শ্রীকৃষ্ণ-সংকীর্তনের পরম বিজয় হোক। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন মাত্র ১৫ বছর বয়সের বালক, তখন তিনি নবদ্বীপে এই সংকীর্তন আন্দোলনের প্রবর্তন করেন। আধুনিক যুগে যেমন বিভিন্ন রকমের নতুন নতুন ধর্মের আবির্ভাব হচ্ছে, মহাপ্রভু কিন্তু সেই রকম কোন নতুন ধর্মের উদ্ভাবন করেননি। প্রকৃতপক্ষে, ধর্ম কখনও তৈরী করা যায় না। ধর্মং তু সাক্ষাৎ ভগবৎ-প্রণীতম্– ধর্মের অর্থ হচ্ছে ভগবানের দেওয়া আইন। রাষ্ট্রের আইন না মেনে যেমন আমরা সুখে-শান্তিতে থাকতে পারি না। আর ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন, “যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত- যখনই ধর্মের গ্লানি দেখা দেয়, অভ্যুত্থানমধর্মস্য- অধর্মের অভ্যুদয় হয়, তদাত্মানং সৃজাম্যহম্- সেই সময়ে আমি (কৃষ্ণ) আবির্ভূত হই।” জড় জগতেও আমরা সেটি হতে দেখি; যখন রাজ্যের আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে, তখন সেই বিশৃঙ্খলা দমনের জন্য পুলিশ ও বিশেষ বিশেষ সরকারী কর্মচারীরা আসেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গোস্বামীদের দ্বারা পূজিত হয়েছিলেন। তাঁর অতি অন্তরঙ্গ পার্ষদ এই ছয়জন গোস্বামী হচ্ছেন– শ্রীল রূপ গোস্বামী, শ্রীল সনাতন গোস্বামী, শ্রীল রঘুনাথভট্ট গোস্বামী, শ্রীল জীব গোস্বামী, শ্রীল গোপালভট্ট গোস্বামী এবং শ্রীল রঘুনাথদাস গোস্বামী। ‘গো’ শব্দটির তিনটি অর্থ আছে। ‘গো’ শব্দের একটি অর্থ হচ্ছে ভূমি, তার আর একটি অর্থ হচ্ছে গাভী এবং তৃতীয় অর্থটি হচ্ছে ইন্দ্রিয়। আর ‘স্বামী’ কথাটির অর্থ হচ্ছে নিয়ন্তা। তাই ‘গোস্বামী’ বলতে তাঁকেই বোঝায়, যিনি তার ইন্দ্রিয়ের নিয়ন্তা বা যিনি তাঁর ইন্দ্রিয়গুলিকে দমন করেছেন। কেউ যখন ইন্দ্রিয়গুলির নিয়ন্তা অর্থাৎ গোস্বামী হন, তখন তিনি পারমার্থিক জীবনের উন্নতি সাধন করতে পারেন। সেটিই হচ্ছে ‘গোস্বামী’ কথাটির প্রকৃত অর্থ। ‘গোস্বামী’ কথাটির অর্থ ইন্দ্রিয়ের প্রভু। দাসত্ব করাটা স্বামীর কাজ নয়, তার কর্তব্য হচ্ছে ইন্দ্রিয়গুলিকে শাসন করা।
এই ছয় গোস্বামীর মধ্যে শ্রীল রূপ গোস্বামী ছিলেন প্রধান এবং তিনি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বন্দনা করে বলেছেন, “এই কলিযুগ অত্যন্ত কলুষিত এবং এই যুগের মানুষেরা নিরন্তর মতানৈক্যের সৃর্র্ষ্টি করে পরস্পরের সঙ্গে কলহ করছে। এমনতর অবস্থায়, অর্থাৎ যখন সব কিছুই মতানৈক্য এবং কলহে পূর্ণ, তখন আপনি ভগবানের সর্বোচ্চ প্রেম বিতরণ করার জন্য আবির্ভূত হয়েছেন।” সমর্পয়িতুমুন্নতোজ্জ্বলরসাম্– তা কেবল শ্রেষ্ঠই নয়, তা- ভগবৎ- প্রেমের অতি উন্নত ও উজ্জ্বল রস। পুরটসুন্দরদ্যুতি– “আপনার অঙ্গকান্তি সোনার বর্ণ ও দ্যুতিসম্পন্ন। আপনি সকলকে করুনা করুন, যাতে সকলেরই হৃদয়ে আপনার এই দিব্য রূপ স্ফুরিত হয়।”
প্রয়াগে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে রূপ গোস্বামীর যখন প্রথম সাক্ষাৎ হয়, তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পথে পথে ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করতে করতে নৃত্য করেছিলেন। সেই সময়েও তিনি আর একটি স্তব প্রার্থনা করেছিলেন– নমো মহাবদান্যায় কৃষ্ণপেমপ্রদায় তে– “ হে প্রভু, আপনি মহাবদান্য অবতার, কারণ আপনি কৃষ্ণপ্রেম প্রদান করেছেন। কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্যনাম্নে গৌরত্বিষে নমঃ– “ আপনি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, কারণ আপনি যদি শ্রীকৃষ্ণ না হতেন, তা হলে আপনি কৃষ্ণপ্রেম দান করতে পারতেন না। আর কৃষ্ণপ্রেম সহজলভ্য নয়, কিন্তু আপনি জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সকলকে এই সম্পদ দান করেছেন। ” এইভাবে বঙ্গদেশের নবদ্বীপে সংকীর্তন আন্দোলনের সূচনা হয়। সেদিক দিয়ে বাঙালীরা অত্যন্ত ভাগ্যবান, কারণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাদের দেশে সংকীর্তন আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন এবং তিনি ভবিষ্যদ্বানী করে বলেছিলেন, “পৃথিবীতে আছে যত নগরাদি গ্রাম/ সর্বত্র প্রচার হইবে মোর নাম। ” পৃথিবীর প্রতিটি নগরে ও গ্রামে এই সংকীর্তন আন্দোলন প্রচারিত হবে। এটি তাঁরই ভবিষ্যদ্বাণী।
তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কৃপার ফলে এই আন্দোলন ইতিমধ্যেই পাশ্চত্য জগতে প্রচলিত হয়েছে। তা প্রথম শুরু হয় নিউ ইয়র্কে ১৯৬৬ সালে। সেই সময়ে আমি টম্পকিন্স স্কোয়ার পার্কে ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন শুরু করি। সেখানে আমি একটি ছোট মৃদঙ্গ বাজিয়ে প্রতিদিন তিন ঘন্টা ধরে কীর্তন করতাম, আর এই সমস্ত আমেরিকান ছেলেরা সেই কীর্তনে আকৃষ্ট হয়ে আমার চারপাশে ঘিরে দাঁড়াত। তারপরে তারা আমার সঙ্গে যোগ দেয়, এবং এই আন্দোলন ক্রমান্বয়ে প্রসারিত হতে থাকে। প্রথমে এর শুরু হয়েছিল নিউ ইয়র্কে ২৬ নং সেকেন্ড এ্যাভিনুর একটি দোকানঘরে। তারপর সানফ্রান্সিস্কোতে আমরা আমাদের কেন্দ্র খুললাম; তারপর মন্ট্রিয়ল, বোস্টন, লস্ এঞ্জেলেস, বার্কলি, কলম্বিয়া, সর্বত্র আমাদের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। এখন লন্ডন, হ্যামবুর্গ প্রভৃতি বিভিন্ন স্থানে আমাদের প্রায় ১০০ টির বেশি শাখা রয়েছে। এই সমস্ত পাশ্চাত্যের ছেলে-মেয়েরা শ্রীমন্মহাপভুর বাণী প্রচার করছে। এরা সন্ন্যাসী নয় বা এরা বৈদান্তিকও নয়, এরা হিন্দু নয় বা ভারতীয় নয়, কিন্তু অত্যন্ত ঐকান্তিকতার সঙ্গে তারা মহাপ্রভুর প্রদর্শিত এই পথ গ্রহণ করেছে। ‘লন্ডন টাইম্সে’ একটি প্রবন্ধের শিরোনামায় বলা হয়েছে, “কৃষ্ণকীর্তনে লন্ডন চমকিত হয়েছে। ” এখন এই আন্দোলনে অনেক সমস্যা রয়েছে। পাশ্চাত্যে আমার প্রায় সমস্ত শিষ্যই হচ্ছে আমেরিকান ও ইউরোপীয়ান। তারা ভগবানের নাম কীর্তন করছে, আনন্দে মগ্ন হয়ে নৃত্য করছে এবং Back to Godhead নামক একটি পত্রিকা ছাপাচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা বেশ কয়েকটি গ্রন্থও প্রকাশ করেছি। শ্রীমদ্ভাগবত, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা, ঈশোপনিষদ এইগুলির মধ্যে অন্যতম।
এমন নয় যে, এটি হচ্ছে একটি আবেগপ্রবণ দল। এমনকি কখনও মনে করা উচিত নয় যে, সমস্ত ছেলেরা ধর্মের অন্ধ আবেগে বা মূর্খ গোঁড়ামির বশে এইভাবে নাচছে। আমাদের এই ধর্ম সর্বশ্রেষ্ঠ দর্শন এবং উন্নত ধর্মতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এই প্রসঙ্গে আমরা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর দৃষ্টান্তকে বিচার করে দেখতে পারি। তিনি যখন প্রচার করেছিলেন, তখন এক সময়ে তিনি মায়াবাদী সন্ন্যাসীদের পীঠস্থান বারাণসীতে যান। শঙ্করাচার্যের অধিকাংশ অনুগামীদেরই সাধারণত বারাণসীতে দেখা যায়। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যখন বারাণসীতে ছিলেন, তখন তিনি কীর্তন করে পথে পথে নৃত্য করতেন। কিছু লোক সেটাকে খুব পছন্দ করেছিল এবং সেইজন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। সেখানকার একজন প্রখ্যাত সন্ন্যাসী প্রকাশানন্দ সরস্বতী, যিনি ছিলেন হাজার হাজার মায়াবাদী সন্ন্যাসীদের নেতা, তাঁকে তাঁর অনুগামীরা এসে বলল, “বঙ্গদেশ থেকে একজন তরুণ সন্ন্যাসী এসেছেন। তিনি খুব মধুর স্বরে কীর্তন করছেন এবং নৃত্য করছেন। ” প্রকাশানন্দ সরস্বতী ছিলেন মস্ত বড় বৈদান্তিক। সেই কথা শুনে তার ভাল লাগল না। তিনি বললেন, “ও হচ্ছে ভন্ড সন্ন্যাসী। নাচা, গান করা, এইগুলি তো সন্ন্যাসীর কর্ম নয়, সন্ন্যাসীর কর্ম হচ্ছে সর্বক্ষণ বেদান্ত অধ্যয়ন করা। ” তখন একজন ভক্ত যিনি প্রকাশানন্দ সরস্বতীর এই মন্তব্য সহ্য করতে পারলেন না, তিনি মহাপ্রভুকে বললেন যে, তাঁকে নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে। তখন সেই ভক্তটি সমস্ত সন্ন্যাসীদের একত্রিত হওয়ার আয়োজন করেন এবং সেখানে মহাপ্রভুর সঙ্গে প্রকাশানন্দ সরস্বতীর বেদান্ত সম্বন্ধীয় দার্শনিক আলোচনা হয়। তাঁদের সেই আলোচনা Teachings of Lord Chaitanya ( শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা) গ্রন্থে সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে। মহাপ্রভুর কাছে বেদান্তের মূল তত্ত্ব সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে প্রকাশানন্দ স্বরস্বতী ও তাঁর সমস্ত শিষ্যরা সকলেই তাঁর চরণাশ্রয় গ্রহণ
করলেন।
তেমনই, তৎকালীন শ্রেষ্ঠ নৈয়ায়িক সার্বভৌম ভট্টাচার্য, যিনি নিজে একজন নির্বিশেষবাদী বা মায়াবাদী ছিলেন, তাঁর সঙ্গে মহাপ্রভুর গভীর আলোচনা হয় এবং অবশেষে তিনিও মহাপ্রভুর শরণাগত হন। সুতরাং, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর এই আন্দোলন কতকগুলি ভাবুকের ভাবপ্রবণতা নয়। দর্শণ এবং ন্যায়ের মাধ্যমে কেউ যদি এই সংকীর্তন আন্দোলনকে বুঝতে চান, তা হলে তাঁরা দেখবেন যে, এটি হচ্ছে সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার প্রকাশ। এই আন্দোলনকে যথাযথভাবে জানার যথেষ্ঠ সুযোগ রয়েছে, কারণ এই আন্দোলন যথার্থ বিজ্ঞান এবং বৈদিক প্রমাণের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অত্যন্ত সরলভাবে এই আন্দোলনকে উপস্থাপিত করা হয়েছে। সেটাই হচ্ছে এই আন্দোলনের মাধুর্য। মস্ত বড় দাশনিকই হোন কিংবা একটি শিশুই হোন, যে কেউ এই আন্দোলনে অনায়াসে অংশগ্রহণ করতে পারেন; আত্মজ্ঞান লাভের অন্যান্য সমস্ত পন্থা অর্থাৎ জ্ঞানযোগ, ধ্যানযোগ, হঠযোগ ইত্যাদি পন্থাগুলিকে শাস্ত্রে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, কিন্তু এই যুগে সেইগুলি সম্ভব নয়। শ্রীমদ্ভাগবতে (১২/৩/৫২) সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছেঃ
কৃতে যদ্ধ্যায়তে বিষ্ণুং ত্রেতায়াং যজতো মখৈ।
দ্বাপরে পরিচর্য্যায়াং কলৌ তদ্বরিকীর্তনাৎ ॥
সত্য যুগে ভগবানের কৃপা লাভের পন্থা হচ্ছে ধ্যান। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাল্মীকি মুনি ষাট হাজার বছর ধ্যান করে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। কিন্তু আমাদের স্থায়িত্ব কত দিন ? আর তা ছাড়া ভগবদ্গীতায় ধ্যান করার যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে যে, নির্জন স্থানে গিয়ে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গভাবে ধ্যান অনুশীলন করতে হয়, তাতে মেরুদন্ড সোজা রেখে বসতে হয়, পূর্ণ ব্রহ্মচর্যের জীবন যাপন করতে হয়, ইত্যাদি। সেই সম্বন্ধে নানা রকম বিধি-নিষেধ রয়েছে। অষ্টাঙ্গযোগ অনুশীলন করা এই যুগে কারও পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু কেউ যদি অনুকরণ করে আনন্দ পায়, তা হলে সেটা আলাদা কথা। তবে কেউ যদি সিদ্ধি লাভ করতে চায়, তা হলে তাকে এই অষ্টাঙ্গ যোগের প্রতিটি অঙ্গেরই অনুশীলন করতে হবে। অার তা যদি না করা হয়, তা হলে শুধু সময়েরই অপচয় হবে।
