অদৃশ্য নিয়ন্তা

অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্।
অপরস্পরসম্ভূতং কিমন্যৎ কামহৈতুকম্॥
“অসুরেরা বলে যে, এই জগৎ অসত্য, এর কোন আশ্রয় নেই।  এবং এর নিয়ন্তা কোনো ঈশ্বর নেই–কামের প্রভাবে এর উৎপত্তি হয়েছে, এবং কাম ছাড়া এর আর কোন হেতু নেই।”                                                                             (ভগবদ্গীতা ১৬/৮)

এটিই হচ্ছে আসুরিক মতবাদ, অসত্যম্– তারা বলে যে, এই জড় জগৎ অসত্য।  জগৎ মিথ্যা।  জগৎ মানে হচ্ছে এই জড়া প্রকৃতি, তাকে অসুরেরা মিথ্যা বলে, কারণ তা গতিশীল, তা সর্বদাই পরিবর্তনশীল।  এটি সত্য যে, জড় জগতে সব কিছুরই পরিবর্তন হচ্ছে- ঠিক যেমন আপনারা দেখতে পান যে,  গাড়িগুলি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে চলেছে, সর্বক্ষণ অত্যন্ত কর্মব্যস্ত।  এই কক্ষপথে ভ্রমণ করছে।  এমন কি সূর্যও তার কক্ষপথে ভ্রমণ করছে।  সেই কক্ষপথে লক্ষ লক্ষ মাইল বেগে সূর্য ছুটে চলেছে।  তাই এই প্রকৃতিকে বলা হয় জগৎ– ‘গচ্ছতি ইতি জগৎ’– এই ব্রহ্মান্ডে সব কিছুই গতিশীল বা পরিবর্তনশীল।  কিন্তু তার গতি বা পরিবর্তন কোন বিশেষভাবে নির্ধারিত হয়।

যেমন, আমাদের ঘরের বাইরে রাস্তায় গাড়িগুলি প্রচন্ড গতিতে ছুটে চলেছে।  কিন্তু তারা অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে কোন বিশেষ পথ ধরে চলেছে; তা না হলে অন্য গাড়ির সাথে ধাক্কা লাগবে, দূর্ঘটনা ঘটবে।  তেমনই, এই সমস্ত গ্রহগুলি তাদের স্বীয় কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে, আর এই রকম লক্ষ কোটি গ্রহ রয়েছে– তারা তাদের কক্ষপথে প্রচন্ড বেগে ছুটি চলেছে, কিন্তু কোন দূর্ঘটন ঘটছে না।  এটি কি করে সম্ভব হচ্ছে ? ব্রহ্মান্ডের এই সমস্ত পথগুলি কে তৈরী করেছে ?

এখানে গাড়িগুলি ৬০ অথবা ৭০ মাইল বেগে চলছে এবং নির্দেশ দেওয়া আছে যে, লাইন টানা পথ ধরে তারা যাবে।  এই বন্দোবস্ত কে করেছে ? পুলিশ বিভাগ করেছে, সরকার করেছে।  সুতরাং আপনি যদি বলেন, এই গাড়িগুলির চলাচল কারোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে না, তা হলে সেটা আপনার নির্বুদ্ধিতা।  এটি একটি উপমা।  ‘উপমা’ কথাটির অর্থ হচ্ছে সাদৃশ্য প্রদর্শণ করে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া।  ঠিক যেমন আপনি দেখেছেন যে, রাস্তায় গাড়িগুলি দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে, কিন্তু তারা তাদের কক্ষপথে (সাদা আর হলুদ লাইন টানা পথে) চলছে, কারণ কোন বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন বিভাগ, কোন কর্তৃপক্ষ এই ভাবে গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রন করছে, যাতে কোন দূর্ঘটনা না ঘটে।  তেমনই, সমস্ত গ্রহগুলি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তাদের কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে, কারণ এই ব্রহ্মান্ডের কর্তৃত্বাধীনে তারা পরিচালিত হচ্ছে।

