাড় পর্যন্ত ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হতে থাকবে। বেতার তরঙ্গও এইভাবে বৃত্তাকারে প্রসারিত হয়, এবং সেই তরঙ্গ যখন আপনি বেতারগ্রাহক যন্ত্র রেডিওতে ধরেন, তখন তা আপনি শুনতে পান। সেইভাবে আমাদের প্রেমের অনুভূতিও প্রসারিত হয়।
আমাদের জীবনের শুরুতে আমরা কেবল খেতে চাই। একটি শিশু যা পায়, তাই সে খেতে চায়। সে তখন কেবল তার স্বার্থ চিন্তাতেই মগ্ন থাকে। তারপর শিশুটি যখন ধীরে ধীরে একটু বড় হয়, তখন সে তার ভাই-বোনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার চেষ্টা করে– “ঠিক আছে। তুমিও একটু নাও। ” এটি ভ্রাতৃত্ববোধের প্রসার। তারপর সে যখন আরও বড় হয়, তখন সে তার মা-বাবাকে ভালবাসতে শুরু করে, তারপর তার সেই ভালবাসা প্রসারিত হয় তার আত্মীয়-স্বজনদের প্রতি, তারপর তার সমাজের প্রতি, তারপর তার দেশের প্রতি এবং অবশেষে সব কয়টি জাতির প্রতি। কিন্তু তার সেই ভালবাসার প্রসারের কেন্দ্রটি যদি ঠিক না হয়, তা হলে তার সেই অনুভূতির বিস্তার– তা জাতীয়ই হোক অথবা আন্তর্জাতিক হোক– তা কখনও পূর্ণ হবে না।
দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, জাতীয় কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘কোন বিশেষ দেশে যার জন্ম হয়েছে। ’ আপনারা অন্য আমেরিকাবাসীদের প্রতি সহানুভূতি অনুভব করেন, কারণ তাঁরাও এই দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন। আপনাদের দেশের লোকদের জন্য আপনারা প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করতে রাজী থাকেন। কিন্তু তাতে একটি গলদ রয়েছে; জাতীয় কথাটির অর্থ যদি কোন বিশেষ দেশে জন্মগ্রহণ করা হয়, তা হলে আমেরিকাতে যে-সমস্ত পশুদের জন্ম হয়েছে, তাদেরও আমেরিকান বলে গণ্য করা উচিত। কিন্তু তা তো হচ্ছে না। আমাদের সমস্যাটি হচ্ছে, আমরা মানব-সমাজের গন্ডীর বাইরে আমাদের প্রেম প্রসারিত করছি না, আমরা যেহেতু পশুদেরও আমাদের দেশবাসী বলে মনে করছি না, তাই কসাইখানায় তাদের নির্দয়ভাবে হত্যা করতে আমাদের একটুও অনুশোচনা হয় না।
এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, আমাদের জাতীয় ভাবধারা অথবা আন্তর্জাতিক ভাবধারা যথাযথ ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। কেন্দ্রটি যদি ঠিক থাকে, তা হলে তার চারপাশে অসংখ্য বৃত্ত সৃষ্টি হতে পারে। সেই বৃত্তগুলির পরস্পর কোন সংঘর্ষ হয় না। তারা ক্রমান্বয়ে বর্ধিত হতে পারে। তাদের কেন্দ্রটি যদি ঠিক থাকে, তা হলে কখনও তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হবে না। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত যদিও সকলেই জাতীয়তাবোধ অথবা আন্তর্জাতীয়তাবোধের দ্বারা অনুপ্রাণিত হচ্ছে, কিন্তু তাদের কেন্দ্রটির কোন ঠিক নেই। তাই আপনার আন্তর্জাতীয়তাবোধের সঙ্গে আমার আন্তর্জাতীয়তাবোধের সংঘর্ষ হচ্ছে, আপনার জাতীয়তাবোধের সঙ্গে আমার জাতীয়তাবোধের সংঘর্ষ হচ্ছে।
তাই আমাদের সেই কেন্দ্রবন্দিুটি খুঁজে পেতে হবে, যাকে কেন্দ্র করে আমাদের ভালবাসার অনুভূতিগুলি প্রসারিত হবে। তখন আপনার ভালবাসার পরিধি যতদূর ইচ্ছা প্রসারিত করতে পারেন, তখন আর কোন সংঘর্ষ হবে না। সেই কেন্দ্রটি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ।