যোগের পরম উদ্দেশ্য কি ? যোগের অর্থ হচ্ছে পরমেশ্বর ভগবানের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। তেমনই দার্শনিক গবেষণা হচ্ছে জ্ঞান, এবং তারও উদ্দেশ্য হচ্ছে পরমব্রহ্মকে জানা। নিঃসন্দেহে এইগুলি হচ্ছে অনুমোদিত পন্থা, কিন্তু শাস্ত্রের নির্দেশ অনুসারে এই কলিযুগে তার অনুশীলন করাটা সম্ভব নয়। তাই হরি-কীর্তনের পন্থা অবলম্বন করতে হবে। এই পন্থার অনুশীলন করার জন্য কোনরকম যোগ্যতার প্রয়োজন নেই, যে কেউ এতে যোগ দিতে পারে। এই পন্থা অবলম্বন করতে হলে দর্শন বা বেদান্ত পাঠ করতে হয় না প্রকাশানন্দ সরস্বতীকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই কথাটাই বুঝিয়েছিলেন।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও প্রকাশানন্দ সরস্বতী যখন বেদান্ত দর্শন নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন প্রকাশানন্দ সরস্বতী তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, “ আমি শুনেছি যে, আপনার পূর্বাশ্রমে আপনি একজন মস্ত বড় পন্ডিত ছিলেন (শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু পূর্বাশ্রমে মস্ত বড় পন্ডিত ছিলেন। তাঁর নাম ছিল নিমাই পন্ডিত এবং ১৫ বছর বয়সে কেশব কাশ্মীরী নামে কাশ্মীরের এক দিগ্বিজয়ী পন্ডিতকে তিনি পরাস্ত করেন), এবং বিশেষ করে ন্যায়শাস্ত্রে আপনার অগাধ পান্ডিত্য আছে। ব্রাহ্মণ পরিবারে আপনার জন্ম হয়েছে এবং এখন আপনি সন্ন্যাসী। তা হলে বেদান্ত অধ্যয়ন না করে আপনি কেন এইভাবে কীর্তন-নর্তন করছেন ?” প্রকাশানন্দ সরস্বতীর এই প্রশ্নের উত্তরে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছিলেন,, “হ্যাঁ, তার কারণ হচ্ছে যে আমার গুরুদেব যখন আমাকে দীক্ষা দান করেন, তখন তিনি আমাকে বলেছিলেন, “তুমি মূর্খ, বেদান্ত অধ্যায়নে তোমার অধিকার নেই। তাই বেদান্ত অনুশীলনে তোমার শুধু সময়েরই অপচয় হবে। তুমি কেবল ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন কর এবং তার ফলেই তোমার সংকল্প সিদ্ধ হবে। ” শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অবশ্যই মূর্খ ছিলেন না, এবং বেদান্ত মূর্খদের জন্য নয়। যথেষ্ঠ শিক্ষালাভ করে, জ্ঞানের বিশেষ স্তরে উন্নীত হলে তবেই বেদান্ত-দর্শন উপলব্ধি করা যায়। তার প্রতিটি শব্দের অসংখ্য অর্থ, এবং শঙ্করাচার্য, রামানুজাচার্য প্রমুখ বড় বড় আচার্য সংস্কৃত ভাষায় তার ভাষ্য রচনা করে গেছেন। কিন্তু আমরা বেদান্ত কিভাবে বুঝব? আমাদের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। একজন-দু’জনের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হতে পারে, কিন্তু সকলের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। তেমনই, যোগ অনুশীলন করাও সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই কেউ যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রদর্শিত পন্থা অবলম্বন করে ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করেন, তখন তাঁর প্রাথমিক লাভ হচ্ছে চেতোদর্পণ-মার্জনম্– চিত্তের সমস্ত আবর্জনাগুলি বিদূরিত হবে। এই করতে কোন রকম পয়সার দরকার হয় না এবং তাতে কোন ক্ষতিও হয় না। কেউ যদি কেবলমাত্র এক সপ্তাহ ধরে এই নাম জপ করেন বা কীর্তন করেন, তা হলে তিনি দেখবেন যে, তাঁর কতটা পারমার্থিক উন্নতি লাভ করা হয়েছে।