যেমন এই পৃথিবীর কথাই ধরুন, এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে।  তাই নয় কি? একটি গাড়ি ৭০ মাইল বেগে যখন চলে, তখন আমরা মনে করি সেটি কত জোরে চলছে, কিন্তু এই পৃথিবী তার থেকেও অনেক অনেক দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে।  কিন্তু আমরা সেটি বুঝতে পারছি না। এত সুন্দরভাবে সব কিছুর আয়োজন করা হয়েছে যে, আমাদের মনে হচ্ছে যেন আমরা এক জায়গায় বসে আছি।  আমরা যখন দেখি যে, সকাল হচ্ছে, তারপর দুপুর হচ্ছে- তখন আমরা বুঝতে পারি যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে।  এরোপ্লেনও চলে– কিন্তু তাতে কত ঝাঁকানি হয়, কত শব্দ হয়।  এরোপ্লেনগুলি নিখুঁত নয়।  কিন্তু প্রকৃতিতে আমরা দেখছি কত নিখুঁতভাবে সব কিছুর আয়োজন করা হয়েছে।  পৃথিবী প্রতি ঘন্টায় হাজার হাজার মাইল বেগে ছুটে চলেছে, কিন্তু তবুও তাতে কোন ঝাঁকানি নেই, কোন শব্দ নেই– আমাদের মনে হচ্ছে যেন আমরা এক  জায়গাতেই বসে আছি।  কিন্তু তবুও আপনারা বলেন যে, এই নিয়ন্ত্রণের পিছনে কোন বুদ্ধিমত্তা নেই ?

এই গ্রহে রাস্তা দিয়ে গাড়ির গতিবেগ নিয়ন্ত্রন করার জন্য কত বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয়– পুলিশের কত আয়োজন, কত সরকারীর বন্দোবস্ত, কত বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কত কিছু রয়েছে।  যস্য প্রভা প্রভবতো জগদন্ডকোটি।  এখানে কোটি কোটি ব্রহ্মান্ড রয়েছে এবং প্রতিটি ব্রহ্মান্ডে অসংখ্য গ্রহ রয়েছে। প্রতিটি গ্রহের আবহাওয়া ভিন্ন ধরনের।  এমন নয় যে, প্রতিটি গ্রহই একরকম।  আপনারা দেখবেন যে, বিভিন্ন গ্রহের বিভিন্ন আবহাওয়া রয়েছে।  যেমন, সূর্য হচ্ছে একটি আগ্নেয় গ্রহ, তার তাপমাত্রা এত প্রখর যে, নয় কোটি ত্রিশ লক্ষ মাইল দূরে থাকা সত্ত্বেও সূর্যের প্রচন্ড দহন আমরা অনুভব করতে পারি।  তেমনই আবার চন্দ্র হচ্ছে অত্যন্ত শীতল।  এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, বিভিন্ন গ্রহের বিভিন্ন আবহাওয়া রয়েছে, এবং তারা সকলেই তাদের কক্ষপথে পরিভ্রমণ করছে– এবং সেইজন্য নিশ্চয়ই একটি উন্নত নিয়ন্ত্রন-ব্যবস্থা রয়েছে।  এখন, আমরা যদি এই অতি উন্নত নিয়ন্ত্রন-ব্যবস্থা দেখা সত্ত্বেও বলি যে, তার পেছনে কোন নিয়ন্তা নেই, তাহলে সেটি কি খুব একটা বুদ্ধিমানের কথা হবে ?