আমাদের এই সংস্থাটি, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ, সমস্ত দেশের মানুষদের শিক্ষা দিচ্ছে যে তাদের ভালবাসার কেন্দ্র হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ। অর্থাৎ, আমরা মানুষকে মহাত্মা হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি। আপনার নিশ্চয়ই এই ‘মহাত্মা’ শব্দটি আগে শুনেছেন। এই সংস্কৃত শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘যার চেতনা অত্যন্ত প্রসারিত– যার অনুভূতির বৃত্ত বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত।’ ‘মহা’ কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘বৃহৎ’ অথবা ‘মহান’। সুতরাং ‘মহাত্মা’ কথাটির অর্থ হচ্ছে ‘ যাঁর আত্মার অনুভূতি বা চেতনা বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত।’
মহাত্মার বর্ণনা ভগবদ্গীতায় (৭/১৯) বলা হয়েছে,–
বহূনাং জন্মনামন্তে জ্ঞানবান্ মাং প্রপদ্যতে।
বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্লভঃ ॥
এই শ্লোকটিতে বলা হচ্ছে যে, বহু বহু জন্মের পর মহাত্মা হওয়া যায় (বহূনাং জন্মনামন্তে)। আত্মা এক দেহ থেকে আরেক দেহে দেহান্তরিত হচ্ছে। চুরাশি লক্ষ বিভিন্ন দেহ (প্রজাতি) রয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে এক দেহ থেকে আরেক দেহে বিবর্তনের মাধ্যমে অবশেষে আমরা মনুষ্যদেহ প্রাপ্ত হই। তখনই কেবল আমরা মহাত্মা হতে পারি। তাই শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, বহূনাং জন্মনামন্তে– বহু বহু জন্মের পর মহাত্মা হওয়া যায়।
শ্রীমদ্ভাগবতে এইরকম একটি শ্লোক রয়েছে- লব্ধা সুদুর্লভমিদং বহু সম্ভবান্তে– ‘বহু বহু জন্মের পর এই সুদুর্লভ মনুষ্য-জন্ম তুমি লাভ করেছ। ’ মনুষ্য-জীবন এত সহজলভ্য নয়। কুকুর, বেড়াল প্রভৃতি পশুদের শরীর অত্যন্ত নিচু স্তরের, কিন্তু এই মনুষ্য শরীর নিচু স্তরের নয়। অন্তত আশী লক্ষ বিভিন্ন শরীর জন্ম গ্রহণ করার পর আমরা এই মনুষ্য-শরীর প্রাপ্ত হই। তাই শ্রীমদ্ভাগবত এবং ভগবদ্গীতা সেই একই কথা আমাদের বলেছেন। সব কটি বৈদিক শাস্ত্রই পরস্পরকে সমর্থন করছে। তাই যিনি তা বোঝেন, তাঁর কাছে আর কোন রকম মতবিরোধ থাকে না।
সুতরাং বহু জন্ম-জন্মান্তরের পর অবশেষে মনুষ্য-শরীর লাভ করা যায়। কিন্তু এই মনুষ্য-শরীর পাওয়ার পরেও আমাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু সম্বন্ধে বহু জন্ম-জন্মান্তর ধরে জ্ঞান অর্জন করতে হয়। কেউ যখন যথার্থভাবে পারমার্থিক জ্ঞান লাভের অনুশীলন করেন, তখন কেবল এক জন্মে নয়, বহু বহু জন্মের পর– অবশেষে চরম জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে জ্ঞানবান হওয়া যায়। অর্থাৎ, প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায়। তারপর শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রপদ্যতে– ‘সে আমার, অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণে বা ভগবানের শরণাগত হয়। ’ শ্রীকৃষ্ণ বলতে আমি সর্বাকর্ষক পরমেশ্বর ভগবানকে বোঝাই।
যথার্থ জ্ঞান লাভ করার পর মানুষ কেন শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হয় ? বাসুদেবঃ সর্বমিতি- কারণ তিনি তখন জানতে পারেন যে, বাসুদেব, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সব কিছু– তিনিই হচ্ছেন সমস্ত প্রেমের কেন্দ্র। তারপর, স মহাত্মা সুদুর্লভঃ– এখানে ‘মহাত্মা’ কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। বহু জন্ম-জন্মান্তর ধরে যথার্থ জ্ঞান অর্জন করার পর চেতনা উন্নত হতে হতে মানুষ ভগবানকে ভালবাসার স্তরে উপনীত হয়–তখন তিনি ‘মহাত্মা’ পদবাচ্য হন এবং এই ধরনের মহাত্মা অত্যন্ত দুর্লভ। ভগবান মহান এবং তাঁর ভক্তরাও মহান। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, স মহাত্মা সুদুর্লভঃ–সেই ধরনের মহাত্মা সচরাচর দেখা যায় না। ভগবদ্গীতায় মহাত্মা সম্বন্ধে এই বর্ণনাটি আমরা পাচ্ছি।