কেবলমাত্র এই কীর্তনের দ্বারা আমরা কত মানুষকে আকৃষ্ট করি এবং তারা সমস্ত দর্শনকে উপলব্ধি করতে পারছে এবং তার ফলে পবিত্র হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। আর ইতিমধ্যেই আমাদের অনেকগুলি কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। পাশ্চাত্যে ছেলে-মেয়েরা ঐকান্তিভাবে এটিকে গ্রহণ করেছে, আর তার ফলে তারা সুখী হয়েছে। তাদের চিত্তের সমস্ত আবর্জনাগুলি দূরীভূত হয়ে যাচ্ছে কেবলমাত্র ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’– হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে/ হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে- কীর্তন করার ফলে।
তার পরের স্তরটি হচ্ছে ভবমহাদাবাগ্নিনির্বাপণম্– অর্থাৎ হৃদয়ে সমস্ত আবর্জনাগুলি পরিস্কার হয়ে যাওয়ার পর জড় অস্তিত্বের সমস্ত সমস্যাগুলির সমাধান হয়ে যায়। শাস্ত্রে এই জড় জগতকে দাবানালের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এই জড় জগতে কেউই দুঃখ চায় না, কিন্তু তা সত্ত্বেও অনিবার্যভাবে দুঃখ আসে। সেটাই হচ্ছে জড়া প্রকৃতির নিয়ম। আগুণ কেউই চায় না। শহরের সর্বত্রই দেখা যায়, ‘ফায়ার ব্রিগেড’ খুব সক্রিয় হয়ে রয়েছে। কিন্তু তবুও আগুণ ধরে। তেমনই, অনেক কিছু আছে যা কেউই চায় না। কেউই মৃত্যু চায় না- কিন্তু তারও মৃত্যু হয়। কেউই বৃদ্ধ হতে চায় না- কিন্তু তবুও বার্ধক্য আসে। আমরা ইচ্ছা না করলেও আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এইগুলি আসে।
তাই এই জড় অস্তিত্বের অবস্থাটা আমাদের একটু বিবেচনা করে দেখা উচিত। এই মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে পারমার্থিক জ্ঞান লাভ করা; পশুদের মতো আহার, নিদ্রা, ভয় এবং মৈথুনের চিন্তায় মগ্ন থেকে এই দুর্লভ মানব জীবন নষ্ট করা উচিত নয়। পশু প্রবৃত্তিগুলি চরিতার্থ করে যে জীবন তা সভ্যতার জীবন নয়। শ্রীমদ্ভাগবতে বলা হয়েছে যে, ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য কঠোর পরিশ্রম করা এই শরীরের উদ্দেশ্য নয়। নায়ং দেহো দেহভাজাং নৃলোকে কষ্টান্ কানানর্হতে বিড়্ভুজাং যে- অর্থাৎ কঠোর পরিশ্রম করে ইন্দ্রিয়-ভোগ করার মাধ্যমে সুখ-ভোগ করার প্রচেষ্টা শূকরদের কাজ, মানুষের নয়। (ভাঃ ৫/৫/১) মানব জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে তপস্যা। বিশেষ করে ভারতবর্ষে, এখানে কত বড় বড় মুনি-ঋষি, রাজা, মহারাজা, ব্রহ্মচারী, সন্ন্যাসী পারমার্থিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গভীরভাবে তপস্যা করেছেন। বুদ্ধদেব ছিলেন একজন রাজপুত্র, কিন্তু তিনি সব কিছু ত্যাগ করে তপস্যায় ব্রতী হয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে মানুষের জীবন। মহারাজ ভরত (যাঁর নামানুসারে এদেশের নাম হয়েছে ভারতবর্ষ) মাত্র ২৪ বছর বয়সে তাঁর রাজ্য, সুন্দরী স্ত্রী এবং শিশু- সন্তানদের পরিত্যাগ করে পরমার্থ সাধনের জন্য তপস্যা করতে গিয়েছিলেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বয়স