রাক্ষস এবং অসুরেরা বলে, ‘অসত্যং অপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্’– “জগতের কোন নিয়ন্তা নেই এবং তা অসত্য। ” অসত্য ? এত নিখুঁতভাবে সমস্ত আইন-কানুনগুলি অনুসরণ করা হচ্ছে।  সূর্য এত নিখুঁতভাবে তার কক্ষপথে ভ্রমণ করছে যে, সূর্য যদি একদিকে একটু হেলে পড়ে, তা হলে এই পৃথিবীটা নিমিষের মধ্যে ভস্মীভূত হয়ে যাবে অথবা জমে বরফ হয়ে যাবে।  সেই কথা বৈজ্ঞানিকেরাও স্বীকার করে।  সুতরাং সূর্য নিশ্চয়ই কোন নিয়ন্তার পরিকল্পনা অনুসারে চলছে।  সেই কথা শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে।  ব্রহ্ম-সংহিতাতেও বলা হয়েছে, যস্যাজ্ঞয়া ভ্রমতি সংভৃত কালচক্রো।  পরমেশ্বর ভগবানের আজ্ঞা অনুসারে সূর্য তর কক্ষপথে ভ্রমণ করছে।  আজ্ঞয়া মনে হচ্ছে আদেশ।  যখনই আদেশের প্রশ্ন ওঠে, তখন আমরা বুঝতে পারি যে, তা হলে আদেশ প্রদানকারী নিশ্চয়ই কেউ রয়েছেন, তা না হলে আদশের কি অর্থ হল।  যস্য আজ্ঞয়া মানে হচ্ছে, যার আদেশে।  অর্থাৎ, সূর্যের থেকেও মহৎ কেউ আছেন, যিনি সূর্যকে আদেশ দিচ্ছেন এবং সূর্য তাঁর সেই আদেশ পালন করছে।  সুতরাং আদেশ-দাতা একজন নিশ্চয়ই রয়েছেন, তা হলে কিভাবে আপনারা বলেন যে, কোন নিয়ন্তা নেই ? সেই সম্বন্ধে আপনাদের কি যুক্তি রয়েছে ? আপনারা যে বলেন কোন নিয়ন্তা নেই, সেই সম্বন্ধে আপনারা কি কোনো যুক্তি প্রদর্শণ করতে পারেন ? অসুরেরা বলে যে, ভগবান নেই, কোন নিয়ন্তা নেই– কিন্তু তাদের যুক্তি কি ? আমি তাদের জিজ্ঞাসা করি, “আপনারা সেই কথা কিভাবে বলেন ? সেই সম্বন্ধে আপনাদের যুক্তি কি ? আপনারা যে বলেন ভগবান নেই, কোন্ যুক্তির প্রভাবে আপনারা সেই কথা বলেন ? আসুন, সেই নিয়ে আমরা আলোচনা করি। ”

এখানে আমি একজন বিদেশী হতে পারি, কিন্তু আমি যখন দেখি যে, রাস্তায় গাড়িগুলি অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে এবং পুলিশ পাহারা দিচ্ছে, তখন বুঝতে পারি যে, এই দেশে নিশ্চয়ই একটি সরকার রয়েছে।  আমি তা জানতে পারি বা না জানতে পারি, কিন্তু এটি হচ্ছে সাধারণ জ্ঞান।  তেমনই, আমি যখন দেখি এই জগতে সব কিছুই অত্যন্ত সুন্দরভাবে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তখন আমি কিভাবে বলতে পারি যে, তার পেছনে কোন নিয়ন্তা নেই, সেটি তা হলে কি ধরনের যক্তি হবে ? বৈজ্ঞানিকেরা বলে যে, কোন নিয়ন্তা নেই, ঈশ্বর নেই, জগদাহুরনীশ্বরম্।  কিন্তু তাদের যুক্তি কি ?

একটি নির্বোধ শিশু কেবল বলবে, “সব কিছু ঘটনাক্রমে প্রকাশিত হয়েছে। ” সেটি একটি নির্বোধ শিশুর কথা। কিন্তু আপনি যদি সেই কথা বলেন, তা হলে আপনাকে যথাযথ যুক্তি প্রদর্শণ করতে হবে।  যে কোন কিছুর সম্বন্ধেই আপনি বলতে পারেন, “ঘটনাক্রমে এর সৃষ্টি হয়েছে।  যে কেউ সেই কথা বলতে পারে, কিন্তু সেটি যুক্তিযুক্ত নয়।  আপনি যখনই ‘ঘটনাক্রমে’ কথাটির উল্লেখ করেন, তখনই সেটি সম্পূর্ণ যুক্তিহীন হয়ে যায়।  কেউ যদি বলে, “ঘটনাক্রমে আমি এই পৃথিবীতে এসেছি”, সেটি কোন যুক্তি নয়।  আপরার নিশ্চয়ই একজন পিতা আছে, নিশ্চয়ই একজন মাতা আছে, এবং আপনার পিতা-মাতার মিলনের ফলে আপনার জন্ম হয়েছে।  এটি হচ্ছে বিজ্ঞান।  ‘ঘটনাক্রমে আমি আকাশ থেকে এখানে পড়েছি’ এটি কোন যুক্তিপূর্ণ উক্ত নয়– এই ধরনের যুক্তির কোনও মূল্য কি আপনি দেন ? কোন প্রকৃতিস্থ মানুষ ‘ঘটনাক্রমে’ কথাটি মেনে নেবে না।