এখন আমরা আমাদের অন্তরের স্বাভাবিক প্রেমকে বিভিন্ন বস্তুতে প্রসারিত করেছি। আমরা আমাদের দেশকে ভালবাসতে পারি, আমরা আমাদের সমাজকে ভালবাসতে পারি, আমরা আমাদের পরিবারকে ভালবাসতে পারি, আমরা আমাদের কুকুর বেড়ালকে ভালবাসতে পারি। আমাদের মধ্যে ভালবাসা রয়েছে এবং আমাদের জ্ঞান অনুসারে আমরা তা প্রসারিত করি। আমাদের জ্ঞান যখন পূর্ণ হয়, আমরা যখন শ্রীকৃষ্ণকে ভালবাসতে শুরু করি, তখনই আমাদের জীবন সার্থক হয়। সমস্ত কার্যকলাপের চরম লক্ষ্য, জীবনের চরম লক্ষ্য হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণপ্রেম। শ্রীকৃষ্ণই যে জীবনের পরম লক্ষ্য, সেই সম্বন্ধে শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে–
ধর্মঃ স্বনুষ্ঠিতঃ পুংসাং বিষ্বক্সেনকথাসু যঃ।
নোৎপাদয়েৎ যদি রতিং শ্রম এব হি কেবলম্ ॥
এই শ্লোকের প্রথম বক্তব্য হচ্ছে, ধর্মঃ স্বনুষ্ঠিতঃ পুংসাং– অর্থাৎ সকলেই তার অবস্থা অনুযায়ী তার কর্তব্য করে চলেছে। গৃহস্থদের এক রকমের কর্তব্য রয়েছে, সন্ন্যাসীদের আরেক রকম কর্ত্যব্য রয়েছে, ব্রহ্মচারীদের আবার আরেক রকম কর্তব্য রয়েছে। বিভিন্ন বৃত্তি এবং পেশা অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন রকমের কর্তব্য রয়েছে। কিন্তু শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হচ্ছে, খুব ভালভাবে কর্তব্যগুলি সম্পাদন করেও যদি শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অনুরাগের উদয় না হয়, তা হলে যা করা হয়েছে, তা সবই পন্ডশ্রম (শ্রম এব হি কেবলম্)। সুতরাং আপনারা যদি আপনাদের জীবন সার্থক করতে চান, তা হলে আপনাদের শ্রীকৃষ্ণকে জানতে হবে এবং তাঁকে ভালবাসতে হবে। তখন আপনাদের জাতীয়তাবোধ অথবা আন্তর্জাতীয়তাবোধ তার চরম সীমা পর্যন্ত প্রসারিত হবে।
অনেক সময় অনেকে দাবি করে যে, তারা সকলকে ভালবাসে– তাদের ভালবাসা বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু এটা তো কেবল মুখের কথা নয়, তার লক্ষণগুলির মাধ্যমে বোঝা যায় যে, কার ভালবাসা কতদূর পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছে। সেই সম্বন্ধে শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্্গীতায় বলেছেন–
বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পন্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ ॥
(ভগবদ্গীতা ৫/১৮)
কেউ যদি যথার্থই পন্ডিত হন- পূর্ণজ্ঞান লাভ করে থাকেন, তাহলে তিনি সকলের প্রতি সমদৃষ্টি-সম্পন্ন হবেন (সমদর্শিনঃ)। কারণ পন্ডিতের দৃষ্টি কেবল দেহের উপরেই সীমাবদ্ধ নয়, তিনি দেহের উর্ধ্বে আত্মাকে দর্শন করেন। তিনি একজন ব্রাহ্মণকে আত্মারূপে দর্শন করেন, তিনি একটি কুকুরকে আত্মারূপে দর্শণ করেন, তিনি একটি হস্তীকে আত্মারূপে দর্শণ করেন, এমন কি তিনি একটি নীচ-কুলোদ্ভুত মানুষকেও আত্মারূপে দর্শন করেন। উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে চন্ডাল পর্যন্ত, মানব সমাজে বহু সামাজিক শ্রেণীবিভাগ রয়েছে, কিন্তু কেউ যদি যথার্থই পন্ডিত হন, তা হলে তিনি সকলকে, প্রতিটি জীবকে, সমদৃষ্টিতে দেখেন। সেটিই হচ্ছে যথার্থ জ্ঞান।