যখন মাত্র ২৪ বছর, তিনি তাঁর যুবতী স্ত্রী, বৃদ্ধা মাতা এবং সব কিছু ছেড়ে গিয়েছিলেন। এই রকম বহু বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভারতবর্ষ হচ্ছে তপস্যার স্থান, তপোভূমি। কিন্তু সেই কথা আজ আমরা ভুলে গেছি। এখন আমরা এটিকে করখানার দেশ তৈরী করার চেষ্টা করছি। আশ্চর্যের বিষয় যে, ভারতবর্ষে তপস্যার কথা আর প্রচার করা হচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এই ভারতবর্ষ হচ্ছে ধর্মের পীঠস্থান, ধর্মক্ষেত্র।
কেবল ভারতবর্ষেই নয়, এই কলিযুগে সর্বত্রই সব কিছুর অধঃপতন হচ্ছে। প্রায়েনাহল্পায়ুষসভ্য কলাবস্মিনযুগেজনাঃ– এই কলিযুগে মানুষের আয়ু কমে গেছে, পারমার্থিক জ্ঞান লাভের জন্য তার কোন রকম প্রচেষ্টা নেই এবং সেই প্রচেষ্টা যদি তারা করে, তখন নানা রকম সমস্ত প্রতারকের দ্বারা প্রতারিত হয়ে তারা বিপথগামী হয়। এই যুগটা অত্যন্ত কলুষিত। তাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু প্রবর্তিত সংকীর্তন আন্দোলনের পন্থাই হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সব চাইতে সরল।
হরের্নাম হরের্নাম হরের্নামৈব কেবলম্।
কলৌ নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব নাস্ত্যেব গতিরন্যথা ॥
এই কলিযুগে ভগবানের দিব্য নাম কীর্তন করা ছাড়া আর কোনও ধর্ম নেই, এবং সেটিই হচ্ছে সমস্ত শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত। এই ছাড়া আর কোনও গতি নেই, আর কেনও গতি নেই, আর কোন গতি নেই। এই শ্লোকটি বৃহন্নারদীয়-পুরাণ থেকে নেওয়া হয়েছে। কেবল ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করাই হচ্ছে একমাত্র কর্তব্য। এই ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই। সুতরাং এটি আমাদের গ্রহণ করতেই হবে।
শ্রীমদ্ভাগবতে আরও একটি শ্লোক আছে। শুকদেব গোস্বামী পরীক্ষিৎ মহারাজকে কলিযুগের পাপ-পঙ্কিল অবস্থার কথা বর্ণনা করে শোনালেন শ্রীমদ্ভাগবতের দ্বাদশ খন্ডের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এবং বর্তমানে তা আমরা আমাদের চোখের সামনেই দেখতি পাচ্ছি। কলিযুগের কথা বর্ণনা করে শুকদেব গোস্বামী বললেন, কলের্দোষনিধে রাজন্নস্তি হ্যেকো মহান্ গুণঃ– হে রাজন! এই কলিযুগ হচ্ছে একটি পাপের সমুদ্রের মতো, কিন্তু তার একটি মহান গুণ রয়েছে। সেটি কি? কীর্তনাদেব কৃষ্ণস্য মুক্তসঙ্গঃ পরং ব্রজেৎ– কেবলমাত্র ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ কীর্তন করার ফলে যে কেউ এই জড় জতের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের কাছে ফিরে যেতে পারে।
এটি অত্যন্ত ব্যবহারিক এবং প্রামাণিত পন্থা এবং কেবল ভগবানের নাম জপ করার মাধ্যমে আমরা পরীক্ষা করে দেখতে পারি আমাদের কতটা উন্নতি হচ্ছে। এই কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলন নতুন কিছু নয়। এটি এমন কিছু নয় যা আমরা নিজেরা তৈরি করেছি বা প্রবর্তণ করেছি। এটি বৈদিক তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত, সমস্ত মহান আচার্যদের দ্বারা স্বীকৃত। আর এই পন্থা অত্যন্ত সরল, এতে কোন ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। আমরা এর বিনিময়ে কোন মূল্য চাইছি না, এর বিনিময়ে আমরা কিছু দাবি করছি না; আমরা বলছি না যে, আমাদের ৫০০ টাকা দিন, তা হলে আমি আপনাকে একটি গুহ্য মন্ত্র দেব, আর সেটি ছ’মাস জপ করলে আপনি ভগবান হয়ে যাবেন। না, এইভাবে আমরা মানুষকে প্রতারণা করছি না। আমরা যা করছি তা সকলের চোখের সামনেই করছি এবং যে কেউ , স্ত্রী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ সকলেই ভগবানের নাম কীর্তন করতে পারেন এবং তার ফল যে কি তা তাঁরা নিজেরাই বিচার করে দেখতে পারেন।