আপনি যদি কোন অপরাধ করার ফলে দন্ডভোগ করেন, তখন কি আপনি বলতে পারেন, “ঘটনাক্রমে আমি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে দন্ডভোগ করছি।” ‘ঘটনাক্রমে’ না। আপনি যদি চুরি করেন তা হলে পুলিশ এসে আপনাকে ধরবে এবং বিচারক আপনাকে দন্ড দেবে।  এই দন্ড আপনাকে ভোগ করতেই হবে। এটি ‘ঘটনাক্রমে’ নয়, ঘটনাক্রমের কোন প্রশ্নই উঠে না।  সেটি একটি অযৌক্তিক যুক্তি।  ‘ঘটনাক্রমে’ কোন কিছু ঘটে না– সেটিই হচ্ছে যথার্থ যুক্তি।  ‘ঘটনাক্রমে’ মানে হচ্ছে অজ্ঞতা, যে জানে না, সে-ই বলে ‘ঘটনাক্রমে’। এটি জ্ঞান নয়, অজ্ঞান।

এই সমস্ত বৈজ্ঞানিকেরা হচ্ছে এক-একটি নির্বোধ, মূর্খ।  তাদের যে সমস্ত যুক্তি– “আমি ভগবানকে দেখিনি, তাই আমি ভগবানকে বিশ্বাস করি না”, “সব কিছুই ঘটনাক্রমে সৃষ্টি হয়েছে”, “ঘটনাক্রমে প্রকৃতির উপাদানগুলির সমন্বয়ের ফলে”….. এইগুলি সমস্ত অর্থহীন প্রস্তাবনা।  কারও নিয়ন্ত্রনের ফলে সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।  এটিই হচ্ছে যথার্থ জ্ঞান। ঠিক যেমন টোকিও শহরের সব বন্দোবস্ত দেখে আপনি সহজেই বুঝতে পারেন যে, এখানে একটি সরকার রয়েছে।  তেমনই, আপনি যদি বুদ্ধিমান হন, তা হলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন যে, এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের অপূর্ব সুন্দর সমস্ত বন্দোবস্তের পেছনে একজন পরম নিয়ন্তা নিশ্চয়ই রয়েছেন।  সেটি হচ্ছে আস্তিক্যবাদ, সেটিই হচ্ছে জ্ঞান।

এই সমস্ত মূর্খ তথাকথিত বৈজ্ঞানিকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।  তারা বলে, “আমাদের এই বিশ্বাস প্রমাণ করার জন্য আমাদের আরো কিছু দিন সময় দিন। ” কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কেউ যদি যথার্থ জ্ঞানী হন, ঐকান্তিকভাবে কেউ যদি প্রকৃত জ্ঞানের অনুসন্ধান করেন, তা হলে একসময় তিনি জানতে পারবেন যে, ভগবান আছেন বাসুদেবঃ সর্বমিতি স মহাত্মা সুদুর্ল্লভ।  তখন তিনি একজন প্রথম শ্রেনীর মানুষে পরিণত হবেন, মহাত্মায় পরিণত হবেন।  কিন্তু সেই ধরনের মহাত্মা অত্যন্ত দুর্লভ।