আমরা সামাজিকভাবে, সাম্প্রদায়িকভাবে, জাতীয়ভাবে, আন্তর্জাতীয়ভাবে অথবা বিশ্বজনীনভাবে আমাদের ভাবধারার প্রসার করার চেষ্টা করছি। আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হচ্ছে, আমাদের চেতনার বিস্তার করা। কিন্তু আমার বক্তব্য হচ্ছে, আমরা যদি আমাদের চেতনাকে চরম স্তর পর্যন্ত প্রসারিত করতে চাই, তা হলে অস্তিত্বের যথার্থ কেন্দ্রবিন্দুটিকে আমাদের খুঁজে নিতে হবে। সেই কেন্দ্রটি হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ বা ভগবান। শ্রীকৃষ্ণ যে ভগবান তা আমরা জানলাম কি করে ? ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেই ঘোষণা করে গেছেন যে– তিনি হচ্ছেন ভগবান। একটি জিনিস আপনারা দয়া করে মনে রাখবেন যে, এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের ভিত্তি হচ্ছে ভগবদ্গীতার যথাযথ জ্ঞান। আমি যা বলছি তা ভগবদ্গীতারই কথা। দূর্ভাগ্যবশত আজ তথাকথিত বহু ভাষ্যকারেরা ভগবদ্গীতার কদর্থ করে প্রচার করছে। ফলে, মানুষ বুঝতে পারছে না, ভগবদ্গীতার মূল তত্ত্বটি কি। প্রকৃতপক্ষে, ভগবদ্গীতার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবদ্-চেতনার বিকাশ করা, শ্রীকৃষ্ণের প্রতি আমাদের স্বাভাবিক প্রেম বিকশিত করা, এবং সেই শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টাই আমরা করছি।
ভগবদ্গীতার কয়েক জাযগায় শ্রীকৃষ্ণ ‘মহাত্মা’ কথাটির বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেছেন–
মহাত্মানস্তু মাং পার্থ দৈবীং প্রকৃতিমাশ্রিতাঃ।
‘যিনি যথার্থই মহাত্মা, তিনি সর্বদাই আমার দৈবী প্রকৃতির আশ্রয়ে অবস্থান করেন। ’ তিনি তখন আর জড়া প্রকৃতির প্রভাবে মোহাচ্ছন্ন থাকেন না। ’
আমরা যা কিছু দেখছি, সবই ভগবানের বিভিন্ন শক্তির প্রকাশ। উপনিষদে বলা হয়েছে, পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রুয়তে– ‘পরমেশ্বর ভগবানের শক্তি বিভিন্নরূপে প্রকাশিত হয়। ’ এবং এই সমস্ত শক্তিগুলি এত সুন্দরভাবে কাজ করছে যে, তা দেখে মনে হয়, তারা যেন আপনা থেকেই কার্যকরী হয়েছে– স্বাভাবিকী জ্ঞান-বল ক্রিয়া চ। যেমন, আমরা সকলেই ফুল ফুটতে দেখি। আমাদের মনে হতে পারে যে, সেইগুলি আপনা থেকেই এত সুন্দরভাবে ফুটছে। কিন্তু না, ভগবানের জড়া প্রকৃতি তার পিছনে কাজ করছে।
তেমনই, শ্রীকৃষ্ণের পরা প্রকৃতি রয়েছে, এবং যিনি মহাত্মা তিনি সেই পরা প্রকৃতির আশ্রয়ে রয়েছেন, তিনি আর জড়া প্রকৃতির দ্বারা মোহাচ্ছন্ন নন। এই সব কিছুই ভগবদ্গীতায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ভগবদ্গীতায় বহু শ্লোক রয়েছে, যার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণের শক্তি যে কিভাবে কাজ করে, তার বর্ণনা করা হয়েছে, এবং আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ভগবদ্গীতার জ্ঞান বিকৃত না করে যথাযথভাবে দান করা। মনগড়া কতকগুলি অর্থহীন ভাষ্যের কি প্রয়োজন ? ভগবদ্গীতা সূর্যোলোকের মতো স্পষ্ট। সূর্যকে দেখবার জন্য যেমন প্রদীপের প্রয়োজন হয় না, তেমনই ভগবদ্গীতার মর্ম উপলব্ধি করার জন্য কতকগুলি মূর্খ প্রবঞ্চকের ভাষ্যের প্রয়োজন হয় না। ভগবদ্গীতার যথাযথ অর্থ হৃদয়ঙ্গম করে ভগবদ্গীতা পাঠ করা উচিত, তা হলেই দিব্য জ্ঞান লাভ করা যায়। তখনই যথার্থ জ্ঞানী হওয়া যায় এবং ভগবানকে– শ্রীকৃষ্ণকে জানা যায়। তখনই আমরা ভগবানের শরণাগত হয়ে মহাত্মায় পরিণত হতে পারি।