এই বাণীও পৃথিবীর সমস্ত মানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার জন্য আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় আমাদের কেন্দ্র স্থাপন করছি। আমেরিকাতে আমরা নব-বৃন্দাবন স্থাপন করেছি। সানফ্রান্সিসকোতে নব-জগন্নাথপুরী স্থাপিত হয়েছে এবং প্রতি বছর সেখানে রথযাত্রা মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। জগন্নাথদেব, সুভদ্রাদেবী ও বলদেবের জন্য তিনটি রথ থাকে এবং তাদের টেমস নদীর তীরে নিয়ে যাওয়া হয়। আমেরিকাতে ঔপনিবেশিকেরা নিউ ইংল্যান্ড এবং নিউ ইয়র্ক স্থাপন করেছে, তা হলে নব-বৃন্দাবন কেন স্থাপন হবে না ? আমাদের বিশেষ করে নব-বৃন্দাবন প্রতিষ্ঠা করা উচিত. কারণ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ঘোষণা করে গেছেন- ব্রজেন্দ্রনন্দন কৃষ্ণ হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং তাই তিনি হচ্ছেন পরম আরাধ্য এবং তাঁর ধাম বৃন্দাবনও সমভাবে আরাধ্য। পাশ্চাত্যের ছেলেমেয়েরা কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করছে এবং বৃন্দাবনের মতো তাদের একটি থাকবার জায়গা থাকা উচিত। কীর্তনানন্দ স্বামী দু’বছর আগে আমার সঙ্গে বৃন্দাবনে গিয়েছিল। বৃন্দাবন কেমন তা সে জানে, তাই আমি তাকে বলেছি সেখানে অন্তত সাতটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে। বৃন্দাবনে রাধা কৃষ্ণের পাঁচ হাজার মন্দির আছে। কিন্তু সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ মন্দির আছে সাতটি, সেগুলি গোস্বামীরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আমাদের পরিকল্পনা হচ্ছে নব-বৃন্দাবনে থাকা ক্ষেতের ফসল এবং গাভীর উপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করা এবং শান্তিতে কৃষ্ণভক্তি অনুশীলন করা। ‘হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র’ জপ-কীর্তন করা, সেটিই হচ্ছে আমাদের বৃন্দাবনের পরিকল্পনা। যুক্তাহারঃ বিহারাশ্চ যোগ ভবতি সিদ্ধিদা– কৃত্রিমভাবে দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলি বাড়ানো মানব জীবনের উদ্দেশ্য নয়। কেবলমাত্র দেহ ধারণের সংস্থান করেই আমাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত, আর বাকি সময়টা আমাদের পারমার্থিক উন্নতির কাজে ব্যবহার করা উচিত, কৃষ্ণভাবনার অমৃত লাভ করার প্রয়াসে ব্যবহার করা উচিত। এই দেহ ত্যাগ করার পর আমাদের যেন অন্য আর একটি জড় শরীর ধারণ করতে না হয়। এই জীবনেই যেন, আমরা আমাদের প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে পারি। সেটিই মানব-জীবনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