অধিকাংশ মানুষই হচ্ছে দুরাত্মা; তারা বিকৃত মনোবৃত্তিসম্পন্ন।  তারা বলে, অনীশ্বরম্– “কোন নিয়ন্তা নেই, ঈশ্বর নেই; এই জগৎ মিথ্যা। ” এই জগৎ মিথ্যা নয়।  আপনি সমস্ত কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখুন।  একটি পাতার কথাই ধরুন– তাতে কী সুন্দর বন্দোবস্ত রয়েছে, কত সুক্ষ্ম শিরা-উপশিরা রয়েছে এবং তারা কত নিপুণভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছে।  একটি ক্ষুদ্র পাতা বা একটি ছোট ফলে কী অপূর্ব দক্ষতার নিদর্শণ আমরা দেখতে পাই।  আপনি যদি বুদ্ধিমান হন, তা হলে আপনি কিভাবে বলবেন যে, ‘ঘটনাক্রমে এইগুলি সৃষ্টি হয়েছে ? সেটি আপনি বলতে পারেন না।  এই জড় সৃষ্টির পিছনে অতি উন্নত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন কেউ রয়েছেন।  আর সেই বুদ্ধিমত্তার ঊর্ধ্বে আরও উন্নত বুদ্ধিমত্তা রয়েছে, তারও ঊর্ধ্বে তারও ঊর্ধ্বে তারও ঊর্ধ্বে– বহূনাং জন্মনামন্তে- সেই পরম বুদ্ধিমান সত্তাকে খুঁজতে গিয়ে বহু বহু জন্মের পরে আমরা বুঝতে পারি যে, বাসুদেব সর্বমিতি।  আমরা তখন বুঝতে পারি যে, বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন সর্বকারণের পরম কারণ।  সেই সিদ্ধান্ত ব্রহ্ম-সংহিতায় করা হয়েছে– ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ- পরম ঈশ্বর হচ্ছেন শ্রীকৃষ্ণ।

অধীন নিয়ন্তা অনেক রয়েছে।  যেমন, এই শহর পরিচালিত হচ্ছে পুলিশ কমিশনারের নিয়ন্ত্রনাধীনে। কিন্তু তার উপরে কেউ রয়েছে, তারও উপরে কেউ রযেছে এবং তারও উপরে কোন নিয়ন্ত রয়েছে– এবং সবার উপরে রয়েছেন পরম ঈশ্বর শ্রীকৃষ্ণ।  সেটিই হচ্ছে বেদের সিদ্ধান্ত।  শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ, তিনিই হচ্ছেন পরম ঈশ্বর এবং তাঁর রূপ সৎ, চিৎ এবং আনন্দময়।  শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সর্ব কারণের পরম কারণ, এবং তিনি একলা নন।  তাঁর অনন্ত শক্তি রয়েছে।

আমার মতো একজন সাধারণ মানুষ ভক্তিবেদান্ত স্বামী- আমি একলা নই।  আমার অনেক সহকারী রয়েছে।  সমস্ত পৃথিবী জুড়ে অনেক সহকারী রয়েছে।  সুতরাং কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতার কথা যদি আপনারা বিবেচনা করেন, তিনি একলা নন।  আমি যেমন আমার শিষ্যদের মাধ্যমে বহু জায়গায়, বহুভাবে নিজেকে বিস্তার করেছি, তা হলে আপনারা একটু বিবেচনা করে দেখুন শ্রীকৃষ্ণ কিভাবে নিজেকে বিস্তার করতে পারেন– সেটি আপনারা শুধু একটু বিবেচনা করে দেখুন।  তিনি হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান। অদ্বৈতমচ্যুতমনাদিমনন্তরূপম্। অনন্তরূপম্– যদিও তিনি হচ্ছেন একজন পুরুষ, তিনি অনন্ত রূপে নিজেকে প্রকারশ করতে পারেন।  আর সেইভাবে তিনি সব কিছু করছেন।  আমি যেমন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আমার সমস্ত সহকারীদের নির্দেশ দিচ্ছি এবং তারা আমার নির্দেশ অনুসারে কাজ করছে, শ্রীকৃষ্ণও তেমনই তাঁর অনন্ত রূপের মাধ্যমে, অনন্ত সহকারীদের মাধ্যমে সব কিছু পরিচালনা করছেন।  পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রুয়তে- পরমেশ্বর ভগবান অনন্ত শক্তিসম্পন্ন।  সেই কথা আপনাদের বুঝতে হবে।  তিনি এক হলেও বহু রূপে, অনন্ত রূপে নিজেকে প্রকাশিত করেছেন।

পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সকলকেই পরিচালিত করছেন।  ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি, অনন্ত কোটি জীব রয়েছে এবং প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজ করে তিনি তাদের জ্ঞান, স্মৃতি এবং বিস্মৃতি দান করছেন।  এইভাবে তিনি সব কিছু পরিচালনা করছেন।  আমরা যদি মনে করি যে, তিনি আমাদের মতো একজন পরিচালক, তা হলে সেটি আমাদের ভুল হবে।  তিনি পরিচালনা করেন অনন্ত জ্ঞান, অনন্ত সহকারী এবং অনন্ত শক্তির সাহায্যে।

এই সমস্ত নাস্তিকেরা, বৈজ্ঞানিকেরা বুঝতে পারে না যে, কিভাবে একজন এই রকম অনন্ত শক্তিসম্পন্ন হতে পারে।  তাই তারা নির্বিশেষবাদী হয়ে যায়।  তারা অনুমান করে, “সেই নিয়ন্তা যদি একজন ব্যক্তি হয়, তা হলে তিনি আমার মতো একজন ব্যক্তি।  আমি এটি করতে পারি না।  তাই তিনিও এটি করতে পারবেন না। ” তাই ভগবদ্গীতায় তাদের মূঢ় বলে সম্বোধন করা হয়েছে।  অবজানন্তি মাং মূঢ়াঃ– এই সমস্ত নির্বোধ মূর্খগুলি শ্রীকৃষ্ণকে জানতে পারে না, কারণ তারা তাদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের তুলনা করে।  তারা মনে করে যে, শ্রীকৃষ্ণও তাদের মতো একজন মানুষ।  বেদে বলা হয়েছে, যদিও তিনি একজন সবিশেষ পুরুষ, কিন্তু তিনি অনন্ত কোটি জীবকে পরিচালনা করছেন।  কিন্তু নির্বিশেষবাদী বৈজ্ঞানিকেরা সেই কথা জানে না- একো বহুনাং যোগ বিদধাতু কামান্- একজন পুরুষ তিনি অনন্ত কোটি জীবকে পরিচালনা করছেন।

আমরা সকলেই হচ্ছি এক-একজন ব্যক্তি, আমি একজন ব্যক্তি, আপনি ব্যক্তি, কীট-পতঙ্গগুলিও হচ্ছে এক-একটি ব্যক্তি, একটি গাছ একটি ব্যক্তি।  আরেকজন ব্যক্তি রয়েছেন, তিনি হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ।  নিত্যো নিত্যানাং চেতনশ্চেতনানাম্ একো বহুনাং যো বিদধাতু কামান্ (কঠোপনিষদ): একজন ব্যক্তি অনন্ত কোটি জীবকে নিয়ন্ত্রন করছেন। সেটি হচ্ছে বৈদিক তথ্য।  আর শ্রীকৃষ্ণও ভগবদ্গীতায় বলেছেন : অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে। — “আমি হচ্ছি সব কিছুর উৎস; আমাকে আশ্রয় করেই সব কিছু প্রকাশিত হয়েছে।  তাই কেউ যখন যথাযথভাবে বুঝতে পারে যে, এই পরম ঈশ্বর হচ্ছেন পরম নায়ক, তিনিই হচ্ছেন পরম নিয়ন্তা, তিনি হচ্ছেন সব কিছুর পরিচালক, তখন সে শ্রদ্ধাভরে তার শরণাগত হয়, তাঁর ভক্ত হয়।

আমরা, কৃষ্ণভক্তরা মূর্খ বা নির্বোধ নই।  আমাদের যক্তি রয়েছ।  আমাদের দর্শন রয়েছে।  আমরা যখন জানতে পারি যে, শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন প্রকৃতপক্ষে পরমেশ্বর, পরম পুরুষ, পরম নিয়ন্তা– তখন আমরা তাঁর ভক্ত হই।  এটি অন্ধ বিশ্বাস নয়।  আমরা সর্বতোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, এই পুরুষই হচ্ছেন পরম ঈশ্বর।  তাই আমরা তাঁর শরণাগত হয়েছি।  আমরা অন্ধ অনুগামী নই।
অহং সর্বস্য প্রভবো মত্তঃ সর্বং প্রবর্ততে।
ইতি মত্বা ভজন্তে মাং বুধা ভাবসমন্বিতা ॥
শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, “আমিই উৎস; আমার থেকেই সব কিছু প্রকাশিত হয়।  কেউ যখন আমার ভক্ত হয়, তখন সে তা সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারে। ” বুধা কথাটির অর্থ হচ্ছে যিনি যথাযথভাবে বুঝতে পারেন।