মহাত্মাদের কার্যকলাপ কি রকম ? মহাত্মা শ্রীকৃষ্ণের পরা প্রকৃতির আশ্রিত। কিন্তু এই আশ্রয়ের লক্ষণটি কি রকম। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, মাং ভজন্ত্যনন্যমনসো– ‘মহাত্মা সর্বদাই ভক্তি সহাকারে আমার সেবায় যুক্ত। ’ সেটিই হচ্ছে মহাত্মার মূখ্য লক্ষণ- তিনি সর্বদাই শ্রীকৃষ্ণের সেবায় যুক্ত। তিনি কি তা হলে অন্ধের মতো তাঁর কার্যকলাপ করে চলেন ? না। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, জ্ঞাত্বা ভূতাদিম্যব্যয়ম্– ‘তিনি পূর্ণরূপে জানেন যে, আমিই হচ্ছি সব কিছুর উৎস। ’
ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ সব কিছু বিশ্লেষণ করেছেন; আর আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের মাধ্যমে ভগবদ্গীতার জ্ঞান অবিকৃতভাবে সর্বত্র বিতরণ করা। তা হলে এই জ্ঞানের মাধ্যমে মানব সমাজ উপকৃত হবে। এখন সামাজিক অবস্থা খুবই খারাপ। কিন্তু মানুষ যদি ভগবদ্গীতার তত্ত্ব-জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করে, প্রকৃতপক্ষে উদার দৃষ্টিভঙ্গি-সম্পন্ন হতে পারে, তা হলে সব রকম সামাজিক, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলির সমাধান হয়ে যাবে। তখন আর কোন অসুবিধা থাকবে না। কিন্তু আমরা যদি আমাদের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু সম্বন্ধে অজ্ঞ থেকে আমাদের হৃদয়ের ভালবাসা প্রসারিত করবার জন্য কতকগুলি মনগড়া পন্থা সৃষ্টি করি, তা হলে কেবল সংঘাতেরই সৃষ্টি হয়–কেবল দেশে দেশেই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগুলির মধ্যেও। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগুলি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে; আপনাদের দেশেও United Nations রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, তার মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে পতাকাগুলিই কেবল বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেমন, এক সময় ভারতবর্ষ একটি দেশ ছিল, কিন্তু আজ সেটি বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছে, কয়েকদিন পরে হয়ত একটি শিখীস্তান হবে, তারপর আরও কত ‘স্তান’ হবে।
ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে তারা বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে, কারণ কেন্দ্রবিন্দুটি আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তাই আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ হচ্ছে, আপনারা যেহেতু আন্তর্জাতিক ছাত্র, তাই আপনারা আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবধারার মূল কেন্দ্রবিন্দুটিকে খুঁজে নিতে চেষ্টা করুন। যথার্থ আন্তর্জাতিক ভাবধারা তখনই সম্ভব হবে, যখন আপনারা বুঝতে পারবেন যে, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সব কিছুর কেন্দ্র। তখন আপনাদের আন্তর্জাতিক আন্দোলন সার্থক হবে। ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন–
সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ।
তাসাং ব্রহ্ম মহদ্যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা ॥
(ভগবদ্গীতা ১৪/৪)
শ্রীকৃষ্ণ এখানে বলছেন, “আমি হচ্ছি সমস্ত জীবের বীজ-প্রদানকারী পিতা। ” পিতা এবং মাতা ছাড়া কারোরই জন্ম হতে পারে না। পিতা বীজ প্রদান করেন এবং মাতা দেহ দান করেন। এই জগতে ব্রহ্মা থেকে শুরু করে একটি পিপীলিকা পর্যন্ত সকলেরই মাতা হচ্ছেন জড়া প্রকৃতি। আমাদের দেহটি হচ্ছে জড় পদার্থ; তাই সেটি আমাদের মাতা জড়া প্রকৃতির দান। কিন্তু ‘আমি’, আত্মা, হচ্ছে পরম পিতা শ্রীকৃষ্ণের অংশ। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ –‘সমস্ত জীবই হচ্ছে আমার অংশ। ’