বৈষয়িক জীবন মানে হচ্ছে আহার, নিদ্রা, ভয় এবং মৈথুন-সমন্বিত জীবন, কিন্তু পারমার্থিক জীবন সম্পূর্ণ অন্য রকম। এটি অনেক উন্নত। এই হচ্ছে পশু-জীবন এবং মানব-জীবনের মধ্যে পার্থক্য। পশু জীবনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হচ্ছে আহার, নিদ্রা, ভয় এবং মৈথুন। একটি কুকুর খাদ্যের অন্বেষণ করে, একটি মানুষও তেমনই খাদ্যের অন্বেষণ করে। একটি কুকুর ক্লান্ত হয়ে ঘুমাতে চায়, একটি মানুষও তেমনই ক্লান্ত হয়ে ঘুমাতে চায়। একটি কুকুর অন্য কুকুরের সঙ্গে মৈথুন করে, মানুষও তেমনই স্ত্রী-পুরুষে সঙ্গ করে। ভয় পেলে কুকুর আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে, মানুষও তেমনই আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। একটি কুকুর হয়ত তার দাঁত-নখ দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষ পারমাণবিক বোমা দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রবৃত্তি তো একই। এই চারটি প্রবৃত্তিই মানুষ এবং পশু উভয়ের মধ্যেই দেখা যায়, এবং এই প্রবৃত্তিগুলি চরিতার্থ করার জন্য যে প্রগতি, সেটি মানব-সভ্যতার প্রগতি নয়, সেটি পশু সভ্যতার প্রগতি। মানব সভ্যতার অর্থ হচ্ছে অথাতো ব্রহ্মবিজ্ঞাসা। পরমতত্ত্ব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করতে হবে। সেটিই হচ্ছে মানব জীবন। যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষ পারমার্থিক জীবন সম্বন্ধে জিজ্ঞাসু হয়, জিজ্ঞাসু শ্রেয়ঃ উত্তমম্, ততক্ষণ তাকে একটি মনুষ বলে গণ্য করা যায় না, তাকে তখন একটি পশু বলে গণ্য করা হয়। কারণ সে পশুর মতো জীবন যাপন করে। তাকে অবশ্যই জিজ্ঞাসু হতে হবে, কারণ সে জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধির দুঃখময় জীবনে পতিত হয়েছে। এর কি কোন নিরাময় আছে ? সেই প্রশ্নই করতে হবে। সেটিই হচ্ছে প্রকৃত মানব জীবন, সেটিই পারমার্থিক জীবন।
পারমার্থিক জীবন মানে যথার্থ জীবন, আর বৈষয়িক জীবন মানে পাশবিক জীবন। আমাদের জীবন যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে, যা ভগবদ্গীতায় নির্দেশিত হয়েছে, যুক্তাহারঃ বিহারশ্চ। তার অর্থ এই নয় যে, আমি যদি পারমার্থিক জীবন যাপন করতে চাই, তা হলে আমাকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিতে হবে। পক্ষান্তরে, আমার খাওয়ার প্রবৃত্তিটিকে যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। ভগবদ্গীতায় বর্ণিত হয়েছে, কোন খাদ্যগুলি সাত্ত্বিক, কোন খাদ্যগুলি রাজসিক, আর কোন্ খাদ্যগুলি তামসিক। মনুষ্য স্তরে সাধারণত সাত্ত্বিক খাদ্য আহার করা প্রয়োজন। সুতরাং সর্বপ্রথম আমাদের অভ্যাস নিয়ন্ত্রন করতে হবে। তারপর আমাদের অপ্রাকৃত চেতনা বা কৃষ্ণভাবনামৃত পুনর্জাগরিত করতে হবে। শাস্ত্রে সব কিছু রয়েছে, দুর্ভাগ্যবশত আমরা শাস্ত্রের পরামর্শ গ্রহণ করি না।
এবং প্রসন্নমনসো ভগবদ্ভক্তিযোগতঃ।
ভগবত্তত্ত্ববিজ্ঞানং মুক্তসঙ্গস্য জায়তে ॥
(শ্রীমদ্ভাগবত ১/২/২০)
যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ থেকে মুক্ত হতে না পারছে, ততক্ষণ সে ভগবানকে জানতে পারবে না। তাকে অবশ্যই আত্মজ্ঞান লাভ করতে হবে। ব্রহ্মভূত প্রসন্নাত্মা ন শোচতি না কাঙ্ক্ষতি (ভগবদ্গীতা ১৮/৫৪)। শাস্ত্রে এই সমস্ত নির্দেশগুলি রয়েছে। সুতরাং শাস্ত্রের দেওয়া এই নির্দেশগুলি অনুশীলন করে আমাদের লাভবান হতে হবে এবং সেই বাণী প্রচার করতে হবে। সেটিই হচ্ছে সমস্ত বুদ্ধিমান মানুষের কর্তব্য। সাধারণ মানুষ জানে না যে, ভগবান মহান্। সেটি আমরা বৈদিক শাস্ত্র থেকে জানতে পারি। তাই এই কলিযুগে আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ভগবানের মহিমা প্রচার করা। সেটিই হচ্ছে হরি-কীর্তন। পরং বিজয়তে শ্রীকৃষ্ণসংকীর্তনম্- পূর্ণরূপে পরমেশ্বর ভগবানের মহিমা কীর্তন করতে হবে, আর সেটিই হচ্ছে মানব জীবনের সার্থকতা।