আসুরিক বৈজ্ঞানিকদের মতবাদ হচ্ছে অপরস্পর সম্ভূতম্- সব কিছুরই প্রকাশ হয়েছে যান্ত্রিক আকর্ষণের ফলে।  কিমন্যৎ কামহৈতুকম্।  ‘কাম’ মানে হচ্ছে জড় ইন্দ্রিয় উপভোগের বাসনা।  একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী পরস্পরের প্রতি কামার্ত হয়ে যৌন ক্রীড়ায় লিপ্ত হয় এবং তার ফলে সন্তানের জন্ম হয়।  বৈজ্ঞানিকেরা বলে যে, এই ব্রহ্মান্ডও তেমনই যান্ত্রিক আকর্ষণের ফলে, কামের প্রভাবে, ঘটনাক্রমে প্রকাশিত হয়েছে– এর পেছনে নাকি কোন পরিকল্পনা নেই।  কিন্তু তারা জানে না যে, এই প্রকৃতিতে সব কিছুর পেছনেই একটি মহৎ পরিকল্পনা রয়েছে।  আর সেই পরিকল্পনার একটি অংশ হচ্ছে–
যদা যদি হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥
“ যখনই ধর্মের গ্লানি হয়, অর্থাৎ ধর্মের অবনতি এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখন আমি অবতরণ করি।” সেটিই হচ্ছে পরিকল্পনা।
এই সমস্ত মূর্খগুলি, এই সমস্ত নাস্তিকগুলি বলে, কিমন্যৎ কামহৈতুকম্– “কামই হচ্ছে একমাত্র হেতু, এবং এই ব্রহ্মান্ড সৃষ্টির একমাত্র কারণ। ” “আমাদের কাম-ক্রীড়ার ফলে একটি সন্তানের জন্ম হতে চলেছে, কিন্তু তার ভরণপোষণের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে আমরা চাই না।  সুতরাং তাকে মেরে ফেল।  তাতে ক্ষতি কি ?” তাই তারা ভ্রুণ হত্যা করছে– মাতৃ-জঠরে শিশুহত্যা করছে– এবং সেটিকে আইনসঙ্গতভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।  তাদের ইন্দ্রিয় সুখভোগের ফলে একটি সন্তানের জন্ম হয়, কিন্ত তারা তাকে চায় না।  তাই তারা বলে, ‘তাকে মের ফেল। ’ এইভাবে মা তার গর্ভে নিজের সন্তানকে হত্যা করছে; এটিই হচ্ছে নাস্তিকতার পরিণতি।

এইগুলি হচ্ছে সমস্ত নির্বোধ মতবাদ– “ঘটনাক্রমে”, “অহৈতুকী কামের প্রভাব।” সব কিছুর পেছনেই একটি মহৎ বন্দোবস্ত রয়েছে।  এটি রাস্তার যানবাহন নিয়ন্ত্রনের মতো– এটির পেছনে একটি মস্ত বড় আয়োজন রয়েছে।  ঘটনাক্রমে তা হয়নি।  আমরা কি ঘটনাক্রমে গাড়ি চালাবার রাস্তাগুলি পেয়েছি ? না, ঘটনাক্রমে তা হয়নি।  সুতরাং আপনারা কি বলেন “ঘটনাক্রমে সব কিছু ঘটেছে ?” অসুরেরা এই সমস্ত মতবাদ সৃষ্টি করছে।  এই সমস্ত আসুরিক মতবাদগুলি আমাদের কোনভাবে সাহায্য করবে না।  এই সমস্ত মতবাদের দ্বারা প্রভাবিত হলে আমরা চিরকাল অজ্ঞানের অন্ধকারে পড়ে থাকব, জ্ঞান লাভ করতে পারব না।

Comments are closed.

August 2015
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Blog Stats

  • 140,959 hits