তাই আপনারা যদি আপনাদের স্বজাতীয়তাবোধ চরম সীমা পর্যন্ত প্রসারিত করতে চান, তা হলে ভগবদ্গীতার জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করার চেষ্টা করুন। আপনারা তা হলে দিব্যজ্ঞান উপলব্ধি করতে পারবেন। আপনারা তখন যথার্থ মহাত্মায় পরিণত হতে পারবেন। তখন আপনারা কুকুর, বেড়াল, এমনকি সরীসৃপদের প্রতিও প্রেম অনুভব করবেন। শ্রীমদ্ভাগবতের সপ্তম স্কন্ধে নারদ মুনি বলেছেন, কারও বাড়িতে যদি একটি সাপও থাকে, তা হলে তার কর্তব্য হচ্ছে তাকে কিছু খেতে দেওয়া। তা হলে দেখুন, আপনার সহানুভূতি কতদুর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। একটি সাপের প্রতিও তখন আপনি করুণা প্রদর্শন করেন, তা হলে অন্যান্য দন্ড এবং মানুষদের প্রতি আপনি যে কতটা সহানুভূতি-সম্পন্ন হবেন, সেটি সহজেই অনুমেয়।
যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারছি, ততক্ষণ আমরা দিব্যজ্ঞান লাভ করতে পারি না। তাই আমরা সমস্ত পৃথিবী জুড়ে এই কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচার করছি। এই কৃষ্ণভাবনামৃত নতুন কোন আন্দোলন নয়। আমি আগেই বলেছি তা ভগবদ্গীতার তত্ত্বজ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত; এবং ভগবদ্গীতা হচ্ছে অতি প্রাচীন এক শাস্ত্র-গ্রন্থ। ঐতিহাসিক দিক দিয়ে তা পাঁচ হাজার বছরের পুরানো। আর প্রাগৈতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে তা লক্ষ লক্ষ বছরের প্রাচীন। ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্– ‘এই অতি প্রাচীন জ্ঞান আমি প্রথম সূর্যকে দান করেছিলাম। ’ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণ প্রথম ভগবদ্্গীতা শুনিয়েছিলেন কয়েক কোটি বছর আগে। কিন্তু ঐতিহাসিক দিক দিয়ে দেখতে গেলে ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছিলেন কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। সুতরাং সেদিক দিয়ে দেখতে গেলেও এই ভগবদ্গীতা হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত শাস্ত্র-গ্রন্থের মধ্যে প্রাচীনতম।
ভগবদ্গীতাকে যথাযথভাবে জানবার চেষ্টা করুন। অর্থহীন কতকগুলি ভাষ্যের কোন প্রয়োজন নেই। আপনারা যদি দিব্য জ্ঞান লাভ করতে চান, তা হলে সেইজন্য ভগবদ্গীতার বাণীই যথেষ্ট। কিন্তু আজ দুর্ভাগ্যবশত ভগবদ্গীতার জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে, কিছু মানুষ তার মাধ্যমে তাদের মনগড়া দর্শন চালাবার চেষ্টা করছে। সেটি সম্পূর্ণ অর্থহীন। ভগবদ্গীতা যথাযথভাবে জানবার চেষ্টা করুন। তা হলেই আপনি দিব্য জ্ঞান লাভ করতে পারবেন; তখনই আপনারা জানতে পারবেন যে, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সমস্ত কার্যকলাপের কেন্দ্রীভূত কারণ। আর আপনারা যদি কৃষ্ণভাবনার অমৃত লাভ করেন, তা হলে সব কিছুই পূর্ণ হয়ে উঠবে এবং সমস্ত সমস্যার সমাধান হবে।
আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এই সম্পর্কে কারও যদি কোন প্রশ্ন থাকে, তা হলে প্রশ্ন করতে পারেন।
জনৈক ভারতীয় ছাত্রঃ ভগবদ্গীতার সেই শ্লোকটি আমার জানা নেই। তবে এক জায়গায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “সমস্ত পথই আমাতে এসে মিশেছে। মানুষ যাই করুক, যে মতই পোষণ করুক, যে রকম কার্যকলাপেই লিপ্ত থাকুক, অবশেষে সে আমার কাছেই ফিরে আসবে। ” সুতরাং পরম তত্ত্ব-জ্ঞান কি স্বাভাবিকভাবে লাভ করা যায় ?
শ্রীল প্রভুপাদঃ শ্রীকৃষ্ণ কখনও বলেননি যে, তুমি যা কর, তুমি যে মতই পোষণ কর, তুমি অবশেষে স্বাভাবিকভাবেই আমার কাছে ফিরে আসবে। কৃষ্ণভাবনায় ভাবিত হওয়া অথবা ভগবত্তত্ত্বজ্ঞান লাভ করা বদ্ধ জীবের পক্ষে স্বাভাবিক নয়। সেইজন্য সদ্গুরুর কাছে শিক্ষা লাভ করার প্রয়োজন হয়। তা না হলে শ্রীকৃষ্ণ কেন অর্জুনকে ভগবদ্গীতা শুনিয়েছিলেন ? জ্ঞান অর্জন করতে হয় উন্নত জ্ঞানসম্পন্ন কোন ব্যক্তির কাছ থেকে, তাঁর নির্দেশ অনুসারে অনুশীলন করার মাধ্যমে।
অর্জুন মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন। যিনি বুঝতে পারছিলেন না তাঁর কি করা উচিত এবং কি করা উচিত নয়। তেমনই, এই জগতে প্রতিটি জীবই মোহাচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। তাই শ্রীকৃষ্ণ এবং তার প্রতিনিধি গুরুদেবের কাছ থেকে নির্দেশ প্রাপ্ত হতে হয়। তখনই আমরা দিব্যজ্ঞান লাভ করতে পারি।
মনুষ্যেতর জীবেদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই বিবর্তনের মাধ্যমে চেতনার উন্নতি হয়। কিন্তু মনুষ্য-শরীর লাভ করার পর আমরা আমাদের ইচ্ছামতো কাজ করার স্বাধীনতা লাভ করি। আপনি যদি শ্রীকৃষ্ণকে পেতে চান, তা হলে শ্রীকৃষ্ণের দিকে যেতে পারেন; আর আপনি যদি অন্য কিছু চান, তা হলে সেইদিকে যেতে পারেন। সেটি নির্ভর করবে আপনার বিবেচনার উপর।
সকলেরই ক্ষুদ্র স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। ভগবদ্গীতার শেষে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ– ‘সব রকম তথাকথিত ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। ’ (ভগবদ্গীতা ১৮/৬৬)। এই শরণাগতি যদি স্বাভাবিক হত, তা হলে শ্রীকৃষ্ণ কেন সেই কথা বললেন, “তোমার এটি করা উচিত। ” না, এই জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ জীবের পক্ষে শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত হওয়াটা স্বাভাবিক নয়। সেটি আমাদের শিখতে হবে। তাই আমাদের শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর আদর্শ প্রতিনিধি সদ্গুরুর মুখ-নিঃসৃত বাণী শ্রবণ করতে হবে, তাঁর সেই আদেশ অনুসরণ করতে হবে। তার ফলে আমরা দিব্যজ্ঞান লাভ করতে পারব এবং অমৃতময় স্তরে অধিষ্ঠিত হতে পারব।